অ্যামব্রোস গুইনেট বিয়ার্স (24 জুন, 1842 – 1914?) একজন গৃহযুদ্ধের প্রাক্তন,আমেরিকান সম্পাদক, সাংবাদিক, ছোটগল্প লেখক এবং ব্যঙ্গকার ছিলেন। তিনি তার ছোট গল্প, আউল ক্রিক ব্রিজের একটি ঘটনা এবং তার ব্যঙ্গাত্মক শব্দ অভিধান, যাকে শয়তানের অভিধান এর জন্য খ্যাত। মানুষের বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃতি নিয়ে তার কাজ ও সমালোচক হিসাবে তার তীব্রতা তাকে “বিটার বিয়ার্স” ডাকনামে ভূষিত করে। বিয়ার্স কবি জর্জ স্টার্লিং এবং কথাসাহিত্যিক ডব্লিউ সি মোরো সহ অনেক তরুণ লেখকদের উত্সাহিত করতে সফল হয়েছিলেন। 1913 সালে, বিয়ার্স মেক্সিকোতে ভ্রমণ করতে যান যার সম্পর্কে তার উৎসাহের প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ ছিল ওই দেশের তৎকালীন বিপ্লব। বিদ্রোহী সৈন্যদের সাথে ভ্রমণ করার সময়, প্রবীণ লেখক কোনও ইঙ্গিত ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যান।
অ্যামব্রোস বিয়ার্সের এই ছোটগল্প 13 জুলাই, 1890-এ সান ফ্রান্সিসকো এক্সামিনার দ্বারা মূলত প্রকাশিত হয়েছিল এবং এটি প্রথমবার বিয়ার্সের বই টেলস অফ সোলজারস অ্যান্ড সিভিলিয়ানস (1891) এ অন্তরভুক্ত করা হয়েছিল।
আমেরিকান গৃহযুদ্ধ (12 এপ্রিল, 1861 – মে 26, 1865; অন্যান্য নামেও পরিচিত) ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন (“উত্তর”) এবং কনফেডারেসি (“দক্ষিণ”) এর মধ্যে হওয়া এক লড়াই। এই যুদ্ধের মূল কারণ ছিল দাসপ্রথাকে পশ্চিম অঞ্চলে সম্প্রসারিত করার দাবী নিয়ে বিরোধ, দক্ষিণ ছিল দাস প্রথা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রসারের পক্ষে। ইউনিয়ন বা ফেডেরাল সেনার হাতে তাদের পরজয় ঘটে।
এই গল্পের মূল চরিত্র পেইটন ফারকুহার কনফেডারেসি (“দক্ষিণ”) এর সমর্থক।গল্পেটি সময়ের ‘নন-লিনিয়ার’ গমন এবং ঘটনাবলীর মোড়ের জন্য বিখ্যাত। চরিত্রের মনের চিত্রকল্পকে বিয়ার্স রৈখিক বর্ণনার পরিবর্তে ‘চেতনার প্রবাহ’ শৈলীতে রচনা করেছেন

আঊল ক্রীক ব্রিজের ঘটনা
ভাষান্তরঃ শান্তনব
মানুষটা উত্তর অ্যালাবামার কোন এক রেলব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে, পায়ের কুড়ি ফিট তলায় দুরন্ত জলপ্রবাহের দিকে তাকিয়েছিল। তার হাতদুটি পিছমোড়া করে, দড়ি দিয়ে বাঁধা। অন্য একটা দড়ির ফাঁস গলায় শক্ত করে প্যচানো। সেটা মাথার উপর একটা মজবুত কাঠের ক্রুশে ঝোলানো আর ঢিলে অংশটা নেমে এসে হাঁটুর কাছে থেমে গেছে। কিছু আলগা কাঠের পাটাতন লাইনের রেইলগুলিতে ঠেকনা দেওয়া ছিল, লোকটির নিজের ও তার দুই জল্লাদ- যুক্তরাষ্ট্রীয় সেনার দুই সৈনিকের জন্য, পা রাখার মতন ব্যবস্থা, যাদের পরিচালনা করছিলেন একজন সেনা সার্জেন্ট যিনি নাগরিক জীবনে হয়ত ডেপুটি শেরিফ হতে পারতেন।
অনতিদূরে একই অস্থায়ী পাটাতনের উপর নিজের র্যাঙ্ক এর উর্দিধারী এক অফিসার দাঁড়িয়েছিলেন, সশস্ত্র। ইনি একজন ক্যাপ্টেন। ব্রিজের প্রতিটি প্রান্তে একজন সেন্টিনেল রাইফেল সমেত “সমর্থন” নামক বিখ্যত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়েছিল, অর্থাৎ বাম কাঁধের সামনে বন্দুকের নল খাড়াভাবে তুলে, বুকের উপর আড়াআড়ি ফেলা পুরোবাহুর উপরে বাঁট এর অংশ ঠেকনা দেওয়া, – আনুষ্ঠানিক এবং অপ্রাকৃতিক ভঙ্গিমা, শরীরকে জোর করে খাড়া গাড়ির মতন করে রাখা। ব্রিজের মাঝামাঝি কী ঘটছে তার খবর নেওয়া এই দুইজনেরই কর্তব্য বলে মনে হয়নি; তারা শুধু দুইপাশের পায়ে হাঁটা গলির দুই প্রান্ত, অবরোধ করে কোনোমতে দাঁড়িয়েছিল ।
একপ্রান্তের সেন্তিনেলের পিছনে আর কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। রেল লাইন সোজা গিয়ে একশ গজের জঙ্গলে মিশেছে, তারপর, বাঁক নিয়ে, দৃষ্টির অগোচরে মিলিয়ে গেছে। নিঃসন্দেহে আরেকটি আউট পোষ্ট দূরে কোথাও থেকে থাকবে। স্রোতের অন্যপারে বিস্তীর্ণ খোলা জমি- মসৃণ ঢাল যার উপরিভাগ খাড়া গাছের সারিতে ঢাকা, রাইফেল এর জন্য গর্ত করা, সাথে একখানি ফাঁকা গলি যার মধ্যে দিয়ে পিতলের কামানের নল মুখ বাড়িয়ে ব্রিজের দিকটা আগলাচ্ছে।
ঢালু জমির মাঝ বরাবর ব্রিজ ও কেল্লার দূরত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে একদল দর্শক- পদাতিক সৈন্যের একক একটি কোম্পানি, “কুচকাওয়াজ বিরতি” কায়দায়, তাদের বন্দুকের বাঁট মাটিতে নামানো, নলগুলি ঈষৎ পিছনে কাত হয়ে ডান কাঁধে ভর দেওয়া। হাতজোড়া আড়াআড়ি গুলির বেল্টের উপর রাখা।
ব্রিজের উপরে ওই চারজন মানুষ ছাড়া আর কেউই নড়ছিল না।কোম্পানির অবস্থান ব্রিজের অভিমুখে, দৃষ্টি স্থির, অবিচল।
সেন্টিনেল দুজনকে, নদীর পাড়ে দাঁড়ানো, ব্রিজের শোভাবর্ধক দুই মূর্তি বলেও মনে হতে পারে। ক্যাপ্টেন সাহেব হাত মুড়ে, নিঃশব্দে, অধঃতন কর্মীদের কাজ নিরীক্ষণ করছিলেন, কিন্তু কোন ইশারা করছিলেন না। মৃত্যু, যেন এক বিশিষ্ট অভ্যাগত, তাই যখন সে খবর দিয়ে আসে তাকে আনুষ্ঠানিক ঊপাচারের মাধ্যমেই বরণ করতে হয়, এমনকি যারা তার সাথে সুপরিচিত তাদেরও। সেনার অনুশাসনে নৈশব্দ আর স্থৈর্য মননের প্রতীক।
ফাঁসিকাঠে দাঁড়ানো লোকটির বয়স আন্দাজ পঁইত্রিশ হবে। একজন অসামরিক নাগরিক, জীবিকা বলতে গেলে, কৃষিকাজ। মুখশ্রী ভাল- নাক সোজা, দৃঢ় চোয়াল, কপাল চওড়া যার উপরে ঘন কালো পিছনে ফেলে আঁচড়ানো চূল, কানের পিছনের ফ্রক কোটের কলারে গিয়ে শেষ হয়েছে। পুরু গোঁপ ও সুচাল দাড়ি কিন্তু জুলপি বিহীন। চোখগুলি বড় ও ঘন ধূসর বর্ণের এবং মুখে এক অমায়িক অভিব্যক্তি যা দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না যে এর গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলতে পারে। স্পষ্টতই এ কোন নৃশংস খুনি নয়। তবে সেনার লিবারাল আইনে বিভিন্ন মানুষকে ফাঁসীতে ঝোলাবার নিয়ম রয়েছে। এবং অসামরিক মানুষরা তার থেকে বঞ্চিত নয়। বন্দবস্ত শেষ হলে, দুই সৈনিক পিছিয়ে দাঁড়ায় আর ওরা যে পাটাতন এর উপর দাঁড়িয়েছিল, সেগুলি তুলে নেয়।
ক্যাপ্টেনসাহেব এর দিকে ফিরে স্যালুট জানিয়ে সার্জেন্ট অফিসার এর পিছনে গিয়ে দাঁড়ান, সাথে সাথে সে এক গজ দূরত্বে সরে যায়। এই অবস্থান বদলের ফলে, আসামী ও সার্জেন্ট, একই পাটাতনের দুই প্রান্তে রয়ে গেছিল, যে প্রান্ত দুটি ব্রিজের তিনখানি ক্রসটাই জুড়ে বিছানো ছিল। আসামীর দিকের পাটাতনের অংশ প্রায় চতুর্থ টাই এর গোরায় পৌঁছে গেছিল। ক্যাপ্টেন সাহেবের দেহের ওজনের উপরে ভর করেই এই পাটাতনটির ভারসাম্য রাখা ছিল এখন যা সার্জেন্ট এর দৈহিক ভরে চালান হয়েছিল । পূর্ববর্তী মানুষটির সঙ্কেত পেলেই বর্তমান মানুষটি সরে দাঁড়াবেন, ফলে পাটাতনটি একদিকে নুইয়ে পড়বে, আর আসামী ওই দুই টাই এর মাঝখানের খালি অংশে লটকে যাবে।
এই উপায়টি তার বিচারে বেশ নির্ঝঞ্ঝাট ও কার্যকরী মনে হয়েছিল. তার মুখে কোন ঢাকা দেওয়া নেই নেই চোখে কোন পট্টি, এক মুহূর্তের জন্য তার টলমল পাদদেশ র দিকে তাকিয়ে সে দৃষ্টি ভাসিয়ে দিয়েছিল, পায়ের তলার ঘূর্ণি জলের দুরন্ত উন্মত্ত স্রোতের দিকে। এক টুকরো ভেসে যাওয়া কাঠের টুকরোতে তার দৃষ্টি আটকতেই সে চোখ দিয়ে তার অভিমুখ অনুসরণ করেছিল। কি মন্থর গতিতে সেটা এগিয়ে চলেছে! কি অলস স্রোতের টান! সে চোখ বন্ধ করেছিল, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা শেষবার ভাবার জন্য। ভোরের সূর্যস্নাত নদীর সোনালী জল, কিছু দূরে নদীর তীরে ও গতিপথের অভিমুখে প্রলম্বিত ধোঁয়াশা, কেল্লা, সেনাবাহিনী, ভেসে যাওয়া কাঠ- সব যেন তার চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। আর এবার অন্য এক উপদ্রব তার চিন্তায় প্রবেশ করে। প্রিয়জনের স্মৃতিচিন্তার জাল ভেদ করে ভেসে আসে এক অচেনা শব্দ, যা সে অনুধাবনও করতে পারেনা অগ্রাহ্যও করতে পারেনা, এক ধারালো, সুস্পষ্ট, ধাতব বাদ্যযন্ত্রসুলভ, কামারের হাতুড়ি পেটার মতন শব্দ যার মধ্যে ক্রমান্বয় এক অনুরণন ছিল। শব্দটা কীসের এই ভেবে সে বিস্মিত হয়, এবং তা পরিমিত দূরত্বে নাকি বহুদূরে – মনে হয় যেন দুদিক থেকে একই সঙ্গে ভেসে আসছিল। বারংবার ফিরে আসছিল, কিন্তু খুব ধীর গতিতে যেন কফিনের পেরেক পোঁতা চলছে। সে অপেক্ষা করে, প্রতিটি নতুন আঘাতের সাথে কমে আসা ধৈর্য আর- কেন সে বুঝতে পারছে না- এই আশঙ্কা নিয়ে। নৈশব্দের বিরামকাল ক্রমে বাড়ছিল; বিলম্বগুলি প্রাণান্তকর হয়ে উঠছিল, তাদের দ্বৈত অক্ষরতা দিয়ে শব্দগুলি অত্যাধিক শক্তিশালি এবং তীব্র হয়ে ওঠে। তার শ্রবণশক্তি কে ছুরির তীক্ষ্ণতায় আঘাত করতে থাকে; সে যেন ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠবে, মনে হয়েছিল। আদতে শব্দটি ছিল তার ঘড়ির টিকটিক ধ্বনি।
সে চোখ মেলে তাকিয়ে আবার নীচের জল দেখটে পায়। “ আমি নিজের হাত মুক্ত করতে পারলে,” সে চিন্তা করেছিল, ” গলার ফাঁস ছুঁড়ে ফেলে নদীতে ঝাঁপ দিতে পারি। ঝাঁপ দেওয়ার ফলে বন্দুকের গুলি থেকে গা বাঁচিয়ে, জোরে সাঁতার কেটে, ওই পাড়ে পৌঁছে, জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে, বাড়ি ফিরতে পারি, আমার বাড়ি, ধন্যবাদ ঈশ্বর ওটা এখনও এদের থেকে বহুদূরে; আমার স্ত্রী আর বাচ্চারা, এখনও এই বম্বেতেদের পরিসীমার নাগালের বাইরে আছে”
যে ভাবনাগুলি এখানে শব্দে প্রকাশ করা আবশ্যক, সেগুলি এই দুর্ভাগা মানুষটার মাথায় উদ্ভূত না হয়ে এক পলকের জন্য বিক্ষিপ্ত হতেই ক্যাপ্টেন সাহেব মাথা নাড়িয়ে সার্জেন্টকে ঈশারা করেন আর সে পাটাতন থেকে সরে দাঁড়ায়।
২
পেইটন ফারকুহার আলামাবার ধনী এবং অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত পরিবারের এক সম্পন্ন কৃষক ছিল। নিজে একজন দাসপ্রভু এবং অন্যান্য দাসপ্রভূ দের ন্যায় একজন রাজনিতিকও হওয়ায় , স্বাভাবিক ভাবেই সে প্রকৃত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও দক্ষিণের দাবীতে গভীরভাবে নিবেদিত ছিল, কিছু আগ্রাসী পরিস্থিতি, যা এখানে ব্যাখ্যা করার বিশেষ প্রয়োজন নেই, তাঁকে পদাতিক সেনার সার্ভিস থেকে দূরে রেখেছিল, এক বিপর্যয়কারী যুদ্ধের শেষে পদাতিক সেনাদল কোরিনথ এর পতন ঘটাতেই, সে এক অলৌকিক সংযমের ভারে চাপা তার জীবনীশক্তির অভিলাষ, সেনার জীবনের বৃহত্তর প্রাপ্তি, উপাধিগ্রহণ এর অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল। অন্যান্য বীর যোদ্ধাদের ন্যায় তারও উপাধিলাভ এর যোগ প্রবল ভেবেছিল, তবে ইতিমধ্যে কোন সামরিক দায়িত্বও সে পালন করেনি, দক্ষিণের সেনাবাহিনীর সেবা করার কাজ তার জন্য একটু বেশি বিনয়ধর্মী ছিল, আবার অসামরিক ভাবমূর্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তার জন্য বিপজ্জনক কোনো দুঃসাহসিক কাজ করা শ্রেয় ছিলনা, যিনি হৃদয়ের গভীরে একজন সৈনিক, কিন্তু সরল বিশ্বাসে এবং খুব কম যোগ্যতা সত্যেও যিনি এই দুষ্টচরিত্রের আপ্তবাক্যটি অন্তত আংশিকভাবে মেনে নিয়েছিলেন যে, প্রেম এবং যুদ্ধে সবই ন্যায়সঙ্গত।
এক সন্ধ্যায় যখন ফারকুহার তাঁর স্ত্রীর সাথে ক্ষেত এর সীমানায় এক জংধরা বেঞ্চে বসেছিল, তখন ধুসর-উর্দির এক সৈনিক ঘোড়া ছুটিয়ে গেটের সামনে এসে জল খেতে চায়। শ্রীমতী ফারকুহার নিজের শ্বেতশুভ্র হাতে সৈনিক কে জল পান করাবার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন। মহিলা যখন জল আনতে যান তার স্বামী সেই ধুলামলিন ঘোড়সওয়ার এর কাছে গিয়ে উদগ্রীব চিত্তে যুদ্ধের খবর জানতে চেয়েছিল।
“ ইয়াঙ্করা( উত্তুরে) রেলপথ মেরামত করছে” লোকটি বলেছিল “ তারপর আরেকটি আক্রমণ এর জন্য তৈরি হচ্ছে। ওরা আউলক্রীক ব্রিজ অবধি পৌঁছে গেছে। মেরামত করে চালু করতে এবং উত্তরের নদীর পাড়ে রসদ জমা করতে। কমান্দান্ত এক আদেশনামা জারি করেছেন, কোন অসামরিক ব্যাক্তি, রেলপথ, ব্রিজ, টানেল এবং ট্রেন মেরামতের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে ধরা পড়লে তাকে ফাঁসিতে ঝোলান হবে, আমি আদেশ্নামা দেখেছি।“
“ ওরা আউলক্রীক ব্রিজ থেকে কতদূরে রয়েছে ?” ফারকুহার জিজ্ঞেস করেছিল।
“ তা প্রায় মাইল তিরিশেক”
“ খাঁড়ির এই পাড়ে কোন বাহিনী নেই”?
“শুধু একটা পিকেট পোষ্ট আছে আধ মাইল জুড়ে, রেলপথের উপর, আর একজন সেন্তিনেল, ব্রিজ এর এই পাড়ে মোতায়েন রয়েছে”
“যদি কোন মানুষ- অসামরিক এবং ফাঁসির শিক্ষানবিশ- পিকেট পোষ্ট এড়িয়ে এবং সেন্তিনেলকে টপকাতে পারে,” ফারকুহার হেসে বলেছিল
”তাহলে তার পক্ষে কি করা সম্ভব?”
সৈনিকটি চিন্তিত হয়ে পড়ে। “আমি ওখানে এক মাস আগে ছিলাম,” সে উত্তর দেয় “আমি দেখেছি যে গত শীতকালের বন্যায়, সেতুর এই পাশে বৃহত পরিমাণে কাঠ ভেসে এসে জমা হয়েছে। এখন সেগুলি শুষ্ক হয়ে আছে এবং আগুন দিলে দাউ দাউ করে জ্বলতে পারে।”
এরপর মহিলা জল আনেন, যা সৈনিক পান করে। সে তাকে আলঙ্কারিক ঢঙে আনতশিরে ধন্যবাদ জানিয়ে, তার স্বামীর দিকে নমস্কার করে চলে যায়। এক ঘণ্টা পর, রাতের অন্ধকারে, ঘোড়া চড়ে উত্তরের দিকে ফেরত যাওয়ার সময়, সে খামার বাড়ির পথ আবার পেরোয়। আসলে সে ছিল ছদ্মবেশী ফেডারেল বাহিনীর এক স্কাউট ।
৩
পেইটন ফারকুহার যখন ব্রিজ থেকে সোজা নিচে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তখন সদ্য মৃত এক মানুষের মতন তার চেতনার অবলুপ্ত ঘটে গেছে। এই অবস্থা থেকে তার জাগরণ হয়— বহুযুগ পরে জ্ঞান ফিরে এসেছে- অনুভূতির মাঝে- গলায় একটি তীব্র চাপের ব্যথা এবং তার সাথে শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়ার অনুভুতি বোধ করেছিল।
তীক্ষ্ণ, কষ্টদায়ক ব্যাথাটি তার ঘাড় থেকে শরীরে এবং অঙ্গগুলির প্রত্যেক তন্তুতে ছড়িয়ে পড়ছিল। এই ব্যথা যেন স্পষ্টভাবে পরিভিন্ন শাখা ধরে ছড়িয়ে যাচ্ছইল এবং অতী দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যবধানে ধাক্কা দিতে দিতে, লেলিহান তীব্র আগুনের ধারাবাহিক শিখার মত ছুঁয়ে যাচ্ছিল, যা তাকে অসহনীয় তাপমাত্রায় উত্তেজিত ও উষ্ণ করে তুলচিল। ।
মস্তিষ্কের মধ্যে, সে কোন কিছু অনুভব করতে পারছিল না, শুধু এক পরিপূর্ণ- ভিড়ে ঠাসা জড়তা ছাড়া। এই অবস্থাক্রমের সঙ্গে কোনো চিন্তা জড়িত ছিল না। তার বুদ্ধিমত্তার অংশটি আগেই মুছে গেছিল; শুধু অনুভব করার শক্তিটুকু ছিল, এবং অবস্থাটি খুবই যন্ত্রণাপূর্ণ ছিল। তবে চলাচলের সচেতনতা ছিল।
সে যেন কোন জ্যোতিময় মেঘে আবৃত, আগ্নেয় হৃদয়ের পার্থিব অস্ত্বিত্বহীন অংশ যার অতীতখানি অকল্পনীয় দোলনের ঘূর্ণাবর্তে দুলছিল, এক বৃহৎ পেন্ডুলাম এর মতো। তারপর অকস্মাৎ একসাথে এক অতিকায় জলোচ্ছ্বাস; ও ভীষণ গর্জন কানে প্রবেশ করতেই সমস্ত আলো উপর দিকে বিদায় নেয়, আর সব কিছু হিমশীতল এবং অন্ধকার হয়ে যায়। চিন্তাশক্তির যেন পুনঃস্থাপনা ঘটে; তার গলার দড়ি ছিন্ন হয়ে সে জলের স্রোতে নিমজ্জিত হয়েছে এইটুকু সে বুঝতে পেরেছিল। দমবন্ধ হওয়ার অতিরিক্ত কোন উপক্রম ছিল না। কণ্ঠে আবদ্ধ দড়ির ফাঁস তার ফুসফুসে নদীর জল প্রবেশ করতে বাঁধা দিচ্ছিল। জলের নিচে গলায় ফাঁসে মৃত্যু!- ধারণা বেশ পরিহাসকর শোনাচ্ছিল..সে অন্ধকারের মধ্যেই চোখ মেলে চেয়ে মাতাহ্র উপর এক আলোকময় দ্যুতি দেখেছিল, কিন্তু সে যেন কত দূরে, কত অধরা! সে তখনও ডুবছিল, কারণ আলকদ্যুতি ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছিল। তারপরেই উহা ক্রমে বৃহৎ ও উজ্জ্বল হতে সুরে করে, আর তৎক্ষণাৎ সে বুঝতে পেরেছিল যে সে উপরে ভেসে উঠতে চলেছে- যদিয়ও দ্বিধগ্রস্থ মনে, “ ফাঁসি ও জলে ডুবে মৃত্যু,” সে ভেবেছিল “তাও মন্দ নয়; কিন্তু কখনই গুলি খেয়ে মৃত্যু কাম্য নয় আমার; সে খুবই অনুচিত হবে” একটা তীব্র ব্যাথা কব্জি দুটোয় অনভব করছিল কিন্তু এই বোধ ছিলনা যে সে হাতের বন্ধন খুলে ফেলতে চাইছে। এরপর সে অসাধ্য সাধনে মনোযোগ দিয়েছিল, যেমন একজন জাগলার দেয়, ফলের চিন্তা না করে। আহা চমৎকার চেষ্টা!- অপূর্ব, কি অতিমানবিক ক্ষমতা তার! আহ, একখানি নিখুঁত হাতযশ এর ঝলক ছিল ব্যাপারটা! শাবাশ! দড়ি খুলে পড়ে যায়; তার হাতদুটো আলাদা হয়ে উপরে ভেসে উঠতেই, দুইপাশের ক্রমবর্ধমান আলোর রোশনাইতে সেগুলি আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছিল। ওদের দিকে নতুন কিছু দেখার উৎসাহে তাকিয়ে ছিল সে তারপর বাহুদ্বয় গলার ফাঁস টেনে ধরেছিল আলগা করতে। সেটা ছিঁড়ে ফেলে একটানে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতেই, দড়ির সেই আঁকাবাঁকা গমন যেন এক ভুজঙ্গের সর্পিল গতিকে মনে করায়। “আবার পরাও, আবার পরাও!” হাতদুটোকে সে যেন এ কথা চিৎকার করে বলেছিল মনে হয়, কারণ ফাঁস আলগা করার সাফল্য যেন গলার ওই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেই প্রথিত ছিল।
অসহ্য এক কামড়ের যন্ত্রণায় তার গ্রীবা যেন কাতর; মাথায় আগুন লেগেছিল, হৃদয়, যা ম্রিয়মাণ ছন্দে চলছিল, এক লাফে মুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়া আসার উপক্রম হয়। তার গোটা শরীর এক অসহায় ক্রোধে দুমরে মুচরে যাচ্ছিল! কিন্তু তার অবাধ্য হাত দুটো কিছুতেই নির্দেশ মানছিল না। ওরা প্রবলভাবে জল কাটিয়ে, দ্রুত, নিম্নগামী সাঁতারে, তাকে জলের উপর ভাসিয়ে তুলচ্ছিল। তার মাথা ক্রমে জলের উপরে ভেসে উঠছে বুঝতে পারছিল, সূর্যয়ের প্রখর আলো চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে; বুক হাপরের মতন উঠানামা করছিল, আর এক বিশাল ও প্রবল বেদনা ভরা ফুসফুস যে বাতাস ভিতরে গ্রহণ করেছিল, আর্তনাদ এর সঙ্গে তা যেন স্বাধীন হয়ে বেরিয়ে আসছিল মুখ দিয়ে। এবার যেন সে নিজের শারীরিক অস্তিত্বের পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছিল। অধিপ্রাক্রিতিক উপায়ে তাঁর স্নায়ুতন্ত্র যেন আবার সজাগ হয়ে উঠেছিল। জৈবিক ব্যবস্থার এক বিশ্রী গোলযোগের ফলে তা এতটাই সচেতন ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে যে এমন অনেক কিছুই ধরা পড়ছিল যা আগে কখনও অনুভূত হয়নি। স্রোতের উচ্ছ্বাস মুখের উপর অনুভব করছিল তার সাথে জলের ঝাপটার পৃথক শব্দ ভেসে আসছিল। স্রোতের তীরে ঘন জঙ্গলের দিকে তাকাতেই, সে যেন প্রত্যেকটা গাছকে আলাদা করে দেখতা পাচ্ছিল, তাদের সবুজ পাতার ভিতরে শীরা উপশিরার গায়ে ভ্রাম্যমাণ কীট পতঙ্গ, পঙ্গপাল, উজ্জ্বল রঙ্গিন সব প্রজাপতি, ধুসর মাকড়শা, জাল বিছিয়েছে এক ডাল থেকে অন্য ডালে। লাখ লাখ ঘাসের ফলার উপরে জমা শিশির বিন্দুর মধ্যে প্রতিসৃত সূর্যালোকের রামধনু রং। সেই ভ্রমরের গুঞ্জন যারা স্রোতের উপরিভাগে নাচছিল, ড্রাগন মাছির পাখা নাড়ার শব্দ, জল-মাকড়শার সাঁতরে যাওয়া পায়ের শব্দ, যেন বইঠা দিয়ে নৌকা বাইছে কেউ- এ সমস্তই সুশ্রাব্য হয়ে উঠেছিল, একটা মাছ তার চোখের নীচ দিয়ে গলে জেতেই, তার গায়ের জল কেটে যাওয়ার শব্দ কানে ভেসে এলো।
সে স্রোতের নিচের দিকে মুখ করে তীরের পানে এগিয়ে আসছিল; এক মুহুর্তের মধ্যে দৃশ্যমান জগৎটি ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে পাক খাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, যার ভরকেন্দ্র সে নিজেই
আর সে দেখতে পাচ্ছিল সেই ব্রিজ, কেল্লা, ব্রিজের উপরে সৈন্যদল, সেই ক্যাপ্টেন কে, তার পাশে সার্জেন্ট, দুইজন প্রাইভেট ও তার জল্লাদ দের।
নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে তাদের ছায়ামূর্তির মতন দেখাচ্ছিল। তারা চিৎকার করে অঙ্গভঙ্গি করছিল তার দিকে উদ্দ্যেশ্য করে। ক্যাপ্টেন তার পিস্তল টেনে বের করেছিলেন কিন্তু গুলি চালান নি, বাকিরা নিরস্ত্র ছিল। তাদের অঙ্গভঙ্গি কুৎসিত ও বীভৎস ছিল। হথাত সে শুনতে পায় একটা তীক্ষ্ণ বস্তুর মাথার পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাওয়ার শব্দ, মুখে চোখে জল ছিটকে লাগে।
তারপর দ্বিতীয় একটা আওয়াজ শোনে, আর দেখতে পায় একজন সেন্টিনেল তার রাইফেল কাঁধে তাক করে আছে, নীলাভ এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী নলের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল। জলমগ্ন মানুষটি দূরে ব্রিজের উপরে বন্দুকের মাছিতে নিশানাবদ্ধ লোকটির চোখ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল, সরাসরি তার চোখের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ লোকটার। লক্ষহ করেছিল, যে সেই চোখের তারা ধুসর রঙের, তাতে মনে পড়ে, ধুসর চোখের মানুষরাই সব থেকে অভ্রান্ত হয়, সব বিখ্যাত নিশানাবাজরাই ধুসরনেত্র বলে শোনা যায়। যাই হোক এই লোকটি নিশানা ভ্রষ্ট হয়েছিল।
একটি পাল্টা ঘূর্ণি ফারকুহারকে ধরে অর্ধেক বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে উল্টে দেয়; সে আবার দুর্গের বিপরীত তীরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়েছিল। একঘেয়ে গানের মধ্যে এবার স্বচ্ছ, উচ্চ কণ্ঠের একটি শব্দ তার পিছনে মন্দ্রিত হয়েছিল এবং এক স্বতন্ত্র তীব্রতায় জলের ধারে ঘেঁষে অন্য সমস্ত শব্দকে এমনকি তার কানে ঢেউয়ের আঘাতকে ভেদ করে আসে এবং তাকে বশীভূত করে ফেলছিল। যদিও সে কোন সৈনিক ছিল না, কিন্তু ঘন ঘন সেনা ছাউনিতে যাতায়াতের ফলে এই স্বপ্রনদিত, একটানা, উচ্চাকাঙ্খিত নির্ঘোষের তাত্পর্য ও অভিঘাত বোঝার ক্ষমতা তার ছিল ; কতটা ঠাণ্ডা এবং নির্মমভাবে—কী সমান, শান্ত স্বরে, এবং সৈন্যদের মধ্যে প্রশান্তি ও প্রসন্নতা ছড়িয়ে —কী নির্ভুল পরিমিত ব্যবধানে সেই নিষ্ঠুর শব্দগুলি আউরে যাচ্ছিলেন লেফটেন্যান্ট:
“কোম্পানি!…মনোযোগ!…কাঁধে অস্ত্র!…প্রস্তুত!…লক্ষ্য!…ফায়ার!”
ফারকুহার ডুব দিয়েছিল – যতটা গভীরে পারে, ডুব। নায়াগ্রার কণ্ঠস্বরের মতো জল তার কানে গর্জন করছিল, তবুও সে গুলি নিক্ষেপের নিস্তেজ বজ্রধ্বনি শুনতে পেল এবং জলপৃষ্ঠের দিকে আবার উঠতেই, একদিক চ্যাপ্টা, ধীরে ধীরে নীচের দিকে দোদুল্যমান ধাতুর চকচকে টুকরোগুলির সাথে দেখা মিলেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ওর মুখ এবং হাত স্পর্শ করেছিল, তারপর তাদের বংশধারা অব্যাহত রেখে দূরে ছিটকে পড়েছিল। একজন তার কলার এবং ঘাড়ের মধ্যে আটকে যায়; অস্বস্তিকরভাবে উষ্ণ ঠেকেছিল এবং বস্তুটি ছোঁ মেরে বের করে ফেলে দেয় সে ।
শ্বাসকষ্টের জন্য সে যখন জলপৃষ্ঠে উঠে আসে, দেখতে পায় যে সে দীর্ঘ সময় ধরে জলের নিচে ছিল; প্রত্যক্ষভাবে অনেক দূরে, নিচের দিকে-নিরাপত্তার কাছাকাছি। সৈন্যরা আবার বন্দুক লোড করা শেষ করেছিল প্রায়; ধাতব র্যামরডগুলি একসাথে রোদে ঝলসে উঠেছিল যখন তাদের ব্যারেল থেকে টেনে বাতাসে ঘোরানো হয়, এবং সকেটের ভিতর ঠেলে দেওয়া হয়। দুই সেন্টিনেল আবার গুলি চালিয়েছিল, পৃথকভাবে এবং অকৃতকার্য হয়ে।
এই মানব শিকারটি তার কাঁধের উপর দিয়ে এই সব দেখতে পায়; এখন স্রোতের অনুকূলে সে জোরে সাঁতার কাটছিল। তার মস্তিষ্ক তার হাত এবং পায়ের মতোই উদ্যমী হয়ে উঠেছিল; বিদ্যুতের দ্রুততায় সে ভাবছিল
:
“অফিসার” যুক্তি সাজায়, ” মার্টিনেটের সেই ভুল দ্বিতীয়বার করবেন না। গুলি নিক্ষেপ একবার ফাঁকি দেওয়া একটি একক গানশটের মতোই সহজ ব্যাপার। তিনি সম্ভবত ইতিমধ্যেই ইচ্ছামতো বারংবার গুলি ছোঁড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করুন, এত বুলেটকে ফাঁকি দিতে আমি পারব না!”
তার দুই গজের মধ্যে একটি ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস ও পরে একটি বিকট শব্দ হয়, দিমিণূএনদো, ধীরে ধীরে সেই তীব্র প্রভাব বাতাসের মধ্য দিয়ে দুর্গের দিকে ফিরে গিয়ে একটি বিস্ফোরণে পর্যবসিত হয় যা নদীকে তার গভীরে আলোড়িত করেছিল! জলের ঢেউ এর একটি উচ্ছ্বাসিত চাদর তার উপর এসে পড়তেই, তাকে প্রায় দৃষ্টিহীন করে দিল, শ্বাসরোধ করে দিল! এবার কামান খেলায় নেমেছিল ।
ছিটকে পড়া জলের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকাতেই সে শুনতে পাচ্ছিল সামনের বাতাসে বিক্ষিপ্ত গুলির মূর্ছনা চলছে, এবং মুহূর্তের মধ্যে তা ওপারের বনের ডালপালা ভেঙে তছনছ করে ফেলছিল।
“ওরা আর এমন করবে না,” সে ভাবল; “পরের বার ওরা গ্রেপ চার্জ ব্যবহার করবে। আমাকে অবশ্যই নলের দিকে নজর রাখতে হবে; ধোঁয়া আমাকে জানান দেবে- শব্দ দেরিতে আসছে; উৎক্ষেপণের অনেক পরে।উৎকৃষ্টমানের কামান।”
হঠাৎ অনুভব করল সে নিজে বৃত্তাকারে ঘূর্ণায়মান – একটি শীর্ষের মতো ঘুরছে। জল, নদীতীর, জঙ্গল, এখন দূরবর্তী সেতু, দুর্গ এবং মানুষ, সবকিছু মিশেল এবং অস্পষ্ট ছিল। শুধুমাত্র তাদের রং দিয়ে তাদের নির্ধারণ করা বোঝা যাচ্ছিল; বৃত্তাকার অনুভূমিক বর্ণের রেখাগুলো—এটাই সে দেখতে পাচ্ছিল। এক ঘূর্ণিতে আটকে পড়ে সে এবং আগাম বেগে পাক খেতে থাকে যা তাকে অসুস্থ করে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে স্রোতের বাম পাড়ের পাদদেশে-দক্ষিণ তীরে-এবং একটি প্রজেক্টিং পয়েন্টের পিছনে নুড়ির উপর নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যা তাকে শত্রুদের কাছ থেকে আড়াল করে। তার বেগের এই আকস্মিক গতিরোধ, নুড়ির উপর তার একটি হাতের ঘর্ষণ তাকে পুনরুদ্ধার করেছিল এবং সে আনন্দে কেঁদে ওঠে। বালির মধ্যে তার আঙ্গুলগুলি খুঁড়ে, মুঠোয় করে নিজের উপর ছুড়ে দেয় এবং সশব্দে আশীর্বাদ করে। শেগুলি দেখতে হীরা, রুবি, পান্নার মতো লাগছিল; এমন সুন্দর কিছু ভাবতে পারছিলনা যা এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ । পাড়ের উপরে বৃক্ষরাজি ছিল বিশাল আকারের কাননবৃক্ষ; তাদের বিন্যাসে একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম লক্ষ্য করেছিল সে, প্রস্ফুটিত ফুলের সুবাস প্রাণভরে আঘ্রাণ করেছিল।
একটি অদ্ভুত গোলাপী আলো তাদের কাণ্ডের মধ্যে ফাঁকা জায়গা দিয়ে জ্বলছিল এবং বাতাস তাদের শাখায় ঈলীয়াণ বীণার সঙ্গীত তৈরি করেছিল। তার পলায়নকে সে নিখুঁত করতে চায়নি- পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সেই মনোমুগ্ধকর জায়গায় থাকতেই সন্তুষ্ট বোধ করছিল।
তার মাথার উপরে ডালপালাগুলির মধ্যে কামানের একটি গ্রেপচার্জ এর ধাক্কা তাকে দিবাস্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তুলেছিল। বিভ্রান্ত কামানচালক তাকে এক এলোপাথাড়ি বিদায় বার্তা পাঠিয়েছিল। সে এক্লাফে ঝুঁকে পড়ে, ঢালু তীর বেয়ে ছুটে যায় এবং বনের ভীতে মিলিয়ে যায়।
সারাদিন সে ঘুরে বেড়ায়, সূর্যের বৃত্তাকার পথ ধরে। অরণ্যকে অন্তহীন মনে হয়; কোথাও সে এর মধ্যে ফাঁক খুঁজে পায় না, এমনকি একটি কাঠের রাস্তাও খুঁজে পায় না। সে জানতই না যে সে এত ঘন বনাঞ্চলে বাস করে।
এই উপলব্ধির মধ্যে একটা অস্বস্তির উদ্রেক হয়েছিল।
রাত নামতেই সে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, বিক্ষতচরণ হয়ে পড়ে। স্ত্রী-সন্তানের চিন্তা তাকে তাড়না দিচ্ছিল। অবশেষে সে এমন একটি রাস্তা খুঁজে পায় যা তাকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে জানত। এটি একটি শহরের রাস্তার মতো প্রশস্ত এবং ঋজু ছিল, তবুও তা অপ্রচলিত বলে মনে হয়েছিল। কোন ক্ষেত এর সীমানা নেই, কোথাও কোন বসতি নেই। মানুষের বাসস্থানের ইঙ্গিতবাহী কুকুরের ডাকও নেই।
গাছের কালো দেহগুলি উভয় দিকে একটি সমান্তরাল প্রাচীর তৈরি করেছে, যা দিগন্তে একটি বিন্দুতে গিয়ে বিলীন হয়েছে, পাঠ্যপুস্তকের একটি রেখাচিত্রের মতো। মাথার উপরে, সে যখন অরণ্যের মধ্য দিয়ে একফালি আকাশের দিকে তাকায়, তখন অচেনা এবং অদ্ভুত সব নক্ষত্রপুঞ্জের দুর্দান্ত স্বর্ণাভ তারাগুলি দলবদ্ধভাবে জ্বলজ্বল করছিল। সে নিশ্চিত ছিল যে তাদের যে ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে তার একটি গোপন এবং দুষ্ট তাত্পর্য ছিল। দুপাশের অরণ্য একক শব্দে পূর্ণ ছিল, যার মধ্যে-একবার, দুবার এবং বারংবার- সে স্পষ্টভাবে অজানা জিহ্বায় ফিসফিস শুনতে পেয়েছিল।
তার ঘাড় ব্যাথা করছিল এবং সেই দিকে হাত তুলে ছুঁয়ে দেখেছিল তা ভয়ানকভাবে ফুলে গেছে। সে জানত যে ওখানে একটা কালো গোল দাগ রয়েছে যেখানে ফাঁসির দড়িটা থেঁতলে দিয়েছিল। তার চোখ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল; সে আর তাদের বন্ধ করতে পারেনি। তৃষ্ণায় তার জিভ স্ফীত হয়ে উঠছিল; তাকে দাঁতের মাঝখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাসে ঠেলে দিয়ে সে জ্বর উপশম করে। এত মৃদুভাবে ঘাসজমি সেই অপ্রচলিত পথটিকে মুড়ে রেখেছিল —সে আর তার পায়ের নীচে রাস্তার কাঠিন্য অনুভব করতে পারেনি!
নিঃসন্দেহে, তার যন্ত্রণা সত্ত্বেও, হাঁটতে হাঁটতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, আপাতত সে অন্য এক দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিল – সম্ভবত সে কেবল প্রলাপজ্বর থেকে সেরে উঠেছে। নিজের বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছে। সবকিছু যেমন সে রেখে গেছিল, এবং সকালের রোদে সব উজ্জ্বল এবং সুন্দর লাগছিল। সে অবশ্যই সারা রাত ঘুরে বেরিয়েছে । যখন সে ঠেলাঠেলি করে গেট খুলে প্রশস্ত সাদা পথে হেঁটে যায়, তখন দেখতে পায় নারী পোশাকের আলোড়ন; তার স্ত্রী, তরতাজা এবং শান্ত এবং মিষ্টি দেখাচ্ছিল, তার সাথে দেখা করতে বারান্দা থেকে নেমে আসে। সিঁড়ির শেষ ধাপের নীচে, অনবদ্য আনন্দের হাসি, অতুলনীয় মায়া এবং মর্যাদার অভিব্যক্তি নিয়ে দুহাত মেলে সে অপেক্ষা করছিল, ।আহ, সে কত সুন্দর! সে প্রসারিত বাহু নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যখন সে তাকে আঁকড়ে ধরতে চলেছে তখন ঘাড়ের পিছনে একটি অত্যাশ্চর্য আঘাত অনুভব করেছিল; একটি দৃষ্টিনাশক সাদা আলো কামানের গোলার মত শব্দে তার চারপাশ ঘিরে জ্বলে ওঠে – তারপর সব অন্ধকার এবং নীরব হয়ে যায়!
পেইটন ফারকুহার মারা গিয়েছিল; আউলক্রিক ব্রিজের কাঠের পাটাতনের নিচে তার শরীর, ভাঙা ঘাড়ের সাথে আলতো করে দুলছিল।
সমাপ্ত