ছোটগল্প সিরিজ, HORROR, thriller, world literature

পাতাল প্রহর

স্টিফেন এডউইন কিং (জন্ম 21 সেপ্টেম্বর, 1947) হরর, অতিপ্রাকৃত কল্পকাহিনী, সাসপেন্স, অপরাধ, বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী এবং ফ্যান্টাসি উপন্যাসের ও গল্পের “ভয়ের রাজা” নামে বিখ্যাত। 2006 সাল পর্যন্ত তার বইগুলি 350 মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি এবং অনেকগুলি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন সিরিজ, ছোট সিরিজ এবং কমিক বইতে রূপান্তরিত হয়েছে। কিং 65টিরও বেশি উপন্যাস/উপন্যাসিকা প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে সাতটি কলাম রিচার্ড বাচম্যান নামে এবং পাঁচটি নন-ফিকশন বই রয়েছে। এছাড়াও তিনি প্রায় 200টি ছোটগল্প লিখেছেন, যার অধিকাংশই গল্পসংগ্রহ রূপে প্রকাশিত হয়েছে।

কিং ব্রাম স্টোকার অ্যাওয়ার্ডস, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ডস এবং ব্রিটিশ ফ্যান্টাসি সোসাইটি অ্যাওয়ার্ডস পেয়েছেন। 2003 সালে, ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন তাকে আমেরিকান চিঠিতে বিশিষ্ট অবদানের জন্য পদক প্রদান করে। তিনি তার সমগ্র গ্রন্থপঞ্জির জন্য সাহিত্যে অবদানের জন্য পুরস্কারও পেয়েছেন, যেমন 2004 ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড ফর লাইফ অ্যাচিভমেন্ট এবং 2007 গ্র্যান্ড মাস্টার অ্যাওয়ার্ড অফ আমেরিকার মিস্ট্রি রাইটার্স। 2015 সালে, তিনি সাহিত্যে অবদানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর আর্টস থেকে একটি ন্যাশনাল মেডেল অফ আর্টসে ভূষিত হন। স্টিফেন কিং এর লেখক জীবনের দ্বিতীয় প্রকাশিত গল্প এটি। তার বহু কাহিনীর মতন এর ভৌগলিক পটভূমিও গেটস ফলস, মেইন। লেখক প্রকৃত জীবনে যে অঞ্চলের বাসিন্দা।

একে ঠিক অনুবাদ বলা চলে না। মূল কাহিনীর ভাব অনুসরণ করে লেখা তাই ব্যাকরণগত ত্রুটি বিচ্যুতি আছে অবশ্যই। তবে কাহিনীর সমস্ত অংশই তুলে ধরা হয়েছে নির্ভুল ভাবে। আশাকরি ভালো লাগবে।

“ পাতাল প্রহর”

কাহিনী: স্টিফেন কিং

ভাবান্তর: শান্তনব রায়

রাত দুটো, শুক্রবার

হল এলিভেটরের পাশে রাখা বেঞ্চে বসেছিল যখন ওয়ারউইক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল, তিনতলায় এটাই একমাত্র সিগারেট খাওয়ার জায়গা। ওয়ারউইকের আচমকা উপস্থিতিতে হল মোটেও খুশি হয়নি। রাত তিনটের এই গ্রেভইয়ার্ড শিফ্টে ফোরম্যানের ঢুঁ মারার কথা না ; তার এখন বেসমেন্টের অফিসে বসে ডেস্কের কোনায় রাখা বড় পাত্র থেকে কফি ঢেলে খাওয়ার কথা।

তাছাড়া এখানে বেজায় গরম।

গেটস ফল্সে সেবার উষ্ণতম জুন মাস, এলিভেটরের পাশে রাখা অরেঞ্জ ক্রাশ থার্মোমিটারও ৯৪ ডিগ্রিতে এসে ঝিমিয়ে নিচ্ছে ভোর তিনটের সময়। তিনটে-এগারোটার শিফটে মিলের ভেতর কেমন নরক হয়ে থাকে তা ভগবানই জানেন।

হল, পিকার মেশিন চালাবার কাজ করে, ক্লিভল্যান্ডের এক বিলুপ্ত ফার্মের বানানো ১৯৩৪ সনের পেল্লাই ভারী যন্ত্র একটা। এই কাপড়ের মিলে সে এপ্রিল মাস থেকে কাজে লেগেছে অর্থাৎ ঘন্টায় মেরেকেটে ১.৭৮ ডলার পায় যাতে মোটামুটি তার চলে যায়। বউ নেই, বান্ধবীর ঠিক নেই, খোরপোষ দেওয়ার বালাই নেই। ভেসে বেড়ানোই জীবন, তাই গত তিন বছরে বার্কলে (কলেজের ছাত্র)থেকে লেক টাহো (বাসের খালাসি) হয়ে গাল্ভেশটোন থেকে মায়ামি(রাঁধুনি) হয়ে হুইলিং( ট্যাক্সিচালানো ও বাসনধোয়া) থেকে গেটস ফল্স, মেইনে (পিকারমেশিন চালক) এসেছে। শীতের আগে এ অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার, এগারোটা থেকে সাতটার শিফ্ট তার বেশ পছন্দ, তখন মিল এর রক্তচাপ ঠান্ডা থাকে আর বলাই বাহুল্য তাপমাত্রাও কম থাকে।

একটাই শুধু অপছন্দের ব্যাপার, ইঁদুর।

এই তিনতলাটা বেজায় লম্বা, পরিত্যক্ত, ম্যাড়মেড়ে ফ্লোরোসেন্ট লাইটের আলো ছড়ানো। অন্য দুটো তলার থেকে এটা অনেকটা শান্ত আর ফাঁকা। ইঁদুড়ের ব্যাপারটা আলাদা।

এই তলায় যন্ত্র বলতে একমাত্র ওই পিকার মেশিন। মাটিতে পরে থাকা নব্বই পাউন্ডের কাপড়ের স্তুপগুলো ওই লম্বা দাঁতওলা মেশিন দিয়ে তুলে বাছাই করতে হয়।

সসেজ এর স্তুপের মতন সেগুলো মেঝেতে থরে থরে ডাঁই করা (বিশেষত বাতিল মেলটন আর এবড়ো খেবড়ো হাতার স্লিপ যেগুলির কোনো সামঞ্জস্য নেই) বহু পুরোনো, কারখানার বর্জ্যে ধূসরমলিন ।

ইঁদুরের জন্য আদর্শ বাসা বাঁধবার জায়গা, বিরাট পেট মোটা, জুলজুল চোখের লোমশ জীবগুলি, শরীরভর্তি উকুন আর জীবাণু নিয়ে দৌরাত্ম্য করে বেড়ায়।

বিরতির সময় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া ঠান্ডা পানীয়ের খালি ক্যান দিয়ে একটা ছোট অস্ত্রাগার তৈরি করার অভ্যাস করেছে হল। কাজ যখন একটু ঢিমে হয় তখন ক্যান ছুঁড়ে সে ইঁদুর তাড়ায়, পরে আবার সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আসে সুযোগ পেলে। শুধু এই প্রথমবার ছিঁচকে হারামজাদা ফোরম্যানটা লিফটের বদলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসায় হল কে দেখে ফেলল।

“কি করছিস হল?”

হল বোকা বোকা ভাবে উত্তর দিল “ইঁদুর “,

যদিও ততক্ষণে সবকটা আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে।

“ যখনি দেখতে পাই এই ক্যান‌ ছুড়ে ব্যাটাদের তাড়াবার চেষ্টা করি”

ওয়ারওইক অল্প একটু মাথা নাড়লো, তার বিশাল নিরেট চেহারায় মাথার চুল খুব ছোট করে ছাঁটা, জামার হাতা গোটানো,গলার টাই ঢিলেঢালা। হল এর দিকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে সে বললো, “তোকে এখানে ইঁদুর কে ক্যান ছুঁড়ে মারবার জন্য মাইনে দেওয়া হচ্ছে না, আবার যেন না হয়”

হল মুখে জবাব দিলো, ‘হ্যারি উপরতলা থেকে মাল নামাচ্ছে না কুড়ি মিনিট হয়ে গেল, সাপ্লাই ‌না পেলে আমি পিকার দিয়ে কি তুলবো!” মনে ‌মনে বললো, চুপচাপ মুখ বন্ধ রেখে অফিসে বসে কফি খেলেই তো পারিস শালা!

ওয়ারউইক ওর বক্তব্যে পাত্তা না দিয়ে মাথা নাড়লো।

“আমি বরং উপরে গিয়ে উইসকনস্কির খবর নেই “

“পাঁচটা থেকে একটা ওবধি ব্যাটা চটিবই নিয়ে বসে থাকে, এদিকে আবর্জনার স্তূপ জমছে বিনে।”

হল কোনো উত্তর দিল না।

হঠাৎ ওয়ারউইক আঙ্গুল তুলে চেঁচিয়ে উঠলো

“ওই আরেকটা, মার শালা বেজন্মাকে!”

হলের হাতে ধরা পানীয়ের ক্যানটা গোলার মতন শোঁ করে উড়ে গেল। জুলজুল চোখে যে ইঁদুরটা কাপড়ের বস্তার উপর বসে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল সেটা চিঁ শব্দ করে পালালো। লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া ক্যানটা হল কে তুলে আনতে দেখে ওয়ারউইক পিছনে মাথা হেলিয়ে অট্টহাস্য করে উঠলো।

“আমি একটা অন্য ব্যাপারে তোর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম রে।”

“তাই?”

“ আগামী হপ্তায় জুলাই মাসের চৌঠা সপ্তাহ “

হল মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।

অর্থাৎ কাপড় মিল সোমবার থেকে শনিবার

অবধি বন্ধ থাকবে- একবছর মেয়াদী কর্মীদের ছুটির দিন। এক বছরের কম মেয়াদীদের বিদায়।

“উপরি কামাই করতে চাস”?

হল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো

“কাজটা কি “?

“পুরো বেসমেন্ট সাফাই করতে হবে। শেষ বারো বছরে কেউ হাত দেয় নি। নরক হয়ে আছে। হোসপাইপ লাগানো হবে।”

“টাউন জোনিং কমিটি বোর্ড-ডিরেক্টরদের চাপ দিয়েছে তাহলে?”

“তোর কাজ চাই কিনা বল” ওয়ারউইক সোজাসুজি হলের দিকে তাকিয়ে বললো “এক ঘন্টায় দুই পাবি, চতুর্থ দিন ডবল শিফ্ট। রাতের গ্রেভইয়ার্ড শিফ্টে কাজ, কারণ রাতটা একটু ঠান্ডা থাকবে।”

হল মনে মনে হিসাব কষে নেয়।

ট্যাক্স কেটে হাতে পঁচাত্তর মতন আসবে।

আগে কপালে যে পায়রার ডিম জুটছিল তার থেকে ঢের ভালো।

“ঠিক আছে”।

“পরের সোমবার তাহলে ডাই হাউসের নীচের তলায় হাজির হয়ে যাস”

ওয়ারউইকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল হল। মাঝপথে থেমে গিয়ে ওয়ারউইক হলের দিকে ফিরে বলল,

”তুই কলেজে পড়তিস না এক কালে?”

হল মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো।

“বেশ বেশ, কলেজ বয়, মনে থাকবে”।

এই বলে ওয়ারউইক চলে গেল। হল বসে আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে, ক্যান হাতে ধরে ফের ইঁদুরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

বেসমেন্টের ভিতরটা কেমন হবে সেটা আন্দাজ করতে পারছে এখনি। ওটা আসলে সাব-বেসমেন্ট। ডাই হাউসেরও আরেক ধাপ নীচে। ভ্যাপসা, অন্ধকার, মাকড়সা আর পচে যাওয়া কাপড় তার সাথে নদী থেকে আসা ফেনা এবং ইঁদুর। কে জানে বাদুড় চামচিকেও থাকব হয়তো।

ইঁদুরদের বিমানবাহিনী ওরা। যত্তসব!

বিরক্তিতে ক্যানটা জোরে ছুড়ে মারলো হল।

তারপরেই ওর মুখে একটা ‌মৃদু হাসি ফুটে উঠল কারণ উপরের ওভারহেড ডাক্ট দিয়ে ওয়ারউইকের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। হ্যারি উইসকনস্কিকে উত্তম মধ্যম খিস্তি করছে।

বেশ বেশ কলেজ বয়, মনে থাকবে।

কথাটা মনে পড়তেই মাঝপথে হাসি থামিয়ে সিগারেটের শেষটা গুজে নেভায় হল।

কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই উপরতলা থেকে উইসকনস্কি ব্লোয়ার দিয়ে নাইলনের টুকরো নিচে নামাতে শুরু করলে আবার কাজে লেগে পড়ে।

একটু পরে ইঁদুরগুলি বেরিয়ে এসে লম্বা ঘরটার একপ্রান্তে রাখা বস্তা গুলির উপর বসে, পলকহীন চোখে ওকে আবার দেখতে থাকে। ভাবটা অনেকটা আদলতের বিচারপতিদের মতন ।

রাত এগারোটা, সোমবার।

ওয়ারঊইক পুরোনো জিন্স আর উঁচু গামবুট পরে এসে পৌঁছাল যখন, আন্দাজ ছত্রিশ জন লোক এদিক ওদিক ছড়িয়ে বসে অপেক্ষা করছিল। হল বসে হ্যারি উইসকনস্কির কথা শুনছিল। উইসকনস্কি পেল্লায় মোটা, চরম অলস আর খুব বেজার প্রকৃতির মানুষ।

ফোরম্যান এলো যখন উইসকনস্কি বলছিল

‘ব্যাপারটা খুবই ঘাঁটাঘাঁটির কাজ’

‘শুধু দেখতে থাক। বাড়ির ফেরার সময় সবাই পারস্যের কালো ভূত হয়ে ফিরবে”

”বেশ বেশ” ওয়ারউইক সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠল

” নীচে ষাটখানা ইলেকট্রিক বাল্ব লাগানো আছে, আশাকরি কি কাজ করছি সেটা দেখতে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই যে তোমরা-‘  বলে একদল লোকের দিকে ইশারা করলো যারা শুকনো চরকার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

” ওই হোসপাইপগুলি নিয়ে সিঁড়ির কাছে রাখা জলের চেম্বারের সাথে জুড়তে হবে। সিঁড়িতে ফেলে পাইপের ভাঁজ খুলে ‌নিতে পারো। প্রত্যেক মানুষের জন্য আশি গজ পাইপ বরাদ্দ আছে এবং সেটাই যথেষ্ট। খুনসুটি করে সহকর্মীকে জল ছিটাতে যেওনা, তাহলে হাসপাতালে পাঠাতে হবে,ওই জলকামান দিয়ে দেওয়াল ভাঙ্গা হয়।”

‘কেউ একটা চোট-আঘাত পাবেই’

উইসকনস্কি ভবিষ্যৎবাণী করার ঢং এ বলে উঠলো, “শুধু দেখতে থাকো।”

“আর এই যে বাকিরা-“

হল আর উইসকনস্কি যে দলে ছিল সেদিকে ইশারা করলো ওয়ারউইক,

“তোমরা হলে জমাদারের দল, জোড়ায় জোড়ায় নিজস্ব টিমের ইলেকট্রিক ওয়াগনে করে নীচে যাবে। পুরোনো অফিসের আসবাবপত্র থেকে কাপড়ের বস্তা, ভাঙ্গা যন্ত্রপাতির স্তুপ যা আশা করো সব দেখতে পাবে। সবগুলিকে জড়ো করে পশ্চিম দিকের এয়ার শাফ্টের পাশে ডাঁই করতে হবে। এমন কেউ আছো যে ওয়াগন চালাতে জানো না?”

কেউ হাত তুললো না।

ইলেকট্রিক ওয়াগন ব্যাটারি চালিত ছোট আকারের ময়লা তোলার ট্রাকের মতন।

একটানা চললে ওর থেকে একটা গা-গোলানো গন্ধ বেরোয় যেটা নাকে গেলেই ইলেকট্রিক তার পোড়ার কথা মনে আসে হল এর।

“ভাল কথা, বেসমেন্টকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে দেওয়া আছে, বৃহস্পতিবারের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে। শুক্রবার চেন টেনে সব জঞ্জাল উপরে তুলে নেব। কারো কোনো প্রশ্ন আছে?”

কেউ কিছু বললো না। ফোরম্যান এর মুখের ভাবপরিবর্তনে যেন আসন্ন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার পূর্বাভাস লক্ষ্য করলো হল। তাতে অবশ্য খুশিই হলো। ওয়ারউইকের এই দাদাগিরি ওর বিশেষ পছন্দ নয়।

“চমৎকার” ওয়ারউইক বললো,

” তাহলে কাজে নেমে পড়ো সবাই”।

রাত দুটো, মঙ্গলবার।

উইসকনস্কির অনবরত খিস্তি মেশানো ঘ্যানঘ্যান শোনা হলের পক্ষে ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। মাঝে ভেবেছিল উইসকনস্কিকে বেশ করে চাবকাবে কিন্তু তাতে মনে হয়না বিশেষ লাভ হবে বরং সেটা নিয়েই আবার কুটকাচালি করা শুরু না করে দেয়।

নীচের পরিবেশ এতটাও খারাপ হবে, হল আশা করেনি। পুরো মানুষ মারার জোগাড়। নদীর পচা জল, পুরোনো গলে যাওয়া কাপড়ের সাথে পচা সিমেন্টের গাঁথুনি ও সবজির উচ্ছিষ্ট মিশে এক মর্মান্তিক অবস্থা। ব্যাঙের পায়খানার একটা লম্বা কলোনি গুঁড়ো হওয়া সিমেন্টের মধ্যে থেকে উঁকি মারছিল। একটা জং ধরা গিয়ারের দাঁতওয়ালা চাকা টেনে নাড়াতে গিয়ে ওর হাতে সেগুলো লাগলো। অনুভূতিটা উষ্ণ, ফাপানো, শোথ হওয়া মানুষের চামড়ার মতন।

বাল্বের আলোগুলো এই বারো বছরের জমাটবাঁধা অন্ধকারকে দূর করতে পারেনি মোটেই। একটু ঠেলে সরিয়েছে মাত্র আর একটা ফ্যাকাশে হলদেটে আভা ফেলেছে এই জঞ্জালের সাম্রাজ্যে। জায়গাটা একটা পুড়ে যাওয়া চার্চের বিদীর্ণ কেন্দ্রীয় অংশের মতন, উঁচু কড়িকাঠ আর পেল্লায় সব পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি যা কোনদিন ঠেলে সরানো সম্ভব নয়, ভেজা স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে জমাটবাঁধা হলেদেটে শ্যাওলা, গির্জা সঙ্গীতের মতন হোসপাইপের মুখ নিঃসৃত জলের ফোয়ারা, অর্ধেক মুখ আটকে থাকা নিকাশি নালার মধ্যে দিয়ে গিয়ে ঝর্নার পাদদেশ হয়ে বয়ে আসা নদীর জলে মিশছে।

আর রয়েছে ইঁদুর – বিরাট বিরাট ইঁদুর, তিনতলার গুলো এদের কাছে বামন। ভগবানই জানে কি খেয়ে এই গতর হয়। ওরা যখন বস্তা আর বোর্ডগুলি সরিয়ে সরিয়ে ছেঁড়া খবরের কাগজেরটুকরো দিয়ে তৈরি বাসাগুলো আবিষ্কার করছিল তখন ইঁদুরছানারা পালিয়ে পালিয়ে ফাটল আর গর্তে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছিল আর ধেড়েগুলি অধিসঁচারী ক্রোধে সেইদিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের বড়বড় চোখের মধ্যে জমে আছে অপার অন্ধকার।

‘উঃ বাবা এবার একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক’

উইসকনস্কি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো যদিও হল ওর ক্লান্তির কারণ খুঁজে পেল না। সারাদিন ধরে ব্যাটা নড়ে বসেনি। তবুও অনেকটা সময় পেরিয়েছে আর ওদের আশেপাশে এখন আর কেউ নেই।

“ঠিক আছে” বলে হল ইলেকট্রিক ওয়াগনের

 গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট ধরালো।

“আমারি ভুল হয়েছে, ওয়ারউইকের চাপে পড়ে রাজি হওয়ার ঠিক হয়নি।” উইসকনস্কির গলায় আক্ষেপ “এ মানুষের কম্মো নয়। কি আর করি, সেদিন রাতে আমায় প্যান্ট খোলা অবস্থায় ধরে ফেলে ব্যাটা এমন খিস্তি দিলো, যে ভয় পেয়ে গেলাম। উঃ কি রেগে গেছিল সেদিন।”

হল এই কথার কোন উত্তর দিল না। ওর মনে ওয়ারউইক আর ইঁদুর দুটো চিন্তাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এই দুটোতে অলিখিত কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

এত বছর মিল এর নীচে এই পাতালঘরে থেকে ইঁদুরগুলি যেন মানুষের উপস্থিতির ব্যাপারে ভুলেই গেছে। নির্লজ্জ এবং ভয়হীন। একটা ইঁদুর পিছনের পায়ে ভর দিয়ে কাঠবিড়ালির মতন করে বসেছিল যতক্ষণ না হল লাথি মারার জন্য কাছে পৌঁছাচ্ছে। তার দিকে পা চালাতেই জুতোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চামড়ায় কামড় বসাতে শুরু করে দিল।

এরা সংখ্যায় কয়েকশো অথবা কয়েক হাজার হবে। হল ভাবলো, কে জানে এরা কি ধরনের রোগ-জীবাণু বয়ে বেড়াচ্ছে যুগ যুগ ধরে এই কালগহ্বরের মধ্যে। অন্যদিকে ফোরম্যান ওয়ারউইক। ওর মধ্যেও কিছু একটা আছে যেটা..

“টাকাপয়সার সত্যি দরকার ছিল যে ভাই’

উইসকনস্কি বলে উঠলো

“কিন্তু ভগবান! এ কি মানুষের কাজ রে..

ইঁদুরগুলিকে দেখেছিস”!

সন্ত্রস্ত চোখে সে চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে

বললো “ভাব একবার, যদি আমাদের থেকে ওরা সাইজে বড় হতো!”

“আহ! থামো দেখি!” হল ধমক লাগালো।

উইসকনস্কি একটু আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে “ক্ষমা কর ভাই, আসলে..” বলে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে

“ওহ জিসাস, কি দূর্গন্ধ রে বাবা! এ কোনভাবেই মানুষের কম্মো নয়” বলে কেঁদে উঠলো।

সেই মুহূর্তে ওয়াগনের ধার বেয়ে একটা মাকড়সা ওর হাতের উপর উঠে এসেছে। একটা চাপা বিরক্তির শব্দ করে সেটাকে ঝেড়ে ফেললো উইসকনস্কি।

“হাত চালাও” হল সিগারেট ফুকতে ফুকতে বললো “যতো হাত চালাবে ততো তাড়াতাড়ি শেষ হবে”।

‘তাই বটে” উইসকনস্কি দুঃখের সঙ্গে সায় দিল ‘তাই বটে’।

ভোর চারটে, মঙ্গলবার, লাঞ্চের সময়।

হল আর উইসকনস্কি আরও তিন চারজনের সঙ্গে বসে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিটারজেন্ট দিয়েও জন্মে সাফ হওয়ার নয় এরকম ময়লা মাখা হাতে স্যান্ডউইচ চিবাচ্ছিল। হল খেতে খেতে একদৃষ্টে ফোরম্যান এর কাঁচ ঘেরা অফিসের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে বসে ওয়ারউইক কফি আর ঠান্ডা হ্যামবার্গার তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে।

“রে আপসনকে বাড়ি ফিরতেই হয়েছে”

চার্লি ব্রোচু জানালো।

“বমি করেছিল নাকি”? একজন জিজ্ঞেস করলো

“আমার তো নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসছিল প্রায়”।

“নাহ! গরুর গোবর না খাওয়া অবধি রে বমি করেনা। ওকে ইঁদুরে কামড়েছে”।

কথাটা হলের কানে যেতেই ওয়ারউকের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এদিকে তাকালো।

‘তাই নাকি’? চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো হল ।

‘হ্যাঁ’ ব্রোচু জবাব দিল।

‘আমি ওর সাথে কাজ করছিলাম। উফ! এত ভয়ঙ্কর ইঁদুর আগে দেখিনি। হঠাৎ একটা বস্তার ফুটোর ভিতর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রায় বেড়ালের মতন সাইজ হবে। ওর হাত কামড়ে ধরে চিবাতে শুরু করে দিলো’

‘ভগ-বান’! একজন ভয়ে সবুজ হয়ে গেছে একথা শুনে।

‘হ্যাঁ গো’ ব্রচু বলে উঠলো

‘রে তো মেয়েছেলেদের মতন চিৎকার চেঁচামেচি লাগিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য ওকে দোষ দিই না। কাটা শুয়োরের মতন রক্ত ঝরছিল হাত থেকে তবু জানোয়ারটা ছাড়ছিলো না। শেষে আমি তিন চারবার একটা বোর্ড দিয়ে সেটাকে ঘা কতক দেওয়ার পর কাজ হলো। রে পাগলের মতন হয়ে গেছিল। পা দিয়ে পিষতে পিষতে যতক্ষণ না জানোয়ারটা লোমশ একটা দলায় পরিণত হচ্ছে ততক্ষণ ওকে থামানো যায়নি। এরকম শয়তান ইঁদুর আগে দেখিনি কোনোদিন। ওয়ারউইক ওকে হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বলেছে কাল গিয়ে ডাক্তার দেখাতে।’

‘শয়তানটা বোধহয় পালের গোদা ছিল’

একজন বলে উঠল।

ওদের কথা শুনতে পেয়েছে এমন ভাব করে ওয়ারউইক অফিসে উঠে বসলো, তারপর হাত-পা টানটান করে বেরিয়ে এসে বলল

‘চল সবাই, কাজে ফেরার সময় হয়েছে’।

বাকিরা যতটা পারা যায় সময় অপচয় করে উঠে ডিনার জ্যাকেট গুটিয়ে রাখলো, ঠান্ডা পানীয় খেল, ক্যান্ডি বার কিনে আনলো। তারপর নীচতলার দিকে অনিচ্ছুক পায়ে রওনা হলো। লোহার সিঁড়ির গ্রীলের উপর ওদের নিস্তরঙ্গ নিরুৎসাহী পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতে শোনা গেল।

‘চলো হে চলো’ হল খুব ধৈর্য্য নিয়ে জুতোর লেস বাঁধতে থাকা উইসকনস্কিকে তাড়া দিল। তারপর ওরাও নীচে নেমে গেল।

সকাল সাতটা, মঙ্গলবার।

হল আর উইসকনস্কি একসাথেই বাইরে বেরিয়ে এলো। কোনো কারণে নিজেকে এই মোটা পোলিশটার বংশধর মনে হচ্ছিল হল এর। উইসকনস্কির অবস্থা হাস্যকর, গোল চাঁদপানা মুখে এত ময়লা লেগেছে যে দেখে মনে হয় এলাকার কোনো বড়দা ওকে কাদায় ফেলে বেদম পিটিয়েছে। অন্যদের মধ্যে রোজকার খুনসুটি, জামা টানাটানি, ১টা থেকে ৪টের শিফ্টে টোনির বউয়ের বিছানা কে গরম করবে ধরনের চটুল রসিকতার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। শুধু নিস্তব্ধতা আর মাঝে মাঝে গলা খাকরে দরজার গায়ে থুতু ছেটাবার শব্দ ভেসে এলো।

‘তোকে বাড়ি নামিয়ে দেব? উইসকনস্কি

একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

‘ধন্যবাদ’।

মোটরবাইক করে মিল স্ট্রীট ধরে ব্রীজ পেরোনো অবধি ওরা নিজেদের মধ্যে কোনো কথা বললো না। উইসকনস্কি ওকে বাড়ির সামনে নামানোর

সময় সৌহার্দ্য বিনিময় করলো শুধু।

হল সোজা চান করতে ঢুকলো, এখনও সে ওয়ারউইকের কথা ভাবছে। ফোরম্যানের মুখের যে অভিব্যক্তি প্রথমদিন দেখেছিল তার সঙ্গে যোগসূত্রটা খোঁজার চেষ্টা করছে।

বালিশে মাথা রাখতেই ঘুম নেমে এসেছিল হল এর কিন্তু একটা অস্হিরতা নিয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল-

ইঁদুরের দুঃস্বপ্ন দেখেছে সে।

রাত একটা, সোমবার।

হোসপাইপের কাজটা অনেক ভালো।

জমাদারের দল যতক্ষণে একটা অংশ পুরো খালি করছে তার আগেই পাইপওয়ালাদের

পরের অংশে জলকামান দাগা শেষ হয়ে যায় ফলে হাতে সময় পাওয়া যায় জুত করে সিগারেট টানার।

হল হোসপাইপের নজেল নিয়ন্ত্রণ করছিল আর উইসকনস্কি সামনে পিছনে সরিয়ে নড়িয়ে

পাইপের জট ছাড়িয়ে দিচ্ছিল,পাইপের গায়ে বাধা ঠেকিয়ে জলকামানের তেজ কমানো বাড়ানো করছিল।

ওয়ারউইকের মেজাজ খাপ্পা হয়ে আছে

কারণ খুব ধীর গতিতে কাজ এগোচ্ছে।

এভাবে চললে জন্মেও বৃহস্পতিবারের

মধ্যে কাজ শেষ হবেনা।

এই মুহূর্তে কোণায় রাখা উনবিংশ শতাব্দীর অফিস আসবাবের কঙ্কালসার একটা স্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে ওরা-

ভাঙ্গা রোলটপ ডেস্ক, লেজার খাতার মন্ড, রসিদকাগজের রিম, সীট ভাঙ্গা চেয়ারের স্তুপ, একেবারে ইঁদুরের স্বর্গরাজ্য।

মৌচাকের খোপের মতন সেই বিশাল জঞ্জালস্তুপ কে চিরে যে অন্ধকার ভয়াবহ গলিপথ গুলি তৈরি হয়েছে, ইঁদুরের দল চুপিসারে সেইখানে গিয়ে সেঁধিয়েছে এবং দুজন কর্মীকে বিচ্ছিরি ভাবে কামড়েও দিয়েছে। ফলে যতক্ষণ না পর্যন্ত ওয়ারউইক সবার জন্য উপরের ডাই হাউস থেকে দস্তানা আনাবার ব্যাবস্হা করছে ততক্ষণ আর কেউ কাজ করতে চাইলোনা। দস্তানাগুলি মোটা, আ্যসিড সুরক্ষিত।

হল আর উইসকনস্কি পাইপ নিয়ে সামনের স্তপটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলো এমন সময় হঠাৎ সোনালী চুলওয়ালা গামবাট কারমাইকেল চিৎকার আর গালিগালাজ করতে করতে ছিটকে পিছিয়ে এলো। দস্তানাপরা হাত দিয়ে সে নিজের বুকের উপর চাপড় মারছে ছটফট করতে করতে। ওর বুকের কাছে শার্ট কামড়ে ঝুলে আছে ধূসর, লোমশ, জঘন্য দেখতে একটা বুড়ো ইঁদুর আর চিঁ চিঁ করতে করতে সেটা পিছনের পা দিয়ে সমানে কারমাইকেলের পেটে খামচাচ্ছে। অবশেষে ঘুঁসি মেরে কারমাইকেল সেটাকে মাটিতে ছিটকে ফেলতে পারলেও ওর শার্টের গায়ে একটা বিরাট ফুটো দেখা গেল। রক্তের ধারা নেমে আসছে বুকের বৃন্ত থেকে। দৃশ্যটা দেখে কারমাইকেলের মুখের রাগ উবে গেল। উল্টোদিকে ঘুরে সে ওয়াক শব্দ করে বমি করতে উদ্যত হলো। হল হাতে ধরা পাইপের মুখ ইঁদুরটার দিকে তাক করলো। ব্যাটা মন্থর আর বয়স্ক, কারমাইকেলে্র শার্টের টুকরোটা এখনও ওর মুখে আটকে আছে। হোসপাইপের জলের ধাক্কায় ইঁদুরটা ছিটকে গিয়ে দূরের একটা দেওয়ালে ঠুকে থেঁতলে গেল।

মুখে একটা অদ্ভুত ঝোলানো হাঁসি নিয়ে ওয়ারউইক এসে হলের কাঁধ চাপড়ে বললো, ‘বাঃ বাঃ বেশ তো, ক্ষুদেগুলোকে ক্যান ছুঁড়ে

মারার চেয়ে এটা ভালো উপায় কি বলিস কলেজ বয়!’

‘ক্ষুদে’! উইসকনস্কি আঁৎকে উঠলো ‘মোটা বাঞ্চোতটা প্রায় দুফুটের মতন হবে!

‘পাইপটা ওদিকে ঘোরা’ ওয়ারউইক আঙ্গুল তুলে আসবাবের স্তুপের দিকে ইশারা করলো।

‘এই তোরা সরে যা সামনে থেকে’

‘স্বাচ্ছন্দ্যে’ কে যেন বলে উঠল।

কারমাইকেল এবার ওয়ারউইকের দিকে ধেয়ে এসেছে।

‘আমার ক্ষতিপূরণ চাই, ক্ষতিপূরণ..’

যন্ত্রনায় কথা শেষ করতে পারলোনা সে।

‘নিশ্চয়ই পাবে,’ওয়ারউইক হেসে বললো

‘তোর মাইয়ের বোঁটা কাটা গেছে যখন….এবার সামনে থেকে সরে যা বাছা, নাহলে জলের তোড়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাবি।’

হল নজেল তাক করে জল চালিয়ে দিল। সাদা জলকণার স্রোত বিস্ফোরণের মতন গিয়ে আঘাত করলো স্তুপের উপর। একটা ডেস্ক ছিটকে গেল, দুটো চেয়ার ভেঙে টুকরো হয়ে গেল। সর্বত্র ইঁদুর দৌড়ে পালাতে শুরু করলো। হল বাপের জন্মে এতবড় ইঁদুর দেখেনি। ওরা পালাবার সময় মানুষের গলায় ভয় ও ঘেন্না মেশানো চিৎকার ভেসে এলো চারিদিক থেকে। বিরাট চোখের নাদুসনুদুস বা ছিপছিপে চেহারার জীবগুলো। একটাকে দেখে তো ছমাসের কুকুর ছানা বলে মনে হলো হল এর। ইঁদুরের গুষ্টি উদ্ধার চোখের সামনে থেকে পুরোপুরি বিদায় না নেওয়া অবধি জল চালিয়ে গেল হল। তারপর একসময় পাইপের মুখ বন্ধ করলো।

‘এবার জঞ্জাল কুড়োতে লেগে পড়ো সবাই’

ওয়ারউইক অর্ডার দিল।

‘ইঁদুর মারার কাজে আসিনি আমরা’

সাই ইপস্টন বিদ্রোহের স্বরে ঘোষণা করলো।

হল ওদের দলটাকে এক হপ্তা আগে পরামর্শ দিয়েছিল। ইপস্টন তরুণ পরনে কালিঝুলি মাখা বেসবল ক্যাপ আর টি-শার্ট।

‘ ইপস্টন নাকি রে ‘?

ওয়ারউইক সদয় ভাবে প্রশ্ন করলো।

‘হ্যাঁ। এখানে আর একটাও ইঁদুর থাকলে আমি কাজ করবোনা। জঞ্জাল পরিষ্কার করার কাজে এসেছিলাম, রেবিস বা টাইফয়েড বাঁধাতে আসিনি। না পারলে আমাকে বাদ দিয়ে দাও।’

এই কথায় বাকিদের মধ্যেও একটা চাপা গুঞ্জন শোনা গেল। উইসকনস্কি এই সুযোগে হলের দিকে তাকিয়েছিল কিন্তু হল একমনে নজেলের মুখ পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। আন্দাজ ০.৪৫ মিমি বোরের মুখ। সাধারণ মানুষকে অন্তত বিশ ফিট দূরে ছিটকে ফেলতে পারে।

‘তুই তাহলে ছুটি করতে চাস সাই?’

‘তাই তো বলছি” ইপস্টন জবাব দিলো।

‘ঠিক আছে’ ওয়ারউইক মাথা নাড়ে

‘আর কেউ ছুটি করতে চায় নাকি। শুধু মনে রেখ এটা ইউনিয়নের কাজ না। একবার ছুটি করলে সে যেন ফেরৎ কাজে না আসতে পারে সেই দ্বায়িত্ব আমি নিলাম।’

‘কেন, তোমার খুব বাজার গরম ?’

হল বিড়বিড় করলো।

ওয়ারউইক ঘুরে তাকালো

‘কিছু বললি কলেজ বয়?’

হল নির্বিকার হয়ে উত্তর দিল

‘কিছু না, গলা পরিষ্কার করছিলাম ফোরম্যান সাহেব।’

ওয়ারউইক চোরা হাসি দিলো

‘কেন কিছু তেতো ঠেকছে’?

হল উত্তর দিল না।

‘খুব হয়েছে। এবার সবাই হাত লাগাও’

সে বাকিদের নির্দেশ দিল।

সবাই আবার কাজে ফিরে গেল।

রাত দুটো, বৃহস্পতিবার।

হল আর উইসকনস্কি আবার ওয়াগনে করে জঞ্জাল সারনোর কাজে ফেরৎ এসেছে। পশ্চিমদিকে্র এয়ারশাফ্টের উপর এই কয়দিনেই জঞ্জালের অতিকায় স্তুপ জমেছে কিন্তু সেটা গোটা এলাকার অর্ধেকও নয়।

‘চারদিন মুবারক ‘ সিগারেট বিরতির সময়

উইসকনস্কি বললো। ওরা সিঁড়ি থেকে অনেকটা দূরে উত্তর দিকের দেওয়ালের সামনে কাজ করছে। এখানে আলোটা খুবই ক্ষীণ আর অন্যদের কথাবার্তা অনুরণনের ফলে যেন মাইলখানেক দূর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

‘ধন্যবাদ’ সিগারেটে লম্বা টান দিল হল।

‘আজ রাতে বেশি ইঁদুর দেখছি না।’

‘হ্যাঁ কেউই দ্যাখেনি’ উইসকনস্কি উত্তর দেয় ‘মালগুলি সেয়ানা হয়ে গেছে বোধহয়’।

একটা বিদঘুটে বাঁকাচোরা গলির প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুজনে, সেটা তৈরি হয়েছে মূলতঃ পুরোনো লেজার খাতা ও রসিদ বইয়ের স্তুপ, কাপড়ের বস্তার মন্ড আর দুটো চ্যাপ্টা মান্ধাতা আমলের তাঁতবোনার যন্ত্র জমে।

‘উফ! শালা ওয়ারউইকের বাচ্চা’!

উইসকনস্কি থুতু ফেলে।

‘কি মনে হয়, ইঁদুরগুলি কোথায় যেতে পারে’?

হল যেন প্রশ্নটা নিজেকেই করল।

‘দেওয়ালের গায়ে তো সেঁধোবেনা…’

ভেজা থামগুলির ভীতে ভঙ্গুর গাঁথুনির

ফাটলের দিকে তাকিয়ে বললো হল।

‘নদীর জলে ডুবে যেতে পারে হয়তো।

সমস্তই তো ওখানে গিয়েই মিশেছে।’

এমনসময় কালো মতন একটা কিছু ডানা ঝাপটে ওদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। উইসকনস্কি আর্তনাদ করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছিল।

সেটার দিকে তাকিয়ে হল মন্তব্য করলো ‘বাদুড়’

উইসকনস্কি সোজা হয়েছে ততক্ষণে।

‘বাদুড়!.. বাদুড়!’ উইসকনস্কি এবার গর্জে উঠলো।

‘ বাদুড় এই মাটি র নীচে কি করছে? ওরা তো গাছের ডালে ঝোলে আর কার্নিশে আর- ‘

‘এটা বেশ বড় মনে হচ্ছে।’ হল নরম সুরে বললো, ‘আর এই বাদুড় আসলে কি জানো তো? ডানাওলা ইঁদুর একপ্রকার।’

‘হে ভগবান’ উইসকনস্কি আতঙ্কে বলে ওঠে ‘এখানে কিভাবে ..

‘কিভাবে এলো!? ওই যেমনভাবে ইঁদুরগুলি বেপাত্তা হয়ে গেছে সেইভাবেই।’

‘কি ব্যাপার? ওয়ারউইক দূর থেকে হাঁক ছাড়ে

‘ওখানে কারা ?’

‘ কিছ হয় নি চাপ নিও না’ হল নরম সুরে

উত্তর দেয়। অন্ধকারে ওর চোখ চকচক করে ওঠে।

‘কলেজ বয় তুই নাকি? ওয়ারউইকের গলার আওয়াজ একটু এগিয়ে এসেছে মনে হলো।

‘সব ঠিক আছে বস’, হল চেঁচিয়ে উত্তর দেয়

‘শুধু আমার পায়ের ছাল চড়ে গেছে একটু’

ওয়ারওইক ঘেউ ঘেউ করে হেসে ওঠে

‘হৃদয়ভরা পিরিত লাগবে নাকি ?’

‘হঠাৎ এটা বলতে গেলি কেন?’

উইসকনস্কি প্রশ্ন করে।

‘এদিকে দেখো’ হল ঝুঁকে পড়ে একটা দেশলাই কাঠি জ্বালায়। ভঙ্গুর লড়ঝড়ে সিমেন্টের থামে একটা চৌকো মতন জায়গা দেখা যাচ্ছে।

‘টোকা দাও’

উইসকনস্কি টোকা দিয়ে বলে

‘ভিতরটা কাঠের’

হল মাথা নাড়িয়ে বললো ‘এটা একটা দরজা!

আমি এখানে আরও কয়েকটা দেখেছি।

বেসমেন্টের নীচেও আরেকটা ঘর রয়েছে!’

‘হে ভগবান!’ উইসকনস্কি প্রতিবাদের সুরে বলে উঠলো।

ভোর সাড়ে তিনটে, বৃহস্পতিবার।

ওরা উত্তর পূর্ব কোণে মাল সরাচ্ছিল। ওদের পিছনে ইপস্টন আর ব্রচু উচ্চচাপযুক্ত হোসপাইপগুলির একটা ধরে দাঁড়িয়েছিল। হল কাজ থামিয়ে একদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল ‘ওই যে, এইখানেই দেখতে পাবো মনে হয়েছিল।’

একটা কাঠের সুড়ঙ্গ দরজা দেখা যাচ্ছে যার মাঝামাঝি জায়গায় একটা লোহার গোল হাতল লাগানো রয়েছে।

সে ইপস্টনের দিকে ফিরে গিয়ে বললো

‘একমিনিট জল বন্ধ কর’

জলের তোড় যখন‌ ক্ষীণ হয়ে এলো তখন সে গলা ছেড়ে হাঁক ‌দিল।

‘ওয়ারউইক দাদা একবার এদিকে এসে দেখে যাও শিগগির’।

ওয়ারউইক ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে হল এর দিকে সেই কঠিন্ একটা হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো,

‘তোর জুতোর দড়ি খুলে গেছে নাকি কলেজ বয়’?

‘এদিকে দেখো’বলে হল বুট দিয়ে দরজার গায়ে একটা লাথি মারলো

‘পাতালঘর”

‘তাতে কি হয়েছে? কাজের এখনও বিরতি হয় নি’

‘এর মধ্যেই তোমার ইঁদুরের গুষ্টি লুকিয়ে রয়েছে আরামে বংশবৃদ্ধি করছে ‘

‘আমি আর উইসকনস্কি একটা বাদুড়ও দেখতে পেয়েছি’

অন্য কিছু লোকেরাও ততক্ষণে দরজার সামনে দেখতে জড়ো হয়েছে

‘ তাতে আমার বয়েই গেছে, কাজটা বেসমেন্ট পরিষ্কার করার ছিল নাকি…..’

‘তোমার অন্তত কুড়িটা ইঁদুর মারার লোক চাই ,কাজ জানা পেশাদার লোক’ হল বলে চলল ‘ম্যানেজমেন্ট এর খরচা বেড়ে যেতে পারে, বাজে ব্যাপার’!

কেউ ঐকজন হেসে উঠলো ‘ সেটরা প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে’

ওয়ারউইক হল এর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সে গ্লাসের ভিতর বন্দী কোনো পোকা ‘তুই সত্যিই একটা ছিটেল মাল দেখছি’তার গলায় বিস্ময়,

‘তোর কি মনে হয় ওখানে কটা ইঁদুর আছে তার্ জন্য আমার কিছু এসে যায়!?’

‘ তুমি আমার কলেজ জীবন বারবার মনে করাও তাই আজ বিকেলে টাউন লাইব্রেরীতে গেছিলাম। টাউন জোনিং সংক্রান্ত অাইনগুলি পড়লাম। সেগুলি ১৯১১ য় তৈরি হয়েছে ওয়ারউইক, অর্থাৎ এই মিল আকারে বড় হয়ে জোনিং বোর্ড নির্বাচনের বহু আগে। তা সেখানে কি পেলাম জানো?’

ওয়ারউইক খুব ঠান্ডা চোখে বললো,

“বেরিয়ে যা এখান থেকে, তোকে ঐই মুহুর্তে ছাঁটাই করা হল’

‘সেখানে দেখতে পেলাম..’ হল ইতিহাস খুঁড়তে থাকে যেন ওয়ারউইকের কথা তার কানেই যায়নি

‘… যে টাউন জোনিং এর আইনে ভারমিন এর বিশেষ উল্লেখ আছে। হ্যাঁ ঠিক, বুঝতে না পারলে গোটা গোটা করে বলছি, ভা-র-মি-ন । অর্থাৎ রোগজীবাণু বয়ে বেড়ানো পশুপ্রাণী যেমন বাদুড়, কেঁচো, রাস্তার কুকুর আর ইঁদুর।

বিশেষ করে ইঁদুর।‌

দুই প্যারাগ্রাফে চোদ্দবার ইঁদুরের উল্লেখ আছে, ফোরম্যান সাহেব। তাই বলছি আমি যদি এখান্ থেকে বেরিয়ে যাই তাহলে সোজা টাউন কমিশনারের অফিসে গিয়ে এখানকার মাটির তলার ব্যাপারটা জানাবো, সেটা খেয়াল রেখো।’

হল একটু দম নিলো, ওয়ারউইকের ঘৃণাভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সে তৃপ্তি পাচ্ছিল,

‘ আমি, কমিশনার আর টাউন‌ কমিটি একসাথে এই জায়গার উপরে ইঞ্জাংশান ঠুকে দিলে শনিবারের থেকেও লম্বা সময়ের জন্য মিল এর দরজায় তালা পড়ে যাবে ফোরম্যান সাহেব। আর তাতে তোমার মালিক কি বলতে পারেন সেটারও ধারণা আমার আছে। বেকার বীমা করিয়ে রেখেছো আশা করি,ওয়ারউইক।‘

ওয়ারউইক হাতের মুঠো পাকালো

‘সেয়ানা হয়েছিস খুব দেখছি, তোকে আমি -‘

সুড়ঙ্গ দরজার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মুখে হাসি ফিরে এলো..

’কাজে ফেরৎ নিচ্ছি কলেজ বয়’

‘যাক আলো দেখতো পেয়েছ’

ওয়ারউইক সেই অদ্ভুত দেঁতো হাসি দিয়ে মাথা নাড়লো।

‘তুই যখন এতই সেয়ানা তখন তোর একবার নীচে গিয়ে দেখা উচিৎ হল, যাতে কলেজ পাস ছাত্রের মুখ থেকে আমরা নীচের পরিস্থিতি নিয়ে বিশদে জানতে পারি। তুই আর উইসকনস্কি।’

‘আমি না’উইসকনস্কি চমকে উঠে

‘ আমি না, আমি তো-

‘ তুই কি? ওয়ারউইক ওর দিকে তাকায়।

উইসকনস্কি চুপ মেরে যায়।

‘ভালো কথা’ হল এর গলা উৎসাহী শোনালো।

‘আমাদের তিনটে ফ্ল্যাশলাইটের প্রয়োজন। মেন অফিসে ছয় ব্যাটারির মাল এক তাক ভর্তি রাখা আছে দেখেছি মনে হয় ?’

‘তুই সঙ্গে আরও কাউকে নিতে চাস? ‘

ওয়ারউইক টেনে টেনে বললো,

‘সঙ্গী বেছে নে এখান থেকে’

‘তুমি’হল শান্ত স্বরে বললো। অদ্ভুত ভাবটা আবার তার মুখে ফিরে এসেছে। ওয়ারউইক সেই অদ্ভুত দেঁতো হাসি সমেত আবার মাথা নাড়লো।

‘ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে একজন তো থাকা দরকার তাই না? ধরো যদি আমি আর উইসকনস্কি নীচে গিয়ে খুব বেশি কিছু দেখতে না পাই তখন?

কেউ একজন( সম্ভবত ইপস্টন) হেসে উঠলো।

ওয়ারউইক সন্তর্পনে বাকিদের দিকে তাকালো সবাই নিজের জুতোর দিকে চেয়েছিলো তখন। অবশেষে সে ব্রোচুর দিকে ইশারা করে বললো,

‘ব্রোচু, উপরে অফিসে গিয়ে তিনটে ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে আয়। দারোয়ানকে বলিস আমি তোকে ঢুকতে অনুমতি দিয়েছি’

‘আমাকে কেন এতে ফাঁসালি বে’উইসকনস্কি কুঁইকুঁই করে বললো, ‘ তুই জানিস আমার এসব পছন্দ না’

‘আমি ফাঁসাই নি!’ বলে হল ওয়ারউইকের দিকে চাইল। ওয়ারউইক ও তার দিকে ফিরে তাকালো স্থির চোখে

ভোর চারটে, বৃহস্পতিবার।

ব্রোচু তিনটে ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে ফিরে এসেছে। সে একটা হল কে, একটা উইসকনস্কিকে আর একটা ওয়ারউইককে ধরিয়ে দিল।

‘ইপস্টন! হোসপাইপটা উইসকনস্কি কে দে’

ইপস্টন সেই মতন কাজ করলো। পোলিশটার হাতে নজেলটা হালকা হালকা কাঁপছিল।

‘ আচ্ছা বেশ’ ওয়ারউইক উইসকনস্কি কে বললো, ‘ তুই আমাদের মাঝখানে থাকবি, ইঁদুর দেখলেই সাঁটিয়ে দিবি’

নিশ্চয়ই, হল মনে মনে ভাবলো, যদি ইঁদুর থাকে তাহলেও ওয়ারউইক সেটা দেখতে পাবেনা। উইসকনস্কিও রোজগারের খামে দশ ডলার বেশি পেলে আর টু শব্দ করবে না।

ওয়ারউইক দু’জন লোকেরা দিক ইশারা করে বললো, ‘ওটা টেনে তোল’

একজন নিচু হয়ে আঙটার হাতল ধরে টান মারলো।

একমুহুর্তের জন্য হল এর মনে হয়েছিল দরজাটা এত সহজে খুলবে না পরের মূহুর্তেই একটা বিচ্ছিরি ক্যাঁচ শব্দ করে সেটা আলগা হয়ে উঠে এলো, অন্যলোকটা ভিতরের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে উল্টো চাড় দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে গেছিলো কিন্তু আর্তনাদ করে সে ছিটকে সরে এলো। তার হাতটাকে বিরাট বড় বড়, দৃষ্টিহীন ছারপোকার দল ছেঁকে ধরেছে।

আঙটা ধরে থাকা লোকটাঝ একটা খিঁচুনি দিয়ে হাতল ছেড়ে দিতেই সেটা দরজা সমেত নিচে তলিয়ে গেল। দরজার নীচের অংশটা ঘন কালো আর অদ্ভুত এক ফাঙ্গাসে ঢাকা ছিল যা হল এর আগে কখনও দেখেনি। ছারপোকার দল কিছু অতল গহ্বরে ফিরে গেলো আর কিছু বাইরে ছড়িয়ে পড়ায় পায়ের তলায় চাপা পড়লো।

‘দেখো’ হল বলে উঠলো।

একটা জং ধরা তালা ভিতরের দিকে বোল্ট দিয়ে আটকানো ছিল যা এখন ভেঙে গিয়ে ঝুলছে।

‘এটা নীচের দিকে থাকার কথা না ‘ ওয়ারউইক বললো, ‘এটা তো উপরের দিকে থাকার কথা, কিন্তু কেন-‘

‘অনেক কারণ থাকতে পারে’ ,হল বললো, ‘

হতে পারে কোনভাবেই যাতে নীচ থেকে কেউ উপরে উঠে না আসে তার জন্য’

‘কিন্তু তালাটা লাগালো কে? উইসকনস্কি প্রশ্ন করলো।

‘আহ’ হল ব্যাঙ্গ করে ওয়ারউইকের দিকে চেয়ে বললো, ‘সেটা তো এক রহস্য’

‘ওই শোনো’ ব্রচু ফিসফিস করলো

‘হে ভগবান’ উইসকনস্কি ফুঁপিয়ে উঠলো, ‘আমি যাচ্ছি না নীচে’

খুব মৃদু একটা শব্দ, কিছুটা অনুমান করা যায়; কয়েক হাজার পায়ের পাতার সড়সড়ানি আর নড়াচড়ার শব্দ।

‘ব‌্যাঙ ও হতে পারে’ ওয়ারউইক বললো।

হল জোরে হেসে ওঠে।

ওয়ারউইক তার হাতের আলোটা ভিতরে ফেলতেই একটা ঝুলে পড়া পুরোনো কাঠের সিঁড়ি আর নীচের তলার কালো পাথরের জমি দেখা গেল।

কোনো ইঁদুরের চিহ্ন মাত্র নেই।

‘এই সিঁড়িটা আমাদের ভার রাখতে পারবে না’

ওয়ারউইক নিশ্চিত ভাবে বললো।

ব্রোচু এগিয়ে গিয়ে সিঁড়ির প্রথম ধাপে একটু লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে দেখলো। ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ হল বটে কিন্তু ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।

‘তোকে ওস্তাদি করতে বলিনি আমি’ওয়ারউইক বলে উঠলো।

‘রে কে যখন ইঁদুরে কামড়েছিল তখন তুমি ছিলেনা দাদা’ ব্রচু নরম স্বরে উত্তর দিলো।

হল বললো ‘চলো’

ওয়ারউইক একটা তিক্ত নজরে আশেপাশে জড়ো হওয়া লোকজনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে হল এর সাথে গুপ্ত দরজার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। উইসকনস্কি অনিচ্ছুক ভাবে ওদের দুজনের মাঝে পা বাড়ালো। ওরা একজন একজন করে নীচে নেমে গেল। প্রথমে হল, তারপর উইসকনস্কি, তারপর ওয়ারউইক। নীচের ট্যারাবেঁকা উঁচুনিচু মেঝের উপর কয়েকশো ঢিপির পাহাড় আর উপত্যকার উপর ওদের ফ্ল্যাশলাইটের আলোগুলো খেলা করছিল।

নীচের মেঝেতে পা রাখতেই ওয়ারউইক চারিদিকে আলো ঘুরিয়ে দেখলো। আলোয় ধরা পড়ল কিছু পচন ধরে যাওয়া বাক্স, পিপে, ছোটখাটো টুকরো টাকরা।

নদীর থেকে আসা জমাজল ওদের গোড়ালি অবধি ডুবিয়ে দিয়েছে ।

‘আর তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না’ উইসকনস্কি ফিসফিস করলো।

দরজা পিছনে ফেলে রেখে ধীরে ধীরে ‌ওরা হাঁটতে থাকলো পায়ের নীচের পাঁক সরাতে সরাতে।

হল মাঝখানে একটু থেমে বিরাট একটা কাঠের বাক্সের গায়ে আলো ফেলল তাতে সাদা অক্ষরে লেখা

‘এলিয়াস ভারনে’ সে পড়তে পড়তে বললো ‘১৮৪১। মিল টা কি তখন‌ এইখানে ছিলো নাকি?’

‘না’ওয়ারউইক বললো, ‘এটা ১৮৫৭ র আগে তৈরী হয়নি, তাতে কি আসে যায়?’

হল কোনো উত্তর দিলো না। ওরা আরও এগিয়ে চলল। এই পাতালঘর যা ভেবেছিলো তার থেকে অনেক লম্বা।

দূর্গন্ধটা এবার বাড়ছে, পচা, ক্ষয়ে যাওয়া, মাটিচাপা জিনিসের গন্ধ কিন্তু এখনও শব্দ বলতে কানে আসছে শুধু গুহার মধ্যে ঝরে পড়া টিপটিপ জলের ফোঁটার।

‘ওটা কি?’ হল আলো ফেলে ইশারা করলো একটা কংক্রিটের কুঁড়েঘরে দিকে, এই পাতাল কুঠুরির একপ্রান্তে প্রায় দুফুট মতন মাথা বাড়িয়ে আছে যার মধ্যে অন্ধকার অব্যবহিত আর হল এর মনে হচ্ছে ওর ভিতর থেকে শব্দও ভেসে আসছে, আশ্চর্যজনক ভারী আওয়াজ।

‘এটা তো.. না না এ কিভাবে সম্ভব?’

ওয়ারউইক উঁকি দিয়ে বলল

‘মিল এর বাইরের দেওয়াল তাই না? আর উপরের দিকে উঠেছে’

‘আমি ফিরে যাচ্ছি’ হঠাৎ ওয়ারউইক উল্টো দিকে মুখ ঘোরালো।

হল তার ঘাড় চেপে ধরলো জোরে

‘তুমি কোত্থাও যাচ্ছো না ফোরম্যান সাহেব’

ওয়ারউইক ওর দিকে মুখ তুলে তাকালো তার দেঁতো হাসি এই অন্ধকার কে কেটে ফেলছে

‘তোর মাথার ঠিক নেই কলেজ বয়, তাই না? বদ্ধ উন্মাদ তুই’

‘মানুষকে, বন্ধুদের উস্কানো উচিৎ নয় তোমার

চলতে থাকো’

উইসকনস্কির গোঙানি ভেসে এলো ‘ হল-‘

‘আমাকে দাও’হল হোসপাইপটা কেড়ে নিলো।

ওয়ারউইকের ঘাড় ছেড়ে দিয়ে সে হোসপাইপের মুখ তার মাথার দিকে তাক করলো। উইসকনস্কি হঠাৎ করে পিছন ফিরে সুড়ঙ্গ দরজার দিকে হাচড়পাচড় করে দৌড় দিল। হল সেদিকে ফিরেও তাকালো না।

‘আগে আপনি ফোরম্যান সাহেব’

ওয়ারওইক সামনে পা বাড়ালো, এগোতে এগোতে এমন জায়গায় এসে পৌঁছাল যেখানে ওদের মাথায় উপর মিল এর দেওয়াল শেষ হয়ে গেছে। হল এবার আলোটা উপর দিকে জ্বালতেই তার আশঙ্কার পূর্বাভাস সার্থক হল। ইঁদুরগুলি এগিয়ে এসেছে ওদের দিকে নিঃশব্দ মৃত্যুর মতন। ভীড় করে, শ্রেণীবদ্ধ সৈন্যদের মতন। হাজার হাজার চোখ লোভাতুর চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো সারির উচ্চতা প্রায় মানুষের হাঁটুর কাছাকাছি।

ওয়ারউইক ব্যাপারটা একটু দেরিতে দেখতে পেয়েই স্থবির হয়ে গেল।

‘ওরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে, কলেজ বয়’

ওর গলার স্বর এখনও শান্ত, নিয়ন্ত্রিত কিন্তু একটু খরখরে।

‘হ্যাঁ’ বলল হল, ‘চলতে থাকো’

ওরা সামনে এগোলো, হোসপাইপটা পিছনে ঘস্টাচ্ছিল। হল একবার পিছনে তাকিয়ে দেখলো ইঁদুরগুলি ওদের আসার পথটা বন্ধ করে দিয়েছে আর হোসপাইপের মোটা ক্যানভাসের গায়ে দাঁত বসাতে শুরু করেছে।

একটা হঠাৎ মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করলো মনে হল। তারপরেই আবার মুখ নামিয়ে ‌নিলো। এবার বাদুড়গুলিকে দেখতে পাচ্ছে। এবড়ো খেবড়ো জংধরা কড়ি দিয়ে ঝুলছে সেগুলো। বিরাট, প্রায় এক একটা দাঁড়কাকের মতন।

‘ওই দ্যাখ’ ওয়ারউইক ওর আলোটা মোটামুটি পাঁচ ফিট সামনে একজায়গায় ফেলল।

একটা মাথার খুলি, শ্যাওলা ধরা, ওদের দিকে ভেঙচি কেটে তাকিয়ে। আরো সামনে হল দেখতে পেলো একটা প্রকোষ্ঠের হাড়, ভাঙ্গা কোমর আর পাঁজরের একটু অংশ।

‘চলতে থাকো’বললো হল। ভিতরে ভিতরে কিছু একটা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে মনে হচ্ছিল তার, একটা গভীর কালো উন্মত্ততা যেন। তুই আমার আগেই ভেঙে পড়বি ফোরম্যানের বাচ্চা, ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করো।

ওরা হাড় কঙ্কাল পেরিয়ে গেল। ইঁদুর গুলি ওদের পথ আটকাচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছে যেন। ওদের পথ কেটে একটা যেন‌ পার হয়ে গেল আবছায়ায় ভালো বোঝা‌ না‌ গেলেও গোলাপী লেজের একটা অংশ দেখতে পেল‌ হল, প্রায় টেলিফোনের তারের মতন‌ মোটা।

সামনের মেঝেটা খাড়া উপরের দিকে উঠে কিছু দূর গিয়েই আবার খাদে নেমে গিয়েছে। হল একটা ভারী সরাসরানি শব্দ পেল, আওয়াজ টা পেল্লাই। বড়সড় কিছু একটা নড়েচড়ে উঠলো যেন। এমন কিছু যা কোনো জীবন্ত মানুষ চোখের সামনে দেখে নি।

হল এর উপলব্ধি হল হয়তো এমন কিছু একটা চোখে দেখার জন্যই সে সারাদিন পাগলের মতন খুঁজে বেড়াচ্ছিল।

ইঁদুরগুলি এগোচ্ছিল, পেটের উপর ঘসটে ঘসটে

সামনের দিকে

‘দ্যাখ’ ওয়ারউইক এর গলা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

হল দেখতে পেল।

ইঁদুরগুলির মধ্যে এখানে কিছু অস্বাভাবিক ঘটেছিল, কোনো এক ঘৃণ্য রূপান্তর যা সূর্যের আলোর নীচে কখনও সম্ভব হতো না; প্রকৃতি সেটা নিষিদ্ধ করে দিত। তবে এখানে, প্রকৃতি অন্য এক ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে।

ইঁদুরগুলি দানবীয়, কতকগুলি প্রায় তিন ফুট উচ্চতার। তবে তাদের পিছনের পা গুলি চলে গেছে এবং তারা ছুঁচোর মতন অন্ধ বা অনেকটা তাদের ডানাওলা তুতো ভাইদের মতন। জঘন্য এক উদগ্রীব ভাব নিয়ে তারা নিজেদেরকে টেনে নিয়ে এগিয়ে আসছিল।

.

ওয়ারঊইক ঘুরে হল এর মুখোমুখি হলো, মুখের

হাসিটা স্রেফ মনের জোর দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে এখনও, ‘আর আগে যাওয়া যাবেনা হল, দেখতেই তো পাচ্ছিস’

‘ইঁদুরগুলির তোমার সাথে কিছু জরুরী কাজ আছে মনে হচ্ছে’

ওয়ারউইকের নিয়ন্ত্রণ খসে পড়ল এবার

‘দোহাই’সে বলে উঠলো,’দোহাই’

হল হাসলো, ‘চলতে থাকো’

ওয়ারউইক হলের পিছন‌দিকে খেয়াল করে বললো, ‘ওরা হোসপাইপ চিবিয়ে দিচ্ছে, এরপর আর ফেরার উপায় থাকবেনা কিন্তু।’

‘জানি, সামনে এগোও।’

‘তুই বদ্ধ উন্মাদ- ‘ ওয়ারউইকের জুতোর উপর দিয়ে একটা ইঁদুর পেরিয়ে যেতেই সে চিৎকার করে উঠলো।

হল হেসে আলো জ্বালিয়ে ইশারা করলো। চারিদিকে ঘিরে ধরেছে ওরা। সবথেকে কাছেরটা প্রায় এক ফুট দূরত্বে চলে এসেছে।

ওয়ারউইক আবার হাঁটতে শুরু করেছে। ইঁদুরগুলি একটু পিছিয়ে গেছে। ওরা উঁচু অংশটার উপরে পৌঁছে ‌নীচে দিকে তাকালো। ওয়ারউইক আগে পৌঁছেছিল। হল দেখল ওর মুখ কাগজের মতন সাদা হয়ে গেছে। থুতনি দিয়ে লালা ঝরে পড়ছে।

‘হে ঈশ্বর! যিসাস রক্ষা করো’

বলেই সে ঘুরে পালাতে গেল।

হল তখনই নজেলের মুখ খুলে দিতে জলের তোড় গিয়ে ওয়ারউইকের বুকে আড়াআড়ি ভাবে ধাক্কা মেরে তাকে পিছন দিকে ছিটকে নীচে ফেলে ‌দিল,সে যেন কোন অতলে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটা দীর্ঘ আর্তনাদ ভেসে উঠলো জলের শব্দ ছাপিয়ে। আঘাতের শব্দ এলো।

‘ হল’একটা ঘোঁৎ শব্দ ।

তারপরেই তমসালিপ্ত একটা চিঁচিঁ শব্দে যেন পৃথিবী ভরে উঠলো।

‘হল, তোকে ভগবানের দিব্যি-‘

একটা অঙ্গ ছিঁড়ে ফেলার শব্দ এলো, ভেজা । আবার একটা আর্তনাদ, ক্ষীণ। বড়সড় কিছু দাঁত দিয়ে হাড় ভেঙ্গে টুকরো করার ভেজা খটখট শব্দ খুব পরিষ্কার শুনতে পেল হল।

পা হীন ইঁদুর একটা, কোনো এক হতচ্ছাড়া শব্দ তরঙ্গের কল্যাণে সেটা ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর, কামড়াতে। শরীরটা থলথলে, গরম। প্রায় অন‌‌্যমনস্ক ভাবে হল সেটার উপর হোসপাইপ চালিয়ে ছিটকে ফেলল। পাইপের ভিতরে এখন আর আগের মতন জলের চাপ নেই।

ভেজা চড়াই মেঝের গোড়া অবধি গিয়ে হল নীচে তাকালো।‌ এই বিষাক্ত গোরস্থানের ভিতরে গলির শেষ প্রান্ত অবধি ইঁদুরের শরীরে ঠাসা। বিপুল, গা ঘিনঘিনে একটা ধূসর প্রলেপ যেন, দৃষ্টিহীন, নিষ্পদ সবগুলো। হলের আলো তাদের উপর পড়তেই সব একসাথে একটা জঘন্য গোঙানির শব্দ করে উঠলো। প্রথমে রাণী, তারপর ম্যাগনা মেটার, জননী। বিশাল কিছু নামহীন জীব যাদের বংশধরদের হয়তো কোনো দিন ডানা গজাবে। ওয়ারউইকের শরীরের যেটুকু অবশিষ্ট দেখা যাচ্ছে সেটাও ওদের সামনে বামন মনে হচ্ছিল কিন্তু সেটা সম্ভবত ভ্রম। এই বিপুল গরুর আকৃতির ইঁদুর দেখার ফলে মানসিক ভারসাম্যে ধাক্কা লেগেছে তার।

‘বিদায়, ওয়ারউইক’ হল বলে উঠলো।

ইঁদুরটা হিংসায় ফোরম্যানের উপর ঝাপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে নিল হাতের টুকরো।

হল পিছনে ঘুরে ফেরার রাস্তায় দ্দ্রুত পা বাড়ালো, পাইপ দিয়ে ইঁদুর সরাতে সরাতে, জলের তেজ কমে আসছে। কয়েকটা ইঁদুর গা বাঁচিয়ে ওর পায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে কামড় দিতে শুরু করলো, জুতোর উপরের অংশে। একটা মরিয়া হয়ে ওর থাই ধরে ঝুলে রইল, কর্ডুরয় প্যান্ট ফালাফালা করে দিয়ে। হল ঘুষি চালিয়ে সেটাকে পেড়ে ফেললো মাটিতে।

ফেরৎ রাস্তার সোয়াখানেক চলে এসেছিল এমন সময় ডানা‌র ঝাপটের শব্দে অন্ধকার মুখরিত হয়ে গেলো। বিরাট একটা উড়ন্ত অবয়ব এসে ওর মুখে ধাক্কা মারলো।

রুপান্তরিত বাদুড়টার লেজ এখনও আসে পড়েনি।

সেটা হলের গলার চারিপাশে নাগপাশের মতন চেপে ধরে দাঁত দিয়ে ওর ঘাড়ের নীচের নরম জায়গা কামড় বসাবার রাস্তা খুঁজছিল। জীবটা ক্রমাগত মোচড় মারছিল ও ঝিল্লিদার ডানা ঝাপটাচ্ছিলো,ওর শার্টের টুকরো ধরে টানছিল। হল অন্ধের মতন নজেলের মুখটা সেটার দিকে তাক করে বারংবার চালালো, জীবটা গলা থেকে খসে পড়তেই সে পা দিয়ে পিষতে থাকলো, প্রায় অজান্তেই তার গলা দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে আসছিলো। পায়ের উপর দিয়ে বন্যার জলের মতন‌ ইঁদুর পেরতে শুরু করলো।

থমকে থমকে সে দৌড়াচ্ছিল, ঝাঁকুনি ‌দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে। বাকিগুলো ওর পেটে কামড়ালো, কেউ বুকে, একটা ওর কাধে‌ চড়ে কানের লতিতে কামড় বসিয়ে দিলো।

সে দ্বিতীয় বাদুড়টার সঙ্গে ধাক্কা খেল।

চিঁ চিঁ করতে করতে সেটা তার মাথার উপর আটকে রইল কিছুক্ষণ তারপর এক খামচায় মাথার চামড়ার টুকরো ছিঁড়ে নিলো।

হল এর মনে হলো যেন শরীর অবশ হয়ে আসছে।

কানে তালা লেগে যাচ্ছে বহু ইঁদুরের কর্কশ বিলাপে। একবার নিজেকে তোলবার শেষ চেষ্টা করলো সে কিন্তু লোমশ শরীরের গায়ে হোঁচট খেয়ে হাটুর উপর ঘুরে পড়ে গেল। হাসতে শুরু করলো পড়ে গিয়ে, উচ্চস্বরে, আর্তনাদের এক হাসি।

ভোর পাঁচটা, বৃহস্পতিবার।

‘কারোর একটা নীচে গিয়ে দেখা উচিৎ’ ব্রচু তড়িঘড়ি বলে উঠল।

‘আমি না’ উইসকনস্কি ফিসফিস করলো ‘আমি না’

‘ ধুর, তুমি নও, ভুঁড়িমোটা’ ইপস্টন অবজ্ঞার সুরে বললো।

‘বেশ, চলো যাই’ আরেকটা হোসপাইপ টেনে নিয়ে ব্রোগান বলে উঠলো, ‘আমি, ইপস্টন, ডেঞ্জারফিল্ড, নেডাউ। স্টিভেনসন, অফিসে যাও গিয়ে আরো কয়েকটা লাইট নিয়ে এসো।’

ইপস্টন ‌নীচের অন্ধকারের দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘ ওরা হয়তো কোথাও দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। কয়েকটা তো ইঁদুর, কি আর এমন হবে’

স্টিভেনসন লাইট নিয়ে ফিরে এলো; কিছুক্ষণ পর ওরাও রওনা দিল পাতাল ঘরের পথে ।

সমাপ্ত