ট্রুম্যান ক্যাপোটের ছোটগল্প বিংশ শতাব্দীর মার্কিন সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এর মধ্যে অন্যতম। তাঁর গল্পগুলি রহস্যময়, স্বপ্নালু ঘটনার জন্য সুপরিচিত।গল্পের মুখ্য চরিত্ররা জীবনসংগ্রামের পথে বেরিয়ে অপ্রত্যাশিত বাঁধার সম্মুখীন হন যেগুলি কোন ভুতুড়ে, রহস্যময় আগন্তুক এর আকারে তাদের জীবনে উপস্থিত হয়। তাদের শৈশবের কোন স্মৃতি বা পরিচিত মুখের সাথে সাযুজ্য এই আগন্তুকদের উপস্থিতিকে বৃহৎ ও প্রভাবশালী করে তোলে। ক্যাপোটের মুখ্য চরিত্ররা সাধারণত এমন ধরনের মানুষ হন, যারা বাড়ি থেকে দূরে বা ভ্রাম্যমাণ বা একাকী থাকেন, ফলে তাদেরকে এই সহসা অপরিচিতের সম্মুখীন হওয়ার ব্যপারে সব থেকে দুর্বল মনে হয়। একাকীত্ব তাদের দেয় সময়, নিঃসঙ্গতা দেয় প্রেরণা, আর এই অভিজ্ঞতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ উপসংহার এর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

নিশিবৃক্ষ
ট্রুম্যান ক্যাপোট
ভাষান্তরঃ শান্তনব রায়
সে ছিল শীতকাল এর রাত।একসারি নগ্ন বাল্ব এর আলো, দেখে মনে হয় যেন ভিতরের সমস্ত আভা নিঙরে নেওয়া, ছোট্ট ট্রেন ডিপোর ঠাণ্ডা হাওয়ায় মোড়া প্লাটফরমকে আলোকিত করে রেখেছিল। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে এক পশলা আর এখন বরফের কুচি ষ্টেশন ঘরের গায়ে ঝুলে রয়েছে যেন কোন স্ফটিকের দৈত্যের দাঁতের সারি। একটি মেয়ে, তরুণী ও দিরঘাঙ্গি, ছাড়া বাকি ষ্টেশনচত্বর জনমানবহীন। মেয়েটির পরনে ধুসর ফ্লানেল স্যুট, রেইনকোট, আর একট প্লেইড এর স্কার্ফ। মাথার চুল মাঝখানে সিঁথি কেটে দুইপাশে চমৎকার পাক খাওয়ানো, ঘন সোনালি-বাদামি রঙের; আর মুখশ্রী কিঞ্চিত রুগ্ন হওয়ার জন্য তাকে অনবদ্য না হলেও, আকর্ষনীয় বলা চলে।
এছাড়াও তার সঙ্গে রয়েছে কিছু পত্রিকার সংগ্রহ ও ধুসর রঙের সুয়েড এর পার্স যার উপর উজ্জ্বল রুপোলী তবকে নাম খোদাই করা ‘কে’(KAY) এবং চমকপ্রদ সবুজ রঙের একটি গিটার।
ধোঁয়া উগরাতে উগরাতে চোখ ধাঁধানো আলো জ্বেলে, ট্রেনটা যখন অন্ধকার ফুঁড়ে প্ল্যাটফরমে এসে থামল, কে তার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে একদম শেষ কামরাতে গিয়ে উঠল।
কামরার ভিতরটা অতীত বৈভবের স্মৃতিচিহ্ন , ক্ষয়িষ্ণু অন্দরসজ্জার লাল পশমি সীটের বিভিন্ন অংশ ন্যাড়া, আয়োডিন রঙ্গা কাঠের হাতল এর খোসা ছেড়ে এসেছে। সিলিং এর বহু প্রাচীন কপার বাতিটা একই সাথে স্বপানলু এবং বেখাপ্পা। বিষণ্ণ নিষ্প্রাণ ধোঁয়ার চাদর ভেসে রয়েছে ভিতরে, আর কামরার ঘিঞ্জি ভাবটা পরিত্যক্ত স্যান্দউইচ, আপেলের খাওয়া টুকরো, কমলা লেবুর পচা খোসার গন্ধকে তীব্র করে তুলেছে। বিভিন্ন জঞ্জাল যেমন লিলি কাপ, সোডার বোতল, কোঁচকান খবরের কাগজ ছড়িয়ে আছে গোটা আইল জুড়ে। দেওয়ালে লাগানো ঠাণ্ডা পানীয়জলের কল থেকে সমানে জলের ফোঁটা ঝরে পড়ছে মেঝেতে।
কে ওঠার পর তার দিকে ক্লান্তচোখে তাকান যাত্রীদের অবশ্য এইসব অস্বস্তি সম্পর্কে সচেতন মনে হল না। নাক চিপে ধরার প্রবণতা কে অগ্রাহ্য করে কে আইল ধরে, ঘুমন্ত এক বিশালবপু লোকের বেরিয়ে থাকা পায়ে হোঁচট খেয়ে, কোন বিপত্তি না ঘটিয়ে, এগিয়ে চলল। অদ্ভুত দেখতে দুটো লোক হাঁ করে তাকাল সে পেরিয়ে যাওয়ার সময়; আর একটা বাচ্চা নিজের সীট এ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেছিল, “ মা ওই ব্যাঞ্জ টা দেখো, ওই মেয়ে তোমার বাঞ্জও বাজাতে দাও না, একবার দাও” যতক্ষণ না তার মায়ের হাতের কষিয়ে এক থাপ্পড় তাকে চুপ করায়।
মাত্র একটাই খালি জায়গা ছিল ভিতরে। কামরার একদম শেষ প্রান্তে একটা আল্কভ এর ধারে তার খোঁজ মিলল, যদিও একজন লোক আর এক মহিলা ইতিমধ্যেই তা দখল করে সামনের সীটে অলশভাবে পা তুলে বসেছিল। কে একটু ইতস্তত করে বলল, “কিছু মনে না করলে আমি এখানে বসতে পারি”?
এই প্রশ্নে মহিলার নুয়ে পড়া মাথা এমনভাবে ছিটকে উপড়ে উঠল, যেন তাকে শুধু সামান্য প্রশ্ন নয় সাথে ছুঁচ ফুটিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাই হোক মুখে একটু হাসি টেনে “জানিনা, তবে তোমাকে বাঁধা দেওয়ার কোন কারণ দেখছিনা” বলে পা নামিয়ে এবং পাশের লোকটির, যে এদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ না করে জানালার বাইরে চেয়েছিল, পা টেনে নামালেন।
মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে কে গায়ের কোট খুলে, পাশে জিনিসপত্র আর গিটারটা গুছিয়ে রেখে, পত্রিকাটা কোলের উপর মেলে ধরে আরাম করে বসল; যদিও পিঠের জন্য একটা বালিশের অভাব বোধ করছিল। ট্রেন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নড়ে উঠলো, ভৌতিক ছায়ার মতন একরাশ ধোঁয়া জানলা দিয়ে ভিতরে ঢুকে এল আর অনতিবিলম্বেই ডিপোর ফ্যাকাশে আলোগুলিকে দূরে ফেলে গাড়ি এগিয়ে গেল।
“ বাবা কি বিদঘুটে ভাগাড়ে জায়গা!” মহিলা বলে উঠল, “কোন শহর নেই, কিসসু নেই”
“ শহর কয়েক মাইল দূরে” কে বলল।
“ তাই বুঝি, ওখানেই থাক নাকি?”
না। কে এবার বিশদে বলল যে সে এক কাকাবাবুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে গেছিল। যদিয়ও এটা বলল না যে এই কাকাবাবু, নিজের উইলে এই গিটার ছাড়া তার জন্য আর কিচ্ছুটি রেখে যান নি। কোথায় ফিরছিল সে? ও হ্যাঁ, কলেজে ফেরত যাচ্ছিল। এই কথা শুনে একটু চিন্তা করে, মহিলা বললেন,
“কি শেখ ওইসব জায়গায়? দেখ বাছা, জ্ঞানগম্মি আমারও ভালই রয়েছে কিন্তু কোনদিনই আমি কলেজমুখো হইনি”
“ওহ, যান নি?” কে বিনয়ের সাথে বিরক্তি প্রকাশ করে বিষয়টা সাঙ্গ করতে আবার খোলা পত্রিকাতে মনোনিবেশ করল। কামরার আলোটা বেশ ম্রিয়মাণ আর পত্রিকার গল্পওগুলি একটাও পছন্দসই লাগছিল না। তবুও, অপ্রয়োজনীয়ও কথাবার্তার লম্বা দৌড় এড়াবার জন্য সে বোকার মতন খোলা পাতাগুলির দিকেই তাকিয়েছিল, যতক্ষণ না পায়ের উপর একটা অলক্ষিত টোকা অনুভব করে।
“পড়তে হবে না” মহিলা বললেন।
“আমি কথা বলার লোক পাইনা, এর সাথে কথা বলায় কোন মজা নেই।“ মহিলা নির্বাক লোকটির দিকে একটা বুড়ো আঙুল তুলে অঙ্গভঙ্গি করলেন।
“এ প্রতিবন্ধী, মানে বোবা কালা, বুঝলে?”
কে পত্রিকা বন্ধ করে প্রথমবার মহিলার দিকে ভাল করে নজর দিল। তিনি খর্বকায়, পা দুটি কোনোক্রমে মেঝেতে ছুঁয়ে আছে এবং অনেক খর্ব মানুষের মতন তার আকৃতিও বেশ উদ্ভট, একটা বিরাট, আখাম্বা মাপের মাথা। রুজ এর প্রলেপ এত চড়া যে তার ভিতরের ঝুলে পরা মুখের চামড়া দেখে ঠিক বয়স বোঝার উপায় নেই; হবে হয়ত পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন। তার ভেড়ার মতন চোখগুলি কোঁচকানো, যেন মনে হয় চোখের সামনে যা দেখেন কিছুই বিশ্বাস করেন না। চূলগুলিতে যথারীতি লাল রঙ লেপা, শুকনো, কর্কস্ক্রু পাক দেওয়া। একদা সুন্দর ল্যাভেন্ডার রঙ এর বড় টুপীটা মাথার একপাশে হেলে দোল খাচ্ছিল, আর তার কানায় ঝুঁকে পরা সেলুলয়েড এর নকল চেরিগুচ্ছকে তিনি বার বার পিছনে ঠেলে সরাচ্ছিলেন। একটা সাধারণ, কিছুটা মলিন, নীল রঙের পোশাক পরেছিলেন। তার নিশ্বাস থেকে একটা সাংঘাতিক মিষ্টি জিন এর গন্ধ ভেসে আসছিল।
“তুমিও কথা বলতে চাও আমার সাথে বলো?
“নিশ্চয়ই” কে বলল, হাল্কা অবাক হয়ে।
“ জানি তুমি চাও। বাজি ফেলে বলতে পারি। ট্রেন এ যাতায়াত করার একটা ব্যাপারই তো ভাল লাগে। বাসের লোকজন কেমন মুখ বোজা গাম্বাটের মতন। কিন্তু ট্রেন হল মনের কথা পেড়ে বলার জায়গা, আমি তাই তো বলি সবসময়।“ তার কণ্ঠস্বর উৎফুল্ল ও গমগমে, পুরুষ মানুষের মতন ভারী।
“ কিন্তু ওর জন্য আমাদের সবসময় এক ধরণের সীটেই বসতে হয়; একটু গোপনীয়, একটু ফাঁকা কামরা গোছের, বুঝলে?”
“এটা বেশ আরামদায়ক, আমাকে আপনাদের মাঝে জায়গা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ”
“আমিও খুব খুশী হয়েছি,এমনিতে আমাদের বিশেষ সহযাত্রী জোটে না বুঝলে, অন্য লোকেরা ওর সামনে অস্বস্তি বোধ করে কিনা”
যেন অভিযোগ অস্বীকার করছে, এই ভঙ্গীতে লোকটা গলার গভীর থেকে একটা অদ্ভুত চাপা গোঁৎ শব্দ করে মহিলার জামার হাতা ধরে টান মারল।
“আহ ছাড় না আমাকে সোনা” মহিলা কথাটা বললেন, যেন কোন অমনোযোগী বাচ্চার সঙ্গে কথা বলছেন। “আমি ঠিক আছি, আমরা দুজনে একটু মনের কথা বলছি, এবার তুমি শান্ত হয়ে বসও নাহলে এই সুন্দরী মেয়টি কিন্তু উঠে যাবে এখান থেকে, ও খুব বড়লোক, কলেজে পড়ে বুঝেছ” তারপর এদিকে চোখ মেরে বললেন, ”ও ভাবছে আমি মাতাল হয়ে গেছি”
লোকটি শান্ত হয়ে সীট বসল, তারপর চোখের কোণা দিয়ে কে এর চেহারা পর্যবেক্ষণ করতে করতে একপাশে মাথা হেলিয়ে রইল। তার ওই চোখজোড়া, যেন মেঘলা দুধঘোলা নীল মার্বেল এর মতন, মোটা চোখের পলক সমেত, খুবই অদ্ভুত ধরণের সুন্দর। একটা বিশেষ আদিমতা ছাড়া তার প্রশস্ত রোমহীণ মুখটায় আর কোন জৈব অভিব্যক্তি ছিল না। যেন সামান্যতম অনুভূতি বোধ করতে বা ব্যক্ত করতেও সে অক্ষম। তার ধূসর রঙের চূল ছোট করে কেটে সামনের কপালে অসমান ভাবে ঝোলান। দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন শিশুকে অলৌকিক উপায়ে বয়স্ক করে দেওয়া হয়েছে। পরনে একটা নীলাভ সার্জেন্ট সুট ,খুব সস্তা বাজে পারফিউম এ নিজেকে চোবানো আর কব্জিতে একটা মিকি মাঊস ঘড়ি জড়ানো ছিল।
কে তখনো লোকটার দিকে চেয়েছিল। লোকটার চাহনি ওর দিকে এমন ভাবে সেঁটে রয়েছে যে বেশ গা ঘিনঘিন করছে তা সত্ত্বেও চোখ ফেরাতে পারছিল না।
“ও ভাবছে আমি মাতাল হয়ে গেছি” মহিলা আবার বললেন, “আর মজার কথা কি জানো, সত্যিই আমি মাতাল হয়ে গেছি, আরে ধুর নিকুচি করেছে- কিছু তো একটা করতে হবে, ঠিক কিনা?
তিনি কাছে ঝুঁকে এসে আবার বললেন, “ঠিক কিনা?
“হূম তা বটে” কে উত্তরে বলল।
“তাহলে এসো একসাথে পান করা যাক” মহিলা প্রস্তাব দিলেন। তারপরেই একটা অয়েল ক্লথ এর পুটুলির মধ্যে হাত পুরে দিয়ে, আধখাওয়া একটা জিন এর বোতল বের করে আনলেন। প্রথমে নিজেই ছিপি খুলতে শুরু করে, তারপর কি জানি ভেবে, বোতলটা কে এর হাতে ধরিয়ে দিলেন, “দেখো কি কাণ্ড, তুমি আছ ভুলেই গেছিলাম” বলে “আমি যাই দুটো ভাল কাগজের কাপ যোগাড় করে আনি”
শুনে কে আপত্তি জানিয়ে বলতে যাবে, সে মদ খেতে ইচ্ছুক নয়, তার আগেই, মহিলা উঠে দাড়িয়ে ঈষৎ টলতে টলতে, আইল ধরে হাটা লাগালেন ঠাণ্ডা পানীয় জলের দিকে।
কে একটু হাই তুলে জানলার কাঁচে মাথা ঠেকাল, তার আঙুল গীটারের তারে অলসভাবে খেলা করছিল; তারযন্ত্র গাইছিল এক ফাঁকা, ঘুমপাড়ানি সুর। একঘেয়ে, অন্ধকারে মাখা, জানলা ঘেঁষে পেরিয়ে যাওয়া দক্ষিণভূমের নিসর্গ রাত্রির দৃশ্য। হিমশীতল চাঁদ ট্রেন এর মাথার উপর রাতের আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল রুগ্ন শাদা চাকার মতন।
আর সেই মুহূর্তেই, কোন পূর্বাভাস ছাড়াই, এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। লোকটা হাত বাড়িয়ে আলতো ভাবে কে এর গাল ছুঁয়ে দিল। কাজটার মধ্যে এক শ্বাসরুদ্ধ আবেশ থাকা সত্ত্বেও, এই দুসাহসী ব্যবহারে কে এতোটাই চমকে গেছিল যে কি করবে বুঝতেই পারেনি; তার চিন্তা তিন থেকে চার রকম উদ্ভূট দিকে ডানা মিলল। লোকটা এবার সামনে ঝুঁকে এলো যতক্ষণ না তার অদ্ভুত চোখ ওর খুব খুব কাছে চলে আসে; ওর উগ্র আতরের গন্ধ গা গুলয়। গিটার থেমে গেছে দুজনের এই অনুসন্ধাণী দৃষ্টি বিনিময়ে। হটাত কোন এক অনুকম্পার তার বেজে ওঠে কে র ভিতর; সাথে, অনস্বীকার্য এক তীব্র বিরক্তি, চরম ঘেন্না, লোকটার ব্যাপারে এমন একটা অনুভূতি হল যার দিকে আঙুল তুলে সরাসরি নিশ্চিত হওয়া যায়না, কি যেন একটা, কি যেন?
একটু পড়ে লোকটা মাথা নিচু করে নম্র ভাবে নিজের সীটে হেলান দিয়ে ডুবে গেল, একটা মূর্খে র মতন হাসি ভরতি মুখে, যেন খুব চালাকির কোন কাজ করেছে যার জন্য তার সাধুবাদ প্রাপ্য।
“ওঠ! ওঠ! আমার ছোট্ট রাখাল বালক … মহিলা চীৎকার করতে করতে এসে ধপাস করে বসে ঘোষণা করলেন “ ডাইনির মতন নেশাতুর! কুকুর এর মতন ক্লান্ত! হূইঊ!” মহিলা একমুঠো লিলি কাপ থেকে দুটো আলাদা করে রেখে বাকি ব্লাঊজ এর ভিতর গুঁজে দিলেন, “সুরক্ষিত ও শুকনো থাকবে, হাহাহা” বলতেই সাংঘাতিক কাশীর দমক উঠল তার, কিছুক্ষণ পর সেটা যখন স্তিমিত হল তাকে শান্ত ও স্থির লাগছিল। “আমার বয়ফ্রেন্ড মজার কিনা?” জিজ্ঞেস করলেন, বুকে চাপড় মারতে মারতে। “ওহ কি মিষ্টি সোনাটা আমার” বলে এমন ভাবে তাকালেন যেন এখনই অজ্ঞান হয়ে যাবেন, কে মনে মনে চাইল তাই যেন হয়।
“আমি চাই না” কে বোতল ফেরত দিয়ে বলল, “আমি এসব খাইনা কখনও, বিশ্রী লাগে ”
“ওফ, রসভঙ্গ করো না তো” মহিলা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন “নাও লক্ষ্মী মেয়ের মতন কাপটা ধরো ”
“না প্লীজ…”
“দয়া করে কাপটা শক্ত করে ধরো, ভাবো তোমাদের এই বয়েসের নার্ভ! আমি, আমি গাছের পাতার মতন কাঁপতে পারি, তার কারণও আছে। হে ভগবান আমার তো ইয়ে আছে…”
“ কিন্তু…”
একটা ক্রূর হাসিতে মহিলার ময়ূখটা জঘন্য রকম টেড়া হয়ে গেল।
“ কি ব্যাপার হে? ওহ, তুমি ভাবছ, আমি তোমার সাথে পান করার যোগ্য নই?”
“ প্লীজ ভুল বুঝবেন না” কে কাঁপা গলায় উত্তর দিল, “ আসলে আমার যা ভালো লাগেনা আমাকে কেউ জোর করে তা করাতে চাইলে পছন্দ করিনা, আচ্ছা এই কাপটা আমি এই উনাকে দিয়ে দিতে পারিনা”?
“ ওকে! আজ্ঞে না; ওর যা কাণ্ডজ্ঞান বাকী আছে সেটুকু থাকা প্রয়োজন, এবার এসো দেখি সোনা, এক চুমুকে তরী পার কর”
কে নিরুপায় হয়ে অযথা নাটকীয়তা এড়াতে নিজেকে সঁপে দিল পরিস্থিতির হাতে। মদে চুমুক দিতেই ঝনঝন করে উঠল গোটা গা। জঘন্য জিন। গলা জ্বলে চোখে জল চলে এলো। মহিলার চোখ এড়িয়ে চট করে অবশিষ্ট জিনটা, গিটারের গর্তে ঢেলে দিল। যদিও লোকটা সেটা দেখেছে, এবং কে সেটা বুঝতে পেরে চোখের ইশারাতে অণুরোধ করল মহিলাকে মদ খেতে বাঁধা দিতে। কিন্তু তার শূন্য অভিব্যক্তি দেখে ঠাহর হল না যে লোকটা তার কথা আদেও বুঝেছে কিনা।
“তোমার বাড়ী কোথায়, বাছা?” মহিলা আবার শুরু করলেন।
কিছু হতভম্ব মুহূর্ত এর জন্য কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। তার মাথার ভিতর অনেক শহর এর নাম ভেসে এল একসাথে। তারপর বিভ্রান্তি কাটিয়ে একটা নাম খুঁজে পেয়ে বলে উঠল, “নিউ অরলিন্স, আমার বাড়ী নিউ অরলিন্স!”
“এন.ও তে আমিও যেতে চাই বুড়ো হয়ে গেলে। এককালে, ওই ধরো, ১৯২৩, আমার ছোট্ট একটা ভাগ্য গণনার দোকান ছিল সেখানে। দেখা যাক সেন্ট পিটার স্ট্রীট এ কি অপেক্ষা করে শেষকালে।“
একটু থেমে মহিলা ইতিউতি চেয়ে জিন এর খালি বোতলটা মেঝেতে গড়িয়ে দিলেন। আইল এর মধ্যে সেটা আগে পিছে বিচ্ছিরি শব্দ করে লাট খেতে লাগলো। “আমি টেক্সাস এ বড় হয়ে হয়েছি- বিশাল খামারবাড়ীতে – বাবা খুব বড়লোক ছিলেন। আমরা ভাইবোনরা সব থেকে সেরাটা পেতাম- প্যারিস, ফ্রান্স থেকে আসা জামা কাপড় সমেত। আমি বাজি ফেলে বলতে পারি তোমারও বিরাট বাড়ী রয়েছে, আর বাগান? ফুলের বাগান কর নাকি?”
“ওই, শুধু নীললোহিত।“
একজন কন্ডাক্টর কোচের ভিতর ঢুকল, সঙ্গে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার দমক, আইল এর আবর্জনার সুবাস দমবন্ধ পরিবেশে আবার খেলা করে গেল। লোকটা একটু থপথপ করে চলছিল, দাড়িয়ে মাঝে মাঝে টিকিট পাঞ্চ করছিল বা কোন যাত্রীর সাথে কথা বলছিল। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। কেউ একজন পাকা হাতে হারমনিকা বাজাচ্ছে। কেউ আবার জনৈক রাজনীতিবিদ এর যোগ্যতা নিয়ে অন্যের সাথে তর্ক করে চলেছে। কোন বাচ্চা ঘুম এর মধ্যে কেঁদে উঠল।
“তুমি আমাদের আগের কথা জানলে হয়ত এত বিরক্ত হতে না” মাথা নাড়াতে নাড়াতে মহিলা বললেন, ”আমরা হাঘরে লোক ছিলাম না গো, চিরকাল”
লজ্জিত হয়ে কে সিগারেট এর প্যাকেট খুলে একটা ধরাল। ভাবছিল কামরার অন্যত্র কোন বসার জায়গা বোধয় খালি নেই। এই মহিলাকে আর এক মিনিট এর জন্যও সহ্য করেত পারছে না, এমনকি, ওই লোকটাকেও না। কিন্তু সে এর আগে কোনোমতেই এই ধরণের পরিস্থিতিতে পড়েনি।
‘মাপ করবেন” সে বলল “আমাকে উঠতে হবে, খুব ভাল লাগলো আপনাদের কিন্তু ট্রেনে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো কথা দিয়ে এসেছি।“
প্রায় এক অদৃশ্য ক্ষিপ্রতায় মহিলা মেয়েটির কব্জি চেপে ধরলেন। “মিথ্যা কথা বলা পাপ তোমার মা কি শেখায় নি?” তার গলার স্বর হিসহিসে শোনাল। ল্যাভেন্ডার রঙা টুপী মাথা থেকে খুলে পড়ে গেছে কিন্তু সেটা তোলার কোন চেষ্টা করলেন না। জিভ বের করে শুকনো ঠোট চেটে নিলেন। কে উঠে দাঁড়াতেই মুঠি আরও শক্ত করে চেপে বললেন, “এখানে কোন বন্ধু নেই…বসে পড়…আমরাই তোমার একমাত্র বন্ধু আর তাই বাকী দুনিয়ার জন্য তোমাকে চলে যেতে দিতে পারিনা”
“আরে সত্যি, আমি বানিয়ে বলছি না”
“বস বাছা”
কে সিগারেট ফেলে দিতেই লোকটা সেটা কুড়িয়ে নিলো। তারপর এক কোণায় গুঁজে বসে ধোঁয়ার ঘন রিঙ বানাতে মগ্ন হয়ে পড়ল, যেগুলি ফাঁপা অক্ষি গোলোক এর মতন উপরে উঠে বাতাসের শূন্যতায় বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।
“ কি হল, তুমি নিশ্চয়ই ওর মনে আঘাত দিতে চাও না, আমাদের ছেড়ে গিয়ে, এই মুহূর্তে, চাও কি, বাছা?” মহিলা এবার মৃদু স্বরে মিনমিন করলেন।
“বসে পড়, বস, এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। ওমা, কি সুন্দর গিটার গো। কি সুন্দর সুন্দর গিটার…” তার কণ্ঠস্বর পাশ দিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যাওয়া দ্বিতীয় একটা ট্রেন এর একঘেয়ে শব্দে হারিয়ে গেল আর হটাত কামরার আলোগুলি নিভে গিয়ে পাশের ট্রেন এর সোনালী জানালাগুলি এই অন্ধকার কামরার ভিতর উঁকি দিতে থাকল, কালো-হলুদ-হলুদ-কালো-কালো-হলুদ-কালো।
লোকটার মুখে ধরা সিগারেট এর আগুণ জোনাকির আলোর মতন ধিকধিক করছিল আর ধোঁয়ার রিঙ উপরে উঠে প্রশান্তি ছড়াতে ব্যস্ত ছিল। বাইরে একটা সাইরেন বেজে উঠলো উচ্চস্বরে।
কামরায় যখন আলো ফিরে এলো, কে হাত দিয়ে নিজের কব্জি মালিশ করছিল, ঠিক যেখানে ওই মহিলার শক্ত আঙুল ব্রেসলেট এর ব্যথার লাল দাগ ফেলে দিয়েছে। ক্রোধ এর থেকে সে বিভ্রান্ত অনেক বেশি। ঠিক করে রেখেছিল কন্ডাক্টর এলেই অণুরোধ করবে অন্য কোথাও একটা খালি সীট এর ব্যবস্থা যদি করে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি টিকটি দেখতে এলেন যখন, অনুরোধটা কে এর ঠোটে এসে অসংলগ্ন তোতলামি তে আটকে গেল।
“ হ্যাঁ ম্যাম কিছু বলবেন?”
“ না কিছু না” সে উত্তর দিল
আর তিনি চলে গেলেন।
এরপর আল্কোভ এর এই ত্রয়ীর ভিতরে এক রহস্যময় নীরবতা নেমে এসেছিল যতক্ষণ না মহিলা আবার মুখ খুললেন, “ ও আমার কাছে একটা জিনিষ আছে, সোনা, তোমাকে দেখাই” আবার অয়েলক্লথ ব্যাগ এর মধ্যে হাত ঠেসে ঢোকালেন, “এইটা দেখলে তোমার নাক উঁচু ভাবটা কমে যাবেই”
কে এর দিকে তিনি যেটা এগিয়ে দিলেন সেটা একটা ইস্তেহার, এমন পুরনো ও সস্তা হলুদ কাগজে ছাপানো, যে দেখে মনে হয় শতাব্দী প্রাচীন, যাতে লেখা ছিলঃ
লাজারুশ
জীবন্ত কবর দেওয়া মানুষ
এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা
সচক্ষে দেখে যান
প্রাপ্তবয়স্ক – ২৫ সিলিঙ, শিশু- ১০ সিলিঙ
“আমি সবসময় একটা স্তুতি গাই আর উপদেশ পড়ি”, মহিলা বললেন, “খুব দুঃখজনক দেখতে হয় ব্যাপারটা, লোকে কেঁদে ফেলে, বিশেষ করে বুড়োবুড়িরা। আর আমি একটা উপযুক্ত পোশাক পরি; কালো ওড়না আর কালো গাউন, আহা বেশ নাটকীয়। ও একটা দর্জি দিয়ে বানানো ঝকঝকে বিয়ের পোশাক পড়ে, সঙ্গে একটা পাগড়ী আর মুখে অনেকটা সাদা পাঊডার। আমরা ব্যাপারটাকে যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করি, একদম আসল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতন” কিন্তু আজকাল একদল ছোঁড়া হয়েছে, শুধু খ্যাকখ্যাক করে হাসতে আসে। মাঝে মাঝে তাই ভাবি ও এরকম হয়ে ভালই হয়েছে, নাহলে বেচারা কষ্ট পেত।“
কে এবার বলল, “তার মানে আপনারা কোন সার্কাস বা নাটকের দলের সঙ্গে আছেন?”
“ না না, আমরা একাই” মাটিতে পড়ে যাওয়া টুপীটা তুলে নিয়ে, মহিলা বললেন, “ আমরা বছরের পর বছর ধরে এই কাজ করছি- দক্ষিণ এর সমস্ত ছোট বড় অঞ্চলে আমরা গেছি; সিঙ্গাসঙ, মিসিসিপি- স্পেকি, লুইজিয়ানা- ইউরেকা, আলাবামা… “
এগুলি সমেত আরও অনেক শহরের নাম তার মুখ দিয়ে গানের সুরে ঘুরপাক খেতে লাগল বৃষ্টির মতন, “ স্তুতি আর উপদেশ পাঠ করা হয়ে গেলে আমরা ওকে কবর দিয়ে দিই,”

“কফিন এর মধ্যে?”
“ ওইরকমই, তবে এটা খুব জমকাল দেখতে, এর ঢাকনার উপর রূপোলী তারা আঁকা রয়েছে।“
“ কিন্তু দমবন্ধ হয়ে যাবে তো, এরকম ভাবে কতক্ষণ থাকে”?
“ তা ধর ঘণ্টা খানেক- তবে প্রধান আকর্ষণটা শো শেষ না হলে করি না”
“প্রধান আকর্ষণ”
“ ঊহ, আরে শো এর আগের রাতে যে ব্যাপারটা করি, মানে একটা দোকান খুঁজে বের করি, পুরনো কোন দোকান, এবার তার মালিককে ডেকে তার কাঁচের জানালার ভিতরে এই বাবুকে বসাবার অনুমতি চেয়ে নি, তারপর ও নিজেই নিজেকে সন্মহিত করে ফেলে এবং মড়া মানুষ এর মতন সারারাত বসে থাকে, লোকজন এসে ওকে দেখেই ভয়ে প্রায় কাপড়ে চোপড়ে হয়ে পালায়,” কথাগুলি বলবার সময় মহিলা কানের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে খোঁচাচ্ছিলেন আর মাঝে মাঝে আঙুল বের করে কিছু পাওয়া গেল কিনা নিরীক্ষণ করছিলেন, “আর একবার মিসিসিপির এক বুড়ো শেরিফ কি করেছিলেন জানো…”
এরপরের গল্পটা নেহাতই বিরক্তিকর ও অর্থহীন শোনালো, কে তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখল না। যাইহোক, এতক্ষণ যা শুনেছে তাতে এক দিবাস্বপ্ন এর মতন তার চোখের সামনে সদ্যপ্রয়াত কাকাবাবুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দৃশ্যগুলি ভেসে উঠছিল, এমন এক ঘটনা যেটা তাকে খুব বেশি প্রভাবিত করেনি, কারণ কাকা ভাইঝির সম্পর্ক খুব ক্ষীণ ছিল। আর তাই, ওই লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে, সিল্ক কাস্কেট এর ভিতরে বালিশে শোয়ানো, মৃত কাকার শাদা মুখটা, ভেসে আসছিল মানসপটে।
এই দুটো মুখ, কাকার ও লোকটার, একসাথে দেখতে দেখতে মনে হল, কোথাও যেন এক বেখাপ্পা মিল রয়েছে; অর্থাৎ লোকটার মুখে এক জঘন্য আতর মাখানো গোপন অসাড়তা রয়েছে, একভাবে বলা যায়, সে সত্যিই যেন এক কাঁচের কফিনে ঢাকা নিদর্শন, চোখ মেলে তাকাতে যে নিরাসক্ত, অন্যের দৃষ্টি সম্পর্কেও নিরুৎসাহি।
“মাপ করবেন, কি বলছিলেন যেন?”
“ বলছিলাম, যদি কেউ একটা আসল কবরস্থান এ খেলা দেখাবার সুযোগ দিত তাহলে কি ভাল হত….এখন তো যেখানে জায়গা পাই সেখানেই দেখাই…এই ধর কোন ফাঁকা পারকিং লট, দশের মধ্যে নয়টাই জোটে বিশ্রী গন্ধওয়ালা কোন পেট্রোল পাম্পের পাশে, তাতে অসুবিধে হয় খুব। কিন্তু ওই যে বললাম, আমরা একদম সেরা খেলাটা দেখাই, তুমিও সুযোগ পেলে একবার এসে দেখে যেও।
“হ্যাঁ যেতে পারলে ভালই লাগবে”
“হ্যাঁ যেতে পারলে ভালই লাগবে” মহিলা কে র কথা নকল করে ভেঙ্গিয়ে বললেন, “তোমায় কে ডেকেছে গো? কেউ ডেকেছে নাকি?” নিজের স্কারট তুলে পেটিকোটের কোনা দিয়ে জোরে নাক ঝাড়লেন। “উফ, সামান্য কটা টাকা রোজগার করতে কি ঝক্কি মাইরি, বিশ্বাস কর” আগের মাসে কত উঠেছে জানো? তিপান্ন! সোনা আমার একবার এই টাকায় জীবন চালিয়ে দেখো কেমন লাগে!” বলে স্কারট টা শুকে আবার পরিপাটি করে সাজিয়ে নিলেন। “কোন একদিন আমার সোনা বাবুটা নিশ্চয়ই দমবন্ধ হয়ে মরে যাবে ভিতরে, তখনও লোকে বলবে এতো শস্তার খেলা”
এইসময় লোকটা নিজের পকেট থেকে যেটা বের করে নিজের হাতের তালুতে সন্তর্পণে রাখল, সেটা দেখে মনে হল জলে গুলে পরিষ্কার করা একটা পিচফল এর বীজ। সে কে এর দিকে আড়ে তাকিয়ে, তাঁর মনোযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে, নিজের চোখের পাতা বড় করে মেলে বীজ এর গায়ে অশ্লীল ভঙ্গিমায় হাত বুলাতে শুরু করল।
কে ভ্রুকুটি করে বলল, “ও কি চাইছেটা কি?”
“ও চাইছে তুমি ওটা কিনে নাও”
“ কিন্তু জিনিসটা কি”
“কবচ,” মহিলা বললেন, “প্রেম কবচ”
হারমনিকা বাজাচ্ছিল যে, থেমে গেছে। অন্যান্য শব্দ, অপেক্ষাকৃত কম অভিনব, কয়েক মুহূর্তের জন্য অভিক্ষিপ্ত হয়, কেউ নাক ডাকছে, জিন এর বোতল গড়াগড়ি যাচ্ছে, ঘুমন্ত কণ্ঠে তর্ক চলছে, ট্রেন এর ভারী চাকার দূরবর্তী গুঞ্জন আসছে।
“শস্তায় ভালবাসা কোথায় পাবে বাছা?”
“দেখতে খারাপ না। মানে বেশ মিষ্টি…” কে উত্তর দিল, সময় অতিবাহিত করার জন্য। লোকটা ত্রাউজারে ঘসে পালিশ করে নিল জিনিসটা। তাঁর মাথাটা প্রার্থনাসুলভ, শোকজ্ঞাপক ভঙ্গিতে ঝুকে ছিল, তারপর দাঁতের মাঝে বীজটা রেখে কামড় দিল, যেন সেটা সন্দেহজনক কোন রুপোর টুকরো।
“কবচ ব্যাপারটা আমার জন্যে পয়া নয় কোনদিনই। তাছাড়া…দয়া করে আপনি ওকে এইসব নাটক বন্ধ করতে বলবেন?”
“আহা ভয় পেয়ো না” মহিলা বললেন, আগের চেয়ে অনেক সাদামাটা গলায়, “ও তোমার ক্ষতি করবে না”
“ওকে থামান এক্ষুনি”
“ আমি কি করতে পারি?” মহিলা কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন
“ তুমি তো বড়লোক, তোমার টাকাপয়সা রয়েছে, ও তো সামান্য এক ডলার চাইছে”
“ আমার কাছে কলেজ ফেরার পয়সা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই” কে নিজের পার্স এবার বগলে চেপে ধরে বলল।
কথাটা সত্যি নয়, তাও সে সীট ছেড়ে উঠে পড়ে আইলের মধ্যে বেরিয়ে এলো। সেখানে দাঁড়িয়ে এক মহুরত আসন্ন বিপদ এর আশঙ্কা করছিল কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না।
মহিলা বরঞ্চ ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা দেখিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখ বুজলেন; লোকটি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে কবজটা নিজের পকেটে পুরে ফেলল। তারপর এক হাত সিটের পিছনে মেলে দিয়ে মহিলাকে অলস আলিঙ্গন করল।
কে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এসে কামরার বাইরের অংশে দাঁড়াল। খোলা হাওয়া কনকনে ঠাণ্ডা, আর রেইন কোটটা আল্কভ এই ফেলে এসেছে। স্কার্ফ টা খুলে মাথার চারিপাশে জড়িয়ে নিল।
এই লাইনে সে আগে কোনদিন যাতায়াত করেনি অথচ ট্রেনটা যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে পেরচ্ছিল দেখে খুব চেনা লাগলঃ লম্বা গাছগুলি, কুয়াশাঘেরা ফ্যাকাশে ধূসর রঙ করা, ক্রুর জ্যোৎস্নালোকে, দুইপাশেই দুর্ভেদ্য টাওয়ার এর মতন মাথা তুলে রয়েছে। উপরে অতল ঘন নীল আকাশটা তারাখচিত, এদিক ওদিক অনেক তারা নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। ট্রেন এর ইঞ্জিন থেকে ঘন ধোঁয়ার স্রোত লম্বা জীবকোষের মেঘ এর মতন বেরিয়ে আসছিল। এক কোণে ঝোলানো কেরোসিন লন্ঠন একটা রঙিন ছায়া ফেলেছে।
একটা সিগারেট খুঁজে পেয়ে জ্বালাতে চেষ্টা করেছিল; হাওয়ায় সব দেশলাই কাঠি নিভে গিয়ে শেষ একটা পড়ে রইল। কোনায় যেখানে লন্ঠন জ্বলছিল সেখানে হেঁটে গিয়ে হাত দিয়ে শেষ কাঠিটা আড়াল করার চেষ্টা করল। আগুনটা ধরে, হুশ করে জ্বলে, নিভে গেল। বিরক্ত হয়ে সে সিগারেট আর ফাঁকা প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল; ভিতরে জমে উঠে চাপা উত্তেজনায়, বিরক্তিপূর্ণ নিক্ষেপ এ দেওয়ালে ঘুষি মেরে ফোঁপাল মৃদুভাবে, খিটখিটে বাচ্চার মতন।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মাথা ধরে গেছে, কামরার উষ্ণ পরিবেশে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পরার আকাঙ্ক্ষা জাগছে, কিন্তু পারল না, অন্তত এইমহুরতে নয়, আর সেটা কেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই, উত্তরটা তাঁর ভালই জানা।
দাঁতকাঁপা আর গলার স্বর স্বাভাবিক রাখতে সে সোচ্চারে বলে চলল, “আমরা এখন আলাবামাতে, মনে হয়, আগামীকাল আটলান্টাতে পউছাব, আর আমার বয়স উনিশ, আগস্টে কুড়ি হবে, আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী… অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে ভোরের আলোর উন্মেষের আশায়, সেই একঘেয়ে গাছের সারির দেওয়াল, সেই ঘোলাটে চাঁদকেই খুঁজে পেল।
“আমি ওকে ঘেন্না করি…জঘন্যও একদম…” বলে সে থামল, নিজের ছেলেমানুষি ব্যাবহারে লজ্জিত এবং সত্যর অনুসন্ধানে ক্লান্ত হয়ে, সে ভয় পেয়েছে।
হটাত তাঁর মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রয়জনিয়তা অনভব করল, নিচু হয়ে লন্ঠন এর গা ছুঁয়ে দেখার। সুন্দর কাচের শার্সি গরম হয়ে রয়েছে, লালচে আভা তার হাতকে আলোকিত করে দিল।উষ্ণতা আঙ্গুলগুলি কে থিতিয়ে দিয়ে একটা রোমহর্ষক আবেশ পৌঁছে দিচ্ছিল শরীরে।
সে নিজের মধ্যে এত ডুবে গেছিল যে দরজা খোলার আওয়াজ কানে যায় নি। ট্রেন এর চাকার অবিরত ধাতব শব্দ লোকটার পায়ের আওয়াজ ঢেকে দেয়। একটা মৃদু শূন্যতা বোধ তাঁর সম্বিত ফেরাল কিন্তু পিছনে ফিরে তাকাতে আরও কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়ে গেছিল।
লোকটা এক নির্বাক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে, দুই হাত ঝুলিয়ে, মাথা কাত করে দাঁড়িয়ে। তাঁর বিস্বাদ নিরীহ, লন্ঠনের আলোয় রাঙা মুখ এর দিকে তাকিয়ে কে বুঝতে পারল সে কেন ভয় পেয়েছে; একটা স্মৃতি, শৈশবের এক ভয়ের স্মৃতি, যা বহুকাল আগে কোন নিশিবৃক্ষের শুষ্ক ডাল থেকে ভূতের মতন ঝুলে থাকত। মাসি পিসি, রান্নার লোক, কাজের লোক, অপরিচিত- সবাই ভয়, মৃত্যু , বিদেহী আত্মা, পিশাচ, অশুভ শক্তি নিয়ে গপ্পো বা ছড়া শোনাতো যার মধ্যে এক ছিল শয়তান জাদুকরের কথা, বাড়ি থেকে বেরিয়ো না খুকি নাহলে জাদুকর তোমায় কেড়ে নিয়ে গিয়ে আস্ত গিলে খাবে! সর্বত্রই তার বিচরণ, জাদুকর, সর্বত্র তার বিপদ এর ছায়া। রাতে, বিছানায় শুয়ে, জানলায় তার টোকা দেওয়ার শব্দ শুনতে পাও? ওই শোন!
রেলিং ধরে সে উপর দিকে উঠতে থাকল যতক্ষণ না সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। লোকটি মাথা নাড়িয়ে দরজার দিকে হাতের ঈশার করে দেখাল। কে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়, একসাথে তারা ভিতরে প্রবেশ করে।
কামরার ভিতরের আবহাওয়া ঘুমে অসাড়ঃ একটা একাকী আলো পুরো কামরাকে আলোকিত করার চেষ্টায় এক কৃত্রিম গোধূলি সৃষ্টি করেছে। ট্রেন এর অলস ঝাঁকুনি আর পরিত্যক্ত খবরের কাগজের ভারী খরখর ছাড়া আর কোন গতিময়তা নেই।
একা মহিলাই জেগে ছিলেন।দেখেই বোঝা যায় যে বেশ উৎফুল্ল হয়েছেনঃ নিজের চুলের কার্ল আর টুপির চেরি নিয়ে উশখুশ করছিলেন, আর গোলগাল পা দুটো, গোড়ালির কাছে জড় করে, সামনে পিছনে বিরক্তিসহকারে দোলাচ্ছিলেন। লোকটি সিটে এক হাঁটু মুড়ে শরীরের তলায় চালান করে হাতদুটো বুকের কাছে মুড়ে বসল। কে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় একটা পত্রিকা খুলে বসল। ভালই বুঝতে পারছে যে লোকটা তাকে জরিপ করছেঃ এটা সে জানত কিন্তু নিশ্চিত হতে ভয় পাচ্ছিল এবং কান্নাকাটি করে কামরার সবাইকে জাগিয়ে তুলতে চাইছিল। কিন্তু কেউ যদি তার চিৎকার না শুনতে পায়? যদি তারা আদতে ঘুমন্ত না হয়? চোখে জল এল,পত্রিকার খোলা পাতাটা বড় এবং বিকৃত হয়ে উঠল যতক্ষণ না সব ঝাপসা হয়ে আসে। পত্রিকা তা তীব্র ঝাপতে বন্ধ করে সে মহিলার দিকে তাকাল।
“আমি কিনবো” সে বলে ওঠে। “ মানে ওই কবচটা, কিনবো, যদি সেটাই- তোমরা চাও”
মহিলা কোন উত্তর দিলেন না। করুণার হাসি হেসে লোকটির দিকে তাকালেন। কে এর চোখের সামনে লোকটার মুখাবয়ব যেন পালটে যাচ্ছে, জলের ভিতরে গড়িয়ে যাওয়া, চাঁদের আকৃতির একটা পাথরের মতন হয়ে উঠছে। একটা উষ্ণ আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরছিল।মহিলা যে মুহূর্তে তার পার্স তুলে নিয়ে, রেইনকোট দিয়ে তার মাথার উপরে কাফনের মতন ঢেকে দিচ্ছিলেন, তখনও সে অল্প সচেতন ছিল।
সমাপ্ত