
ফরাসি জল্লাদ ‘শার্ল-অঁহি সাঁসোঁ’ র মর্মস্পর্শী কথা
রচনা এডওয়ার্ড হোয়াইট
ভাষান্তর শান্তনব রায়
১৭৮৮ তে ফরাসি কামার মথুহাঁ লুশ্কাৎ কে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। কান্ডটা এক মূহুর্তের মধ্যে ঘটে গেলেও এর উপক্রম আরও একমাস আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। গোঁড়াপন্থী মথুহাঁ তার ছেলে জা লুশ্কাৎ-এর স্বাধীনতা ও সাম্যবাদী নব্য চিন্তাভাবনায় সাংঘাতিক চটে গিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। জাঁ তার নিজের বিশ্বাস ও ধ্যানধারণা নিয়ে সমাজে সোচ্চার হওয়ায় গোটা ফ্রান্স জুড়ে প্রগতিবাদী হাওয়া ছড়িয়ে পড়ছিল। মাথুহাঁ, জাঁ-কে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েও ক্ষান্ত হননি, তাকে শায়েস্তা করার জন্য জাঁ-এর প্রেমিকা হেলেন কে বিয়ে করতে উদ্যত হন। হেলেনের পরিবার এতে খুব খুশি হলেও, হেলেন জাঁ-এর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সারাজীবন ওই কদাকার বৃদ্ধ ভামের সংসারে শেকলবন্দী হয়ে থাকার কথা ভাবতেও পারতনা। সুতরাং জাঁ হেলেনকে উদ্ধার করে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে একরাতে মাথুহাঁর ঘরে পৌছায়। কিন্তু মাথুহাঁ ওদের পালাতে বাঁধা দিলে দুই পক্ষে হাতাহাতি শুরু হয়। জাঁ একটা লোহার হাতুড়ি দিয়ে মাথুহাঁর মাথায় সজোরে বাড়ি মারে। প্রথম আঘাতেই তার মৃত্যু হয়। এরপর আত্মপক্ষ সমর্থনের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও জাঁ-কে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং চাকায় বেঁধে গুঁড়িয়ে ফেলার মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।
অপরাধীকে একটি বিরাট চাকার সঙ্গে বেঁধে তার হাড়পাঁজর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রথাটি ইউরোপীয় ইতিহাসে বহু শতাব্দী ধরে শাস্তি, অপমান বা অত্যাচারের উপায় রুপে প্রচলিত ছিল। কেউ মনে করেন এটি অদ্বিতীয় ফরাসিদের উদ্ভব, যার প্রচলন ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে হয়েছিল। জাঁ লুশ্কাত যেদিন ভার্সেইতে নিজের যন্ত্রনাময় ভবিতব্যের দিকে এগিয়ে গেছিল ঠিক সেইদিনই এই হাজার বছরের প্রথার সমাপ্তি ঘটে যায়। কারণ জনগনের মধ্যে অনেকেরই মনে হয়েছিল যে জাঁ লুশ্কাৎ কে হত্যার অপরাধে নয় বরং তার রাজনৈতিক মতাদর্শ আর বিশ্বাসের জন্য মৃত্যুদন্ড দেওয়া হচ্ছে। সে যখন মৃত্যুদন্ডের মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলেছে সেই সময় কয়েক ডজন জনতা, অতর্কিতে ভীড়ের মধ্য থেকে ধেয়ে এসে, জাঁ-কে মঞ্চ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, কোনো সুরক্ষিত স্থানে মিলিয়ে যায়। এরকম একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনায় কর্তৃপক্ষও হতবাক হয়ে যান। এরপর জনমতের চাপে স্বয়ং ষোড়শ লুই পর্যন্ত জাঁ-কে নিরপরাধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন। জাঁ লুশ্কাতের এই মুক্তির ঘটনা ছিল সেই সমস্ত অগণ্য ঘটনাবলীর মধ্যে একটি, যা পূর্বাভাস ছিল ভবিষ্যতের বৃহত্তর ফরাসি বিপ্লবের, বহু বছরের প্রথাগুলিকে যে বিপ্লব ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেছিল। ফ্রান্সে মৃত্যুদণ্ডে চাকার ব্যবহার এরপর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। লুশ্কাতের ঘটনার আনুমানিক একবছরের মধ্যেই জনসমক্ষে প্রথমবার শাস্তি দেওয়ার নতুন পদ্ধতি নিয়ে প্রস্তাব আসে নাম তার- গিলোটিন: উদ্ভাবকদের মতে যা কিনা আরো পরিচ্ছন্ন আর তীক্ষ্ণ উপায়ে দন্ড দিতে সক্ষম । অর্থাৎ এক এক ঝটকায় একটি করে মুন্ড ধড় থেকে গড়িয়ে পড়বে।
১৭৯০ এর প্যারিসের সেই উত্তাল সময়ে গিলোটিনের মঞ্চে বা তার আগে জাঁ- লুশ্কাতের মৃত্যুদন্ডের সময় প্রধান জল্লাদের গুরুদায়িত্ব সামলেছিলেন যে ব্যক্তি তার নাম- ‘শার্ল-অঁহি সাঁসোঁ’। সাঁসো, ষোড়শ লুই অথবা তার পরবর্তী প্রজাতান্ত্রিক শাসন, দুই যুগেই প্রধান জল্লাদের দ্বায়িত্ব পালন করেন। যদিও ওই সময়ের মানুষ তাঁকে ভয় ও ঘেন্নার চোখে দেখতো কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি “দ্যা গ্রেট সাঁসোঁ” নামে প্রখ্যাত হন। ফ্রান্সের বা ইউরোপীয় ইতিহাসে এখনও নৈতিক সততার প্রতীক হয়ে আছেন এই সাঁসোঁ। মানবনিধন ব্যাপারটা সাঁসো দের পরিবারে বংশপরম্পরায় প্রথিত ছিল। শার্ল-অঁহি র প্রপিতামহ এবং বংশের প্রথম পুরুষ, তাঁর শ্বশুর মশাইয়ের অকাল প্রয়াণে রাজার দরবারে প্রধান জল্লাদের দ্বায়িত্ব নিতে বাধ্য হন। ১৭৭৮ এ শার্ল-অঁহি বহাল হয়ার আগে প্রায় এক শতক ধরে আরও তিন জন সাঁসো বংশীয় পুরুষ এই পদে কাজ করেছিলেন। শার্ল-অঁহি যখন এই প্রধান জল্লাদের দায়িত্ব পান তখন তাঁর বয়স উনচল্লিশ। কিন্তু ততদিনে মৃত্যুদন্ড পরিচালনা করতে তিনি সিদ্ধহস্ত হয়ে গেছেন। নিজের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাকে মৃত্যুদন্ডের মঞ্চে জল্লাদের দ্বায়িত্ব হাতে তুলে নিতে হয়েছিল। সেই অল্প বয়সেই তিনি অপরাধীদের শ্বাসরোধ, মুন্ডচ্ছেদ বা পুড়িয়ে মারার কাজে অসামান্য বুদ্ধি আর সাহস দেখিয়েছিলেন। রবেত-ফ্রাঁসোয়া দামিয়েঁ কে যখন রাজহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তখন নাবালক শার্ল-অঁহি সাঁসো প্রথমবার জল্লাদের দ্বায়িত্ব পালন করেন। ফ্রান্সের ইতিহাসে আসামীকে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর সেটাই ছিল শেষ নিদর্শন। এরপর সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। সাঁসোর মতে এই সময়টা অনেক সহজ সরল ছিল কারণ তখন রাজহত্যাকেই একমাত্র মৃত্যুদণ্ডচিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত। সাঁসো সম্পর্কে যা জানা যায় তাতে অনুমেয় যে, তিনি অত্যন্ত সুবক্তা ও চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সুশিক্ষিত, পন্ডিত ও বহুভাষী এই মানুষটি জনগণের কর্মচারী রূপে নিজের দায়িত্বকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।

তার দৌহিত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সাঁসো নিজে চাইলেও ওই জল্লাদের ফাঁসিকাঠের কালো ছায়া, তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মচারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে দূষিত করে রেখেছিল চিরকাল। ঐতিহ্যগতভাবে একজন সরকারি জল্লাদ যা মাইনে পেত তাতে আর্থিক অবস্থা সুষ্ঠভাবে চললেও সমাজে উনার কোন সম্মান ছিল না। জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ডের তামাশা দেখার পিপাসু হলেও যে মানুষটি ওই হত্যালীলার দ্বায়িত্ব পালন করতেন, তাকে জনগণ আধ্যাত্মিক পর্যায়ে দূষিত ও অভিশপ্ত মনে করত। সাঁসো এতে মানসিক ভাবে খুবই ভারাক্রান্ত বোধ করতেন এবং চেষ্টা করেছিলেন নিজের বংশের নাম থেকে এই কালিমাকে মুছে ফেলার। ১৮শ শতাব্দীর প্যারিসকে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা টালমাটাল করে দিয়েছিল সে সম্পর্কে সাঁসোর মনোভাব কি ছিল তা বলা কঠিন তবে রাজার প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য সেই টালমাটাল সময়েও তিনি বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু রাজার একনিষ্ঠ সেবক হওয়ার জন্য সমাজে যে সম্মান প্রাপ্য, সাঁসো সেটা আগে কোনদিন পান নি। অদ্ভুতভাবে, ফরাসি বিপ্লব তাকে সেই সুযোগ এনে দেয়। বাস্তিল দুর্গের পতনের সময় জীবন, মৃত্যু ও সামাজিক অধিকার নিয়ে ফরাসি সমাজের পুরোনো ধ্যান-ধারণাগুলিকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ১৭৮৯ এর ডিসেম্বরে নব নির্মিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে- অভিনেতা, ইহুদী এবং জল্লাদ, ফরাসি সমাজের এই তিন গোষ্ঠী, যারা আগে সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতেন, তাদের পূর্ণ অধিকার দেওয়ার জন্য পুনর্বিবেচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের (liberté, égalité and fraternité) সেই যুগেও জল্লাদদের সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে অনেকেই নাক সিঁটকোতেন। অ্যাবে মুরি বলেছেন “এই বৈষম্য বা বিতৃষ্ণা’র পিছনে শুধুমাত্র কুসংস্কার কাজ করত তাই নয়, নিকটাত্মীয় বা পড়শীদের হত্যাকারীকে চোখের সামনে দেখলে সমস্ত সাধারণ মানুষেরই আত্মা ভয়ে কেঁপে উঠতো।”

এমতাবস্থায় ফ্রান্সের সমস্ত জল্লাদদের সপক্ষে প্রতিবাদ জানিয়ে সাঁসো আসেম্ব্লিকে একখানি চিঠি লিখেন। তিনি বলেন এই ব্যাপারটিকে সুবিচার দেওয়া বিপ্লবী সমাজের একটি অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না হলে সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে। তিনি যুক্তি রাখেন যে হয় অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া মুকুব করা হোক নাহলে মৃত্যুদণ্ড পরিচালনার জন্য জল্লাদের উপস্থিতিকে বাধ্যতামূলক করা হোক।এর ফলে কাজ হয়। জল্লাদদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন হতে শুরু করে।এযাবৎ, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ও প্রতিপত্তি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিগুলি আলাদা আলাদা হত। অপেক্ষাকৃত বিত্তবান পরিবারের মানুষদের মুন্ডচ্ছেদ এবং গরীবদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দম বন্ধ করে মারা হত। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ডের জন্য ডক্টর ‘জোসেফ-ইগনাস গিলোটিন’ নতুন যে পদ্ধতির প্রস্তাব করেন তাতে এক ধরনের মানব-নিধন যন্ত্রের পরিকল্পনা দেন যা সমস্ত ধরনের আসামীকে অভিন্ন ভাবে মৃত্যুদণ্ড দিতে সক্ষম হবে ফলে অনেক দ্রুত বিচার ব্যবস্থাকে পরিচালনা করা যাবে এবং তথাকথিত প্রাচীন, যন্ত্রণাদায়ক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ পদ্ধতিগুলি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। শুরুতে নিজের যন্ত্র সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা না থাকলেও ডঃ গিলোটিন দাবি করেন যে
” আমার যন্ত্রের সাহায্যে চোখের পলকে আপনার ধড় থেকে মাথা নামিয়ে দেব এবং আপনি টেরও পাবেন না।”
অনেকেই ডক্টর গিলোটিনের এই যন্ত্রের পরিকল্পনাকে নিছক ঠাট্টা ভেবেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক জে.ডব্লিউ.ক্রোকার বলেছেন যে- “ডক্টর গিলোটিনকে তার বন্ধু-পরিজন সবাই উপহাসের পাত্র হিসেবে দেখতো- এমনি এক ব্যাস্তসমস্ত ব্যাক্তি যাকে কেউ পাত্তাই দিত না। তবুও মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে তার উদ্ভট সাম্যবাদী এই ভাবনা ফলপ্রসূ হতে শুরু করে। ১৭৯১ এর অক্টোবরে মৃত্যুদন্ড নিয়ে এক আইন পাশ হয় যাতে একমাত্র মুন্ডচ্ছেদ ব্যাতীত সমস্ত প্রথাকে রদ করে দেওয়া হয়।”
…এদিকে বহুব্যবহৃত তলোয়ার গুলির ফলার ধার ও অবস্থা দেখে সাঁসো দাবি করেন যে ভবিষ্যতে এত বিপুল পরিমাণ মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র তলোয়ারের সাহায্যে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে সুতরাং আরো কার্যকরী পদ্ধতির প্রয়োজন। নতুন আইন পাশ হওয়ার ফলে ডক্টর গিলোটিনের তথাকথিত হাস্যকর কোতোল যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা প্রকট হয়ে পড়ে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের নামের ক্রমাঙ্ক ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ডক্টর আঁতোয়া লুই নামের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে চটজলদি নতুন মুন্ডচ্ছেদ যন্ত্রের কাঠামো প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং টোবিয়াস স্মিডট্ কে গিলোটিনের নক্সায় সেই যন্ত্র তৈরির জন্য ভাড়া করা হয়।

১৭ই এপ্রিল ১৭৯২ এ সাঁসো এই যন্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য বিসেথ হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে যোগদান করেন। সারাদিন ধরে প্রচুর খড়ের আঁটি, ভেড়া এবং মৃত মানুষের শবকে ওই গিলোটিনে ব্লেডের নিচে ফেলে ক্রমান্বয়ে কেটে পরীক্ষা করা হয়। এর এক সপ্তাহ পরে সাঁসো প্যারিসের উদগ্রীব ও উচ্ছসিত জনতার সামনে গিলোটিনের অভিষেক ঘটান। নিকোলাস জাক পেলেতিয়ে নামক এক কুখ্যাত দস্যুকে প্রথমবার ওই করাল গিলোটিনের ব্লেডে মুন্ডচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু এরপর আরো কতসহস্র মানুষকে যে গিলোটিনে মাথা দিতে হতে পারে তার ধারণা বোধহয় সাঁসো নিজেও করতে পারেননি। সমকালীন তথ্য থেকে জানা যায় গিলোটিনের প্রথম কয়েকটি প্রদর্শনে মানুষের মনে ভাবাবরোহের সৃষ্টি হয়। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিগুলিতে যে আড়ম্বরপূর্ণ নাটকীয়তা ও আদিম বিভৎসতা উপভোগ করা যেত গিলোটিনের এই দক্ষ আর কার্যকরী প্রক্রিয়াতে সেসব না থাকায় জনতা প্রথম দিকে একটু নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার একেই প্রগতিশীল বলে মনে করতেন, হয়তো এর ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা জনতার মনোরঞ্জনের উপাদান থেকে বাদ পড়বে আশা করতেন। মোদ্দাকথা, ধীরগতির ‘মধ্যযুগীয় পাশবিক বর্বরতা’ থেকে আধুনিক, ‘যন্ত্রচালিত বর্বরতা’য় বিবর্তন হয় এই সময় থেকে। আগে যেমন , মৃত্যুদণ্ডের মঞ্চের দিকে আসামীর এক মর্মস্পর্শী নিস্তব্ধতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া দেখে মানুষের মন কেঁদে উঠতো, সেই সব নাটকীয়তা সরে গিয়ে বৈপ্লবিক বোধে ভরপুর উচ্ছলতা দেখা যেতে শুরু করে আসামীদের মধ্যে। সাঁসো এরপর যাদেরকেই গিলোটিনের মঞ্চে তুলেছেন তাদের অনেকেই মঞ্চে যাওয়ার পথে উদ্দাম কন্ঠে গান, নাচ, নিজের শত্রুদের দিকে তাকিয়ে হাসি ঠাট্টা ও অঙ্গভঙ্গি শুরু করে। ঐতিহাসিক ডেভিড জিরু লিখছেন-” মৃত্যুদণ্ডের প্রতি আসামীদের একটা সর্বাত্মক তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা শুরু হয়। এরকম ভয়াবহ ও বীভৎস একটা পরিণতিকে এক ‘চমৎকার প্রদর্শনী’র আখ্যা দেওয়া হয়। “যারা যারা বিপ্লবের ভালো ও মন্দ এই দুই দিকেরই স্বপক্ষে ছিলেন গিলোটিন তাদের কাছে মানুষের চূড়ান্ত ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় এবং কালক্রমে এই যন্ত্র সমাজে এক পুরাকল্পীয় অবস্থান নিয়ে ফেলে। সাঁসো এই যন্ত্রের প্রধান পরিচালক হওয়ার ফলে তাঁর প্রতিও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন হয়। বুর্বোঁ রাজবংশের সঙ্গে তার একনিষ্ঠ যোগাযোগের ইতিহাস জানা সত্ত্বেও রাস্তায় ঘাটে মানুষ তাকে “জনতার প্রতিশোধ” নামে ডাকা শুরু করে। তিনি আমজনতার কাছে জ্ঞান ও শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন। সাঁসোর খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে তাঁর জল্লাদের পোশাক- সবুজ ওভারকোট, ডোরাকাটা ট্রাউজার এবং তিন কোনা হ্যাট পুরুষদের ফ্যাশন হয়ে ওঠে। মহিলারা গিলোটিন-আকৃতির কানের দুল ও ব্রোচ পরতে শুরু করেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল, ফরাসি বিপ্লবের যারা চূড়ান্ত নিন্দুক ছিলেন তাদের কাছেও সাঁসো, বিপ্লবের একমাত্র উপযুক্ত মুখপাত্র হয়ে দাঁড়ান। শিষ্টাচার ও সম্ভ্রান্ত মনোভাব, প্রাণী ও প্রকৃতি প্রেম, বাগান করার শখ অথবা পিতা ও স্বামী হিসেবে উনার নম্র মনোভাবের গল্প সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
তৎকালীন ব্রিটিশ পরিদর্শক যারা ফরাসি বিপ্লবকে আদর্শগতভাবে অপরিণত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ মনে করতেন তারাও সাঁসোর নামে প্রশংসা ও সুখ্যাতি করেন- এমনকি ১৭৯৩ সনে রাজা ষোড়শ লুইকে নিজে হাতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও। হয়তো তারা সাঁসোর মধ্যে এক প্রাক্তন, ফরাসি আভিজাত্যের ছোঁয়া পেয়েছিলেন যিনি তাঁর নিজস্ব ভাবাবেগকে গৌণ করে রাজধর্মের দায়িত্ব, বহু শতকের পরম্পরা ও ঐতিহ্যকে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে পালন করেছিলেন। সমকালীন তথ্যাবলী ও পরবর্তীকালে তাঁর পরিবারের লোকজনের বয়ানে জানা যায় যে ষোড়শ লুই-এর মৃত্যুদণ্ডের মঞ্চে, যা অনেকের মতে গিলোটিনের কুখ্যাত হয়ে উঠার প্রারম্ভ, প্রধান জল্লাদের ভূমিকা পালন করার সময় সাঁসো তীব্র বিবেক দংশনে ভুগেছিলেন। লুইয়ের মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই বিপ্লবী নেতাদের মধ্যে অস্থিরতা ও মতবিরোধ দেখা দেয় যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপে দেশ জুড়ে সন্ত্রাস ও হিংসা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বছরখানেকের মধ্যেই নতুন সরকার বিপ্লব-বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার যাবতীয় প্রচেষ্টা শুরু করে । রাষ্ট্র অনুমোদিত হিংসা ও গণহত্যার প্রধান কান্ডারী,অন্যতম জাকোবাঁ, মাক্সিমিলিয়েঁ রবেস্পিয়ে বলতেন -“এই সন্ত্রাস হল দ্রুত, গুরুতর এবং নমনীয় ন্যায়বিচারের প্রতিরুপ”।

জুন ১৭৯৩ থেকে জুলাই ১৭৯৪ এর মধ্যে ফ্রান্সে প্রায় সাড়ে-ষোলো হাজার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের এই বৃহৎ পরিমাণ ধ্বস ফ্রান্সের সমাজে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় নামিয়ে আনে যার সাথে বিপ্লবের মূল আদর্শের কোনো যোগাযোগ ছিল না। “সন্ত্রাসের রাজত্ব”এর প্রাক্কালে, ফ্রান্সের উত্তরে কম্বহে শহরে জোসেফ লেব্রঁ নামে এক পাদ্রী, স্থানীয় জল্লাদের দ্বায়িত্ব নিয়ে অবাধ মানবনিধনের কারবার শুরু করে দেন। নিজেকে কনিষ্ঠ রবেস্পিয়ে ভেবে নিয়ে কথায় কথায় ব্যক্তিগত আক্রোশ আর যুক্তিহীন অভিযোগে, ডজন ডজন মানুষকে কচুকাটা করতে থাকেন। এই সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে সাঁসো এক ব্যক্তিগত বিয়োগে চূড়ান্ত আঘাত পেয়েছিলেন- তাঁর এক পুত্র,বংশপরম্পরায় যে ছিল তাঁর প্রধান সহকারী, মৃত্যুদণ্ডের মঞ্চে একটি কাটা মুণ্ড জনতার সামনে তুলে ধরতে গিয়ে মঞ্চ থেকে পড়ে মারা যায়। পুত্র বিয়োগের সেই দুঃখের উপর একের পর এক আসতে থাকে গণহত্যার ঢেউ। প্রায় দুহাজারেরও বেশি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দ্বায়িত্ব সাঁসোর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
তার দৌহিত্রের বয়ান অনুসারে সাঁসোর ডায়েরিতে এই দুর্বিসহ সময়ের উল্লেখ রয়েছে। ১৭ ই জুন ১৭৯৩ সনে যখন তাকে ৫৪টি মানুষের মুন্ডচ্ছেদ করার দায়িত্ব দেয়া হয় তখন সাঁসো ডায়েরিতে লেখেন “আরও একটি ভয়ানক কর্মদিবস“।
আরেকদিনের বয়ানে, যখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড পরিচালনা করতে ১৬ জন সহকারী নিয়োগ করতে হয়েছিল তখন লেখেন “ওরা গিলোটিনকে এমন নিষ্ঠার সাথে প্রস্তুত করছে যেন তা অনাদিকাল থেকে যাবে”।

কোনো প্রভাত তাকে উপহার দিয়েছে ‘মারি আঁতয়ঁনেত’-এর ছিন্ন গ্রীবা আবার কোনদিন ত্রাসের রাজত্বে স্বৈরাচারের অন্যতম প্রতীক ‘জর্জ দাঁতো’র মুন্ড।
কোন দেশপ্রেমিককে হঠাৎ বিশ্বাসঘাতক ঘোষণা করা হবে অথবা কোন দলগুলোর ভাগ্যের পরিণতি কি খাতে গড়াবে তার হিসাব রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। শোনা যায় সাঁসো তার ডায়রিতে অনুশোচনা করেছেন-“মহান নাগরিক ও সম্মানীয় মানুষেরা একে অপরকে গিলোটিনের পথে ক্রমান্বয়ে অনুসরণ করে চলেছেন। আর কত মানুষের বলি নেবে এই গিলোটিন?”
গিলোটিন ততদিনে ন্যায়বিচারের প্রতীক থেকে স্বৈরশাসনের প্রধান যন্ত্র হয়ে উঠেছে। অদ্ভুতভাবে, পরম্পরা অনুযায়ী জল্লাদের দপ্তর এমন একটি প্রতিষ্ঠান ছিল যার উপর কোন আঘাত আসেনি সতেরোশ নব্বইয়ের দশক জুড়ে। ১৭৯৫ সনে রবেস্পিয়ের পতন ও সন্ত্রাসের জমানার সমাপ্তি ঘটলে ক্লান্ত সাঁসো তার নিজের দায়িত্ব সমর্পণ করে দেন তার অন্য পুত্র অঁরির হাতে।
তার উনচল্লিশ বছরের কর্মজীবনে সাঁসো প্রায় ৩০০০ মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র অঁহি আবার প্রাচীন ভাবধারায় বিশ্বাস করতেন, তিনি ১৮৪০ সন অব্দি প্রধান জল্লাদের পদে নিযুক্ত ছিলেন। ততদিনে ফ্রাঁন্সে আবার একনায়কতন্ত্রী শাসন ফিরে এসেছে এবং জল্লাদদের সামাজিক পরিচিতি বিপ্লবের সময়ের ‘জাতীয় নায়ক’ থেকে পুনরায় সরকারি পা-চাটা মোসাহেবে পরিণত হয়েছে। জল্লাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার রূপান্তর কেবলমাত্র একটি স্বল্পমেয়াদী ঘটনা ছিল। অঁরির মৃত্যুর পর দায়িত্ব আসে তার ছেলে অঁহি-ক্লেমেঁতের ঘাড়ে। এই পারিবারিক উত্তরাধিকারকে সে এক অসহনীয় লজ্জাজনক বোঝা মনে করত। জল্লাদের দপ্তরের কারবার তাকে ক্রমশ শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক জটিলতা ও নিদ্রাহীন দুঃস্বপ্নের রাত্রি উপহার দিতে শুরু করে।
সে মদ্যপান ও জুয়াখেলা কে আপন করে নেয়। ১৮৪৭ এর কোন এক সময় অঁহি-ক্লেমেঁত সরকারকে চিঠি লিখে জানায় যে সে জুয়াতে গিলোটিনকে বাজি রেখে হেরে গেছে এবং পয়সা জোগাড় না হওয়ায় তাকে আর ফেরত আনতে পারেনি। সাঁসো বংশের সাত প্রজন্ম ও ফ্রান্সের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সরকারি দপ্তরের মধ্যে সম্পর্কের সেটাই ছিল শেষ পর্ব।
অঁহি-ক্লেমেঁত, সাঁসো বংশীয় পুরুষদের এক অতিরঞ্জিত ইতিহাস রচনা করেছিলেন, উনার পিতামহ শার্ল-অঁহির ফরাসী বিপ্লবের সময়কার লেখা ডায়েরি থেকে। দূর্ভাগ্যবশতঃ এরকম কোন ডায়েরি উদ্ধার করা যায় নি, ফলে অঁহি-ক্লেমেঁতের নিজের বয়ানে যখন লিখছেন যে তার পিতামহ শার্ল-অঁহি, প্রধান জল্লাদের পদে থাকার সময়, প্রবল মানসিক যন্ত্রণা ও অশান্তির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, তার সত্য যাচাই করা অসম্ভব। তবুও, শার্ল-অঁহি সাঁসো ফ্রান্স জুড়ে সর্বজনবিদিত ব্যাক্তিত্ব হওয়ায়, আলেক্সান্ডার ডুমা থেকে শুরু করে হিলারি মেন্টেল, বিভিন্ন লেখকের কাহিনীতে একজন পীড়িত অথবা পীড়াদায়ক মানুষের চরিত্র রূপে দেখা দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে উনাকে মাঙ্গা সিরিজের এক রোমান্টিক অ্যান্টি হিরোর রূপদান করা হয়েছে, যেখানে এক সহজ সরল, চমৎকার যুবক, পারিবারিক সম্মান রক্ষার অনৈতিক দাবি পূর্ণ করতে, এক উত্তাল সমাজের করাল, হিংসাত্মক কর্মে নিজেকে উৎসর্গ করে।
গিলোটিনের প্রভাব অবশ্য আরও সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক ছিল। জানা যায় যে প্রায় ১৯৭২ অব্দি নাকি গিলোটিন ব্যবহার করা হয়েছিল। এক উকিলের বয়ানে আছে যে তার মক্কেলকে যখন দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তখন ফ্রান্সের জনতার উচ্ছাস, গিলোটিনের আদিযুগের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছিল যা রীতিমত ঘেন্না ও বিরক্তির উদ্রেক করে। তার মতে -“সেই সময় সাঁসোর মত কেউ যদি মুন্ড হাতে করে জনতার সামনে তুলে ধরতেন তাহলে নিশ্চিত ভাবে সেই জনতাও হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠত।”
কিন্তু আমরা এতক্ষণে এটুকু জানি যে সাঁসো ওই শীতল মুহূর্তগুলিকে আদপেই উপভোগ করতেন না। মৃত্যুদণ্ডের সময় আপনার কেমন লাগে, প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিয়েছিলেন
-“মেঁসিয়, বিশ্বাস করুন আমার বড় তাড়া থাকে এই কাজটা দ্রুত শেষ করবার।”
এডওয়ার্ড হোয়াইট মার্কিনী সাহিত্যিক ও রচনাকার। এই লেখাটি প্রথম প্রকাশ: ‘দ্যা প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকা
শান্তনব রায় গল্পAGISH এর স্রস্টা ও সহ সম্পাদক