নোবেল পুরস্কারজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনার (1897-1962) অক্সফোর্ড, মিসিসিপিতে বড় হয়েছিলেন, যার শিকড় দক্ষিণ অঞ্চলের এক সাবেকী পরিবারে প্রোথিত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডিয়ান এবং ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের পর্ব শেষ করে, উনি মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন এবং নিউ ইয়র্কের একটি বইয়ের দোকান এবং নিউ অরলিন্স সংবাদপত্রে কাজও করেছিলেন। পরবর্তীকালে ফকনার তার নিজস্ব ফার্মে, উপন্যাস এবং ছোট গল্প লেখার জন্য তার বেশিরভাগ সময় উৎসর্গ করেন, যার মাঝে মাঝে ইউরোপ, এশিয়া এবং হলিউডে ভ্রমণ করেন।
তাঁর লেখার মাধ্যমে, ফকনার আমেরিকার দক্ষিণের ঐতিহাসিক উত্থান এবং পতনের বিভিন্ন অধ্যায়কে ভিত্তি করে একটি কাল্পনিক পটভূমিকা ও এই অঞ্চলের বিবিধ জটিলতার প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্রগুলির একটি বৈচিত্র্যময় বিবরণ তৈরি করেছিলেন। প্রতিটি গল্প এবং উপন্যাস তাঁর সৃষ্ট কাল্পনিক ইয়োকনাপাতাওফা কাউন্টির নির্মাণে অবদান রেখেছিল, সার্টোরিস এবং কমসনের মতো পরিবারের মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছিল সাবেকী দক্ষিণের ক্ষয় এবং স্নোপসিস পরিবারের মতো নির্মম নবাগতদের আবির্ভাব। ফকনারের লেখনীতে, মনোলোগের মাধ্যমে সময়কালের পরিবর্তন বা বিকৃতি এক বিশেষ উপাদান। ফকনার তার লেখায় চেতনার প্রবাহের ঘন ঘন ব্যবহার করেছেন এবং প্রায়শই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ, সূক্ষ্ম, সেরিব্রাল, জটিল এবং কখনও গথিক বা বিচিত্র চরিত্রের গল্প লিখেছেন যার মধ্যে রয়েছে প্রাক্তন দাস বা ক্রীতদাসদের বংশধর, দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ, কৃষিজীবী, বা শ্রমিক-শ্রেণীর দক্ষিণী, এবং দক্ষিণের অভিজাতরা। দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি (1929) এবং স্যাঙ্কচুয়ারি (1931) এর মতো কাজগুলিতে এই শৈলী উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাবহার এর পাশাপাশি জাতিগত কুসংস্কারের কথা উত্থাপিত হয়েছে উপন্যাস আবশালোম! (1936) এ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে ফকনারের সবচেয়ে স্পষ্টবাদী নৈতিক মূল্যায়ন ইনট্রুডার ইন দ্য ডাস্ট (1948) এ পাওয়া যায়।
এই কাহিনীতেও সেই সমস্ত উপাদানের ছোঁয়া রয়েছে। লেখাটি ফকনারের প্রথম ছোটগল্প, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে ফোরাম পত্রিকায়।

এমিলির গোলাপ
রচনাঃ উইলিয়াম ফকনার
ভাষান্তরঃ শান্তনব রায়
মিস এমিলি গ্রিয়ারসন পরলোক গমন করলেন যেদিন, আমাদের পুরো শহর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় গিয়েছিল: পুরুষরা কোনো এক পতিত স্মৃতিস্তম্ভ দর্শনের শ্রদ্ধা নিয়ে আর বেশিরভাগ মহিলারাই তাঁর ঘরের অন্দরমহল দেখার কৌতুহল নিয়ে, যা শুধু একজন বৃদ্ধ-চাকর—একজন মালী ও বাবুর্চি ছাড়া—অন্তত দশ বছরে কেউ দেখতে পায়নি।
একটি বড়, বর্গাকৃতির ফ্রেমের বাড়ি যা এককালে শ্বেতশুভ্র ছিল, সুসজ্জিত, কাপোলাস এবং স্পিয়ার ও স্ক্রোল করা বারান্দার ভারী শৈলীতে আঠেরশ সত্তরের দশকের ছোঁয়া, যা আমাদের এককালের সবচেয়ে প্রিয় রাস্তার উপর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে মোটর গ্যারাজ এবং কার্পাস ওয়াগনের সারি সেই পথের ধারে অভিনিবেশ করে তার সমস্ত ইতিহাস,এমনকি অগস্ট শাহাদতের ঐতিহ্যের স্মৃতিকেও কেড়ে নিয়ে মুছে ফেলে; একমাত্র মিস এমিলির বাড়িটি অবশিষ্ট ছিল, তার একগুঁয়ে এবং চটুলতা ভরা ক্ষয়ের আখ্যানকে, তুলোর ওয়াগন এবং পেট্রল পাম্পের ভীড়ের মধ্যে থেকে তুলে ধরার জন্য- এ যেন দৃশ্যদূষণের ঘাড়ে আরও এক দৃশ্যদূষণ।
আর এখন মিস এমিলি নিজেই সেই অগাস্ট শাহাদতের প্রতিনিধিদের সাথে যোগ দিতে চলে গেলেন, সেই যেখানে তাঁরা পদাধিকারী ও বেনামী, জেফারসনের যুদ্ধে শহীদ হওয়া ইউনিয়ন ও কনফেডারেট সৈন্যদের কবরের পাশে, দেবদারু ছায়াঘেরা কবরস্থানে শুয়ে ছিলেন।
জীবদ্দশায় মিস এমিলি ছিলেন, এক ঐতিহ্য, এক সামাজিক কর্তব্যবোধ, এবং পরিচর্চার প্রতীক ; শহরের উপর ন্যাস্ত এক প্রকারের বংশগত ঐতিহ্যের বাধ্যবাধকতা। ঠিক সেই দিন থেকে, যেদিন 1894 সালে, তদানীন্তন মেয়র, কর্নেল সার্টোরিস– এক বিধানের প্রবর্তন করেন যে, কোনও নিগ্রো মহিলা, ট্যাক্স মওকুফ-লেখা এপ্রোন ছাড়া রাস্তায় বের হতে পারবে না, বিধানটি এমিলির পিতার মৃত্যুকাল থেকে স্থায়ীভাবে চিরজন্মের মতন লাগু হয়, যদিও মিস এমিলি দানগ্রহণ করে জীবনযাপন করতেন এমনও নয়। তবে কর্নেল সার্টোরিস গপ্পো ফেঁদেছিলেন যে এমিলির পিতার গোটা শহরের কাছে দেনা রয়েছে, যা কিনা শহর, তার ব্যাবসায়িক স্বার্থে এই উপায়ে আদায় করতে পছন্দ করে। একমাত্র কর্নেল সার্টোরিসের প্রজন্মের সেকেলে চিন্তাধারার মানুষই এই বিধান আবিষ্কার করতে পারতেন, এবং শুধুমাত্র একজন মহিলাই এটি বিশ্বাস করতে পারতেন।
শহরের পরবর্তী প্রজন্ম যখন, তাদের আরও আধুনিক ধ্যান ধারণা নিয়ে, মেয়র, কর্তৃপক্ষ, হয়ে ওঠে, এই ব্যবস্থা নিয়ে কিছু অসন্তোষ তৈরি হয়। বছরের প্রথম তারিখে তারা মহিলাকে একটি ট্যাক্স নোটিশ পাঠায়। ফেব্রুয়ারী চলে আসে, কোন উত্তর মেলে না। তারা একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি লেখেন, উনার সুবিধামত শেরিফের অফিসে বেতারযোগ করতে বলে। এক সপ্তাহ পরে মেয়র উনাকে নিজেই লেখেন, টেলিফোন করার বা উনার জন্য নিজের গাড়ি পাঠানোর প্রস্তাব দেন এবং বদলে একটি পুরাতন আকৃতির চিরকূটে , ক্ষীণ ও সাবলীল ক্যালিগ্রাফিতে, বিবর্ণ কালিতে লেখা এমন এক উত্তর পান, যার ফলে মহিলার আর কোনোদিনই বাইরে বেরনো হয়নি, ট্যাক্স নোটিশখানি চিরকুটের সাথেই বিনা মন্তব্যে সংলগ্ন ছিল।
এরপর অল্ডারম্যান বোর্ডের একটি বিশেষ সভা ডাকা হয় মহিলার বাড়িতে। একটি ডেপুটেশনকারী দল উনার সেই বিখ্যাত সদর দরজায় পৌঁছে কড়া নাড়ে, যার মধ্য দিয়ে বিগত আট দশ বছরে আর কোন দর্শনার্থী প্রবেশ করেনি, যবে থেকে মহিলা চীনা ক্যালিগ্রাফির প্রশিক্ষণ দেওয়া বন্ধ করেছিলেন।
বৃদ্ধ নিগ্রো ভৃত্য তাদের এক আবছায়া, ছোট হলঘরের মধ্যে প্রবেশ করায় যেখান থেকে একটি সিঁড়ি আরও ছায়াঘন স্থবির অন্ধকারে উঠে গেছে। চারিপাশে জমাট ধুলো এবং অপব্যবহারের গন্ধ – এক বদ্ধ পরিত্যক্ত গন্ধ। নিগ্রো তাদের সিঁড়ি বেয়ে পার্লারে নিয়ে আসে। চামড়া মোড়া ভারী আসবাবে সাজানো ঘরটি। ভৃত্যটি ঘরের জানালার কয়েকটি খড়খড়ি খুলতেই, তারা দেখতে পান সেই চামড়ার মোড়কের অধিকাংশ ই জীর্ণ; তার উপর বসতেই, পাতলা ধুলোর এক অলস আস্তরণ, তাদের থাই এর উচ্চতায় ভেসে উঠে, বাতাসে পাক খেতে থাকে, তীর্যক সুর্য রশ্মির গা বেয়ে। ফায়ারপ্লেস এর সামনে, গিল্টি করা মলিন ইজেল এর উপর, ক্রেয়নে আঁকা, এমিলির পিতার পোর্ট্রেট টাঙানো ছিল।
মহিলা ঘরে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়ায়- ক্ষুদ্রকায় স্থূল চেহারার কালো পোশাক পরা মহিলা, গলায় ঝোলানো লম্বা সোনার চেনের দৈর্ঘ তার কোমরের বেল্টে গিয়ে মিশে গেছে, সোনালী হাতলের বাদামী রঙের বেতের ছড়িতে ভর দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তার কাঠামো খর্বকায় হওয়ার ফলে, যে পরিমাণ চর্বি জমলে মাঝারি বা দীর্ঘকায় কাঠামোয় স্বাস্থবতী মনে হওয়ার কথা, তা ওনার শরীরে পৃথুল ও অতিরিক্ত দেখাচ্ছে। অদ্ভুত ফেঁপে যাওয়া শরীর, যেন অনেকক্ষণ জলে চুবিয়ে রেখেছিল কেউ, বর্ণটিও ঘোলাটে। চোখগুলি মুখের স্থূল পরতে নিমজ্জিত,যেন দুটো কয়লার টুকরো একতাল ময়দায় ঠেসে দেওয়া হয়েছে, যেগুলি মুখের একদিক থেকে অন্যদিকে নড়েচড়ে বেড়াতে থাকে যতক্ষণ অতিথিরা দাবী সনদ পাঠ করে।

উনি কাউকে বসতে বলেন না, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন যতক্ষণ না প্রস্তাবকদের পাঠ শেষ হচ্ছে। তারপর তার চেনের প্রান্তে বাঁধা, অদৃশ্য ঘড়ির টিকটিক শোনা যায়। ঠান্ডা ও শুষ্ক কন্ঠে তিনি বলেন, “জেফারসনে আমার কোনো ট্যাক্স নেই, কর্নেল সার্টোরিস আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন। আপনাদের মধ্যে কেউ শহরের পুর-রেজিস্টার খুঁজে দেখুন, উত্তর পেয়ে যাবেন নিজেরাই।”
“কিন্তু আমাদের চাওয়ার অধিকার আছে। আমরা শহরের কর্তৃপক্ষ, মিস এমিলি. আপনি কি শেরিফ এর স্বাক্ষরিত নোটিশ পান নি?”
“হ্যাঁ,আমি একটা কাগজ পেয়েছি বটে,” মিস এমিলি বলে উঠেন, “সম্ভবত সেই ভদ্রলোক নিজেকে শেরিফ মনে করেন.. যাই হোক জেফারসনে আমার কোনো ট্যাক্স নেই।”
“কিন্তু রেজিস্টারে এমন কিছু লেখা নেই যাতে প্রমাণ হয় যে, আচ্ছা দেখুন আমাদের তো আইন মেনে…”
“ কর্নেল সার্টোরিসের কাছে যান। জেফারসনে আমার কোনো ট্যাক্স নেই।”
“কিন্তু, মিস এমিলি -“
“কর্নেল সার্টোরিসের কাছে যান (কর্নেল সার্টোরিস মারা গেছেন প্রায় দশ বছর।)
“আমি বলছি,জেফারসনে আমার কোন ট্যাক্স নেই। টোবি!”
নিগ্রো হাজির হয়।
“এই ভদ্রলোকদের বাইরের পথ দেখিয়ে দাও।”
2
এভাবেই তিনি ওদের পরাস্ত করলেন, অশ্বারোহী ও পদাতিক, সমস্ত শক্তির প্রয়োগে, যেমন করে ওদের পিতৃপুরুষদের পরাস্ত করেছিলেন, ত্রিশ বছর আগে, বিকট দূর্গন্ধের অভিযোগে।
ঘটনাটি, তাঁর পিতার মৃত্যুর দুবছর এবং তার প্রেমিক- যে তাঁকে বিয়ে করবে বলে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, পরিত্যাগ করার পরের কথা। পিতার মৃত্যুর পর উনি এমনিও বাইরে কম বের হতেন; উনার প্রিয়তম চলে যাওয়ার পরে, লোকেরা তাঁকে আর দেখতেই পায় নি। কিছু মহিলার টেলিফোন কল করার সাহস হয়েছিল, কিন্তু তাদের কলে কেউ সাড়া দেয়নি। বাড়িটায় জীবনের একমাত্র চিহ্ন বলতে ছিল, সেই নিগ্রো ভৃত্যের, তখন সে যুবক, বাজারের ঝুড়ি হাতে বাড়িতে প্রবেশ ও প্রস্থান।
” আহা, যেন একজন পুরুষমানুষ – যে কোন পুরুষ মানুষ – রান্নাঘর ঠিকভাবে সামলাতে জানে” মহিলারা বলাবলি করতেন; তাই দুর্গন্ধটা যখন বাড়ির ভিতর থেকে ছড়াতে শুরু করে তখন তারা অবাক হননি।
ব্যাপারটা আরেকটি যোগসূত্র তৈরি করেছিল বাইরের স্থূল, জনবহুল বিশ্ব আর অহংকারী গ্রিয়ারসনদের মধ্যে। একজন প্রতিবেশী, এক মহিলা, আশি বছরের মেয়র, বিচারক স্টিভেনসের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।
“এতে আমার কি করার আছে ম্যাডাম?”
“কেন, ওনাকে ব্যাপারটা বন্ধ করতে নির্দেশ দিন, রাজ্যে আইন কানুন নেই নাকি?” মহিলা বলেন
” আমার মনে হয় না তার প্রয়োজন হবে, সম্ভবত ওর নিগ্রো ভৃত্য উঠানে কোনো সাপ বা ইঁদুর মেরে থাকবে, আমি উনার সাথে কথা বলবো এ ব্যাপারে”
পরের দিন তিনি আরও দুটি অভিযোগ পান, যার একটি আসে ভিন্ন বিষয়ে দেখা করতে আসা এক ব্যক্তির কাছ থেকে
“আমাদের অবশ্যই এই ব্যাপারে কিছু করতে হবে, জজসাহেব। আমি মিস এমিলিকে বিরক্ত করার ব্যাপারে শেষ ব্যাক্তি, কিন্তু আমাদের কিছু করতেই হবে।”
সেই রাতে অল্ডারম্যান বোর্ড আবার সাক্ষাৎ করেছিল — তিনজন ধূসর দাড়ি এবং একজন অল্পবয়সী সদস্য, নবীন প্রজন্মের।
” এ তো সহজ কাজ” সে বলে ওঠে
“উনাকে বাড়ি পরিষ্কার করার জন্য নির্দেশ পাঠান। এবং এটি করার জন্য উনাকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিন, আর যদি উনি না শোনেন …”
বিচারক স্টিভেনস শুনে বললেন, ” চুলোয় যাক, তুমি কি একজন মহিলাকে তার মুখের দূর্গন্ধের জন্য অভিযুক্ত করতে পার?
অতয়েব পরের রাত্তিরে, মধ্যরাতে, চারজন লোক মিস এমিলির বাগান ও পাঁচিল পেরিয়ে, চোরের মতন ঢুকে পড়ে। তারা ইঁটের দেওয়ালের চারিপাশে, সেলারের মুখ গুলি শুঁকতে থাকে, একজন কাঁধে ঝোলানো থলি থেকে ধানের বীজ ছড়ানোর ভঙ্গিতে, চুন ছেটাতে থাকে, সেলারের দরজা ভেঙে তার মধ্যে চুন ছেটায়, বাড়ির বাইরে সর্বত্র। বাগানের লনের পাশ দিয়ে ফেরার সময়, দোতলার একটা জানালা, যা আগে, অন্ধকার ছিল, আলোকিত দেখায় এবং সেখানে মিস এমিলিকে বসে থাকতে দেখা যায়। তার পিছনে জ্বলা আলো আর তার নিশ্চল অবয়বকে কোনো এক দেবীমূর্তির মতন দেখাচ্ছিল।
সেই দেখে ওরা গুড়ি মেরে, নিশঃব্দে লন পার করে, লোকাস্টের ছায়াঘেরা সদর রাস্তায় মিলিয়ে যায়। এক দু সপ্তাহ পরে সেই দূর্গন্ধ চলে যায়। তখনই মানুষজনের একটু অনুশোচনা হতে শুরু করে মহিলার ব্যাপারে।

আমাদের শহরের মানুষজন, উনার বুড়ি পিসী লেডি ওয়াট, কিভাবে উন্মাদ হয়ে গেছিলেন সেই স্মৃতিচারণ করে বলত যে, গ্রিয়ারসন রা নিজেদের, যোগ্যতার তুলনায় একটু বেশীই মহান ভাবে। কোন যুবাপুরষই নাকি মিস এমিলি বা তাঁর বংশের মেয়েদের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। আমরা দীর্ঘদিন মনে করতাম এই পরিবার এক যাত্রাপালার দল বৈ কিছু নয়, মিস এমিলির খর্বকায় সাদা পোষাকের চেহারা, সামনে তার পিতার ঘোড়ার চাবুক হাতে প্রশশ্ত অবয়ব, পিছনে ঠেলা সদর দরজার ফ্রেমে দুজনের দাঁড়িয়ে থাকার সেই প্রতিচ্ছবি। সেই কারণে উনার বয়স যখন প্রায় ত্রিশ ছুঁইছুঁই এবং তখনও অবিবাহিতা রয়ে গেলেন,আমাদের নিজেদেরকেই অপরাধী মনে হত। পরিবারে উন্মাদনার ইতিহাস থাকলেও, উনার জীবনের সমস্ত সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি, হয়তো সেগুলি বাস্তবায়িত হতেও পারত।
পিতার মৃত্যুর পর তাই এই বাড়িটা ছাড়া উনার জীবনে আর কিছুই রইল না; আর একভাবে, মানুষজনও খুশীই হয়েছিল। মিস এমিলির প্রতি তারা সমবেদনা ও করুণা প্রকাশ করার সুযোগটা পেয়েছিল, বেচারি একাকিনী, ভাগ্যহীনা, এই জাতীয় কিছু মানবিক শব্দ প্রয়োগ করা গেছিল। এবার উনিও সাধরণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সেই আনন্দ ও দুঃখ অনুভব করতে পারবেন। এই ভেবে শহরের মহিলারা পিতার মৃত্যুর পরদিন সকলে উনার বাড়িতে শোক জ্ঞাপন করতে একত্রিত হলে, রীতি অনুযায়ী এমিলি সবার সাথেই সদর দরজায় দেখা করলেন, কিন্তু তার মুখে বা পোশাকে পিতৃবিয়োগের শোক লেশমাত্র দেখা গেল না, বরং উল্টে বললেন তার পিতা মারা জান নি। এইভাবে তিনদিন, পিতার মৃতদেহ সৎকার করার জন্য ডাক্তার ও কতৃপক্ষের বারংবার অনুরোধ অগ্রাহ্য করে, লোকে যখন বাধ্য হয়ে পুলিশ ডাকতে উদ্যত, তখন ভেঙে পড়লেন, বাকিরা তড়িঘড়ি উনার পিতার মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে কবর দিয়ে দিল।
উনাকে আমরা তখনও উন্মাদ বলিনি, কারণ মনে পড়েছিল সেই সমস্ত যুবাপুরুষদের, যাদের উনার পিতৃদেব তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আর আমরা এও বুঝতাম, জীবনে কিছুই না পেয়ে উনার তো সেটাকেই আঁকড়ে ধরার কথা যা উনাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে, মানুষ তো এরকম করেই থাকে।
3
অনেকদিন অবধি উনি অসুস্থ ছিলেন। আবার যখন উনাকে দেখতে পেলাম, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, সেই সব কিশোরী দেবদূতের মতন দেখাচ্ছিল, যাদের ছবি চার্চের জানলায় আঁকা থাকত—এক প্রকারের বিমর্ষ আবার নৈসর্গিক।
ততদিনে শহরের রাস্তার ফুটপাথ বানানোর ইজারা পাশ হয়েছে, আর উনার পিতার মৃত্যুর পরবর্তী গ্রীষ্মে কাজও শুরু হয়ে গেল। নির্মাণ কোম্পানি এল সাথে করে অনেক নিগ্রো শ্রমিক, অশ্বেতর, আর ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে, আর এক সর্দার, হোমার ব্যারন, উত্তরের ইয়াঙ্কি—বিশালাকায়, তামাটে বর্ণের, ওস্তাদ লোক, গলার স্বর ও চোখ-নাক, মুখের তুলনায় পাতলা।
নিগ্রো শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তার গালিগালাজ আর শ্রমিকদের পাথর ওঠানামা করার গান শোনার জন্য, বাচ্চারা দলে দলে ভীড় জমাত। অচিরেই শহরের সবাই তাকে চিনে ফেলল। যেখানেই জটলা করে হাসির রোল উঠতে দেখা যেত, জানবেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত হোমার ব্যারন। প্রতি রবিবার, মিস এমিলি ও তাকে দেখা যেত একসাথে, হলুদ রঙা বগী ভ্যান চালিয়ে অথবা লিভারি আস্তাবলের ঘোড়ার জুটির পিঠে চেপে ঘুরতে। প্রথমে আমরা খুশীই হতাম, যাক মিস এমিলির কারোর প্রতি উৎসাহ জেগেছে, কারণ মহিলারা বলাবলি করতেন,
“যাই হোক, একজন গ্রিয়ারসন হয়ে তো এক উত্তরের
দিনমজুরের ঘরকন্না করবে না,” কিন্তু বয়জষ্ঠ প্রবীণরা বলতেন, কে বলে দুঃখের ভারে অভিজাত মহিলারা জাত্যাভিমান বিসর্জন দেন না,,এও বলতেন,
” বেচারির অবস্থা দেখো, ওর জ্ঞাতিগুষ্টির লোকেদের এখানে আসা উচিৎ” অ্যালাবামাতে উনার কিছু আত্মীয়বর্গ আছে শোনা যেত, কিন্তু বহু বছর আগে, লেডি ওয়াট, সেই উন্মাদ পিসির জমিদারির দখল নিয়ে, এমিলির পিতার সাথে তাদের ঝামেলা হয়, সেই থেকে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায় দুই পরিবারে। তারা শোকসভাতেও উপস্থিত ছিলেন না।
প্রবীণদের মুখে “বেচারি এমিলি” শুনতেই শহর জুড়ে ফিসফিসানি শুরু হয়ে যায়, “ও তার মানে ব্যাপারটা সত্যিই?” একজন আরেজনকে বলে, “অবশ্যই ও ছাড়া আর কি হবে…”
হাতের পিছনে ঢাকা মুখ থেকে, শৌখিন সিল্ক আর স্যাটিনের খসখসে পর্দা ঘেরা, রবিবারের রোদে ভেজানো জানালার খড়িখড়িতে উকি দিয়ে, প্রণয়ীদ্বয়ের ঘোড়ার খুড়ের টকটক আওয়াজের ফাঁকে, কথাটা ভেসে আসত, “বেচারি এমিলি”
উনি মাথা উঁচু করেই চলতেন, এমনকি যখন সবাই ধরে নিল যে উনার অধঃপতন হয়েছে, তখনও। যেন উনি শেষ গ্রিয়ারসন হিসেবে সব থেকে বেশী সম্ভ্রম দাবী করছেন; যেন উনার এই কাদামাটির স্পর্শ প্রয়জন ছিল নিজের অভেদ্যতা কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।
যেমন ধরুন, উনি ইঁদুরের বিষ কিনতে এলেন যখন, আর্সেনিক।
“বেচারি এমিলি” প্রবচন চাউর হয়ে যাওয়ার বছরখানেক পরের কথা, ওর দুই মহিলা ভাইঝিরা তখন দেখা করতে এসেছেন।
“আমার একটু বিষ দরকার” ড্রাগিস্ট কে বললেন, বয়স তখন ত্রিশ পেরিয়ে গেছে, তখনও রোগা পাতলাই ছিলেন, কিঞ্চিৎ বেশিই ক্ষীণকায় যেন, ঠান্ডা চোখগুলি শুকনো গালের কোটরে ঢোকানো, যেন কল্পনার এক লাইটহাউস রক্ষকের মুখ,
“আমার একটু বিষ দরকার”
“আজ্ঞে, মিস এমিলি, কি জাতীয় বিষ? ইঁদুর-টিদুর কিছু? তাহলে বলবো—”
“কি জাতীয় জানি না, সব থেকে ভাল যেটা, দিন”
ড্রাগিস্ট অনেকগুলি নাম বললেন, ” এগুলিতে হাতিও মরে যাবে কিন্তু আপন কি চাইছেন….”
“আর্সেনিক, ভাল হবে?”
“হ্যা ম্যাম, আর্সেনিক তো ভাল, কিন্তু আপনি কি চাইছেন?”
“আমি আর্সেনিক চাইছি”
এই শুনে ড্রাগিস্ট তার দিকে চোখ নামিয়ে দেখল। উনিও ফিরে তাকালেন, সরাসরি, মুখখানি উড্ডীণ পতাকার মতন তুলে।
” বটেই তো, কেন নয়” ড্রাগিস্ট বলল, ” আপনি যদি তাই চান,বেশ তো, তবে আইন অনুযায়ী আপনাকে এর কারণটি জানাতে হবে”
মিস এমিলি তার দিকে কটাক্ষ করলেন,মাথা পিছনে হেলিয়ে চোখে চোখ রেখে,যতক্ষণ না সে চোখ নামিয়ে দোকানের ভিতরে গেল, আর্সেনিকের প্যাকেট ঠোঙায় মুড়তে। নিগ্রো ডেলিভারি বয়টি, জিনিসটা উনার হাতে দিয়ে গেল, ড্রাগিস্ট আর ফিরে এল না। বাড়ি এসে প্যাকেটটি খুলতেই দেখতে পেলেন, মাথার খুলি ও হাড়ছাপ বাক্সের গায়ে লেখা আছে
” ইঁদুর মারার বিষ”
4
অতয়েব পরের দিন আমরা সবাই বলেছিলাম,
” উনি আত্মহত্যা করবেন” ; এও বলেছিলাম সেটাই সব থেকে ভাল হবে। যখন প্রথম উনাকে হোমার ব্যারনের সঙ্গে দেখা যেত, আমরা বলেছিলাম, ” উনি লোকটাকে বিয়ে করবেন” তারপর বলেছিলাম ” এখনও কিছুদিন প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবেন” কারণ হোমার নিজে মন্তব্য করেছিল- তার পুরুষদের বেশী পছন্দ, সবাই এও জানত যে এল্ক পানশালায় ছোকরা ছেলেদের সাথে বসে সে মদ খেত – সে সংসারী হওয়ার লোক ছিল না।
পরে আমরাও বলতে শুরু করলাম, “বেচারি এমিলি” খড়খড়ির আড়াল থেকে, যখন সোনারঙা বগি চড়ে ওরা দুইজন রবিবার রাস্তা পেরিয়ে যেতেন, মিস এমিলি মাথা উঁচু করে চলতেন আর হোমার ব্যারণ টুপী মাথায় সেঁটে দাতে সিগার চেপে, রেইষ ও চাবুক হলুদ খাপে পুরে।
এরপর কিছু মহিলারা বলাবলি শুরু করেন যে, ব্যাপারটায় শহরের অপমান হচ্ছে,নবীণ প্রজন্মের সামনে খারাপ উপমা তৈরি হচ্ছে। পুরুষরা প্রথমে নাক গলাতে চায়নি, কিন্তু মহিলারা শেষমেষ এক ব্যাপটিস্ট মন্ত্রীমশাই কে চাপ দেন- মিস এমিলির আত্মীয়, যারা বিশপের অধিকারভুক্ত ছিলেন, তাদের গিয়ে জানাতে। সেই সাক্ষাৎকারে কি হয়েছিল তিনি ফিরে এসে বলেন নি কিন্তু দ্বিতীয়বার আর ওদিকপানে যাওয়ার নাম নেন নি।
পরের রবিবার আবার তাদের রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়, আর তার পরদিন মন্ত্রীমশাইয়ের স্ত্রী একখানি চিঠি লেখেন আলাবামায় মিস এমিলির আত্মীয়দের। ফলস্বরুপ উনার রক্তের সম্পর্কিত দের আবার তার ছাতের তলায় দেখা যায়, আর আমরা পরবর্তী কার্যক্রম দেখার আশায় গুছিয়ে বসি।
প্রথমে বিশেষ কিছু হল না। একদিন জানতে পারলাম, মিস এমিলি স্যাকরার কাছে গেছিলেন, পুরুষের রুপোর প্রসাধন সামগ্রী অর্ডার দিয়েছেন যার প্রত্যেকটি তে এইচ. বি হরফ খোদাই করা থাকবে। দুদিন পর শুনলাম, উনি একটি নাইটশার্ট সমেত, পুরুষমানুষের পোশাকের পুরো একখান সেট কিনেছেন। আমরা বললাম, “ওরা বিবাহিত”। বেশ খুশীই হয়েছিলাম। আরও খুশী হয়েছিলাম কারণ উনার ভাইঝিদুটি যে মাত্রার দাম্ভিক গ্রিয়ারসান ছিল,মিস এমিলি সারাজীবনেও ততখানি হতে পারতেন না।
তাই আশ্চর্য হইনি যখন হোমার ব্যারন- রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিন পার হতেই- শহর ছেড়ে চলে গেল।
আনুষ্ঠানিক বিদায় পর্ব না হওয়ায় কিছুটা দুঃখিত হলেও, ভেবেছিলাম সে মিস এমিলির আগমনের জন্য ঘর সাজাতে গেছে, অথবা ভাইঝি দুটিকে বিদেয় করার জন্য উনাকে সুযোগ করে দিল( ততদিনে ব্যাপারটা প্রায় ষড়যন্ত্রের পর্যায়ে চলে গেছে, আর আমরা সবাই মিস এমিলির পক্ষে লড়ছিলাম ভাইঝি দুটিকে ফাঁদে ফেলার জন্য)। অবশেষে এক সপ্তাহ পর নিশ্চিভাবে তেনারা বিদায় নিলেন, আর আশানরুপ এর তিন দিন পরেই
হোমার ব্যারন শহরে ফিরে এসেছিল।
এক পড়শী,সেই নিগ্রো ভৃত্যকে রান্নাঘরের পিছনের দরজা দিয়ে তাঁকে ঘরে ঢোকাতে দেখে, সন্ধ্যার সময়।
হোমার ব্যারনকে সেই শেষবার দেখা গেছিল।

এরপর থেকে ভৃত্যটি শুধু বাজারের ঝুড়ি নিয়ে আসা যাওয়া করত, কিন্তু সদর দরজা বন্ধই থাকত। মাঝে মাঝে মিস এমিলিকে জানালার ধারে কয়েক পলকের জন্য দেখা যেত, ঠিক সেই রাতে চুন ছড়াতে গিয়ে ওরা যেমন দেখেছিল, কিন্তু রাস্তাঘাটে আর বের হতে দেখা যায়নি প্রায় ছয়মাস। আমরা জানতাম যে এই ব্যাপারটাও আশাতীত নয়; কারণ উনার পিতার যেসব চারিত্রিক বৈশিষ্ঠগুলি উনার মেয়েবেলাকে বারংবার আতঙ্কিত করে এসেছে, তা এত বেশী সংক্রামক ছিল যে সহজে তার মৃত্যু হত না।
এরপর আবার যখন মিস এমিলিকে দেখলাম উনি তখন স্থূলকায়, মাথার চুল ধূসর হতে চলেছে। পরের কিছু বছর তা আরও ধূসর হতে হতে, নূনগোলমরিচ মেশানো, ধাতব ধূসরবর্ণের হয়ে গেল। চুয়াত্তর বছর বয়সে, তার মৃত্যুর দিন অবধি সেটি ওইরকম গাঢ় ইস্পাত-ধূসর ছিল, কিছুটা শ্রমজীবি মানুষের মাথার চুলের মতন।
যে সময় নাগাদ উনার সদর দরজা আনুমানিক ছয় সাত বছর বন্ধ থাকতে শুরু করে, তখন বয়স চল্লিশ, উনি তখন চীনা চিত্রকলার প্রশিক্ষণ দিতেন। বাড়ির নীচতলায় একটি স্টুডিও বানিয়েছিলেন যেখানে কর্নেল সার্টোরিসের প্রজন্মের মেয়ে ও নাতনীদের নিয়মিত পাঠানো হত একই নিষ্ঠার সঙ্গে ঠিক যেমন রবিবারের গীর্জাতে পাঠানো হত, পঁচিশ সেন্ট সহযোগে, সংগ্রহ পাত্রের জন্য। ইতমধ্যে উনার ট্যাক্স মকুব করা হয়।
তারপর নতুন প্রজন্ম এই শহরের মেরুদন্ড ও আদর্শ হয়ে দাঁড়াল, চিত্রকলার সেই ছাত্রীরাও বড় হয়ে দূরে সরে গেল, তারা নিজেদের কন্যাদের, রঙের বাক্স, অদ্ভূত দর্শন তুলি কলম ও পত্রিকা থেকে কাটা ছবি সমেত এমিলির কাছে আঁকা শিখতে পাঠাত না আর।
সেই সদর দরজা, বোধকরি শেষবারের মতন এবং সবার মঙ্গলের জন্যই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। শহরের সব বাড়িতে যখন বিনামূল্যে ডাকবাক্স বসাবার বন্দবস্ত হয়েছিল, একমাত্র মিস এমিলি তাঁর দরজায় ধাতব অক্ষরে নাম খোদাই ও বাক্স বসানো নিয়ে তীব্র আপত্তি করেছিলেন। কারোর কোনো অনুরোধই শোনেন নি।
প্রাত্যহিক, মাসিক, বার্ষিক অভ্যাসে আমরা নিগ্রো ভৃত্যটিকে ধূসরকেশ হতে এবং কুঁজো হয়ে ঝুড়ি হাতে আস যাওয়া করতে দেখতাম।
প্রতি ডিসেম্বরেই মহিলাকে ট্যাক্স নোটিশ পাঠানো হত, যা পোস্ট অফিসে ফিরে আসতো অগৃহীত হয়ে।
কখনও উনাকে নীচের তলার জানালায় দেখতে পেতাম—স্পষ্টতই বোঝা যেত, উপরের তলার অংশ বন্ধ করে দিয়েছিলেন–কোন খাঁজকাটা তাকে রাখা মূর্তির মতন দেখাত উনাকে, আমাদের দিকে চেয়ে থাকতেন কিনা তা বলা মুশকিল ছিল।
এভাবেই উনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিক্রম করে গেলেন–
প্রিয়, অনিবার্য, দুর্ভেদ্য, শান্ত এবং বিকৃত।
আর এভাবেই তিনি দেহ রাখলেন।
ধুলো ছায়া মাখা ঘরে চোখ বুজলেন, এক অপেক্ষমান অশ্রুসিক্ত চোখের নিগ্রো ভৃত্যের সামনে। আমরা জানতেও পারিনি যে উনি অসুস্থ ছিলেন; ভৃত্যের কাছ থেকে খবরাখবর নেওয়ার অভ্যাস আমাদের বহুকালই চলে গেছিল। সেও কারোর সাথে কথা বলত না, বোধহয় উনার সাথেও না, তার গলার স্বর অব্যাবহারে কর্কশ ও জংধরা শোনাত।
উনি নীচের তলার একটি ঘরেই মারা যান, ভারী আখরোট কাঠের পর্দা ঘেরা বিছানায়, সূর্যালোকের অভাবে হলদেটে ও জড়ভরত ধূসরবর্ণের মাথাটি, বালিশে সাজানো ছিল।
5
নিগ্রোটি প্রথম মহিলা দলটির সাথে সদর দরজায় দেখা করে এবং তাদের ভিতরে আসতে দেয়, তাদের ফিসফিসে, চাপা কন্ঠস্বর ও ইতিউতি দ্রুত চাউনি সহ, তারপর সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাড়ি ভিতর দিয়ে সোজা হেঁটে সে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে চিরতরের জন্য মিলিয়ে যায়।
সেই দুই ভাইঝি আসেন, দ্বিতীয় দিন সৎকার্য হয়, গোটা শহর এসেছিল বাজারি ফুলের স্তুপের তলায় রক্ষিত মিস এমিলিকে দেখতে, উনার পিতার ক্রেয়ন ঘষা মুখের প্রতিচ্ছবি শবাধারের উপর গভীর মননে মগ্ন, আর চারিপাশে ভয়ানক হিসহিসে স্বরে বাক্যরত মহিলা বর্গ; রঙচটা কনফেডারেট উর্দি পরা কিছু অতি বৃদ্ধ– বারান্দায় ও লনে দাঁড়িয়ে , মিস এমিলির ব্যাপারে কথা বলছিলেন, ভাবখানা এমন যেন উনি এঁদেরই সমসাময়িক ছিলেন, হয়তো কারোর সাথে নাচ করেছিলেন, কারোর সাথে প্রেম, সময়-কালের গাণিতিক প্রগতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বৃদ্ধরা যা করেই থাকেন, সমস্ত অতীতই যেন কোনো মুছে যাওয়া আলপথ নয়, বরং, এক বিস্তীর্ণ ঘাসজমি, কোনো শীতের প্রোকোপ যাকে ছোঁয় না, শুধু নতুন দশকের গোড়ায় এসে যা পৃথক হয়ে যায় তাদের থেকে।
ইতিমধ্যে আমরা জানতাম যে নীচতলার এই অংশের উপরে একখানি ঘর আছে যা চল্লিশ বছরে কেউ দেখেনি, আর যা জোর করে খুলতে হবে। মিস এমিলিকে সুস্থভাবে মাটিতে দফন করা অবধি সবাই অপেক্ষা করেছিল। ঘরটির দরজা ভেঙে ঢোকার কান্ডটা এতটাই ধ্বংসাত্বক হয় যে ঘোটা ঘর ধুলোর মেঘে ছেয়ে গেছিল।
পাতলা,তীক্ষ্ণ সমাধির মতন আবরণ যেন বাসরশয্যার জন্য সাজানো এই ঘরের চারিদিকে ছড়ান ছিল: ম্লান গোলাপরঙা শৌখিন পর্দার উপরে, ড্রেসিং টেবিলের উপরে,স্ফটিকের পাত্রগুলির উপরে এবং রুপোর মলিন প্রসাধন বাক্সের উপর,এতই মলিন সেই রুপো যে খোদাই করা নামের আদ্যাক্ষরও প্রায় অবলুপ্ত।
সেইসবের মধ্যে কলার আর গলার টাই ও রাখা ছিল, যেন সবে মাত্র খুলে রাখা হয়েছে, যা, টেবিলের বাঁদিকে এক অর্ধ চন্দ্রাকার ধুলোর চিত্রাবয়ব তৈরি করেছে। স্যুটখানি একটি চেয়ারের উপর ঝোলানো, সন্তর্পনে ভাঁজ করা; তার নীচে একজোড়া বোবা জুতো ও পরিত্যক্ত মোজা রাখা ছিল।
পুরুষটি স্বয়ং বিছানায় শুয়ে ছিলেন।
আমরা দীর্ঘক্ষণ শুধু দাঁড়িয়ে থাকি সেখানে, সেই গভীর রক্তমাংসহীন অট্যহাস্যের দিকে তাকিয়ে। দেহটিকে একদা আলিঙ্গনের ভঙ্গিমায় শুইয়ে রাখলেও, এই দীর্ঘ নিদ্রা, তার অনুরাগের অভিব্যাক্তিকে পরাস্ত করে,অসতীপতি বানিয়ে ফেলেছে। মানুষটির অবশিষ্টাংশ বলতে, পচে যাওয়া নাইটশার্টের নীচের যে অংশ, বিছানার সাথে অবিচছৃদ্য হয়ে গেছে; আর তাঁর দেহে এবং মাথার বলিশের উপর সেই স্থবির ধুলিকণার পাতলা ও মসৃণ আস্তরণ ছেয়ে আছে। এরপর আমরা লক্ষ্য করি যে তাঁর পাশে দ্বিতীয় একটি বালিশের উপর যেন একটি মাথার অবয়ব বানানো, যার উপর থেকে একজন কিছু একটা টেনে তোলেন, আর আমরা সামনে ঝুঁকে, সেই সুক্ষ্ণ ধুলিকণায় নাক গুঁজে,দেখতে পেলাম,
সেটি ছিল ইস্পাত-ধূসর রঙের এক দীর্ঘ মাথার চুলের গোছা।
সমাপ্ত