ছোটগল্প সিরিজ, নাইট ল্যাম্প

অনিকেতের গল্প

রচনাঃ শান্তনব রায়


যতদূর দেখা যায়, রাশি রাশি মানুষের শরীরের ঘাম বাতাসের কালো ধোঁয়ার সাথে মিশে একটা সরের মতন প্রলেপ গোটা পরিবেশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে। গায়ের চামড়া থেকে শহরের ইমারতের দেওয়াল, সবের গায়ে যেন লেপটে আছে ঘামের আস্তরণ। অফিস, বাস-ট্রাম, রাস্তাঘাট, স্টেশন। শহরটা জুড়ে ঝুলে আছে ঘাম আর কার্বনের একটা কুয়াশা। সুন্দর পোশাক-আশাক পরা নারী পুরুষের সৌখীন ত্বক বা জামা কাপড় থেকেও বেরিয়ে আসছে ঘাম। ভ্যাপসা গরমে গলন্ত মোমের ভাস্কর্যের মতন দেখতে লাগে মানুষগুলোকে। আজকেও অনিকেতের বিকেলবেলার ট্রেনটা ধরা হলোনা। বসের আজকেই ওকে নিয়ে শপিং এ যাওয়ার ছিলো। অনিকেতের কাজ হলো বসকে সঙ্গ দেওয়া, বাজারের প্যাকেট বওয়া, টিকিট বা কুপনের লাইনে দাঁড়ানো। মোদ্দা কথা বসকে তেল মারা। প্রান্তিকের সাথে এই নিয়ে ঝামেলাও কম হয়না। প্রান্তিক ওরই কলিগ,কিন্তু এসব তৈলমর্দন ওর পোষায় না।ও বলে, তুই যে এতটা বেশী এফর্ট দিস তার বদলে অতিরিক্ত কিছু পাচ্ছিস কি? কাজটা যে অনিকেতেরও খুব স্বভাবসিদ্ধ তা নয়। বেশ কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি এইগুলিও শিখতে হয়েছে। বাজারে চাকরি টিকিয়ে রাখা এমনিতেই দায়, উপরি সার্ভিস না চাইলেও করে যেতে হয়।

প্রান্তিকের সে দায় নেই।
ওর বাবা-মা দুজনেই ভালো চাকরি করতেন। তাদের জমানো টাকা সবই পেয়েছে তার সাথে শহরের পুরনো সম্ভ্রান্ত এলাকায় পৈতৃক বসতবাড়ি, আজকের বাজারে মোক্ষম দাম পাবে বিক্রি করলে। ওর বউও স্কুলে পড়ায়। সুখী সংসার।
প্রতি শনিবার ট্রেন ধরে বাড়ি ছুটতে হয়না অনিকেতের মতন। দ্রুত পদোন্নতির চিন্তা না করলেও চলবে ওর কিন্তু অনিকেতের সেই অবস্থা নয়। মা’র স্বাস্থ্য ভেঙে যাচ্ছে দিনদিন। তাকে শহরে নিয়ে আসতে হবে।বেশিদিন আর মফস্বলে ফেলে রেখে এই যাতায়াত সম্ভব নয়। ঋত্বিকার সঙ্গেও সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে গেলে শহরে স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করতেই হবে। শুধু প্রেমের টানে বেশিদিন এ সম্পর্ক ধরে রাখা যাবেনা এটা স্পষ্ট। এমনিতেই বিয়ের ব্যাপারটাকে পিছিয়ে চলেছে অনিকেত। ঋত্বিকা যদিও বেশি চাপ দেয়না বরঞ্চ ভরসা ‌দেয়। ওর পিএইচডির কাজ চলছে। শেষ হয়ে গেলে ভালো চাকরি ওর কপালেও হয়তো জুটে যাবে কিন্তু অনিকেতের চিন্তা কাটেনা।

পরের ট্রেনটা রাতে।অনিকেত বেশ লেট করে স্টেশনে ঢুকলো। তখন যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে। গরমে নাভিশ্বাস উঠছে সবার। দিনের বেলায় অফুরান উদ্যম নিয়ে বাড়ি থেকে বেরয় যে মানুষেরা এই শেষবেলায় এসে কেমন জানি চুপসে যায় তাদের অবয়বগুলি।

ট্রেনের সামনের দিকের কামরায় বেশ কিছু লোক উঠলেও,পেছনের দিকে তেমন কাউকে দেখা গেলোনা। অনিকেত মাঝামাঝি একটা বগিতে উঠে বসলো।ট্রেনের পেছনের দিকটাই ও পছন্দ করে কারণ নামার পরে ঐদিক থেকেই বাড়ি যাবার গাড়ি ধরতে সুবিধা হয়। জানালার ধারে একটু গুছিয়ে বসার পর দেখলো আরেকজন যাত্রী ওরই সামনের সিটে এসে বসেছে। চোখে চৌকো চশমা,আর পরনে ধূসর শার্ট। চোখগুলো বেশ উজ্জ্বল। চুল আঁচড়ানোর ঢং কিছুটা পুরোনো দিনের চিত্রতারকাদের মতন। এর বেশি আর অনিকেতের তাকিয়ে দেখার মতো আগ্রহ নেই। লোকটা বেছে বেছে ঠিক ওর উল্টোদিকের সিটেই বসলেন। অনিকেত একটু বিরক্তই হলো।এত সিট থাকতে এখানেই বসতে হবে! সারাদিন শুধু মানুষ দেখে দেখে ওর চোখটা একটু ফাঁকা খালি জায়গা খুঁজছে এখন।
ট্রেনের পাখাগুলি বোধহয় ওই একরকম শব্দ করেই ঘুরে চলেছে অনন্তকাল ধরে। হাওয়াটা নীচে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই কিন্তু গায়ে লাগছে না। কোনোদিনই লাগে কি?ওই শব্দটা যেন শুধুই একটা আশ্বাস যে পাখা চলছে।

অনিকেত পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। ঋত্বিকার মেসেজ এসেছে কয়েকটা। ট্রেন পেলো কিনা,কিছু খেয়ে নিয়েছে কিনা। অনিকেত মেসেজের রিপ্লাই দিলো। মাকেও একটা ফোন করে দিলো যে ট্রেনে উঠেছে এবং বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যাবে।

ইদানীং মা খুব চিন্তা করে। বাবা মারা যাওয়ার সময়ও মাকে দৃশ্যত ভেঙ্গে পড়তে দেখেনি অনিকেত। দুঃখ কষ্ট সবই মনের মধ্যে রেখে ওকে আগলে রেখেছিল মা। ইলেকট্রিকের দোকানের ব্যবসা বাবা চলে যাওয়ার পরেই উঠে যায়। মামা বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন থাকা সম্ভব হয় নি। লোকের বাড়িতে রান্নাবান্না আর সেলাইয়ের কাজ করে করে অনিকেতকে স্কুল পাশ করায় মা। ছাত্র হিসেবে অনিকেতের সুনাম ছিল কিন্তু নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ানোর আর্থিক সামর্থ্য ছিলনা মায়ের। অনেক কষ্ট করে তাও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিল অনিকেত।যদিও প্রথমে বিশেষ লাভ হয়নি।কপালে জোটে সামান্য রোজগারের ছোটখাটো সেলসম্যানের চাকরি। বেশ কিছুদিন সেসব কাজ করতে করতে অবশেষে এই কোম্পানির চাকরি টা জুটে যায়। মা’র স্বাস্থ্য ততদিনে দূর্বল হয়ে পড়েছে। বাবার উপর এখনও মাঝে মাঝে খুব অভিমান হয় অনিকেতের। এইভাবে পরিবারকে বিপদে ফেলে দিয়ে কেন চলে গেছিল বাবা?

দু‌’একজন ফেরিওয়ালা সারাদিনের বিক্রিবাট্টা সেরে নিজেদের মধ্যে রসিকতা করতে করতে এক কামরা দিয়ে হেঁটে অন্য কামরায় যাচ্ছে। পুলিশ কনস্টেবলও পেরোলো একজন, বৃহন্নলা দলের দু’একজন।

ট্রেনটা একটা স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। আশেপাশে দু’চারজন ঘোরাঘুরি করলেও, স্টেশনে রাতে যারা ঘুমোয় তাদের ছাড়া আর বিশেষ লোক নেই। জানলা দিয়ে দূরে একটা দুটো আলো টিমটিম করছে।
হঠাৎ সহযাত্রী ভদ্রলোক অনিকেতের পাশে এসে বসলেন,
আপনি কি নিত্যযাত্রী?!
অনিকেতের ভাবনায় ছেদ পড়ায় একটু বিরক্ত হলো। প্রথমে ভেবেছিল উত্তর দেবে না কিন্তু ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা। উত্তর শোনার জন্য অনিকেতের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়েই রইলেন।
অনিকেত বললো, না ঠিক তা নই,তবে ওই উইকেন্ডে বাড়ি যাই।
ও,তা বাড়ি কোথায়?
অনিকেত নাম বলাতে লোকটা খুব একটা
আগ্রহ দেখালো না।তার বদলে বলে
উঠলো, এই ট্রেনে ফিরছেন যে! আগের
ট্রেন পান নি?
না মিস করেছি, অপছন্দ হলেও
উত্তরটা দিল অনিকেত।
তাই তো ভাবছি! এমন সময় ওদিককার
যাত্রী তো বড় একটা থাকেনা।
লোকটা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, অনিকেত উঠে দরজার কাছে চলে এলো। পাখার হাওয়াটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে তার চাইতে দরজা দিয়ে আসা মুক্ত বাতাস অনেক আরামদায়ক। স্টেশনে একটা ছোট বাচ্চা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অবাক লাগছে, এত ছোট একটা বাচ্চা একা স্টেশনে ঘুরছে এত রাতে, বাবা মা নেই। সহযাত্রী লোকটা উঠে এবার দরজার কাছে এলো।
এত রাতে স্টেশনে ঘুমানো পাবলিক ছাড়া
আর কারো দেখা পাবেন না।
ধুত্তোর,লোকটা খুব জ্বালাতন করছে। অনিকেত ঘুরে তাকিয়ে বললো,আমি সেই আশা করছিওনা।
পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট বাজছে।
ঋত্বিকা কলিং। অনিকেত এবার দরজা থেকে সরে এলো। ফোনের কথাও বেশিরভাগ হুঁ হা তেই সারতে হলো কারণ ভদ্রলোক খুব অসভ্যের মতন শোনার চেষ্টা করছেন। ফোন রেখে দিয়ে অনিকেত একটু কড়াভাবে বললো,আপনি কিছু বলবেন?
ট্রেনটা হাল্কা দুলুনি দিয়ে চলতে শুরু করেছে, তার সাথেই ফোনের নেটওয়ার্ক উবে গেল।
লোকটা এবার ঘাড়ের ওপর প্রায় মুখ নিয়ে এসেছে, জিজ্ঞেস করলো, তা কি করা হয়?
লোকটা একটু সেকেলে মনে হয়। এযুগে এভাবে কেউ প্রশ্ন কেউ করে নাকি!
অনিকেতের এবার হাসি পেলো, ওই সামান্য চাকরি।
লোকটা এবার আপাদমস্তক ওকে দেখে নিয়ে বললো, প্রাইভেট বোধহয়?
অনিকেত অবাক। পোশাকে খুব আলাদা কিছুতো তার নেই,খুবই সাধারণ রোজকার পোশাক। তারপর আবার মোবাইলে মন দিলো। মাঝে মাঝে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলেও তাতে কাজ বিশেষ হচ্ছেনা। অগত্যা গেমটা খুলে বসলো। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো যে লোকটা অদ্ভুতভাবে ওর ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়ে দেখছে।
গেম বুঝি? আজকাল তো ভয়ানক সব গেম বাজারে এসেছে শুনেছি। এক্কেবারে বাস্তবের সাথে মিল। নিজেকে সেখানে গেমেরই কোনো চরিত্র মনে হয়।
অনিকেত উত্তর না দিয়ে চুপচাপ খেলায় মন দেওয়ার চেষ্টা করছে। যতটা পারা যায় এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু লোকটা যেন একটু বেশীই গায়ে পড়া।

অনিকেতের মোবাইলটা দেখতে বেশ দামী।সেটা খানিকটা ঋত্বিকার অবদান।
ফোনের ওপর তার সাংঘাতিক মায়া নেই ,অনিকেত আরেকটু মাঝারি দামের স্মার্টফোন নেবে ভেবেছিল। তবে ঋত্বিকার যুক্তি খুবই হাস্যকর,ওর বক্তব্য আজকাল ওরকম বোরিং ফোন নিয়ে কেউ চললে নিমিষেই তাকে নাকি নিমপাতা মনে হয় তাই একটু স্টাইলিশ ফোন অনিকেতকে নিতেই হবে।

ট্রেন যতই জোরে ছুটছে আলোগুলো যেনো ততই ঝিমিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে বাইরের পেরিয়ে যাওয়া স্টেশনের আলো দাগ কেটে যাচ্ছে কামরায়। অনিকেত একটা ভিডিও দেখছিল ফোনে কিন্তু বেশিক্ষণ দেখা গেলনা। সিগনাল ক্ষীণ হয়ে গেছে এবার ব্যাটারিও শেষের দিকে। ব‌্যাগ থেকে পাওয়ার ব্যাংক বার করে ফোনটা চার্জে বসালো। গায়ের জামাটায় সারাদিনের ঘাম শুকিয়ে নুনের আস্তরণ পড়ে অস্বস্তিকর অবস্থা। অনিকেত শার্টের বোতামগুলো খুলে জামাটা আলগা করে নিলো। জানলা দিয়ে যে হাওয়াটা ঢুকছে সেটাও বিশেষ তাজা নয়। জলের বোতলটার দিকে তাকিয়ে একটু হতাশ হলো অনিকেত,তলানিতে এসে ঠেকেছে, এখন তো হকারও কমে গেছে,একটা জল কেনাও যাবেনা। ইশ! আগের স্টেশনে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল যখন তখনও খেয়াল পড়েনি। সহযাত্রী লোকটা হঠাৎ কিছু বলার আগেই নিজের ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে এগিয়ে দিল। তেষ্টা পেয়েছে তাই অনিকেতকে নিতেই হল। লোকটাও বোধহয় এই সুযোগ খুঁজছিল।
অনিকেতের জল খাওয়া শেষ হতেই প্রায় হামলে পড়ে বলে উঠলো,আপনাকে একটা ঘটনা শোনাতে চাইছিলাম। গল্পও বলতে পারেন। অনুমতি দিলে বলতে পারি। অনিকেতের এখন না বলার বিশেষ উপায় নেই। ট্রেন লেট যাচ্ছে। ফোনের ব্যাটারিও চার্জ হতে সময় নেবে। লোকটাকে বাকি রাস্তাটা সহ্য করতেই হবে মনে হচ্ছে। তাও একটু বিরক্ত হয়ে বলল, জলের জন্য ধন্যবাদ, তখন থেকে তো গপ্পো ফাঁদার চেষ্টাই চালাচ্ছেন মনে হচ্ছে।
শুনেই দেখুন না, হতাশ হবেন না। দামী টিকিট কেটে ওই বড় শপিং মলে যে ছবিগুলো দেখতে যান তার থেকে ভালো বৈ খারাপ না, বুঝলেন কিনা।
বটে! অনিকেত একটু ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বললো। লোকটা সেটা গায়ে মাখে না। সে যেন গল্প শুনিয়েই ছাড়বে।

ফোনটা আবার বাজছে,নেটওয়ার্ক ফিরেছে বোধহয়। ট্রেন একটু গতি কমিয়ে দিয়েছে। সামনে কোনো সিগনাল আছে নিশ্চয়ই । ফোনটা ধরলো অনিকেত। অজানা নাম্বার। ফোন ধরে কথা বলতে বলতে পাশের লাইন দিয়ে একটা দ্রুতগতির এক্সপ্রেস পার হওয়ার শব্দে পরিষ্কার করে ওপারের কথা শুনতে পেলনা। ভাসা ভাসা বুঝলো জনৈক কোনো বীমা কোম্পানির ফোন । এখন রাতবিরেতেও এরা মানুষকে বিরক্ত করতে ছাড়ে না। ওর জীবনবিমা সংক্রান্ত বিষয়ে মহিলা কথা বলতে চাইছিলেন, কোনো একটা প্যাকেজ গছাবার ধান্দা নির্ঘাত। কিন্তু অনিকেত ধন্যবাদ ইন্টেরেস্টেড নই এসব বলে ফোন রেখে দিল।

পাশের লোকটা বেশ উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে। গল্প শোনানোর জন্য। অনিকেত এবার সামনের সিটে পা তুলে একটু এলিয়ে বসে বলল, নিন শুরু করুন,তবে বোর হয়ে গেলে থামিয়ে দেব।
লোকটা একটু হেসে, বেশ বেশ ঠিক আছে বলে গল্প বলতে শুরু করল-


ছোটবেলায় খুব অভিনয়ের শখ ছিল বুঝলেন কিনা। চেহারায় তেমন চেকনাই ছিলনা তাই ভালো কোনো চরিত্র পেতাম না।একবার পাড়ার নাটকে হলাম ডাকাত,ছোট ডাকাত আর কি,বয়স তখন দশ। তারপরে মফস্বলের নাটকে এরকম ছোটখাটো, চোর ডাকাত চাকরের পার্ট পেতাম। সংলাপ তেমন থাকতোনা,আর থাকলেও সমবেত সংলাপ,ওই জয়ধ্বনি টাইপ।তারপর যাত্রাপালাতেও নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে গেলাম,পেলাম মীরজাফরের চরিত্র,সেই চরিত্র নাকি এমন জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছিল,আশেপাশের এলাকার বউ,বাচ্চারা আমায় দেখে রীতিমতো ঘৃণা করতে শুরু করে।

এইখানে লোকটা একটু মুচকি হাসলো।
অনিকেতের মনে হলো ট্রেনটা বড্ড ঢিমে তালে চলেছে বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে কটা বাজবে কে জানে!
একটা সিগারেট হবে নাকি ভায়া? টানতে টানতে গল্পটা শোনাতাম, বড়ো আরাম হতো,হেহে। লোকটা অদ্ভুত আবদার করলো।
অনিকেত আশ্চর্য হয়ে তাকালো লোকটার দিকে, বাহ,আপনি জোর করে গল্প শোনাবেন আর সিগারেটও আমার কাছে চাইবেন? আমি সিগারেট খাইনা,সামনে কোনো স্টেশনে গাড়ি থামলে কিনে নেবেন ।
লোকটা আক্ষেপের সুরে একটা শব্দ বের করে বললো, আসলে হয়েছে কি ওই বদভ্যাসগুলো হয়ে গেছে যাত্রাপালা আর নাটকের দলে থেকে,কম বয়স থেকেই আর কি! হেঁহে..সে যাকগে,এসব ছাইপাঁশ খাওয়া কোনো কাজের কথা না,বুঝলেন কিনা? তারপর যা বলছিলাম। হলো কি,গ্রামে গ্রামে ঘুরে যাত্রা করি,শীতকালে। বাকি সময় তেমন কাজ নেই। চাকরি বাকরি কোনদিনই আমার ধাতে সইতো না। তবে সংসার চালাতে হবে তো, তাই মফঃস্বলের এক বন্ধুর কথায় তার ব্যবসায় পার্টনার হতে রাজি হয়ে গেলাম।কাজ আমার তেমন বিশেষ ছিলনা। মাঝে মধ্যে ওই শহর থেকে মালপত্র আনা,অর্ডার ডেলিভারি এইসব করতে হতো। বেশীরভাগই ওই বন্ধু খুব দক্ষ হাতে সামলাতে পারতো। কখনও দোকানে গিয়ে বসতাম। হিসেব পত্তরে চোখ রাখতাম। যদিও তার দরকার হতোনা, সবটাই বেশ গোছানো ছিল।পুজোর সময় থেকে শীতকাল অবধি আমার কিন্তু ব্যস্ত সময় কাটতো। তখন দোকানে যেতে পারতাম না। সারারাত জেগে অভিনয়। দিনের বেলা ঘুম।বিকাল থেকে আবার রূপসজ্জা। কি দিন ছিল মশাই। প্রথম প্রথম বন্ধুর কাছে একটু অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলাম বটে, ব্যবসার কাজে সবসময় সাহায্য করতে পারিনা বলে,কিন্তু ও বলতো যে, তুই শিল্পী মানুষ অভিনয়টা চালিয়ে যা, ব্যবসা নিয়ে অতো ভাবতে হবেনা। একরকম ভালই চলছিল।তারপর একদিন বন্ধুও বিয়ে থা করে সংসার পাতলো। এরপর থেকেই আমাদের মধ্যে একটু একটু করে ভাব কমতে শুরু করলো। আমার অনুপস্থিতি নিয়ে এবার ও মাঝে মধ্যেই কথা শোনাতো। আমিও ভেবে পেতাম না প্রত্যুত্তরে কি বলবো। অভিনয় আমার প্রথম ভালোবাসা ওটাকে ছেড়ে থাকা অসম্ভব ছিল।
অনিকেত এখনও অবধি লোকটার গল্পে আগ্রহের বিষয় খুব কিছু খুঁজে পাচ্ছেনা তবুও লোকটার গল্প বলার ভঙ্গিতে একটা আকর্ষণ আছে। নাটকীয়তা জানে তাই পুরোপুরি উপেক্ষাও করা যায় না।লোকটা এবার কিছুক্ষণ চুপ। মনে হচ্ছে একটু দুঃখ পেয়েছে, মাটির দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। অনিকেত বললো, তারপর?
লোকটা অনিকেতের খোঁচায় বেশ চাঙ্গা হয়ে গেলো,দ্বিগুণ উৎসাহে গল্পের স্রোত বয়ে চললো,
বন্ধুটি বেশ চুপচাপ গোছের হলেও গোছানো মানুষ ছিল,হিসেব পত্তর, ডিউটি কোনোটাতেই তার ত্রুটি পাওয়া মুশকিল ছিল,আর আমি হলাম ঠিক তার উল্টো।তবে এখন নিজেকে দোষী মনে হয় বটে,বুঝলেন কিনা।বন্ধুর সাথে একবার বেশ মন কষাকষি হলো,আমি অর্ডার আনার ব্যাপারে কখনো সাহায্য করিনা।কথাটি সম্পূর্ণ সত্যি ,তবু গায়ে লাগলো।
তারপর, তারপরেই এলো সেই দিনটা।
লোকটার গলায় হঠাৎ আতঙ্কের একটা ভাব এলো,সেটা তার নাটকীয়তার গুনেই কিনা বুঝলোনা অনিকেত।কিন্তু কথা বাড়ালোনা,লোকটা বলে যাক।
শহরের এক মক্কেলের কাছ থেকে একটা মোটা অঙ্কের টাকার অর্ডার আনার কথা ছিল বুঝলেন কিনা। টাকাটা তখন ব্যবসার জন্য খুবই দরকারী হয়ে পড়েছিল।
আমার একই সময় শহরে একটা শো ছিল। বন্ধু যেতে না পারায় আমাকে দায়িত্ব দিল। আমিও বুঝে গেলাম এই সুযোগ,কিছুটা দায়িত্ব নিয়ে বন্ধুর চোখে নিজের সম্মান ফেরানোর।
শো-এর পর মক্কেলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চড়ে বসলাম ট্রেনে। ট্রেনভর্তি যাত্রীদের ভীড়। কোথাও একটা বড় মেলা হয়েছিল সেইখান থেকেই ফিরছে সব। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো চলতে চলতে। কামরাতে শুরু থেকেই কেন জানিনা পোড়া তেলের গন্ধ পাচ্ছিলাম।সন্দেহটা আরও বাড়লো যখন টয়লেটের দিকে গেলাম। কিন্তু ট্রেনে এত ভীড় যে ব্যাপারটায় কেউ মাথা ঘামালোনা দেখলাম। আমিও নিজের ভুল ভেবে চেপে গেলাম। টয়লেট সেরে আবার নিজের সিটে ফিরে এসে বসতেই চোখ লেগে গেল, দুদিনের রাত জেগে অভিনয় করার ক্লান্তি,বুঝলেন কিনা। টাকার প্যাকেটটা নিজের জামার ভিতরে ভরে নিয়েছিলাম নাহলে কে কখন লোপাট করে দেবে ভীড়ের মধ্যে। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা, ঘুম ভাঙ্গলো একটা বিরাট চিৎকার চেঁচামেচিতে। গোটা কামরা জুড়ে তান্ডব চলছে তখন। চারিদিকে সবাই ছোটাছুটি ধাক্কাধাক্কি করছে। কালো ধোঁয়ায় ভরে গেছে কামরাটা। আর আগুনের লেলিহান শিখাও দেখতে পেলাম। বুঝতে বাকি রইল না যে ট্রেনের কামরাটা জ্বলছে। আগুন সম্ভবত ওই তেল থেকেই লেগেছিল। প্রাণের দায়ে তখন ওই কামরা থেকে অন্য কামরায় যেতে গেলাম কিন্তু মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর ভীড়ের ঠেলায় ভেস্টিবল অবধি পৌঁছানোই দায়। আতংকে সবাই তখন দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়েছে। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কতজন চলন্ত ট্রেন থেকেই ঝাঁপ দিল। আগুনের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাসও নেওয়া যাচ্ছেনা। টাকার বান্ডিলটা হাতছাড়া করিনি তখনও, নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দরজার দিকে কোনোরকমে পৌঁছাবার চেষ্টা করলাম। মুখটাতে প্রচুর মানুষ দলা পাকিয়ে। সবাই লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু আগুনের হল্কা ঘিরে ধরেছে তাদের। আমার পিঠের দিকটাও তখন আগুন ধরে গেছে, জামা পুড়ে যাচ্ছে, অসহ্য জ্বালা। একটা মরিয়া চেষ্টা করলাম ভীড় টপকে মাথার উপর দিয়ে এগিয়ে যেতে। কিন্তু সম্ভব হলোনা। কেউ একজন পিছন থেকে মাথায় মারলো। জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার সময় বুঝতে পারলাম আগুনের ধোঁয়া দৃশ্যমান সব কিছুকে একটা চাদরের মতন ঢেকে ফেলছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

লোকটা চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। তারপর বললো,সেই থেকে ট্রেন যাত্রা চলছে। জীবদ্দশায় যে দায়িত্বটা পালন করতে পারলামনা এখনও তার দায়ভার বয়ে বেড়াচ্ছি।
অনিকেত অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, আপনার স্ক্রিপ্টটা ভালো, প্রযোজক খোঁজা শুরু করুন।
লোকটা এবার একটা ম্লান হাসি দিয়ে বলল, স্ক্রিপ্ট নয় অনিকেত বাবু, আমার জীবনের ইতিবৃত্তান্ত। অগ্নিকাণ্ডের খবরটা কাগজে বেরিয়েছিল অনেক বছর আগে। এখনও সেই তদন্ত চলছে শুনেছি।
আপনি সেই ট্রেনেই ছিলেন বলতে চান?
লোকটা মাথা নাড়ে।
রাবিশ!
কেন?
কেন মানে? আমাকে দেখে কি ছোটছেলে মনে হয় যে এটা বিশ্বাস করে‌ ফেলবো? যতদূর জানি ওই দুর্ঘটনায় যাত্রীরা কেউ বাঁচেনি। গাঁজাটাজা টানেন নাকি?
আহা ক্ষেপে উঠলেন যে, আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার আমি শুধু ঘটনাটা তুলে ধরলাম।
ধুর মশাই যত্তসব গাঁজাখুরি। কাজকর্ম নেই আপনার? মানুষকে বোকাবোকা গল্প শোনান?
লোকটা একটু হতাশ হয়ে বললো,সে আপনি মানতে না চাইলে আমি জোর করবো না। শুধু আমার একটা অনুরোধ যদি রাখতেন বড় উপকার হতো।
না মশাই ক্ষমা করুন। ওসব পারবোনা। অনেকক্ষণ আপনাকে সহ্য করেছি, অনেক মাথা খেয়েছেন ,এবার চুপ করুন।
লোকটা মাথা নামিয়ে কিছুক্ষণ মেঝের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বললো, বেশ। উঠি তাহলে,
আমার স্টেশন এসে গেল।
হ্যাঁ কাটুন, আমারো ঘুম পাচ্ছে।
আপনাকে বিরক্ত করবার জন্য দুঃখিত, বলে নিজের ব্যাগ বগলে ঝুলিয়ে সামনের স্টেশনে
নেমে গেল লোকটা।

অনিকেত মনে মনে ভাবলো লোকটার খুব সম্ভবত মাথার ঠিক নেই। নাহলে আজকাল এরকম আষাঢ়ে গল্প লোককে কেউ বলে বেড়ায় না। গপ্পোটা বেশ চটুল লেগেছে অনিকেতের। নির্ঘাত কোনো ফিল্ম বা অন্যের লেখা গল্প থেকে টুকে নিজের নামে চালিয়ে যাচ্ছে। অনিকেত যদিও গল্প সাহিত্য খুব বেশী পড়ার সুযোগ পায়নি কিন্তু তাও লোকটার কথা শুনে ওইরকমই মনে হচ্ছে। শুধু একটা ব্যাপারেই খটকা লাগছে অনিকেতের। ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা একটা হয়েছিল অনেকদিন আগে এটা সত্যিই। এমন হতে লোকটার আপন কেউ তাতে মারা যায়, সেই শোক বোধহয় এখনো ভুলতে পারেনি। এরকম মাথা খারাপ লোক কত ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিদিকে।

ট্রেনটা আরও কিছুক্ষণ স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইল।
পাশের লাইন দিয়ে একটা এক্সপ্রেস গাড়ি পেরোবার পর ছাড়লো। এক চিলতে ঠান্ডা হাওয়া আসছে বাইরে থেকে । হয়তো ঝড় বৃষ্টি আসবে,
যা ভ্যাপসা গরম ছিল সারাদিন। হাওয়ার আবেশে অনিকেতের চোখ বুজে আসছে। মাথাটা জানলায় ঠেকিয়ে দিল। সারাদিনের ক্লান্তিতে তন্দ্রা হয়ে চোখগুলিকে চাপ দিচ্ছে। তন্দ্রার মাঝে বাবাকে দেখতে পেলো অনিকেত। বাবার চোখে গোল ফ্রেমের মোটা চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল। হাফ পাঞ্জাবি গোছের জামা,হাতে সিটিজেনের ঘড়ি।সম্ভবত বিয়েতে পাওয়া। অনিকেত স্কুল থেকে ফেরার পথে দোকানের সামনের রাস্তা দিয়েই আসতো। ওকে দেখলেই বাবা ডাকতেন,স্কুলে কি পড়া হচ্ছে জানতে চাইতেন আর স্কুলের পড়া পেরেছে জানলে হাতে একটা পঞ্চাশ পয়সার লজেন্স দিতেন। বাড়িতে বড় একটা কথা বলতেন না।বেশিরভাগ সময় কাটতো দোকানেই। ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতির ব্যবসা। লাল তার, সবুজ তার, কয়েল, ফিউজ, সুইচবোর্ড, টিউব বাল্ব এসব ছোটবেলা থেকেই খুব উৎসাহ নিয়ে দেখতো অনিকেত। বাবা মাকে বলতেন, ওকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবো দেখো।
বাবার আত্মহত্যার কারণটা বড় হয়ে জেনেছিল অনিকেত।ব্যবসায় অনেক টাকার লেনদেন নিয়ে গোলমাল হয় একবার। মক্কেল বাড়ি অবধি এসে শাসিয়ে গেছিল। তারপর থেকেই বাবা অন্যরকম হয়ে যান। মানসিক কষ্টে ভুগতেন। মা’কে ও কিছু পরিষ্কার করে বলতে পারেন নি।


কামরায় অনেক মানুষের গলার শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। এরা কখন উঠলো আবার! বিয়েবাড়ির লোকজন মনে হচ্ছে। বর বউও রয়েছে দলে।
ট্রেন কি কোনো বড় স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল? অথচ ওর ঘুম ভাঙ্গেনি কেন? ট্রেনটা বেশ জোরেই চলছে এবার। কামরার যাত্রীদের কথা বার্তায় বাঙালি বলে মনে হচ্ছে না। অনিকেতের গোটা গায়ে ঘাম শুকিয়ে অস্বস্তি লাগছে, একবার হাত মুখ ধুয়ে আসা দরকার। নিজের সিট থেকে উঠে অনিকেত করিডোর দিয়ে টয়লেটে এসে পৌঁছাল। একটার দরজা বন্ধ অন্যটা খোলা। অনিকেতের একটু অস্বস্তি বোধ হলো। কিন্ত কারণ খুঁজে পেল না। টয়লেটের কাজ সেরে উল্টো দিকের বেসিনে হাত ধুয়ে, চোখে মুখে জল দিলো ভালো করে, আয়নায় নিজের মুখটা মনোযোগ দিয়ে দেখলো, মাথার চুলে একটা দুটো ধূসর রেখা দেখা দিচ্ছে আজকাল। একটু জল দিয়ে মাথার চুলটা ভিজিয়ে সমান করে নিচ্ছিল, হঠাৎ আয়নার নিচে একটা কাগজে মোড়া প্যাকেট দেখতে পেল।
এটা কখন এলো?
কেউ কি ফেলে গেছে?
হাত দিয়ে দেখবে নাকি? কিন্তু যদি বিপজ্জনক কিছু হয়! ধরবেনা ধরবেনা করেও প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ফেলল অনিকেত। কোন একটা অদৃশ্য আকর্ষণ কাজ করছে মনে হলো। প্যাকেটের মোড়ক খুলতেই উত্তেজনায় বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল অনিকেতের। কয়েক বান্ডিল টাকা! এত টাকা এইভাবে এখানে ফেলে গেছে কে!? প্যাকেটটা তাড়াতাড়ি আবার মুড়ে ফেললো। এটা রেলের পুলিশ বা স্টেশনের থানায় জমা দিতে হবে। কিন্তু এই চিন্তাটা ছাপিয়ে নিজের কথা মনে এলো হঠাৎ। মায়ের অবস্থা, ঋত্বিকার সাথে সংসার শুরু করার চিন্তা, শহরে বাড়ি নেওয়ার চিন্তা। এরকম সুযোগ আর কখনও আসবেনা হয়তো। এই টাকাগুলি দিয়ে সবকিছু না হলেও অনেকটা সুবিধা হবে দৈনন্দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের জীবনে একটু সুখ স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেতে। হয়তো তার জন্যেই ঈশ্বর এটা পাঠিয়েছে। বোতাম খুলে প্যাকেটটা জামার ভিতরে চালান করে অনিকেত দরজার ছিটকিনিটা খুলে সন্তর্পনে বাইরে বের হতেই কামরার সমস্ত আলো নিভে গেল। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত তো! চলন্ত ট্রেনে এরকম হয়না কখনও! কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ হলো নাকি! অনিকেত প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে সামনে দিকে এগোলো। মোবাইলের আলোয় অন্ধকার কামরার দুপাশে ঘোরাতেই দেখল কামরা জনমানবশূন্য! একটু আগেই যে সহযাত্রীদের দেখেছিল তাদের চিহ্ন মাত্র নেই। চলন্ত ট্রেন থেকে এতগুলো লোকের নেমে যাওয়া তো অসম্ভব! ট্রেনটা খুব অদ্ভুত রকম দুলছে। অনিকেত দিকভ্রান্তের মতন হাতের মোবাইলের আলোয় এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু মধ্যখানের দরজা বন্ধ!
উদভ্রান্ত হয়ে অনিকেত বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারলো কয়েকবার। কিন্তু ওপার থেকে কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো,
অনিকেত বাবু আমার অনুরোধটা রাখবেন?
চমকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল সেই সহযাত্রী গল্পবাগীশ লোকটা। পরনে শার্ট আর চশমা। লোকটা হাতজোড় করে অনুনয়ের সুরে বলল, আমার বন্ধুর যদি খোঁজ পান দয়া করে তাকে এই টাকাটা দিয়ে দেবেন। প্লিজ অনিকেত বাবু! বলেই লোকটা কাঁদতে কাঁদতে অনিকেতের হাতটা চেপে ধরলো।
অসম্ভব ঠান্ডা সেই হাত! শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা বিদ্যুৎ নেমে গেল অনিকেতের।
লোকটার দেহটা পলকের মধ্যেই ঝলসানো কাঠের চারকোলের মতন ধূসর হয়ে উঠতে শুরু করেছে। প্লিজ অনিকেত বাবু! আমার পাপ থেকে আমায় মুক্তি দিন! অশোকেন্দু নস্কর বা তার পরিবারের কাছে এই টাকাটা পোঁছে দিন দয়া করে।
আর্তচিৎকার করে অনিকেত হাত ছাড়িয়ে নিতেই মোবাইলটা ছিটকে গেল। নিজেও টাল সামলাতে না পেরে সামনের সিটের উপর পড়ে গেল।
আবার সব অন্ধকার!
শুধু মাটিতে মোবাইলের আলোটা জ্বলছে। অনিকেত কি ঠিক শুনলো? কি বললো লোকটা! অশোকেন্দু নস্কর তো অনিকেতের বাবার নাম! তাহলে এই সেই টাকা যার জন্য ওদের জীবনটা তছনছ হয়ে গেছিল। বাবাকে চিরকালের মতন হারাতে হয়েছিল! মাথার মধ্যে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ওর। কামরায় কয়েকটা পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে অনিকেত। এগিয়ে আসছে। হাতড়ে হাতড়ে মোবাইলটা আবার তুলে নিলো। মোবাইলের আলো সেই দিকে ফেরাতে কাউকে দেখতে পেলো না। ট্রেনের ভিতরে অন্ধকার মধ্যে আর সব কিছু ছাপিয়ে ওই শব্দগুলো যেন আরও এগিয়ে আসছে।
অনিকেতের চোখের ভিতরটা গরম লাগছে, হাত ঠান্ডা, হৃদস্পন্দন তীব্র, গলার ভিতরে কে যেন ধাক্কা মারছে। দেহের সমস্ত রক্ত ঘাড়ের কাছে এসে জমা হয়ে ঠেলা মারছে মাথার খুলির দিকে। ব্রহ্মতালু যেন ফুলে উঠে ফেটে যাবে বেলুনের মতন। অনিকেত খুঁজে খুঁজে জানলার উপরের চেন ধরে টান মারলো। হ্যাঁচকা টানে হ্যান্ডেলটা খুলে এলো কিন্তু ট্রেনের গতি পরিবর্তন হলো না!
পায়ের শব্দগুলি এবার অনেক কাছে পৌঁছে গেছে। একদম ওর সামনে। ট্রেনের দরজার দিকে প্রচন্ড ভয়ে খাবি খেতে খেতে পৌঁছে গেছে অনিকেত। বাইরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে দু’ভাগে কেটে ট্রেনটা ছুটে চলেছে।
এ কোন ট্রেন? বাইরে এত অন্ধকার কেন? কোনো গ্রামগঞ্জের আলোও দেখা যাচ্ছে না। অনিকেতের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসছে। ট্রেনের কামরাটাকে যেন একটা চলমান কয়েদখানা মনে হচ্ছে। জানলা-দরজা আছে কিন্তু বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। অনিকেত ওদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। একটা মাংসপোড়ার তীব্র গন্ধ উঠলো কোথাও থেকে! কামরাটা এবার ধোঁয়াতে ভরে যাচ্ছে। ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত বমিভাব উঠে আসছে নাড়ি পাকিয়ে। দম বন্ধ লাগছে,বাম হাতের দিকটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে,চিনচিনে একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। দরজা দিয়ে বাইরে তাকালো অনিকেত, ট্রেনের তীব্র হুইসেলের শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দেবে। পিঠের উপর একটা ঠান্ডা, অলৌকিক স্পর্শ পেল। হাড় হিম করা একটা স্পর্শ। জানালাগুলো খোলা থাকলেও গন্ধটা কামরার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ও কি জ্ঞান হারাবে? যে করেই হোক এর থেকে মুক্তি পেতে হবে। যা থাকে কপালে। সামনে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। শেষবারের মতন একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে ছুঁড়ে দিল তার মধ্যে।


সকালের তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। বারকয়েক চোখের পলক ফেলার পর সয়ে এলো।
প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চের উপর শুয়ে আছে মনে হলো। গায়ে অসহ্য ব্যথা। জামার ভিতরে কি যেন শক্ত একটা কোমরে খোঁচা দিচ্ছে। ভিতরে হাত দিয়ে সেটা বার করে আনলো অনিকেত। একটা খবরের কাগজ মোড়ানো প্যাকেট। তার ভিতর মোটা মোটা টাকার বান্ডিল কয়েকটা। এখানে সে কিভাবে এলো আর সঙ্গে এতগুলি টাকাই বা কি করছে? মনে করতে গিয়ে কিছু মনে এলোনা। যে খবরের কাগজের মোড়কে টাকাগুলি মোড়ানো সেটা পুরোনো, তার সামনের দিকটা একটা খবর বড় করে ছাপা আছে-

“যুবকের রহস্যময় মৃত্যু:
গতকাল ভোরবেলা অনিকেত নস্কর (৩৭) নামক এক যুবকের মৃতদেহ রেললাইনের উপর পাওয়া গেছে। তার দেহ থেকে উদ্ধার হওয়া আইডি কার্ড, টিকিট এবং অন্যান্য নথি থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি শহরের এক ইলেকট্রনিক সংস্থায় বিপণনের কাজ করতেন। ব্যাক্তির দেহ থেকে কাগজে মোড়া কয়েকলাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সন্দেহ করছে ওই লাইনের শেষ যাত্রীবাহী ট্রেন থেকে পড়েই তার মৃত্যু হয়েছে এবং সারারাত দেহটি লাইনের উপরেই পড়ে ছিল। অন্য কোনো যাত্রী বা রেলকর্মী ওই ব্যক্তিকে ট্রেন থেকে পড়ে যেতে লক্ষ্য করেনি।”

খবর দেখে অনিকেতের মনে হলো বিশ্বশুদ্ধ সবারই বোধহয় মাথা খারাপ নাহলে এসব গাঁজাখুরি কে লেখে? খবরের কাগজেও শুধু গপ্পো ছাপে এখন। মাথাটা কেমনে জানি ধরে আছে। বাড়ি ফেরার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে এখন। দিনের বেলায় ভ্যাপসা গরমটা বাড়ছে।

সমাপ্ত

শান্তনব রায় গল্পBAGISH এর স্রষ্টা ও সহ রচনাকার

©2018 http://golpoba-gish.com. ALL RIGHTS RESERVED

2 thoughts on “অনিকেতের গল্প”

Comments are closed.