রচনাঃ পিয়াল দাস
পূর্ব কথা:
আকাশে গ্রীষ্মের মেঘ জড়ো হয়েছে ।কালবৈশাখীর আভাস।গরমে শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। টুকটুকি আবার মা হবে। এই নিয়ে তিনবার। আগের দু’বার মেয়ে হয়েছিল। একটা তিন দিনের মাথায় মারা যায়। পরেরটা তবু বছরখানেক বেঁচেছিল।কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তার শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে,ভয়ংকর সব দৃশ্য সারাক্ষণ তার চোখের সামনে ঘোরে।অচেনা অজানা লোকজন সবসময় কথা বলতে চায়।টুকটুকি একা একাই কথা বলে,তাদের তাড়াতে চায়।চিৎকার করে ওঠে।মেয়েগুলোকে ওরাই নিয়ে গেছে।টুকটুকি অনেক কেঁদেকেটে সবাইকে বোঝাতে চেয়েছিলো। শমসেরও ওঝা এনে ঝাড়ফুঁক করিয়েছে।সেই থেকে ভয়ে আর কিছু বলেনি টুকটুকি। চুপ করে থেকেছে।
একটা কমবয়সী মেয়ে আজকাল বড় বিরক্ত করে। শমসেরের এসব দেখার সময় নেই।সে সকাল সকাল ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ে, কখনো রাতে ফেরে,আবার কখনো ফেরেনা।হাঁড়িতে ভাত ভেজানো থাকে,টুকটুকি খেতে পারেনা।রোজ রোজ তার একই খাবার ভালো লাগেনা।কখনো কখনো ওই আবছায়া মেয়ে বিছানার পাশে বসে থাকে,তার পেটে হাত বোলায়, বিড়বিড় করে কিসব বলে।
টুকটুকির ভয় লাগে,সন্ধ্যা নামলে অন্ধকারে কারা হেঁটে বেড়ায় ঘরের চারপাশে।টুকটুকি একা একাই কাঁদে, ভয় পায়।হঠাৎ কখনো শমসের দুপুরবেলায় ফিরে আসে,তখন টুকটুকির ঘরের দরজা খোলে,জোর করে ভাত খাওয়ায়,ওষুধ খাওয়ায়।টুকটুকির ঘুম পায়।ঘুমের ঘোরেই সে বুঝতে পারে,খুব কড়া আতরের গন্ধ আসছে।শমসের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
টুকটুকির এখন আট মাস।
শমসের প্রায়ই অনেক কাগজপত্র এনে টুকটুকির আঙুলের ছাপ নিয়ে যায়। টুকটুকির যত্নের জন্য এক বুড়িকে রাখা হয়েছে।সে তালা লাগিয়ে বাইরে থাকে।মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকে ওকে খাবার আর ওষুধ দিয়ে যায়। টুকটুকির গায়ে জামাকাপড় রাখতে ইচ্ছে করেনা।বেশিরভাগ সময় উলঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায় ঘরের ভেতর।আজকাল শমসেরও আর এই ঘরে আসেনা।বুড়ি টুকটুকির গায়ে শাড়ি পেঁচিয়ে দেয়। বিকেলে চুল বেঁধে দেয়, মাথায় তেল দিয়ে দেয়। টুকটুকি চোখে ঘোলা দেখে, মাঝে মাঝে এত ঘুম পায় চোখ মেলে রাখতে পারে না।
সারাক্ষণ একটা চাপা অস্বস্তি । শরীরের অস্বস্তি যেমন বুঝতে পারে তেমনি মনের অস্বস্তি ও টুকটুকি ঠিক বুঝতে পারে।
এরকমই একদিন হঠাৎ তার ঘরের দরজা খুলল,বুড়ি যত্ন করে টুকটুকিকে সাবান ডলে স্নান করালো, তারপর নতুন একটা শাড়ি পরাল,ফিতে দিয়ে চুলও বেঁধে দিলো।আর ফিসফিস করে কানের কাছে বললো,
আজকের জন্য একটু সাব্যস্ত থাকো গো মা,
নইলে লোকজন যে খারাপ ভাবে।
টুকটুকি বুঝে পায়না বুড়ি ওকে ঠিক কি করতে বারণ করছে ।জানালায় দাঁড়িয়ে দেখে,বাড়িতে অনেক লোকজন,টুপি পড়া দাঁড়িওয়ালা একজন আছেন,যাকে টুকটুকি নিজের বিয়ের দিনেও দেখেছিল।পোলাওয়ের গন্ধ আসছে,টুকটুকির গা গুলিয়ে উঠে।আর ঠিক তক্ষুনি ওই মেয়েটা ওর গায়ে চিমটি কাটে,
‘আহহ’ বলে চিৎকার করে উঠে টুকটুকি।
মেয়েটা সেসব উপেক্ষা করেই বলে,
তোর সোয়ামি নতুন বউ এনেছে।
একই কথার বারবার ।
টুকটুকি গ্যাসভর্তি বেলুনের হঠাৎ চুপসে যাওয়ার মতো নিশ্বাস ফেলতে থাকে।সাপের মত হিস হিস শব্দ করে
মেয়েটাকে গালি দেয়, তুই আমাকে চিমটি কাটলি কেন?হাড় বজ্জাত মেয়েছেলে।
বুড়ি খাবার দিতে ঘরে ঢুকেই আঁতকে ওঠে।টুকটুকি শাড়ি খুলে ফেলেছে,চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কি বলছে? দাঁত কিড়মিড় করছে আর কাঁদছে।তড়িঘড়ি ঘরের জানালা বন্ধ করে দেয় বুড়ি,
কি হয়েছে গো, মা?শরীর খারাপ লাগে?ক্ষুধা লাগে?’বলে মাথায় পিঠে ক্রমাগত হাত বোলাতে থাকে। টুকটুকি গোঙাতে গোঙাতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।
শমসের সকালে ওর ঘরে আসে,সঙ্গে নতুন শাড়ি, কাঁচের লাল চুড়ি পরা ঘোমটা দেয়া এক ছোটখাটো মেয়ে,সরু চোখে তাকিয়ে আছে ওরই দিকে,
বউ,এ আমাদের বাড়ির নতুন বউ।
কতদিন পর শমসের বউ বলে ডাকলো।নতুন বউয়ের গা থেকে একরকম ঝিম ধরানো কড়া মিষ্টি গন্ধ নাকে আসছে।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার বিনা কারণে গলাখাঁকারি দিচ্ছে শমসের।হঠাৎ টুকটুকির গা গুলিয়ে বমি এলো,নতুন বউ পাশে বসে ছিলো, সরে যাওয়ার সময় পায়নি।
তার নতুন লাল শাড়ি নষ্ট হলো।
ইশ রে! বলে নাক কুঁচকালো।
আর সেই বজ্জাত মেয়েটা টুকটুকিকে চিমটি কাটলো,টুকটুকির প্রাণ বেরিয়ে যাবে মনে হচ্ছে।চোখ ফেটে জল বেরোচ্ছে,আর মুখ দিয়ে চিৎকার। শমসের নতুন বউয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে বেরিয়ে এলো।
এই ঘরে পা দেবেনা আর কোনোদিন।
১
সূর্য ঠিক মাথার উপর জ্বলজ্বল করছে। জৈষ্ঠ্যের তাপে পায়ের তালু অব্দি জ্বলে যাবার জোগাড় ।কিশোয়ার রাস্তার ওপর বসে হাপুস নয়নে কাঁদছে।দৃশ্যটা তার মোটেও পছন্দ নয়,অন্যসময় হলে একটি বছর কুড়ির মেয়ে মাঝরাস্তায় হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছে,এই দৃশ্য,কল্পনাতেও আনতো না,কিন্তু এই মুহূর্তে সে সমস্ত কিছু ভুলে গেছে।বোধগুলো কাজ করছেনা বোধহয়। রীতিমতো লোকজন জড়ো হতে শুরু করেছে রাস্তায়।কিশোয়ার মাথায় হাত দিয়ে কেঁদেই চলেছে।একজন জলের বোতল এগিয়ে দিলো কোত্থেকে যেনো, কিন্তু কিশোয়ার জল খাবে কি খাবেনা সেটা অব্দি ঠিক করতে পারছেনা। প্রচন্ড রোদে এবার মাথাও ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে।জমায়েতের মাঝ থেকে কয়েকজন জলটা নিতে বলায় কিশোয়ার বোতল হাতে নিলো।
ও এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা।সারা মাসের বেতন,এভাবে চুরি হয়েছে।এক মাস ধরে বাবা হাসপাতালে,সেখানে দেখা করতে যাবার জন্যেই তড়িঘড়ি মাইনে নিয়ে বেরিয়েছিল,পথে এরকম কান্ড!কখন যে ব্যাগ কেটে টাকাটা বের করে নিয়েছে!
এখন বাবার সাথে দেখা করতে যাবে কি করে?।ওষুধ কিনবে কি করে!! কয়েকটা পরীক্ষা দিয়েছিল ডাক্তার,টাকার জন্যে কদিন সেটাও দেরি হচ্ছিল আর আজ টাকাটা পেয়েও….উফফ !!
কিশোয়ারের মাথা আর কাজ করছেনা।ভিড়ের ভেতর বেশ কানাঘুষো চলছে সেটাও কিশোয়ারের কানে আসছে।কিন্তু সে খুব বোকার মতো হেঁচকি তোলা ছাড়া কোনো কথাই বলতে পারছেনা।
কেউ কেউ আবার ভিড় সরানোর জন্যে বাড়ি যান,যত্তসব নাটক রাস্তায় করতে হবে এমন মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত দু’তিনজন কাছে গিয়ে চেপে ধরায়,কিছু বললো,যার বেশিরভাগ নিজেও শুনতে পেলোনা।গুছিয়ে বলা তো দুরস্হ।
কিশোয়ার অনেকক্ষণ বসে থাকে রাস্তাতেই । তারপর অগত্যা বাড়ি ফিরে যায়। হাসপাতালে গিয়ে আর কি হবে, বাবাকে কি বলবে, ওষুধইবা কী করে কিনবে! সারারাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে আর ভাবে কিভাবে ক’টা টাকার ব্যবস্থা করা যায়,কিভাবে বাবার ওষুধগুলো কেনা যায় । বাবা ছাড়া তো আর কেউ নেই কিশোয়ারের। তাই এই মানুষটাকে হারানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। ছোটবেলা থেকে বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কিশোয়ারই একমাত্র বাবার কাছাকাছি ছিল সব সময়।সে বাবাকে স্নানের গামছা এগিয়ে দিত,ভাত নিয়ে বসে থাকতো,পান সেজে দিত।বাবা মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে তাই ওকে লেজ বলে ডাকত।মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য কিশোয়ারের ছিল না, বাবাকেই জেনেছে সে নিজের সবকিছু। বাবার এত অসুখে কিশোয়ার কিভাবে সব সামলাবে সেটাই ওর মাথায় আসছিলো না। শহরে আয়ার কাজটা জুটে যাওয়ায় এক রকম স্বস্তি পেয়েছিলো মনে। কিন্তু প্রথম মাইনের টাকাটাই এভাবে খোয়াতে হবে সেটা ওর কল্পনায় আসেনি। তার ওপর বাবাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আজকাল বড্ড অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে। সেজন্যই হয়তো টাকাটা খোয়া গেছে। এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল কিশোয়ার।
খুব ভোরের ট্রেন ধরে কিশোয়ার, চটজলদি তৈরী হয়ে সামান্য সেদ্ধ ভাত ফুটিয়ে নিলো, কাল রাতেও কিছু খাওয়া হয়নি।দরজা খুলে বাইরে তাকাতেই দেখলো দরজার সামনে একটা কাগজের ঠোঙ্গা বেশ যত্ন করে রাখা। কিশোয়ার চোখ টা একবার কচলে নিলো।এটা আবার কি এখানে?হাত দিতেও সাহস পাচ্ছেনা,আজকাল অনেককিছুই হয় চারিদিকে,একা মেয়ে এই ঘরে থাকে,পাড়ায় সকলেরই নজরে পড়ছে, কেউ ইচ্ছে করে বদমায়েশি করতেও পারে।কিছুক্ষণ ভালো করে দেখার পর ভরসা করে হাতে নিলো। ঠোঙা খুলে দেখল ওর সেই চুরি যাওয়া টাকার ব্যাগ আর তার সাথে ওই ব্যাগে রাখা প্রেসক্রিপশন আর কিছু ওষুধ। আশ্চর্য!
কিশোয়ার চট করে ঘরে ঢুকে গেলো।ঠোঙ্গাটা উপুড় করে দিল।তারপর টাকার ব্যাগ খুলে পুরো টাকাটাই পেলো গুনে,আর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ। কি করবে ভেবে পেল না।একবার আনন্দে হাসি পেল আবার অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করলো এরকম কি করে হয়?ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লো কাজে,দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এত ভোরে ভ্যান,রিকশা কিছুই নেই,আর কিশোয়ারের সেই সামর্থও নেই।তাই স্টেশন অব্দি রাস্তা ও হেঁটেই যায়।
খুব দ্রুত হাঁটছিল কিশোয়ার,হঠাৎ মনে হলো অন্য একটা পায়ের আওয়াজ পাচ্ছে।একবার ভাবলো থেমে পেছন ফিরে দেখবে।কিন্তু অপ্রত্যাশিত ঘটনা,আর কাজে যোগ দেবার তাড়া মিলিয়ে খুব একটা পাত্তা দিলোনা।স্টেশনে ঢুকেই দেখলো ট্রেনটা ছেড়ে যাচ্ছে,দিকবিদিক না দেখেই লাগালো ছুট,আরেকটু হলেই হোঁচট খেয়ে ট্রেনের তলায় ঢুকে যেতো, কিন্তু একজোড়া হাত সামলে নিলো ওকে।
কিশোয়ার ধন্যবাদ জানানোর জন্য ঘুরে তাকালো,চেহারাটা কোথায় যেনো দেখেছে-রোগা,উষ্কোখুস্কো চুল,কালো মতো একটা ছেলে।
‘আরেকটু হলে মরতেন যে,পরের ট্রেনে যান।”
কিশোয়ারের মনটা খারাপই হয়ে গেলো, পরের ট্রেনে যাওয়া মানে বেশ দেরি হবে।
কিশোয়ার ছেলেটাকে দেখছিলো বসে বসে,স্টেশন চত্বরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে,হয়তো পরের ট্রেনটাই ধরবে।কিন্তু মুখটা কোথায় দেখেছে মনে করতে পারলোনা।
বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ট্রেনটা এলো,কিশোয়ার চটজলদি উঠে পড়লো লেডিস কামরায়।কিন্তু ছেলেটাকে আর দেখতে পেলোনা।
কোথায় গেলো?
এরপর কাজ সেরে হাসপাতাল যাবার পথে আবার ছেলেটাকে দেখতে পেলো।দূরে,ওকে দেখে এমন ভাব করলো যেন চিনতে পারছেনা।কিশোয়ার বাবাকে দেখে কেঁদে ফেললো,মনে হচ্ছিলো কতদিন দেখেনি।বেশি কথা বলা বাবার বারণ হয়েছে।বেশিরভাগ কথাই ইশারায় বলে।বাবাকে খাইয়ে কিশোয়ার বাড়ির পথ ধরলো।বাড়ি ফেরার পথে ছেলেটাকে আবার দেখলো।এইবারে কিশোয়ার একটু ভয় পেলো।এর আগে কখনো ছেলেটাকে দেখেনি তো!
তাহলে কি ওর পিছু নিয়েছে?কিশোয়ারের বয়স কম,রাস্তাঘাট সম্বন্ধে ধারণাও খুব পোক্ত নয়।ও হনহন করে হাঁটা লাগালো, একসময় বুঝলো,রীতিমতো দৌড়াচ্ছে।
এরপর থেকে প্রায়ই ওর যাতায়াতের পথে নজরে পড়ে ছেলেটাকে।প্রথমদিনের মতো রুখু ভাব নেই,একটু যেন পরিপাটি।তবু ছেলেটাকে দেখলেই কিশোয়ার অন্যমনস্ক হয়ে যায়।বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়।
একদিন বাড়ি ফেরার সময় ঝুম বৃষ্টি নামলো,কিশোয়ারের ছাতা নেই।স্টেশনে প্রচুর লোক ,সবারই প্রায় এক অবস্থা।কিশোয়ার কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিলো, বৃষ্টি ধরলেই বেরোবে।
হঠাৎ কোত্থেকে একটা মস্তবড় ছাতা নিয়ে সেই ছেলেটা হাজির।
‘আসো,বাড়ি পৌঁছে দেই।’
কিশোয়ার দেখলো ছেলেটার মুখে একটা হাসি লেগে আছে।চোখের পাতাগুলো বেশ বড় বড়,তাতে চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব এসেছে।
কিশোয়ার সেই মায়া কাটাতে পারলোনা।আজ প্রথমবার ওর জন্যে কেউ ছাতা ধরে আছে,বাড়ি পৌঁছে দেবে।
বেনু মিয়াঁর পরিবার বলতে কেউ নেই।কয়েকজন বন্ধু আছে একসাথে কাজ করে।কাজ বলতে বেনুমিয়াঁ ছোটখাটো চুরি,পকেটমার করে।কিশোয়ারের ব্যাগটা সেই চুরি করেছিল।বেনু মিয়াঁ অকপটে সেসব কিশোয়ারকে জানিয়েছে।কিশোয়ার প্রথমটা আঁতকে উঠেছিল,তারপর রাগ হয়েছিল নিজের ওপর।কিন্তু বেনুমিয়াঁর সৎভাবে সব স্বীকার করার ব্যাপারটা মনে দাগ কেটেছে।ওর কুড়ি বছরের জীবনে এমন ঘটেনি।কিছুদিন বেনু মিয়াঁকে এড়িয়ে গেছে।কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে বেনু মিয়াঁ সবসময় তার আশেপাশেই রয়েছে।কয়েকবার তো দেখতেও পেয়েছে।সবসময় একটা ছাতা যেন ওর মাথার ওপর ধরা আছে।
বাবার শরীর যত বেশি খারাপের দিকে এগোচ্ছে, কিশোয়ার ততই আশঙ্কায় অসহায় হয়ে পড়ছে।আত্মীয় স্বজন বলতে ওর দিদি,কিন্তু দিদির শ্বশুরবাড়িতে খুব পর্দা,কোথাও একা ছাড়েনা।হাসপাতালেই আসতে দেয়নি একদিনও।তবু কিশোয়ার খবর পাঠায়।কেউ নেই যাকে নিজের এই অসহায় অবস্থা বলে বোঝাতে পারে।
বেনু মিয়াঁ!সত্যি একদিন কিশোয়ারের পেছন পেছন সেও হাসপাতালে উপস্থিত হলো।ডাক্তারবাবু অনেক ওষুধপত্র দিচ্ছেন,কিন্তু কোনোটাই বাবার শরীরে ঠিক কাজ করছেনা।কিশোয়ার বাবাকে এসব বলতে পারেনা।শুধু মাথায় হাত বোলায়।কাজের গল্প বলে।বেনু মিয়াঁ কিশোয়ারের মুখ দেখে ওর অবস্থা বুঝতে পারছিল।সোজা গিয়ে হাজির হলো কিশোয়ারের বাবার কাছে,সব খুলে বললো,সে কিশোয়ার কে বিয়ে করতে চায়।
কিশোয়ার হতবাক।কি সাহস বেনু মিয়াঁর!
বাবার এমন অবস্থা,তার মধ্যে এসব কথা সে বলছে কেমন করে?
একবার ভাবলো তাড়িয়ে দেবে কিন্তু কিশোয়ারের বাবা বেনু মিয়াঁকে কোনো ভালো কাজ খুঁজতে বললো,আর সে যখন রাজিও হয়ে গেল,তখন কিশোয়ার আর কিছু বলতে পারলোনা।
তারপর বেশ কিছুদিন বেনু মিয়াঁকে আর দেখা গেলোনা।কিশোয়ার দেখতেও চায়না।তার এমনিতেই দুশ্চিন্তায় ঘুম হয়না।ভালোই হয়েছে,এই অছিলায় বেনু মিয়াঁকে সরানো গেছে।কিন্তু দশ দিন পরেই আবার হাসপাতালে এসে হাজির বেনু মিয়াঁ। ওকে দেখেই বুক ধক করে উঠলো কিশোয়ারের। মুখে সেই হাসি আর মায়া মায়া চোখ। বাবার কাছে গিয়ে জানলো বেনু মিয়াঁ ওকে বিয়ে করবার জন্যেই এসেছে।সম্ভব হলে আজই।কিশোয়ার রাজি হলোনা।
বাড়ি ফেরার পথে বেনু মিয়াঁ বহু অনুনয় বিনয় করলো। সম্ভব হলে হয়তো কিশোয়ারের পা ধরে ফেলতো,
‘আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।তোমার জন্য সব ছেড়ে দেব।কথা দিচ্ছি।আমি তোমারে অনেক ভালোবাসি।’
এই শেষের কথাটা জীবনে প্রথম শুনলো কিশোয়ার,ওর মনে একটা চিনচিনে অনুভূতি হলো,কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে ঘরে ঢুকে গেলো।পরদিন কাজ থেকে ফিরে ওর চোখগুলো বেনু মিয়াঁকে খুঁজছিলো,কিন্তু নাহঃ,দেখা পেলোনা।হাসপাতালেও আশা করছিলো বেনু মিয়াঁ আসবে,ইদানিং প্রায়ই আসে।কিন্তু সেখানেও নেই।
‘আমি চলে গেলে তোকে কে দেখবে রে মা।পৃথিবীতে আপনজনের তো দরকার।বিপদে আপদে কে পাশে দাঁড়াবে ?’
বাবার কথাগুলো শুনে কিশোয়ারের বুকটা হুহু করে উঠলো। গলার কাছে কি যেন আটকে আছে।
কিশোয়ার আর বসলোনা।
এক জুম্মাবারে কাজী ডেকে বিয়ে হলো কিশোয়ারের।শুধু দু’তিনজন সাক্ষী আর কাজিসাহেব।সব ব্যবস্থা বেনুমিয়াঁ আর তার বন্ধুরাই করেছে। কিশোয়ারের বাবা মারা গেছেন।তিনি এই বিয়ে দেখে যেতে পারলেন না বলে কিশোয়ারের কেমন যেন অপরাধবোধ হচ্ছে।বাবার মৃত্যুর পর সব কাজেই কিশোয়ার বেনু মিয়াঁর সাহায্য পেয়েছে।এই ক’দিনে বেনু মিয়াঁর সাথে সম্পর্কটাও যেন আরো গভীর হয়েছে।ভরসা, আস্থা এই শব্দগুলো আবার নতুন করে চিনেছে কিশোয়ার।
বেনু মিয়াঁ চোর।পকেটমার।তবু কিশোয়ার তাকে আপন করে নিয়েছে এই অপ্রত্যাশিত আনন্দ সে কিভাবে বোঝাবে।রাতে তার ঘুম আসেনা।ঘন ঘন পাশ ফিরে কিশোয়ারকে দেখে ।তার একচালা ঘরে পাখা নেই,যদিও হাওয়া বেশ ভালোই আসে।পূর্ণিমায় চাঁদের আলোতে কিশোয়ারের ঘুমন্ত মুখে হালকা হালকা ঘামের বিন্দুগুলো বেনুমিয়াঁর কাছে হীরের টুকরোর মতো লাগে।গভীর ভালোবাসায় সে তাকিয়ে থাকে কিশোয়ারের দিকে।কতরকম ভাবনা খেলে বেড়ায় কিশোয়ারকে ঘিরে।কিশোয়ারের লাল সবুজ চুড়ি,ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠলে টুংটাং শব্দ করে,বেনু মিয়াঁর কাছে সে এক অদ্ভুত মায়াময় শব্দ।কিশোয়ারের ঘুমন্ত অল্প হাঁ করা মুখটায় হঠাৎ চুমু খেয়ে বসে বেনু মিয়াঁ।কিশোয়ার ধড়ফড়িয়ে ওঠে।তারপর বেনু মিয়াঁকে দেখেই একটা সোহাগ মাখা কটাক্ষ হেনে বলে ঘুমাতেও শান্তি দেবেনা?! যত ভালোবাসা এখনই?! মাঝরাতে পিরিত জেগেছে!
কিশোয়ারের ঘুমজড়ানো গলার আধো অস্পষ্ট কথাগুলো বেনু মিয়াঁর খুব ভালো লাগে।
প্রবল উত্তেজনা আর ভালোবাসায় সে জড়িয়ে ধরে কিশোয়ারকে। এলোমেলো শাড়ি গুটিয়ে ফেলে। তীব্র কামনায় চুমু খেতে খেতে প্রবেশ করে কিশোয়ারের দেহে। চুম্বনরত অবস্থায় ঘুম মেশানো গলার চাপা শীৎকার বেরিয়ে আসে কিশোয়ারের মুখ থেকে।
এক বর্ষার দুপুরে বেনু মিয়াঁ কিশোয়ারকে নিয়ে গেলো তার গ্রাম দেখাতে।তারপর হঠাৎ সেখান থেকে বেশ দূরের এক জঙ্গলে।জঙ্গলটা খুব ঘন নয়।কিন্তু বর্ষার জল আর মেঘের ছায়ায় কেমন অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে,কিশোয়ারের ভয় করতে থাকে। নিরালা দুপুরে জংগলের পশুপাখির শব্দও কোথাও স্তব্ধ হয়ে গেছে।এতো জায়গা থাকতে বেনুমিয়াঁর মায়ের কবর এই সুনসান জঙ্গলে কেন কিশোয়ার ঠিক বুঝতে পারেনা।
২
ছ’মাসেই কিশোয়ারের পেটের আকৃতি বেড়ে উঠেছে।ওঠা বসতেও যেন হাঁফ ধরে যায়।তবু এই নিয়েই কিশোয়ার ঘরের সমস্ত কাজকর্ম করে।একেবারে বসে থাকলে তো হয়না।বেনু মিয়াঁ আজকাল খুব সকালে কাজে যায় অনেক রাত করে ফেরে।মাঝে মাঝে কিশোয়ার টেরই পায়না রাতের কোন সময়ে বেনু মিয়াঁ ঘরে এসেছে।ইট ভাটার কাজে খুব খাটুনি।কিশোয়ার বুঝতে পারে।কিন্তু এই অবস্থায় ও নিজেও কাজে যেতে পারছেনা।মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে।
কিশোয়ার লক্ষ্য করছে বেনু মিয়াঁ রাতের বেশ কিছু সময় কিশোয়ারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে।যেন ধ্যান করছে।প্রথম প্রথম কিশোয়ার আধঘুমে তাকিয়ে দেখেই আবার ঘুমিয়ে পড়তো।কিন্তু ধীরে ধীরে ওর মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি জমা হচ্ছে।বেনু মিয়াঁ কিশোয়ারের পেটে হাত বুলায়,স্বাভাবিক স্নেহের,ভালোবাসার হাত না।যেন কিছু বুঝতে চাইছে,কিছু খুঁজে পেতে চায় যেন।মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কথাও বলে।অনেকবার ভেবেছে এই কথাগুলো বেনু মিয়াঁকে বলবে।কিন্তু মানুষটা বাড়িতে থাকে কতক্ষণ।আর কিশোয়ারের আজকাল অল্পেই চোখ লেগে যায়।বড্ডো ক্লান্ত লাগে।
একদিন হঠাৎ দুপুরবেলা বাড়ি ফিরে বেনুমিয়াঁ কিশোয়ারকে বললো, “মায়ের কবর টায় একবার যাওয়া লাগে যে!’
কিশোয়ার প্রথমটায় বুঝতে পারেনি,তারপর বললো,”তোমার সময় হচ্ছে কোথায়।সত্যি তো একবার জিয়ারত করে আসতে পারো।”
“সেতো আমি প্রায়ই যাই,তোমাকে নিয়ে যেতে হবে।”
কিশোয়ার বেনুমিয়াঁর কথায় চমকে উঠলো।প্রায়ই যায় মানে কি?কোনোদিন তো সে কথা কিশোয়ার কে বলেনি?এর মধ্যে লুকানোর মতো আছেটা কি!?আর তাকে নিয়ে যেতে হবে কথাটাও ঠিক মাথায় ঢুকলোনা। থালায় ভাত তুলে দিতে দিতে কিশোয়ার কথাটা পাড়লো, ‘তোমার কি রাতে ঘুম হয় না? প্রায় দেখি জেগে বসে থাকো, আবার ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ো।’
বেনু মিয়ার চোখ যেনো জ্বলে উঠলো ।এই চাউনি কিশোয়ার চেনেনা।ভয়ে সিঁটিয়ে গেলো সে ।
ওর মুখ দেখে বেনুমিয়াঁর বোধহয় সামান্য পরিবর্তন হলো, আমি জেগে না থাকলে, তোমার পেটের বাচ্চা পাহারা দেবে কে?! বলেই কপাল কুঁচকে তাকালো কিশোয়ারের দিকে ।
এবার কিশোয়ার হতবাক । এই দিনের আলোতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। একি অদ্ভুত কথা!বেনু মিয়াঁ এসব বলে কি!বাচ্চা পাহারা দিতে হবে! কেন?
বেনু মিয়াঁ মুখ ধুয়ে উঠে পড়ে ।বিড়ির ধোঁয়ায়
গা গুলিয়ে ওঠে কিশোয়ারের।বমি করতে করতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, ঘোরের মধ্যেই মনে হয় বেনুমিয়াঁ কথা বলছে।কিশোয়ারের ঘুম ভাঙ্গলো সন্ধের পর।
বেনুমিয়াঁ স্থানুর মতো বসে আছে পায়ের কাছে।
তার হাতে একটা ছোট ধারালো বস্তু। কিশোয়ার উঠে বসে প্রথমে বোঝার চেষ্টা করলো বস্তুটা কি।তারপর তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো,ছুরি জাতীয় জিনিস,মাথাটা তীক্ষ্ম,সূঁচালো,চকচকে শরীরটা দেখেই ধার আন্দাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা।
আতঙ্কে গলা বুজে এলো,অতি কষ্টে আওয়াজ বেরোলো মুখ থেকে,কি করো?কাজে বের হওনি যে।
একটা মুরগি জবাই দেবো। বিপদ আপদ কেটে যাবে।
কিসের বিপদ?
সে তুমি বুঝবেনা।এই বাচ্চা জন্মানোর আগেই অনেক বিপদ ওকে নিয়ে। ওকে মেরে ফেলবে।
কে মেরে ফেলবে?এসব কি বলো?
বেনু মিয়াঁর চোখগুলো আবারো জ্বলে উঠলো। সেই একই অচেনা দৃষ্টি।
কিশোয়ার আতঙ্কে নীল হয়ে যাচ্ছে।দম বন্ধ হয়ে আসছে।মনে হচ্ছে,চারিদিক থেকে কিছু একটা ওকে চেপে ধরেছে শক্ত করে।শরীরটা অবশ হয়ে আসছে।
বর্ষা আসতে আর হয়ত দেরি নেই।বেনুমিয়াঁ শহরের দিকে কাজ পেয়েছে।এখন সারাদিন কিশোয়ার একা,মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই মনেহয় ঘরে কারো উপস্থিতি টের পাচ্ছে।তারপর নিজেকে নিজেই প্রবোধ দেয়,এসব কিছুনা।বেনুমিয়াঁর মায়ের কবরে আর যাওয়া হয়নি।এই অবস্থায় যাওয়া সম্ভব ও নয়।এক প্রবল বৃষ্টির দিনে একজন বুড়ো লোক এলো বেনুমিয়ার খোঁজে। ভরদুপুরেও তখন ভোরবেলার আলো।একা কিশোয়ার ভয়ে দরজা খুলবে কিনা সেটাই ভেবে পাচ্ছিলনা।কিন্তু এই দুরন্ত বৃষ্টি,বৃদ্ধ লোকটার প্রতি কেমন মায়া হলো, কিশোয়ার দরজা খুলে লোকটাকে ভালো করে দেখলো,চুল দাঁড়ি সমস্তই পাকা,পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর ঢোলা সাদা পাজামা,চোখে খুব মোটা কাচের চশমা।ভদ্রপরিবারের লোক বলেই ঠাহর হয় কিশোয়ারের।কি চাই?
আমি বেনু রে খুঁজছি গো মা। সে কি এই বাড়িতে থাকেনা?
তারপর কিশোয়ারের ঢাউস পেটের দিকে তাকিয়ে বলল,তোমারে বেশি কষ্ট দেবনা।আমি শুধু জানতে এসেছি,বেনু এইখানে থাকি কিনা।তাকে বলো,শমসের মিয়া তার খোঁজ করেছে।আমি তবে যাইগো।
কিশোয়ারের সন্দেহ জাগে।কোনোদিন বেনুমিয়াঁর খোঁজে তো কেউ আসেনা।
আপনি কে !ওর কাছে কি জন্যে।এই প্রশ্নটা করার আগেই,বৃদ্ধ উত্তর দিয়ে দিলেন,আমি তার জন্মদাতা।সে আমারে চেনেনা।কথাটা বলতে গিয়ে বৃদ্ধের গলা বুজে এলো।
কিশোয়ার আঁতকে উঠলো।এই লোক বেনুমিয়াঁর বাবা?এসব কি শুনছে সে, বেনুমিয়াঁর এই জগতে কেউ নেই সেটাই এতদিন জানতো।বেনুমিয়াঁ গ্রাম দেখাতেও নিয়ে গিয়েছিল।সত্যিটা কি? বেনুমিয়াঁ নিজেই তার জন্মদাতাকে চেনেনা?
লোকটা কিসের দাবি নিয়ে এসেছে এতদিন পরে?
কিন্তু কিশোয়ার নিজে খুব ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করছে।
কি মনে করে বুড়ো লোকটাকে ঘরে বসতে বললো,তারপর শুকনো গামছা হাতে দিতে দিতে বললো,আমি তার স্ত্রী,আপনার কথা আমারে বলতে পারেন।আমি জানিনা আপনি তার কে,কিন্তু সত্যি যদি তার জন্মদাতা হন,তাহলে সে আপনারে চিনবেনা কেনো?
বৃদ্ধ ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় নিলেও,বলতে শুরু করলেন,
আমার প্রথম বউ টুকটুকি। বেনুর মা। মাথার ঠিক ছিলনা। তবে বড় বাড়ির মেয়ে ছিল।বাপ মায়ের একমাত্র কন্যা। চেহারা ছবিও ভালো। আমার লোভ তারে আমার কাছে নিয়ে আসছিল। তাদের কন্যাকে মাথায় করে রাখবো সেই ভরসা দিয়ে বিয়ে করেছিলাম। ভরসা রাখতে পারিনি গো মা।
এমনি খুব ঠান্ডা ছিল,কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ পাগলের মতো কথা বলত। তাকে কেউ মারতে চায়।
একলা একলা কথা বলতো। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যেত। প্রথম প্রথম রাত বিরাতে খুব ভয় পেতাম,এরপরে বিরক্ত হতে শুরু করলাম। আমাদের প্রথম দুটো সন্তান বাঁচেনি। সেই থেকে অবস্থা আরো খারাপ হলো। তিন বারের বার পোয়াতি হওয়ার পর দেখতাম দিনরাত ভয় পায়,বিকারের মতো বিড়বিড় করে। তার সন্তানকে কেউ নিয়ে যাবে,এই ভয়ে কাঁপে। কেমন জানি ঘোরের মধ্যে চলে গেলো। আমিও রাগে দুঃখে আর পেটেরটার কথা ভেবে তারে আটকে রাখলাম ঘরে।
তখন আমার মাথা ঠিক নাই,লোভের বসে শাদি করে কি পাপ করেছি,সেই চিন্তা আমারে ভেতরে ভেতরে খেয়ে ফেলছে।তারপরে শুরু করলাম বেপাড়ায় রাত কাটানো,অর্থের অভাব তখন নাই,অভাব অন্য জায়গায়। পড়লাম কুসংগে, আরেকখান শাদি করলাম। গরীব ঘরের মেয়ে। সে আসার পর বেণুর মা আরো ক্ষেপে গেলো। কাউরে তার কাছে যেতে দেয়না। যে বিকার হঠাৎ হঠাৎ আসতো সেটা সারা জন্য বাসা বাঁধলো। ভাবলাম এই সন্তানটাও বোধহয় বাঁচবেনা। বুদ্ধি দেবার লোকের তো অভাব নেই মা,ওঝা, ঝাড়ফুঁক, বদ্যি কম করিনি।
শেষে ছেলেটা জন্মাল আর টুকটুকির জায়গা হলো গোয়ালঘরে। ছেলে থাকে আমার সাথে,নতুন বউ তারে দেখভাল করে।বউরে তখন চেনা যায়না,পরনে কাপড় ঠিক নাই,চেহারা ভেঙে গেছে। সেবছর প্রবল শীতে সে ওই গোয়ালেই পড়ে ছিলো,তারপর কি হলো,একদিন ছেলে আর মা রে খুঁজে পাইনা।
বলতে বলতে বৃদ্ধ কেঁদে ফেললো।
কিশোয়ার এতখন নিঃশ্বাস ফেলেনি সেটা বুঝতেই পারেনি,বৃদ্ধের কান্নায় হুঁশ ফিরল ।হাতের কাছেই জগ আর গ্লাস ছিল,জল ঢেলে দিলো বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ খানিকক্ষন ঝিম মেরে বসে রইলো,তারপর আবার বলল,অনেক খুঁজেছি মা গো,ছেলেটার জন্যে কষ্ট পেতাম।কিন্তু যার ছেলে সেই নিয়ে গেছে সবেই এই বুঝ দিলো।আমিও বছরভর খুঁজে ক্লান্ত হয়ে থামলাম। কয়েকমাস আগে আমার দ্বিতীয় বউ বিগত হয়েছে।ওর ঘরে আমার দুই সন্তান হয়েছিল,ছেলে,বাঁচে নাই!মরার আগে সে আমারে সকল সত্যি বলে গেছে,বেনুরে সে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল,ওই দাপুটে শীতের রাত,গ্রামে তখন যাত্রাপালা চলছে,সবেই সেইখানে।নতুন বউ তখন সবে পোয়াতী হয়েছে,কিন্তু আমারে বলে নাই।সে চেয়েছিল বেণুরে সরিয়ে সম্পত্তির কাঁটা তুলে ফেলবে।কিন্তু ওপরে একজন আছেন,তিনি আমাদের দুই জনারেই চরম শাস্তি দিয়েছেন।আজ কতদিন ধরে খুঁজতেছি তোমাদের,বউয়ের কবরের সন্ধান পেয়েছি।আমি এইসব ঘটনা কিছুই জানতাম না,আল্লাহ কসম।তবে এখন মনেহয় সন্তানহারা হওয়ার শোক আমারে দেয়াই ওপরওয়ালার ইচ্ছা ছিল।যে গুনাহ করেছি,তার কোনো মাফি হবেনা গো মা।
বৃদ্ধ আবারো কেঁদে ফেললেন,কাঁদতে কাঁদতেই উঠে দাঁড়ালেন।তখন বিকাল প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছে।আসরের নামাজের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে।
কিশোয়ার বৃদ্ধকে প্রশ্ন করলো, আপনার গ্রামের নামটা..!?
সেকলিগঞ্জ ।
কিশোয়ার গিয়েছিলো সেখানে।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় অদ্ভুতভাবে বৃদ্ধ তার মাথায় হাত রাখে।আল্লাহ যেন তোমার সন্তানের হায়াত দেন।
কিশোয়ার চমকে ওঠে,লোকটা এমন দোয়া করলো কেনো?
রাতে বেনুমিয়াঁকে কথাগুলো বলার জন্যে খুব উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলো কিশোয়ার।
কিন্তু মানুষটা যখন ঘরে ঢুকলো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে।ভিজে চুপসে গেছে বেনুমিয়াঁ।চোখগুলো লাল হয়ে গেছে।হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই কিশোয়ারের সারা গায়ে হাত বুলাতে থাকে।
কিছু হয়নি তো তোমার?কে এসেছিলো।
কিশোয়ারের হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। বেনুমিয়ার তো এসব জানার কথা না।এরকম পাগলের মত করছে কেনো?
কি হয়েছে তোমার?ঠান্ডা হয়ে বসো।আমার কথা শোন।
কিন্তু বেনুমিয়াঁ শান্ত হয়না।তোমাকে একা রেখে যাওয়াই আমার উচিত হয়না।আমি কাজ ছেড়ে দেবো।তোমার সাথে থাকবো আজ থেকে।
কিশোয়ার একটু দম নিয়ে নেয়। বেনুমিয়াঁকে ধীরেসুস্থে বোঝাতে হবে।
আজ তোমার আব্বা এসেছিলেন। শমসের মিয়া। বাড়ি সেকলিগঞ্জ। তোমার মায়ের কবর জিয়ারত করে এসেছেন।
বেনু মিয়াঁ যেনো মুহূর্তের জন্য ছিটকে গেলো দূরে।তারপর রক্তাভ চোখ তুলে বললো, আমার এই দুনিয়াতে কেউ নাই,তুমি জাননা?
তাই তো জানতাম,কিন্তু উনি যে তোমার সবকিছু জানেন।একই গ্রাম থেকে আসছেন।তুমি একবার গ্রামে যাও। গিয়ে দেখো ঘটনা সত্য কিনা। তারপরে নাহয়…!
আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা।এই বাচ্চাটা কে মেরে ফেলার জন্যে এসব গল্প সাজাচ্ছে। তুমি একদম ভয় পাবেনা,আমি ব্যবস্থা করবো।
কে মেরে ফেলবে,আমারে বলো এই বাচ্চা কে মেরে ফেলবে?
তুমি জাননা, ওরা নিয়ে যাবে,এই বাচ্চা নিয়ে যাবে। বেনুমিয়াঁ হাত পা ছুঁড়তে লাগল।যেনো অদৃশ্য কিছুর সাথে তার লড়াই।
এরপর ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়লো।
কিশোয়ার নিজেও বেশ ক্লান্ত,তার ওপর মানসিক চাপ কিছু কম যায়নি। শরীরও এতটা ধকল নেবার অবস্থায় নেই, কিশোয়ার শুয়ে পড়ে,আর তখুনি একটা তীব্র আতরের গন্ধ ওর চেতনা আচ্ছন্ন করে।
পরদিন সকালে বেনুমিয়াঁ একরকম জোর করেই কিশোয়ারকে তৈরি করিয়ে মায়ের কবর জিয়ারত করতে নিয়ে যায়। বর্ষার জঙ্গলে সাপখোপের ভয়,কাদা মিলিয়ে কিশোয়ার চলতে পারছেনা। বেনুমিয়া কি এক ঘোরের মধ্যে চলেছে।কবরের কাছাকাছি পৌঁছে কিশোয়ার দেখলো এই বৃষ্টিতেও একদম পরিচ্ছন্ন চারপাশ। যেন রোজ সাফ করা হয়। তাহলে ওর আশঙ্কাই সত্যি। বেনুমিয়াঁ এখানে রোজ আসে। কখন আসে?
জিয়ারত করার পর বেনুমিয়াঁকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিশোয়ার প্রশ্ন করে, গ্রামে যাবেনা?কষ্ট করে এলাম যখন গ্রামে একবার খোঁজ করলে হতোনা?
বেনুমিয়াঁ কেমন একটা জড়ানো গলায় বলে ওঠে,মা আমার সাথে কথা বলে নাই কোনোদিন।বেঁচে থাকতে শুধু তারে হাসতে দেখেছি।আমার আর কেউ নাই। এই বাচ্চাটাকেও সেই বাঁচাবে, তার হাসি আমি শুনতে পেয়েছি।
কিশোয়ারের মনে হলো পৃথিবীটা দুলে উঠছে,বেনু মিয়া এসব বলে কি!?চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আসে, জ্ঞান হারাচ্ছে সে।
জ্ঞান ফিরলো সেকলিগঞ্জের বাড়িতে।
কিশোয়ার প্রথমে জায়গাটা ঠাহর করতে পারেনি,শমসের মিয়ার উপস্থিতিতে কিছুটা আন্দাজ পেলো।বেনু মিয়াঁ পাশে বসে আছে,চেহারা দেখেই আন্দাজ করা যায় সে উদ্বিগ্ন।শমসের মিয়া তসবি হাতে পায়চারি করছিলেন ঘরে,এবার তার মাথার কাছে এসে কিছু বলে ফুঁ দিলেন আর তখনই বেনু মিয়াঁ রেগে গিয়ে তাকে জোরে ধাক্কা দিলো।আকস্মিক ধাক্কায় টাল সামলাতে পারলেন না বৃদ্ধ।ছিটকে পড়লেন খানিকটা দূরে। কিশোয়ার ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।আল্লাহ!!!
শমসের মিয়া কোনোমতে আঘাত সামলে নিয়েছেন,তার হাতের কনুই থেকে রক্ত পড়ছে,বেনু মিয়াঁ কিশোয়ারকে জড়িয়ে ধরে আছে, কিশোয়ার ছাড়াতে চাইছে কিন্তু পেরে উঠছে না।গুমরে কেঁদে উঠলো,তখনই মাথায় চেনা হাতের স্পর্শ টের পেলো,চোখ মেলে দেখলো পাশে বসে আছে বেনু মিয়াঁ।শমসের মিয়া কে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো।কিন্তু কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লোনা।তাহলে কি স্বপ্ন দেখছিলো?কিন্তু এই বাড়ি এই ঘরটাই অবিকল দেখতে পাচ্ছিলো।ভুলটা কোথায় হচ্ছে?!
কিশোয়ারের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দরকার।সে নিজেই বুঝতে পারছে কিন্তু এরা মনেহয় বুঝতে পারছেনা। সে ধীরে ধীরে উঠে বসলো বিছানায়,বেনু মিয়া জল এগিয়ে দিলো।একবার পেটে হাত বুলিয়ে দিলো। দূরে মাগরিবের আযান হচ্ছে বোধহয়। কিশোয়ার মাথায় কাপড় জড়ালো। শমসের মিয়া বেরিয়ে গেলেন,নামাজ পড়বেন হয়তো।বেনু মিয়াঁকে অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছে, কিশোয়ারের চেনা বেনুমিয়া।পৃথিবীতে তার একমাত্র আপনার জন।দুজনের চোখাচোখি হতেই হাসলো বেনুমিয়াঁ।সেই পুরানো মায়া, কিশোয়ারের খুব কান্না পাচ্ছে।
সব এমন পাল্টে যাচ্ছে কেনো?
পরদিন সকালে শমসের মিয়া কিশোয়ারকে নিয়ে তাদের বাড়ি দেখাতে বেরোলেন।ঘুরতে ঘুরতে ওরা একটা জায়গায় থামলো,সামনে পুকুর,চারপাশ বাঁধানো,বেশ পরিষ্কার জল।
দেখেই ডুব দিতে ইচ্ছা করে।
শমসের মিয়া কোনো ভনিতা না করেই বললেন,
এই পুকুরেই বেনুকে ফেলে দিয়েছিলো তার সৎ মা।
টুকটুকি ঘটনাটা গোয়াল ঘর থেকে দেখতে পায়। পাগল ছিলো কিন্তু ছেলের বিপদ ঠিকই টের পেয়েছিলো। পুকুরে ডোবা ছেলের জান বাঁচিয়ে সে পালিয়ে যায়। তারপর আমার দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে, এই পুকুরেই ডুবে মারা যায়। তোমাকে বলতে পারলাম।কিন্তু এই কথা বেনু জানবেনা,কারণ তাকে আমি বলতে পারবোনা।তুমি তার সন্তানের মা,খোদা তোমারে দেখবেন।বেনু তার মায়ের মত হাবভাব ধরেছে। আমি কাল রাতে জেগেই ছিলাম,তোমার শরীর খারাপ বলে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেছি। আল্লাহর দরবারে সবেরেই জায়গা দিবেন।আমি পাপী,আমার দোয়া কবুল হবে কিনা জানিনা,তবে আমি তোমার জন্য অন্তর থেকে দোয়া দিলাম মাগো।বৃদ্ধের চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে।
কিশোয়ার স্থবির।এতদিন যেই আশঙ্কা তার মনে ছিলো,আজ সেটার সত্যি হবার সম্ভাবনা ওকে বাকরুদ্ধ করে দিলো।বেনু মিয়াঁ পাগল হয়ে যাচ্ছে?নাকি হয়ে গেছে?এখন তাহলে কি করবে কিশোয়ার?ভাবনার কোনো তল পেলনা সে।পুকুরের দিকে স্থির তাকিয়ে রইলো। তখুনি বেনু মিয়াঁ প্রায় ছুটে এসে কিশোয়ারকে টেনে নিয়ে চললো। শমসের মিয়া প্রতিবাদ করতে পারলেন না। পুকুরের ধারে বসে পড়লেন।
ওইখানে গেছো কেনো?ওই বুড়োর সাথে কথা বলবেনা।আমরা এখনই বাড়ি যাবো ।
জেদ আর আতঙ্ক মিশে আছে বেনু মিয়াঁর গলায়।
ওরা ফিরে গেলো।
প্রসবের দিন এগিয়ে আসছে কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে কিছুতেই কিশোয়ারকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইছেনা বেনু মিয়াঁ। জোর করে যেতে হয়। ডাক্তার বলেছেন এখন যে কোনোদিন প্রসব হতে পারে। একেকটা পা ফেলতেও কিশোয়ারের এখন কষ্ট হয়।বেনু মিয়াঁ রাতে ঘুমায়না।
শমসের বেনু আর কিশোয়ারকে বাড়ি নিয়ে যেতে চান নিজের কাছে। বেনু মিয়াঁ রাজি নয়।
তার মা নাকি চায় না। এসব কথায় কিশোয়ারের গায়ে কাঁটা দেয়। বেনু মিয়াঁ কথার উত্তর দেয় না,শুধু হাসে। কিশোয়ারের অস্বস্তি বাড়ে।
কোনো প্রশ্নের জবাব নেই।
বেনু মিয়াঁ তাকে চোখের আড়াল করেনা।
ঘোলা চোখে সারারাত নেশাগ্রস্তের মতো ঝিমিয়ে থাকে,মাঝে মাঝে চমকে ছুটে আসে কিশোয়ারের
কাছে, পেটে হাত রাখে,ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিবর্ণ হাসি।
বেনুমিয়াঁর মেয়ে জন্মালো আকাশভাঙা বৃষ্টি নিয়ে। মেয়ে নিয়ে তার অপার্থিব উল্লাস ।
মায়ের কবরে যাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই ওরা গেলো সেখানে। কিশোয়ারের শরীর সারেনি এখনও,বেনু মিয়াঁর সাথে সমান তালে পা ফেলতে পারছেনা।বেনুমিয়াঁ বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।
কিশোয়ার যখন ওদের পেছন পেছন কবরে পৌঁছালো তখন তাদের মেয়ে কবরের ওপর শুয়ে আছে। কিশোয়ার প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিলো তাকে, দুই দিনের শিশুকে তুমি এইখানে নামাতে পারলে?
বেনুমিয়াঁ অপ্রকৃতিস্হের মত হাসছে।
দাও না,আমার পাগলি মা কোলে নেবে। চাইছে যে। দাও দাও,ওকে আমার মায়ের কোলে দাও।
কিশোয়ার একটা আতরের গন্ধ পাচ্ছে,কিন্তু জ্ঞান হারালে চলবেনা, এখান থেকে তাকে পালাতে হবে।অন্তত এই মেয়ের জন্য।
একটু একটু করে পেছোতে শুরু করলো সে।বেনুমিয়াঁ তখনো হেসে চলেছে। কিশোয়ার শুনতে পাচ্ছে। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এবার প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে । কোথায় যাচ্ছে জানেনা, শুধু জানে দূরে চলে যেতে হবে।
সমাপ্ত
(এই গল্পের সমস্ত চরিত্র ও ভৌগোলিক অবস্থান কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোনো যোগ নেই আর থাকলেও সেটা কাকতালীয়)
চিত্র: Pinterest.com
পিয়াল দাস গল্পBAGISH এর সহ রচনাকার ও সম্পাদিকা
©2019 WWW.GOLPOBA-GISH.COM. ALL RIGHTS RESERVED

Awesome
LikeLike