রচনাঃ শান্তনব রায়
১
ভোর রাত থেকেই আবার তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া ফোরকাস্টে বলেছিল আগামীকাল বৃষ্টি কমে যাবে কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে এই বৃষ্টি সহজে থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। গত দু’দিন ধরে অকালবর্ষণ। মাঝরাতে পৃথার ঘরের জানলাটা ঝোড়ো হাওয়ায় খুলে গেছিলো। জলের ছাঁট ঢুকে বিছানার অনেকটা অংশ ভিজিয়ে দিয়েছে। ইশ! ঘুমের মধ্যে খেয়ালই করেনি। অবশ্য ঘুমাবার বেশী সুযোগও পায়নি। অনেক রাত অবধি ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশন নিয়ে কাজ করেছে।
এতদিন পর খুবই অপ্রত্যাশিত ভাবে অথচ একদম ঠিক সময়ে এই ক্লায়েন্ট মিটিংটার সুযোগ এসেছে। একেবারে কোম্পানির মালিক নিজে দেখা করতে চেয়েছেন। ডিল সফল হলে পৃথার বিজ্ঞাপন সংস্থার সামনে বড় রকমের কাজ আসার সুযোগ তৈরি হবে। ব্যবসায় দীর্ঘ সময় ধরে যে ভাঁটা পড়েছিল সেখান থেকে মুক্তি! গতকালকে অভিজিত আর নোয়েলের সঙ্গে বসে সমস্ত পরিকল্পনা হয়ে গেছে। মক্কেলের সামনে কিভাবে, কি প্রেজেন্টেশন দেবে, মক্কেলের কাছ থেকে সম্ভাব্য কি কি প্রশ্ন আসতে পারে ওদের বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রেডিবিলিটি নিয়ে, এই সমস্ত প্ল্যান করা হয়ে গেছে পৃথার।
বিছানা ছেড়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসে বাইরের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করলো পৃথা। প্রবল জোরে বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎও চমকালো দু একবার। ঘরে ঢুকে আবহাওয়া দপ্তরের ওয়েবসাইট খুলে, স্যাটেলাইট থ্রিডি ইমেজ দেখল। বেশ বড় রকম মেঘ ছেয়ে আছে। তাহলে কি যাওয়া ক্যানসেল করবে? অসম্ভব সে প্রশ্নই ওঠে না! যেভাবেই হোক এই ডিলটা ব্রেক করতেই হবে। বৃষ্টি পড়ুক বা পৃথিবী রসাতলে যাক।
ফোনটা তুলে নিয়ে সবার আগে ড্রাইভার শঙ্করদাকে কল করলো। ও না এলেই কেলেঙ্কারী হবে। কিছুক্ষণ ফোন বাজার পর ওপার থেকে শঙ্করদা ফোন তুললো
হ্যালো ম্যাডাম!
শঙ্করদা তুমি বেরিয়েছো ?পৃথা উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলো।
এই বেরোবো, বৃষ্টিটা একটু ধরার অপেক্ষা করতেছি,ওপার থেকে শঙ্কর উত্তর দেয়।
শোনো, বৃষ্টি তাড়াতাড়ি ধরবে বলে মনে হচ্ছে না কিন্তু আমাদের সময় মতন পৌঁছতেই হবে। অনেকটা রাস্তা। এই বৃষ্টিতে বেশি জোরে গাড়িও চালাতে পারবে না। তাই একটু আগেই বেরোনো ভালো। তুমি রওনা হও। আমি নোয়েলকে ফোন করে দিচ্ছি। বলছি তৈরি থাকতে। ওকে তুলে নিয়ে সোজা আমার এখানে চলে আসবে। বুঝলে?
শঙ্করদা পৃথার কথায় একটু কিন্তু কিন্তু করে তারপর রাজী হলো। শঙ্করদার ফোনটা শেষ হতেই দেখলো নোয়েলের টেক্সট ঢুকেছে।
কি বস? এতো পুরো অ্যাপোক্যালিপ্স! কি প্ল্যান!?
পৃথা লিখল, প্ল্যান যা ছিল তাই আছে। তুই তৈরি থাক। শঙ্করদা আসছে তুকে তুলতে।
ওর মেসেজটা যেতেই নোয়েল ফোন করল।
আর ইউ সিওর ইউ ওয়ান্ট টু গো?
অফ কোর্স, কেন?
না বাইরে যা অবস্থা…!
সো হোয়াট? কম্পানির মালিক নিজে দেখা করতে চেয়েছেন। এই সুযোগটা কেউ ছাড়ে নাকি! তাছাড়া আমাদের এজেন্সির ফিউচারটা নিয়েও তো ভাবতে হবে।
হুমম..খবরে দেখলাম রাজ্যের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। অনেক গ্রামই নাকি অলরেডি ফ্লাডেড, ওয়াটারলগ্ড। বৃষ্টি এরকম চলতে থাকলে রাস্তায় যদি আটকে যাই!?
আই ডোন্ট থিঙ্ক সো। অতটা চিন্তার কিছু নেই।মেজর ট্রান্সপোর্ট করিডরগুলো এখনো কোনোটাই বন্ধ হয়নি। পৃথা নোয়েলের কথা মানতে নারাজ।
সে বুঝলাম কিন্তু রাস্তায় যদি আটকে যাই? নোয়েল একটু দ্বিধায়।
শোন,আমি শঙ্করদাকে বলে দিয়েছি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। আমরা যদি হাতে একটু সময় নিয়ে বেরোই তাহলে রাস্তায় দেরী হলেও পৌঁছে যাব। তুই তৈরি থাক,পৃথা নোয়েলকে আশ্বাস দিলো।
নোয়েল শুকনো মুখে একটু ইয়ার্কি মারার চেষ্টা করলো,
বলছিলাম যে গাড়ি না বলে একটা স্পিডবোট ভাড়া করলে ভালো হতো,তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতাম।
উফফ্ বাজে না বকে তাড়াতাড়ি আয়,
পৃথা ফোন রেখে দিলো।
ওদের গাড়ীটা শহরের রাস্তা ছাড়িয়ে যখন মানসপুর যাওয়ার হাইওয়েতে উঠলো তখন ঘড়িতে সাতটা। বৃষ্টির তীব্রতা একটু যেন কম মনে হচ্ছে।বেশ আশাজনক। চারিদিক ভিজে একসা। রাস্তাগুলি জলে সপসপ করছে। গাড়ির ওয়াইপারটা সমানে ডানদিক বাঁদিক করে চলেছে। ভেজা রাস্তার উপর গাড়ির টায়ারের দ্রুত ও ক্রমাগত ঘূর্ণির ফলে অনবরত ছপছপ করে জল কাটার একটা আওয়াজ বেরোচ্ছে। উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে হেডলাইট জ্বালিয়ে কিন্তু জানলার কাঁচে ক্রমাগত জল গড়িয়ে পড়ার জন্য সেগুলোকে ঝাপসা দেখাচ্ছে। বাইরের আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা কিন্তু এসি না চালিয়ে উপায় নেই। কাঁচ বন্ধ রাখতে হচ্ছে বৃষ্টির ছাঁট এড়াতে। পৃথার বেশ শীত করছিলো।
এসিটা একদম কমিয়ে দাও শঙ্করদা,
বলে ব্যাগের ভিতর থেকে পাতলা একটা চাদর বার করে গায়ে জড়িয়ে নিল পৃথা ।
গাড়ি চালাতে চালাতে শঙ্করদা সমানে কথা বলে যাচ্ছে। কথা না বলে বেশীক্ষণ থাকতে পারে না। কিছুদিন আগে ওর নাতির অন্নপ্রাশন গেছে। অনুষ্ঠানে কি মেনু হয়েছিল, তার জোগাড়যন্ত্রে কত টাকা খরচা হয়েছে তার হিসেব থেকে শুরু করে গল্পে চলে আসে এই রকম বৃষ্টি শেষ কোন সালে হয়েছিল, তাতে বন্যায় ভেসেছিল গোটা রাজ্য। তখন নাকি ওরা অনেক ছোট। তিন চারদিন বাড়ির ভিতরে আটকা পড়েছিল সবাই। সমস্ত সরবরাহ বন্ধ ছিল, খাবার দাবার আসতে পারেনি। আরও অনেক বৃত্তান্ত। শঙ্করদা গল্পের খনি। পৃথার ইচ্ছা আছে যদি কোনদিন লেখিকা হওয়ার স্বপ্নটাকে আরেকবার ঝালিয়ে দেখতে চায় তখন শঙ্করদার কাছ থেকেই গল্প সংগ্রহ করবে।
নোয়েল যথারীতি সিটে গা-এলিয়ে ঘুমোচ্ছে। অদ্ভুত ক্ষমতা ওর। গাড়ি চলতে শুরু করলেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে।ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, কোনোটাতেই কোনো সমস্যা হয় বলে মনে হয় না। তার ওপর আজকে আবার ভোরবেলা বেরোতে হয়েছে। সুতরাং এখন প্রায় দশ পনেরো মিনিট ও মৃত অবস্থায় থাকবে।
পৃথা একমনে ল্যাপটপ খুলে, দেখা হোমওয়ার্ক কেই আবার ঝালিয়ে নিচ্ছিল। ওর মক্কেলের ব্যবসার ইতিহাস বেশীদিনের নয় কিন্তু এর মধ্যেই ভালো পসার হয়েছে কোম্পানির। বিদেশেও জিনিস রপ্তানি করছে ইদানিং। কিন্তু সেই তুলনায় বিজ্ঞাপনী প্রচার একেবারেই কম। কোনো প্রচার পদ্ধতির ঠিক নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতেও কোনো জুতসই উপস্থিতি নেই। এতদিন অবধি এরা প্রচারবিমুখই ছিল বলা যায় তবে ফোনে ওদের নতুন পি.আর মিঃ ভবেশ দত্তগুপ্তের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে যে বিজ্ঞাপনী প্রচার সম্পর্কে এবার একটু সচেতন হতে চাইছে কোম্পানি। মালিক স্বয়ং এই ব্যাপারে উৎসাহ দেখিয়েছেন। পৃথার লক্ষ্য হচ্ছে গোটা বছরের জন্য এদের বিজ্ঞাপনের কন্ট্রাক্টটা নিজেদের ঝুলিতে পুরে ফেলা।
বৃষ্টিটা আবার বাড়ছে। সামনের উইন্ডস্ক্রীনের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে দূরের আকাশটা। ভার সামলাতে না পেরে হাইওয়ের উপর ঝুলে পড়েছে। বৃষ্টির ধোঁয়াশা আবরণের মধ্যে হাইওয়েটা অনেকটাই মিলিয়ে রয়েছে। গাড়ি যেটুকু রাস্তা এগোচ্ছে অবয়বটা কিছুটা ধরা পড়ছে। আবার বাকিটা মিশে যাচ্ছে অস্বচ্ছতায়। ওদিকে বেশ একটা মধ্যম লয়ে নোয়েলের নাক ডাকছে।
সামনে একটা টোল বুথ। এই রাস্তার ট্রাফিকের হিসেবে গাড়ির লাইন অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক কম আজকে। ওদের গাড়িটা যখন বুথের সামনে এলো ভিতরে কোনো কর্মীকে দেখা গেল না। হর্ন বাজাতেও কেউ সাড়া দিলো না।
শঙ্করদা গজগজ করে বললো
কিরে ভাই সব ভোঁ ভা দেখছি!
বার কতক হর্ন বাজাবার পর টোল বুথের অফিসঘরের মধ্যে থেকে ছাতা মাথায় দৌড়তে দৌড়তে একজন কর্মী বেরিয়ে এলো।
আসছি আসছি! হর্ন বাজিয়ে বাজিয়ে তো কানের ইয়ে মেরে দিলে! বিরক্ত হয়ে বলল লোকটা।
শঙ্করদা রসিকতা করে বলল
যেই বৃষ্টি নেমেছে অমনি গেট নামিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছো !?
উফ্ নারে বাবা! পেটটা বড্ড কনকন করছিল। সকাল থেকে এই নিয়ে তিনবার গেলাম!
লোকটার মুখের অবস্থাটা করুণ বেশ।
তাড়াতাড়ি টিকিট দাও! শঙ্করদা তাড়া লাগাল।
টিকিট প্রিন্ট করতে করতে লোকটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,যাচ্ছো কোন দিকে?
মানসপুরের রাস্তায়।
ওহ, ওই দিকে!
কেন, রাস্তা বন্ধ নাকি?
কে জানে! তবে অনেক গাড়ি তো ফিরে আসছে দেখছি। বলছে নাকি জল বাড়ছে ! লোকটা আবার নিজের কাজের পুনরাবৃত্তে ফিরে গেল।
জল বাড়ছে!
এতক্ষণ পুরো ব্যাপারটা নিয়ে পৃথা বেশ বিরক্ত হচ্ছিল। অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে! কিন্তু এই কথাটা শুনতেই মনের মধ্যে কোথাও একটা অস্বস্তির উদ্রেক হলো।
আসমানী ব্রিজের রাস্তা ক্লিয়ার আছে তো?
শঙ্করদা আবার লোকটাকে জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ হ্যাঁ.. ঠিকই থাকবে.. দাও আশি টাকা!
লোকটা হাত বাড়ায়। ওর কথার ভঙ্গিমার মধ্যে কোথাও একটা না বলা কথা রয়ে গেল যেন। টিকিটের পয়সার জন্য শঙ্করদা পিছনে তাকালো। পৃথা নিজের পার্স থেকে একটা একশ টাকার নোট বার করে এগিয়ে দিল। টোল টিকিট নিয়ে ওদের গাড়ি আবার রওনা হয়ে পড়লো আসমানী ব্রীজের দিকে। পৃথার মনে একটা আশঙ্কা দানা বাঁধছে কিন্তু সেটা সে বাইরে প্রকাশ করতে দিতে নারাজ।
নোয়েলটা এখনও ঘুমিয়েই যাচ্ছে। ভাবটা এরকম যেন গোটা পৃথিবীতে কী ঘটে চলেছে তাতে ওর কিছু যায় আসে না! এরা কিভাবে জীবনে উন্নতি করবে! পৃথা মনে মনে ভাবে। যদিও বিজ্ঞাপন এজেন্সির খুব মূল্যবান কর্মী নোয়েল। যে কোনোরকম আইডিয়ার ডিজাইন, প্রেজেন্টেশন বা বিজ্ঞাপনী চিত্রপট নিমেষের মধ্যে বানিয়ে ফেলতে ওর জুড়ি নেই। বছর তিনেক আগে স্বামীর মৃত্যুর পরে পৃথা যখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয় নিয়েছিল সেই সময় অভিজিৎ, নোয়েল, শ্রীতমার মতন সহকর্মীরা ওর পাশে না থাকলে হয়তো এজেন্সিটা কে দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তো। তাই রোজকার জীবনে ওদের এই ব্যাপারগুলোকে বেশি গায়ে মাখে না পৃথা।
বাব্বা এ তো দেখছি বিরাট লাইন!
শঙ্করদার কথায় পৃথা মুখ তুলে সামনে দেখল। অনেক মালবাহী ট্রাক, ছোট গাড়ি সামনে লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তা জ্যাম। সামনে আসমানী ব্রিজ।কিন্তু গাড়ির ভীড়ের আড়ালে দেখা যাচ্ছে না। অনেক গাড়ি আবার উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেরত চলে যাচ্ছে । কিছু পুলিশের লোকজন ছাতা হাতে আর বর্ষাতি পড়ে গাড়ি আটকাতে ব্যস্ত। বৃষ্টিতে সবাই নাজেহাল।
কি ব্যাপার দাদা?
পৃথা গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো। একজন পুলিশ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল,
কোনদিকে যাবেন?
মানসপুরের রাস্তা ধরব।
এদিকে যেতে পারবেন না। ব্রিজের উপর জল উঠে গেছে। ছোট গাড়ি পার হচ্ছে না। আপনারা গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। বলেই পুলিশটা সামনের ট্রাকের লাইন সামলাতে দৌড়ালো।
সত্যিই তো! অন্যান্য ছোট চারচাকার গাড়ি সামনে যেগুলো ছিল সেগুলো কোন মতে ডানদিক-বাঁদিক বেঁকেচুরে রিভার্স করে মুখ ঘোরাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে সব একে একে। কি জ্বালাতন! তাহলে ছোট গাড়ি যাবে কোন দিকে! এই চেঁচামেচিতে নোয়েলের ঘুম ভেঙে গেছে। সে উঠে বসে অবস্থাটা বুঝতে একটু সময় নিলো। নিজের ফোনটা পকেট থেকে বার করে ম্যাপ খুলে মন দিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ তারপর বললো
এক কাজ করো শঙ্করদা, তুমি গাড়ি ঘুরিয়ে নাও। এখান থেকে একটু পিছনে একটা তিনরাস্তার মোড় আছে, সেটা ঘুরে কুড়ি পঁচিশ কিলোমিটার দূরে রহিমগঞ্জের দিকে আরেকটা ছোট ব্রিজ আছে ওইটা দিয়ে বেরিয়ে যাই চলো।
হাতে এখনো সময় আছে।
নোয়েল ফোনে জিপিএস নেভিগেশন চালু করেছে। ও এইসব ব্যাপারে বেশ তৎপর। শঙ্করদা কিছুক্ষণ নিজেই কিসব বিড়বিড় করছিলো,পৃথা ধমক লাগাতেই আর বেশী সময় নষ্ট না করে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে নিলো। বৃষ্টিটা বাড়ছে, মুষলধারে ছেয়ে ফেলেছে বাইরের পরিবেশ।
ঘড়িতে ন’টা বেজে গেল। দিন বোঝার উপায় নেই। রহিমগঞ্জের দিকে পুরোনো বড় রাস্তাটা বেশ খারাপ,দেখভাল প্রায় হয়না বলতে গেলে। জায়গায় জায়গায় ক্ষতবিক্ষত, ভাঙাচোরা রাস্তা। তার উপর বৃষ্টির জল জমে গেছে। ভালো করে ঠাহর করা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন গর্তে পড়ছে গাড়িটা। ঝাঁকুনি লাগছে। নোয়েল শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে একবার পৃথার গায়ে এসে পড়েছে, একবার গাড়ির ছাতে মাথা ঠুকেছে।
পৃথার ফোনটা বেজে উঠলো। নম্বরটা লক্ষ্য করতেই বুঝল পাবলিক রিলেশন অফিসার
ফোন করছে।
গুড মর্নিং মিস্টার দত্তগুপ্ত।
গুড মর্নিং, আপনারা আসছেন তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই, অন দ্যা ওয়ে।
আচ্ছা বলছিলাম একটা ছোট চেঞ্জ হয়েছে।
হ্যাঁ বলুন.. পৃথা একটু ভুরু তোলে।
মিটিংটা বারোটা থেকে পিছিয়ে ধরুন একটা নাগাদ করতে হবে। স্যারের ফ্যাক্টরিতে একটা কাজ পড়ে গেছে সেই কারণে ঘন্টাখানেক দেরী হচ্ছে। আপনাদের কোনো অসুবিধা হবেনা। এখানে পৌঁছে আমাদের কোম্পানি গেস্ট হাউসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে নিতে পারেন। সব ব্যবস্থা করা আছে। মিঃ দত্তগুপ্ত আশ্বাস দিলেন।
ওকে স্যার নো প্রব্লেম, অনেক ধন্যবাদ।
যাক বাবা! পৃথা মনে মনে ভাবলো। দেরী হওয়ার আশঙ্কা করছিল এবার হাতে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। নোয়েলকে খবরটা দিতেই ওর মুখে একটু হাসি।
তাহলে আমরা আগে লাঞ্চটা সেরে নিতে পারব কি বল!?
তোর এখনই লাঞ্চের চিন্তা! আগে পৌঁছতে দে। পৃথা চোখ বড়বড় করে।
শঙ্করদা হঠাৎ রাস্তার ডানদিক ঘেঁষে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে দিল। পৃথা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
কি হল শঙ্করদা?
ওহ বাবারে! অনেকক্ষণ ধরে চেপে আছি।
এই রাস্তায় যা ঝাঁকুনি তাতে আর বেশীক্ষণ থাকতে পারবো না। দু’মিনিট বসো আমি চট করে সেরে আসি।
এই বৃষ্টির মধ্যে কি করে যাবে?
চিন্তা নেই সঙ্গে ছাতা আছে তো।
শঙ্করদা তড়িঘড়ি ছাতা নিয়ে দরজা খুলে ছুটল। বাইরে প্রবল বৃষ্টির ছাঁট ওই অল্পক্ষণের মধ্যেই গাড়ির সামনের সিট অনেকটা ভিজিয়ে দিয়েছে।
নোয়েল বিড়বিড় করল,
খিদে খিদে পাচ্ছে, ভালো করে ব্রেকফাস্ট করে বের হতে পারলাম না।
এখন খাই খাই করিসনা প্লিজ! আগে ব্রিজটা পেরিয়ে যাই তারপর দেখা যাবে। পৃথা অনুনয় করে নোয়েলকে।
আর কতদূর দেখাচ্ছে?
সামনেই আছে, একটা মোড় নিলেই রহিমগঞ্জের ছোট ব্রীজ।
নোয়েল একটা হাই তুলে জলের বোতল থেকে জল খেল। নিজের ব্যাগ থেকে রাবার ব্যান্ড বাঁধা একটা বাসি কুকিজের খোলা প্যাকেট বার করে দু-টুকরো মুখে পুরলো। পৃথা একটা তুলে মুখে দিতেই বুঝলো মিইয়ে গেছে। বাসি কুকিজ চিবিয়ে নোয়েল আবার এক ঢোক জল খেল তারপর বলল,এ যা অবস্থা তাতে কোনো চায়ের দোকান টোকানও খোলা পাবো বলে মনে হয় না।
পৃথা নিজের জানলার কাঁচ একটু নামিয়ে বাইরে তাকাবার চেষ্টা করে একবার। তুমুল বৃষ্টি পড়ছে তার সঙ্গে উথাল পাথাল হওয়া। বৃষ্টির ছাঁটে দূরে ভালো করে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। একটা ঘোলাটে ঝাপসা চাদর যেন সমস্ত দৃশ্যপটকে ঢেকে ফেলেছে।যতদূর মনে হলো গ্রামের বাইরের রাস্তায় ওরা দাঁড়িয়ে । গাড়িতে জল ঢুকছে। জলটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। মুখে এসে লাগতেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। পৃথা কাঁচ তুলে দিল।
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিস!
কি?
একটু আগেও আমাদের আশেপাশে দু একটা গাড়ি যেতে দেখছিলাম কিন্তু এখন আর কোনো গাড়ি নেই! আসমানী ব্রীজের রাস্তা বন্ধ থাকলে এদিক দিয়েই তো বেশিরভাগ গাড়ি যাওয়ার কথা তাই না!
নোয়েল কোনো সাড়া দেয়না।
তুই ঠিকঠাক নেভিগেট করছিস তো? ওই আগের মোড়টা থেকে আমরা ঠিক দিকে এলাম? পৃথার মনে সন্দেহ ।
হ্যাঁ রে বাবা এখনও অব্দি ঠিকঠাকই এসেছি, এই দ্যাখ! বলে নোয়েল পৃথার সামনে ফোনের ভিতর খোলা ম্যাপটা তুলে ধরল।
ম্যাপে ওদের অবস্থান যেখানে দেখা যাচ্ছে তার থেকে আরও একটু এগোলেই একটা বাঁক পড়ার কথা আর তার পরেই নদী। নদীর উপর দিয়ে একটা ব্রীজের রাস্তার চিহ্নও আছে এটা স্পষ্ট। পৃথা তাও একটু অনিশ্চিত।
কিন্তু এই রাস্তাটা দিয়ে গাড়ি যায় কিনা সেটা তুই জানিস?
নোয়েল এবার নির্লিপ্ত হয়ে বললো
নাহ্, তা জানি না। তবে ব্রিজের মতন কিছু থাকলে ওপারে নিশ্চয়ই যাওয়া যাবে।
বলেই আবার সিটে গা এলিয়ে দিলো।
পৃথা প্রত্যুত্তরে আরো রেগে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে সামনে এগোনো ছাড়া আর উপায় নেই। ওরা অনেকটাই ঘুরপথে এসেছে ঠিকই তবে নদীটা পেরোতে পারলে আবার হাইওয়ে ধরে নিতে পারবে।
পাঁচ মিনিট অনেকক্ষণ হয়ে গেছে কিন্তু শঙ্করদা এখনও ফেরত আসেনি। অন্যের উপর ভরসা রেখে এরকম নিরুপায়, নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকা পৃথার মোটে পছন্দ নয়। জানলা খুলে আরেকবার মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করল। অসম্ভব। ভিজে যাচ্ছে পুরো। ফোনটা বার করে শঙ্করদার ফোন নাম্বারে ডায়াল করলো। ওদিকে রিং হতেই। সামনের সীটে ফোনটা বেজে উঠলো!
একি ব্যাপার!
ফোন ছাড়াই বেরিয়ে গেছে!
কোনো কান্ডজ্ঞান নেই!
এদিকে ওদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
নোয়েলটা ঘুমন্ত।
কিছু একটা করা দরকার।
আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পৃথা ব্যাগ থেকে নিজের রেইন জ্যাকেটটা বার করে পড়লো। হুডিটা মাথায় ভালো করে টেনে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই হিমশীতল জলের ছাঁট ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। জোরালো হাওয়ার দাপট। ঠেলা খেয়ে প্রথমে পিছিয়ে গেলেও কোন রকমে সাহসে ভর করে শঙ্করদা যেদিকে গেছে সেই দিকে এগিয়ে গেল পৃথা।
বৃষ্টির ছাঁট সূক্ষ্ম পিনের মতন এসে গায়ে লাগছে। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ মিশে গিয়ে আর কোনো আওয়াজ ভালো করে শোনা যাচ্ছে না। পৃথা এগোতে এগোতে বেশ জোর গলায় দু’বার ডাকলো।
শঙ্করদাআআআ!
শঙ্করদাআআ!!
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।
কত দূরে গেল লোকটা!?
এই দিকেই তো গেছিল বলে মনে হচ্ছে।
আরেকটু এগিয়ে দেখলে হয় কিন্তু বৃষ্টিতে এইভাবে কতটাই বা হাঁটবে ? বিদ্যুৎ-এর ঝলকানিও হচ্ছে থেকে থেকে। সামনে যতটা দেখা যায় তাতে মনে হচ্ছে অনেকটা রাস্তা জলের তলায় ঢেকে গেছে। দূরে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।
চিন্তা ছাপিয়ে পৃথার ভয় হল এবার। তা সত্ত্বেও বৃষ্টির ছাঁট সামলাতে সামলাতে এগিয়ে চললো। পাশ দিয়ে একটা বড় নালা চলে গেছে। সেটাকে অনুসরণ করল। কিন্তু বেশী দূর যেতে পারলোনা। বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কায় রাস্তার উপরে বিরাট একটা গাছ গোড়া সমেত উপড়ে পড়ে রয়েছে। একটু আগেই ওদের গাড়িটা এই রাস্তাটা দিয়ে পেরিয়েছে। তখনও গাছটা দাঁড়িয়েই ছিল। ভেজা মাটি আর ভার রাখতে পারেনি বোধহয়। রাস্তার প্রায় তিন চতুর্থাংশ আটকে দিয়ে গাছটা পড়ে আছে তেরছা ভাবে। মাটির সঙ্গে অকালে সম্পর্ক ছিঁড়ে যাওয়ায় শিকড়গুলি কেমন যেন ভেংচি কেটে তাকিয়ে। ডালপালাগুলো মাটিতে ছত্রাখান। জল-কাদা মেখে মুখ থুবড়ে পড়েছে গাছের মূল কান্ডটা আর ঠিক তার নিচেই শঙ্করদার দেহটা চাপা পড়ে রয়েছে!
কোমর থেকে পায়ের অংশটা বাইরে বেরিয়ে।
নীল রঙের প্যান্ট আর পায়ের জুতোটা কাদা আর রক্ত মাখা কিন্তু চেনা যাচ্ছে।
দেহটা নিথর, নিশ্চল।
পৃথার মুখ দিয়ে যে আর্তচিৎকারটা বেরিয়ে এসেছিল সেটা বৃষ্টির ছাঁট আর হাওয়ার ধাক্কায় কোথায় যেন ভেসে গেল। তার অনুরণন কোথাও শোনা গেল না। কোনোভাবে নিজেকে সামলালো। ভয়ার্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল এবার।
দৃশ্যটা মর্মান্তিক।
শঙ্করদার শরীরটাকে গাছের তলা থেকে বার করে আনার কোনো উপায় নেই। থেঁৎলে গেছে। রক্তের স্রোত ভারী হয়ে, গাছের নিচ থেকে বেরিয়ে এসে জলের সাথে মিশে বয়ে যাচ্ছে নালার দিকে।
পৃথা আর বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা। গাড়ির দিকে দ্রুত পায়ে ফিরে চললো।
ওর কান্নার জল আর বৃষ্টির জল মিলে মিশে যাচ্ছে গালে। স্নায়ুকে যতটা পারা যায় শক্ত রাখতে হবে নইলে আরও বিপদ। ঝোড়ো হাওয়া বাড়ছে। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে । মানুষ নিজের কৃতিত্বের চর্চা আর সৃষ্টির অহংকারে এতই মশগুল যে তার বাইরের পৃথিবীটাই যে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে সেটা তার চোখেই পড়েনা। দু’সপ্তাহ আগেও গরমে নাভিশ্বাস উঠছিল সবার। এখন এই বৃষ্টির জল এতটাই ঠান্ডা যে রেইন জ্যাকেট পরে থাকা সত্ত্বেও রীতিমতো কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
ড্রাইভারের সিটের দরজা খুলে বসে পৃথা গাড়ি স্টার্ট করল। নোয়েলের ঘুম ততক্ষণে ভেঙে গেছে।
কিরে শঙ্করদা কই?
পৃথা অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে সামনের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
জানিনা, নেভিগেট কর।
কিছু বুঝতে না পেরে নোয়েল বললো
দাঁড়া দাঁড়া! নেভিগেট করবো মানে শঙ্করদা কই গেল?
দেখতে পেলাম না! পৃথার গলায় একটা চাপা ভয়।
সেকি! কোথায় গেল এই দুর্যোগে? তুই প্লিজ গাড়ি ঘোরা।
সেটা সম্ভব নয়।
কেন!? নোয়েলের গলায় অবিশ্বাস।
ফিরে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই!
সেকি?
রাস্তাটা গাছ পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
কি বলছিস এসব!?
কথাটা শুনে নোয়েল আঁতকে উঠেছে।
অস্থির না হয়ে চুপ করে আমার পাশে বসে নেভিগেট কর। নাহলে ফোনটা দে আমি নিজেই করে নিচ্ছি। অলরেডি অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে!
পৃথা যতটা পারা যায় নিজের মধ্যে সাহস ফিরিয়ে আনছে।
তাই বলে মানুষটাকে আমরা একা ফেলে দিয়ে… নোয়েল একটা তীব্র প্রতিবাদ করতে গেল
এনাফ! শঙ্করদা ইজ্য ডেড! ইউ হিয়ার মি? হি ইজ ডেড! দ্যাট ট্রি জাস্ট স্কোয়াশ্ড হিম টু পাল্প!
চিৎকার করে উঠল পৃথা।
সেই মুহূর্তে প্রচন্ড জোরে কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়লো। একটা দিশাহীন তীব্র আলো প্রতিসৃত হয়ে গেল চারিদিকের বাড়তে থাকা জলীয় স্তরের উপর। প্রভাবটা এতটাই জোরালো ছিল যে পৃথার স্টিয়ারিং টালমাটাল হয়ে গাড়িটা রাস্তা থেকে স্কিড করে খানিকটা নিচে নেমে জলভর্তি জমি আর রাস্তার মাঝখানে আটকে গেল।
পৃথা হাঁপাচ্ছে। নোয়েলের কথা বন্ধ।
দু’জনের মধ্যে একটা ভয়াবহ নীরবতা।
একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে শুধু।
বাইরে হাওয়ার তান্ডবের শব্দটা নির্মম।
আবার বিদ্যুৎ চমকালো।
ঘড়িতে বেলা দশটা বাজছে কিন্তু আকাশের অবস্থা এমনই যে দিনের আলো ম্লান হয়ে গিয়ে গ্লুকোমার মতো ধূসর প্রচ্ছন্ন একটা অন্ধকার চারিদিকে ঘিরে ধরেছে। পৃথার ফোনটা আবার বেজে উঠল নিস্তব্ধতা ভেঙে।
হাতড়ে হাতড়ে ফোনটা ধরল পৃথা।
ইয়েস, মিস্টার দত্তগুপ্ত!
আচ্ছা শুনুন যতদূর মনে হচ্ছে স্যারের কাজটা একটু আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে সে ক্ষেত্রে মিটিংটা ওই আধঘন্টা পর শুরু হবে। আপনারা কত দূরে রয়েছেন?
আমরা বৃষ্টির মধ্যে একটু ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে গেছিলাম..
হ্যালো!
হ্যালো!
আপনার কথা কেটে যাচ্ছে মিস চৌধুরী।
হ্যা, হ্যালো শুনতে পাচ্ছেন? পৃথা আরও জোর দিয়ে বলে।
হ্যাঁ ..পাচ্ছি.. বলুন।
বলছি আমরা চেষ্টা করছি সময় মতন পৌঁছতে। আবহাওয়ার অবস্থাটা বেশ খারাপ! বুঝতেই পারছেন।
ও আচ্ছা আচ্ছা। তবে স্যার কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবেন না সেটা খেয়াল রাখবেন।
ওদিক থেকে মিঃদত্তগুপ্তের উত্তর এলো।
পৃথা ঠিক কি বলা যায় ভেবে পেল না শুধু বললো
ডোন্ট ওয়ারি স্যার, আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।
ফোনটা রেখে বিরক্ত হয়ে বলল
সাচ আ প্রিক!
নোয়েল এখনও একটা অবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে ।
কোনও কথা বলছেনা। পৃথা নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুঝলো সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়ি থেকে বেরবার সময় আনেনি। অথবা শঙ্করদাকে দেখে ফিরে আসতে গিয়ে বাইরে পড়ে গেছে। অ্যাম্বাসেডারের স্পিডোমিটারের খাঁজে একটা সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই গোঁজা আছে।
শঙ্করদার ছেড়ে যাওয়া। খুলে দেখল দুটো সিগারেট ভিতরে। একটা বের করে নিয়ে ধরালো।
বড্ড কড়া তামাক। কিন্তু নার্ভটাকে এখন শক্ত করার প্রয়োজন। কোনমতে লম্বা দুটো টান দিলো।
পরিস্থিতি যে এইরকম হয়ে উঠবে সেটা শহর ছাড়ার সময় ভাবতে পারেনি। ভয়টা মনের ভিতরের কোটরগুলি থেকে পাক খেয়ে আনাচ কানাচ থেকে বেরিয়ে আসছে। টোলবুথের লোকটার কথাটা আবার কানে ফিরে এলো পৃথার।
জল বাড়ছে!
সিগারেটে তৃতীয় টানটা দিতেই গা গুলিয়ে উঠলো। দরজা খুলে বাইরে ঝুঁকে পড়ে বমি করলো পৃথা। কিন্তু বিস্বাদ জল ছাড়া কিছুই বেরলো না।
সকাল থেকে ওই শুকনো কুকি ছাড়া পেটে খাবার পড়েনি। নোয়েলের এবার সম্বিত ফিরেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে পৃথার দিকে জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিল। পৃথা হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিতে নিতে ভাবলো মিটিংটা কিছুতেই মিস করলে চলবেনা।
বিজ্ঞাপনের কন্ট্রাক্টটা ওর চাই। ওটা পাকাপাকিভাবে না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়বেনা। মুখে চোখে জল দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে পিছনের সিটে তাকিয়ে দেখলো নোয়েল তখনও উদ্বিগ্ন। পৃথা হাত বাড়িয়ে ওর ফোনটা চেয়ে নিয়ে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর রাখা ফোন হোল্ডারটায় গুঁজে দিল।
কিন্তু সিগনাল নেই! ম্যাপটা লাইভ ভিউ দেখাতে পারছেনা। ব্যাগ থেকে নিজের ফোনটা বার করে দেখল,খুব ক্ষীণ সিগনাল আসছে। শেষ যে ছবিটা ম্যাপে দেখা যাচ্ছে সেটাকে ভালো করে দেখল। আন্দাজ মতো ওরা ব্রীজের থেকে খুব বেশি দূরে নেই। হয়তো আর মিনিট পনেরোর রাস্তা। তবে সবার আগে গাড়িটাকে বড় রাস্তায় ওঠাতে হবে।
অনেক কষ্টে নোয়েলকে বাইরে গিয়ে গাড়িটাকে একটু ঠেলতে রাজি করালো পৃথা।
আকাশ আর আর পৃথিবীর সীমারেখা এক ধূসর আর্দ্রতার ঘন স্তরে মিশে গেছে। দূর থেকে আসা বজ্রপাতের শব্দ উপর থেকে নীচে আসছে না নীচ থেকে উপরে যাচ্ছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না।চিত্রটা অবাস্তব হয়ে উঠেছে প্রায়।
জলকাদায় গাড়ির ডানদিকের চাকার কিছুটা গিলে নিয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট সামলাতে সামলাতে অনেক কষ্টে ঠেলা মেরে, স্টিয়ারিং ডাইনে বাঁয়ে কাটিয়ে গাড়িটাকে রাস্তায় ওঠানো গেল অবশেষে। নোয়েল দু’হাত তুলে উচ্ছ্বাসের ভঙ্গিতে হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির সামনের সিটে এসে বসলো।
পরিস্থিতিটা গাড়ির ভিতর থেকে দেখলে মনে বেশী আতঙ্ক সৃষ্টি করে কিন্তু বাইরে গিয়ে রূঢ় বাস্তবের সামনা সামনি দাঁড়ালে হয়তো মনটা দৃঢ় হয়ে যায়। নোয়েল ও বোধহয় নিজেকে একটু একত্রিত করতে পারছে। পৃথা ওর পিঠ চাপড়ে বাহবা জানিয়ে গাড়ি এগোলো।
ওদের রাস্তার প্রায় সমান্তরালে একটা সরু রাস্তা দেখা দিয়েছে । কিছুটা জলের তলায় কিছুটা দেখা যাচ্ছে। অনেক বছর আগে হয়তো এটাই মূল রাস্তা ছিল। মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ এর ঝলকানি অবিচ্ছিন্ন ধূসরতাকে চার পাঁচ ভাগে ফালাফালা করে দিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। হাওয়ার গতিবেগও বেড়েছে। গাড়িটাকে হাল্কা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচ বন্ধ হলেও ধাক্কাটা প্রবল। ওয়াইপারটা বেশ মরিয়া। নিজের ক্ষমতার শেষটুকু দিয়ে সামনের কাঁচটাকে পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির ছাঁট তাকে চারিদিক থেকে নাজেহাল করে তুলেছে।
ওই যে দূরে মোড়টা দেখা যাচ্ছে মনে হয়!
নোয়েল সামনের কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো।
থ্যাঙ্ক গড এই এলাকাটা পেরিয়ে যাব।
হাওয়ায় রাস্তায় ধারে গাছগুলি ভয়ংকর ভাবে নড়ছে। একটা গাছের ডাল নুয়ে এসে প্রায় ওদের গাড়ির ছাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল।
পৃথা কোনরকমে বাঁয়ে কাটিয়ে বাঁচালো।
কয়েকটা আলগা পাতা এসে আটকে গেল সামনের কাঁচে, ওয়াইপারটার গায়ে।
আরেকটু সামনে এগোতেই জোরে ব্রেক কষলো পৃথা। বড় একটা গাছ ডালপালা সমেত আছড়ে পড়েছে রাস্তার উপর।
স্পিড কম থাকায় আচমকা ব্রেকের প্রভাবে গাড়িটা স্কিড না করে একটু বেঁকে গিয়ে থেমে গেল। আর হাত দশেক এগিয়ে থাকলেই গাছটা সোজা গাড়ির উপর পড়তো। ব্রেকের ধাক্কায় নোয়েলের মাথা ঠুকে গেছে সামনের ড্যাশবোর্ডে আর একটা আলগা ডাল এসে সশব্দে বনেটে লেগেছে। আঘাতের শব্দটা গাড়ির ভিতর অবধি পৌঁছে ওদের অস্তিত্বকে যেন নাড়িয়ে দিয়েছে।
গাড়ির স্টার্ট বন্ধ ।
পৃথা চাবি ঘোরাতেও স্টার্ট নিল না।
নোয়েল আর পৃথা পরস্পরের দিকে তাকালো।
দুজনের দৃষ্টিতেই অবিশ্বাস।
আবার চাবি ঘোরালো। গাড়ি চালু হলোনা।
চিরকালের জন্য কি এখানেই আটকে গেলাম?
নোয়েলের গলার স্বর এবার একটু ঠাণ্ডা।
চিরকাল অনেকটা সময়। আর আমাদের হাতে অতো সময় নেই। পৃথার গলার স্বরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও একটা ভয় মিশে আছে।
মনকে সমানে আশ্বাস দিয়ে চলেছে। কিন্তু গাছটাকে চোখের সামনে এইভাবে পড়তে দেখাটা ভয়াবহ দৃশ্য। শঙ্করদার চাপা পড়া দেহটার ছবি ভেসে উঠলো পৃথার মাথায়।এই ভয়টা সংক্রামক। একবার পেয়ে বসলে সবরকম শক্তিকে কব্জা করে নেয়। কিছুতেই সেটা হতে দেবেনা পৃথা।
আর তো একটু রাস্তা, তারপরেই ব্রীজ না রে?
নোয়েল কিছু না বলে মাথা নাড়লো শুধু।
পৃথা আবার চাবি ঘোরালো।
গাড়ির মোটর থেকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাওয়া একটা স্বর বেরোচ্ছে। যেন গলায় শ্লেষ্মা আটকেছে।
একবার, দু’বার। ইঞ্জিন গলা খাকরানি দিয়েই আবার স্বর ছেড়ে দিচ্ছে।
বিরক্তি ও রাগে স্টিয়ারিংয়ে চাপড় মারলো দুবার।
অসহায় লাগছে নিজেকে পৃথার।
দাঁড়া তো! নোয়েল কি একটা ভেবে দরজা খুলে হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে গেল।
কি করছিসটা কি!?
পৃথা চিৎকার করলো। নোয়েল ততক্ষণে ডাল সরিয়ে গাড়ির বনেট খুলে ফেলেছে। বনেটের ঢাকনার আড়ালে নোয়েল কি করছে সেটা পৃথা দেখতে পাচ্ছিলনা।
জানলার কাঁচ নামিয়ে চিৎকার করলো
নোয়েল!
গাড়ির সামনের কাঁচে বাইরের দৃশ্যকে ওয়াশপেইন্টিং এর মতন ধুইয়ে সমানে জলের ধারা নামছে। ওয়াইপারটা বন্ধ হয়ে গেছে।
দাঁড়া দাঁড়া হয়ে এসেছে, নে স্টার্ট দে দেখি এবার!
নোয়েলের অস্ফুট আওয়াজ বৃষ্টির মধ্যে ভেসে এলো।
বনেটের ঢাকনা বন্ধ হতেই আবার দেখা গেল ওকে। নোয়েল হাতের ইশারায় স্টার্ট দিতে বলছে। পৃথা আশ্বস্ত হল। আবার একবার মরিয়া চেষ্টা করলো। হ্যাঁ এবার যেন একটু দম নেওয়ার অবস্থায় আসছে ইঞ্জিন। এয়ার ফিল্টারে জমে ওঠা শ্লেষ্মা কাটিয়ে মোটর অবশেষে স্টার্ট নিলো।
নোয়েল গাড়িতে ফিরতেই দুজনে হাতে হাতে তালি দিয়ে একটা বিজয় অভিবাদন করলো।
পৃথা অ্যাক্সিলারেটরে পা রেখে কয়েকবার জোরে জোরে পাম্প করলো ইঞ্জিনকে। ব্যাপারটা ইঞ্জিন কে কতটা চাঙ্গা করে সেটা নিশ্চিত না হলেও অভিব্যক্তিটা নিশ্চিত ভাবে মানুষকে নতুন উদ্যম এনে দেয়। ক্যাবিনেটের উপর রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালো নোয়েল। ইঞ্জিনের জেগে ওঠার শব্দে প্রত্যয়টা আবার ফিরে এসেছে ওদের।
কিন্তু সামনের রাস্তায় তো গাছ পড়ে! সোজা যাওয়ার উপায় নেই।
এবার! কিভাবে যাবি?
দাঁড়া! একটা উপায় আছে।
পৃথা গাড়িটাকে পিছিয়ে নিল কিছুটা তার পর বাঁদিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সমান্তরাল পুরোনো রাস্তায় নেমে গেল।
নোয়েলও এবার বেশ সিট আঁকড়ে বসেছে। একটু আগেও যে হতাশা আর ভয়টা ঘিরে ধরেছিল সেটা কেটে গিয়ে মরিয়া ভাবটা ফুটে উঠছে। হাইওয়ে ধরতে না পারলে যে এই দুর্বিপাক থেকে কোনো মুক্তি নেই সেটা এখন স্পষ্ট। পুরোনো রাস্তার উপরে জমে থাকা জল কাটতে কাটতে ওদের গাড়িটা একটু পরে এসে বড় রাস্তার বাঁকে উঠলো আবার।
বাঁকের মুখে একটা চালাঘর দেখা যাচ্ছে।
চায়ের দোকান হতে পারে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বোঝা গেল কোনো মানুষজন নেই ভিতরে। ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির তোড়ে একদিকের চালার অংশ খুলে গিয়ে ঝুলছে।
বাঁশের খুঁটি গুলি হেলে পড়েছে।
কোনো পরিত্যক্ত মৃতদেহ যেন।
বাঁক ঘুরতেই নদীর জলের শব্দ শোনা গেল।
এসে গেছি বোধহয়, পৃথা বলে উঠলো।
ব্রীজের মুখে যাওয়ার আগে পুরনো জং ধরে যাওয়া একটা সতর্কীকরণ বোর্ড। অনেক পুরোনো। পোস্টটা কাত হয়ে পড়েছে একটু। তার গায়ে লেখা অক্ষরগুলো ভালো পড়া যাচ্ছে না। গাড়িটা পোস্ট ছাড়িয়ে আরও একটু এগোলো। এবার নদীটা দেখা যাচ্ছে। চওড়াতে খুব বেশী নয়। ব্রীজটাও দেখা যাচ্ছে। তাকে পুরোনো না বলে প্রাগৈতিহাসিকও বলা যায়। জল এখন ব্রীজের উপর দিয়ে বইছে। শব্দটা বেশ প্রবল।
অসম্ভব এটা পেরোনোটা রিস্ক হয়ে যাবে!
নোয়েল আবার দমে গেছে।
কিছু রিস্ক হবে না ব্রীজটা লম্বাতে বেশি নয়।
পৃথার গলায় মরিয়া আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু এটা বেশ পুরোনো ব্রিজ!
পুরোনো হলেও খুব লম্বা নয়। দেখছিস না নদীর বাঁকটা এখানে সরু। পৃথা উত্তর দেয়।
আমি বলি কি, ফিরে চল।আমরা আরেকদিন নাহয় মিটিংটা করবো।
না।
পৃথার গলার স্বর পাল্টে গেছে।
এই সময় তোর এই কথাগুলো আমাদের দুজনেরই সময় আর এনার্জি নষ্ট করছে। এত কিছুর পর কেন ফিরে যাবো?
আরেকদিন আরেকদিন করে পাঁচটা মাস আমরা কি ভাবে চালাচ্ছি তুই জানিস না?
পৃথার গলায় এবার তীব্র শ্লেষ।
নোয়েল পৃথার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। পৃথা ওকে থামিয়ে দিলো।
এই রাস্তাটা তুই নিজেই দেখিয়েছিস নোয়েল আর ফিরে যেতে চাইলেও এখন যাওয়ার উপায় নেই সুতরাং এগোনোটাই একমাত্র অপশন এখন।
তুই কাঁচ তুলে সিট বেল্ট লাগিয়ে নে। বি স্টেডি।
পৃথা কে এই মুহূর্তে অদ্ভুত কঠিন একটা মানুষ মনে হচ্ছে।
ওর কথায় নোয়েলের মুখের কি অভিব্যক্তি হয়েছে, সেদিকে তাকিয়ে পৃথা নিজেকে দূর্বল করতে চায় না। ব্রীজের প্রায় মাঝামাঝি নদীর জল দুর্বার গতিতে বয়ে যাচ্ছে। ওপারের কিছুটা অংশ জলমগ্ন।তারপর একটা ভাঙা রাস্তা বেরিয়ে আছে।
পৃথা অনুমান করলো যে গাড়িটাকে একটানে পুরো দূরত্বটা পার করে নিতে হবে। অসম্ভব কিছুই না। ইঞ্জিনটাকে বার কতক ফুয়েল পাম্প করে তরতাজা করে নিল। তারপর শক্ত করে স্টিয়ারিং চেপে ধরলো। ওর মুখে একটা দৃপ্তভাব ফুটে উঠছে।
পৃথিবীতে পথহারা মানুষেরা কোন দিশায় যায়?
প্রকৃতিই কি সেই দিক নির্ধারণ করে দেয় ?
ধূসর দিনের আলো ঘন হয়ে আসছে চারিদিকে।
২
মিঃ ভবেশ দত্তগুপ্ত একটু চিন্তায় ছিলেন। বাইরে যা আবহাওয়া ওদের আসতে কত দেরি হবে কে জানে। বস আবার বেশীক্ষণ অপেক্ষা করবেন না। সেক্রেটারি এসে জানালো যে বিজ্ঞাপন সংস্থার লোকেরা পৌঁছে গেছে। তিনি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। যাক তাহলে বেশি দেরি হয়নি। ওদের লাউঞ্জে বসাও আমি আসছি।
সেক্রেটারি চলে গেল।
দত্তগুপ্ত ওয়াশরুমে গিয়ে একটু চুলটা আঁচড়ে নিলেন আয়নায় একবার নিজেকে গুছিয়ে নিলেন। তারপর লাউঞ্জে এসে দেখলেন বছর তিরিশের এক মহিলা, সুন্দরী, স্মার্ট বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা,সঙ্গে একটু স্থূলকায়, ভালোমানুষ গোছের একজন যুবক বসে আছে। দুজনেরই পোশাক ভেজা। ওকে আসতে দেখে মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো।
হ্যালো মিস্টার দত্তগুপ্ত, আশাকরি আমরা সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেছি। আমি পৃথা চৌধুরি আর আমার সহকারী নোয়েল রাজন। নাইস টু মিট ইউ।
দত্তগুপ্ত একটু হেঁ হেঁ করে হেসে বললেন
আসুন আসুন, আপনারা তো ভিজে গেছেন দেখছি। একটু ফ্রেশ হয়ে নিন তাহলে। আমি কফি বলে দিচ্ছি।
সেসব পরে হবে আগে মিটিংটা সেরে নি। মহিলার স্বরে দৃঢ়তা স্পষ্ট। দত্তগুপ্ত একটু ইতস্তত করে বললেন
ওকে ,বেশতো, চলুন তাহলে, বোর্ডরুমে যাই ।আমি বসকে খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি।
থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
বোর্ডরুমে ঘন্টাখানেক মিটিং হলো।পৃথা চৌধুরি চমৎকার উপস্থাপনা করলেন। ওদের প্রেজেন্টেশনে বসকে বেশ উৎসাহী মনে হলো দত্তগুপ্তের।
মিটিং হয়ে গেলে বাইরে এসে
পৃথা চৌধুরি মিঃ দত্তগুপ্তকে বললো
স্যার আমরা প্রথম ক্যাম্পেনের ডেমো ভিডিওটা এই সপ্তাহের মধ্যেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি শুধু কন্ট্রাক্টের ব্যপারটা দেখুন যাতে এই মাসের মধ্যে হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে আমাদেরও অন্য ক্যাম্পেনগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে
সুবিধা হবে।
দত্তগুপ্ত ওদের আশ্বাস দিলেন যে তিনি ওই দিকটা যতটা পারেন তাড়াতাড়ি করার চেষ্টা করবেন।
থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ স্যার চলি তাহলে।
সেকি লাঞ্চ করবেন তো!
ওটা আরেকদিন হবে স্যার আজ চলি। ধন্যবাদ।
কথা শেষ হওয়ার মুহূর্তের মধ্যে দুজনে যেন মিলিয়ে গেল। দত্তগুপ্ত একটু অবাক হলেন। এত কিসের তাড়া কে জানে! মহিলাকে আরেকটু আপ্যায়ন করার ইচ্ছে ছিলো।
কাজ সেরে মি: দত্তগুপ্ত যখন নিজের বাড়ি ফিরলেন তখন আবার তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দিনের আলো বিদায় নিয়েছে অনেকক্ষণ।
হাতমুখ ধুয়ে এক কাপ গরম চা নিয়ে সামনের বারান্দার দিকে মুখ করে বসেছেন।
একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে ঘরে।
ফোনটা বেজে উঠলো।
ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে
একজন পুরুষ কন্ঠ বললো,
নমস্কার মিস্টার দত্তগুপ্ত। আমি অভিজিৎ মুখার্জি, ট্রিনিটি বিজ্ঞাপন এজেন্সি থেকে বলছি।
হ্যাঁ বলুন কি ব্যাপার?
আজকের মিটিংটা ফেল করার জন্য ক্ষমা
চাইছি স্যার।
মানে?
আই অ্যাম রিয়েলি সরি স্যার। আপনাদের মূল্যবান সময়টা নষ্ট হলো।
কি ব্যাপার বলুন তো! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!
দত্তগুপ্তর মাথায় সত্যিই কিছু ঢুকছেনা।
আসলে একটা খারাপ খবর দেওয়ার ছিল।
খারাপ খবর?
হ্যাঁ স্যার। একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে আমাদের।
ও প্রান্তে অভিজিৎ -এর স্বর একটু ধরা ধরা।
কি হয়েছে?
স্যার পৃথা চৌধুরী আরেকজন এমপ্লয়িকে সাথে নিয়ে আপনাদের সঙ্গে মিটিং করতে রওনা হয়েছিলেন, রাস্তায় দুর্যোগের কারণে একটা ব্রীজ ভেঙে পড়ায় ওদের গাড়িটা জলে ডুবে যায়। আনফরচুনেটলি দুজনের কেউই প্রাণে বাঁচেনি স্যার।
ওদিকের কথা শেষ হতেই মিঃ দত্তগুপ্তের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল!
চায়ের কাপটা হাতেই থেকে গেছে।
মনে পড়লো ওদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর যখন হাত মিলিয়েছিলেন তখন দুজনের হাতই অসম্ভব ঠান্ডা মনে হয়েছিল।
ঘরের খোলা দরজা দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বারান্দার লাইটের আলো যেটুকু জুড়ে পড়েছে তাতে দেখতে পাচ্ছেন বৃষ্টির জল মাটি ছাপিয়ে বারান্দায় উঠে আসছে
ধীরে ধীরে।
জল বাড়ছে !
সমাপ্ত
(এই গল্পের সমস্ত চরিত্র, ঘটনা ও ভৌগোলিক অবস্থান কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো যোগ নেই আর থাকলেও সেটা কাকতালীয়। )
চিত্র: Pierre La Tan
*UBINAM( Latin): Where in this world.
©2018 http://golpoba-gish.com. ALL RIGHTS RESERVED

Last er punch ta besh uttejok.
LikeLiked by 1 person
অসংখ্য ধন্যবাদ।
LikeLike