এর আগে: ভেলাম্মার মুখে ধ্রুপদের মা’র অল্পবিস্তর বিবরণ আশাবরীকে উৎসুক করে তোলে,কাছাকাছি ঘুরতে গিয়ে বৃষ্টি আসে। প্রথমবার আশাবরী আর ধ্রুপদ ঘনিষ্ঠ হয়।
Karaikudi.
বাড়ির অন্য ঘরগুলো ঘুরতে ঘুরতে ধ্রুপদের ঠাকুরদার ঘরে এসে ঢুকলো আশাবরী। ঘরটা এখন ধ্রুপদ ক্যানভাস স্টোর করতে ব্যবহার করে। এই ঘরের আসবাবপত্র কিছু বিক্রি হয়ে গেছে কিছু ধ্রুপদ নিজের ঘরে নিয়ে গেছে। ঠাকুরদার ঘরে বেশ কয়েকটা ছোট বড় মাঝারি সাইজের কাঠের সিন্দুক দেখতে পেলো আশাবরী। সেগুলোতে বিভিন্ন রকমের নক্সা খোদাই করা। তারমধ্যে দুটো সিন্দুক তালা দেয়া আর দুটো খোলা রয়েছে। আশাবরী একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নিলো প্রথমে। ধ্রুপদ ওর ঘরে কাজ করছে। আর ভেলাম্মা পিছনের বারান্দায় লঙ্কা শুকাচ্ছে। এই মুহূর্তে এইদিকে কারো আসার সম্ভাবনা নেই। সন্তর্পণে একটা সিন্দুকের ডালা খুললো আশাবরী। ভিতরে পুরোনো কিছু কাগজপত্র, কাঁসা আর তামার তৈরী পুরোনো কয়েকটা কৌটো, বেশ অ্যান্টিক।
পরের সিন্দুকটাতে পুরোনো ফটোগ্রাফ রয়েছে কিছু। ছবিগুলো হাতে নিয়ে খুব সাবধানে দেখলো আশাবরী। ধ্রুপদের ঠাকুরদা ও ঠাকুমা পাশাপাশি, ওঁদের ছবি বাড়ির অন্যত্র দেখেছে আশাবরী।
একটি ছেলে মোটরবাইকে চড়ে,পাশে ধ্রুপদের ঠাকুরদা, এটা সম্ভবতঃ ধ্রুপদের বাবা, কারণ পাশে ওর ঠাকুরদাকে বেশ তরুণ মনে হচ্ছে। পরের ছবিটা একটা লাফায়েত স্টুডিও পোর্ট্রেট।
ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে, ওই মাঝখানের ব্যক্তি সম্ভবত ধ্রুপদের ঠাকুর্দার বাবা চেট্টিয়ার অরুমুগম। চেয়ারে বসে আছেন পারম্পরিক বেশভূষা পরে। পাশে ওঁনার দুই ছেলে। ঠাকুরদা বরদারাজন আর তাঁর দাদা সুন্দররাজন। অরুমুগমের সাথে ধ্রুপদের চেহারার মিলও আছে। চোখগুলো ওর মতনই উজ্জ্বল। একটা ছবিতে ঘোড়ায় চড়ে তিনজন, দুজন সাহেব আর চেট্টিয়ার অরুমুগম।
আশাবরী পুরোনো ছবিগুলোতে বেশ তন্ময় হয়ে গেছিলো,হঠাৎ একটা কুঁইকুই আওয়াজ শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখলো মার্কাস এসে দাঁড়িয়েছে, ওর দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে।বোধহয় এঘরে সেভাবে কাউকে আসতে দেখেনা।
আশাবরীও ঠিক কি করবে ভেবে না পেয়ে তাড়াতাড়ি ছবিগুলো সিন্দুকের ভিতরে রাখতে গেলো। ছবির বাঞ্চ থেকে একটা ছবি নিচে মাটিতে পড়ে গেলো। আশাবরী সেটা তুলে সোজা করে রাখতে গিয়েই ভীষণ অবাক হলো।
ছবিতে একজন মহিলা কোলে বীণা নিয়ে বসে আছেন আর তার গলা জড়িয়ে একটা বাচ্চা তাকে চুমু খাচ্ছে।
একি! এ যে অরুন্ধতী বাসু! মাথার চুলে তখনও ধূসর প্রলেপ পড়েনি,বয়স তরুণ, কিন্তু গান গাইতে বসার ভঙ্গি আর হাসিটাতো একরকম।
অরুন্ধতীর ছবি এই বাড়িতে!?
আশাবরীর মনে এবার ভেলাম্মার কথা,অরুন্ধতীর বাড়িতে দেখা ধ্রুপদের পেইন্টিং আর এই ছবিতে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে একটা সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে হলো। কিন্তু নিজে নিজে এই সিদ্ধান্তে আসার আগে একবার ধ্রুপদের কাছে পুরোটা জানতেই হবে। কি আশ্চর্য! ছবিটা আবার সিন্দুকে রেখে ঢাকনা বন্ধ করলো আশাবরী।
মার্কাস আর সেখানে নেই।
সন্ধ্যেবেলা টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিলো, ধ্রুপদ আর আশাবরী আড্ডার মেজাজে বসেছে।হুইস্কি আর টিমটিমে আলোয় দুজনেই মুখ আবছা দেখতে পাচ্ছে।বাইরে ঘোর বর্ষা।আশাবরী কথা শুরু করলো,”তুমি পেইন্টিং কে প্রফেশন হিসেবে নিলে কবে থেকে?”
ধ্রুপদের মুখ হাসি হাসি করে বললো” কেন খুব খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছি?”
আশাবরী জিভ কাটলো “সে কথা বলার ধৃষ্টতা করতে পারবোনা।আমি জানতে চাইছিলাম স্থাপত্যবিদ্যা ছেড়ে প্রফেশন হিসেবে এটাকে নিলে কবে?”
“পেইন্টিং ছোট থেকেই আমার প্যাশন ছিলো।মনের যেকোনো আবেগ পেইন্টিং এর মধ্যেই প্রকাশ পেতো।খুব মন খারাপ বা দারুণ কোনো ভালোলাগা,সমস্ত অনুভূতিগুলোকেই আঁকার মধ্যে ধরে রাখতে চাই আমি।পারিবারিক চাপেই আর্কিটেকচার পড়তে হয়েছিলো,কিন্তু যখন পরিবার বলতেই আর কেউ রইলোনা তখন নিজের প্যাশন নিয়ে বেঁচে থাকাটাই আমার কাছে প্রধান হয়ে উঠলো।” ধ্রুপদ মৃদুস্বরে কথাগুলো বলছিলো।
আশাবরী মুখ ফসকে বলে ফেললো “পরিবার বলতে সত্যিই কেউ নেই?তোমার মা?”
তারপর নিজেরই মনে হলো,ধ্রুপদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছে ও।হয়তো উত্তেজনার বশে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো।
ধ্রুপদ অবশ্য বিশেষ বিরক্ত মনে হলো না।হালকা মেজাজেই বলতে শুরু করলো “মা!আসলে মা শব্দটাই আমার জন্যে খুব ধোঁয়াশার।মা থাকার সময় জীবন একরকম ছিলো, মা চলে যাওয়ার পরেও জীবন থেমে থাকেনি।বাকি সবাই ছিলো।আমার তাতে কোনো আপত্তি ছিলোনা।আই ওয়াজ মেয়ারলি থার্টিন ।আমার মতামত বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে দেখার মতো কেউ ছিলোনা।”
“অরুন্ধতী বাসু,তোমার মা!!??আমি সত্যি ভাবতেই পারছিনা।আমাকে কি বলা যায় সেসব কথা?অস্ট্রেলিয়ায় যখনই দেখা হয়েছে উনি এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন,আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি যে এমন একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো।”
ধ্রুপদ এবার চমকালো,অরুন্ধতী বসু ওর মা সেটা আশাবরী জানলো কি করে!?ভেলাম্মা বলেছে?
কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ করলোনা।শুধু বললো “অরুন্ধতী বসুর সাথে তোমার দেখা হয়েছে সে কথা তুমি মেল করেছিলে,কিন্তু আমিতো তাঁর সম্পর্কে তোমাকে কিছু বলিনি।তুমি জানলে কি করে?”
আশাবরী এবার লুকিয়ে ছবি দেখার কথাটা স্বীকার করে ফেললো।অপরাধী মুখ করে বললো,”তোমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলিয়েছি,হয়তো তুমি বলেই এটা করতে পেরেছি।তুমি তার জন্যে আমাকে খুব খারাপ ভাবতে পারো।”
ধ্রুপদের মনে হলো আশাবরীকে একটু আদর ক’রে।তার বদলে গলার স্বর পাল্টে বললো,”এই অনধিকার চর্চার ফল কঠিন হতে পারে,ঘন্টা দুয়েক টানা বসে পোজ দিতে হবে।”ধ্রুপদের গলায় মেকি গাম্ভীর্য।
আশাবরী হোহো করে হেসে উঠলো।আশাবরীর হাসির সাথে গোটা বাড়িটাও যেনো।
ধ্রুপদ গ্লাসে আরেক পেগ হুইস্কি ঢালছিলো,এমন সময় কলটা এলো।আশাবরী খুব আস্তে কথা বললেও ধ্রুপদের কানে সব কথাই প্রায় আসছিলো।আশাবরী হঠাৎ একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো,ধ্রুপদ ওর পাশে এসে দাঁড়ালো।আশাবরীর কাঁধে হাত রাখলো।আশাবরী ফোনটা কেটে দিলো।তারপর মাথা নিচু করে বসে রইলো।ঘর নিঃস্তব্ধ।ধ্রুপদ আশাবরীর সামনে বসলো,তারপর ওর মুখটা তুলে ধরলো,আশাবরীর গাল ভেজা।ধ্রুপদ ওকে জড়িয়ে ধরলো।
আশাবরী ফুঁপিয়ে উঠলো,কান্নাগুলো আর বাঁধ মানছেনা।
আশাবরীর চোখের জলে ধ্রুপদের টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে।ধ্রুপদ কোনো কথা বলছেনা, শুধু শক্ত করে ধরে আছে আশাবরীকে।আশাবরী ভাঙছে।কান্নাটা জীবনে বড়ো প্রয়োজন।কোথায় যেন পড়েছিলো,
“When you are sorrowful look again in your heart,and you shall see that in truth you are weeping for that which has been your delight”
ধ্রুপদ এর মর্ম বোঝে।আশাবরীর দুঃখের সাথে নিজের চাপা কান্নাগুলো মেশাতে চেষ্টা করছে।
-“প্রতিদিন আমি নিজের সাথে লড়াই করে চলেছি,নিজের ভেতরে,অন্ধকার জায়গাগুলোর সাথে।শুধু আমি জানি সেই ক্ষতগুলোকে।যে জীবন আমি চাইনা তাকে বয়ে বেড়ানোর শক্তি আমার নেই।জীবন থেকে সবকিছু মুছে ফেলার ক্ষমতাও নেই।”
আশাবরী ধ্রুপদের বুকে নিজের মুখ চেপে কাঁদছে আর কথা বলছে।ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ায় ঘটে যাওয়া সমস্তকিছুই বললো ধ্রুপদকে।আশাবরীর জীবনে এতো কিছু ঘটে গেছে,আজ ডিভোর্স অব্দি ফাইল করেছে রাজীব,এর আগে ইমেল বা চ্যাটে এসব কিছুই জানতে পারেনি ধ্রুপদ।
এই পুরো সময়টা আশাবরী একলা যুদ্ধ করেছে,নিজের সাথে,পরিবারের সাথে,নিজের সম্পর্কগুলোর সাথে।
অনেকক্ষণ একটানা কান্নার পর আশাবরী বিরাম নিলো।ধ্রুপদের ঘাড়ে মাথা রেখেছে। ধ্রুপদ আস্তে আস্তে ওর চিবুক ধরে তুললো। নিজের মুখটা কাছে নিয়ে এলো। আশাবরীর নিঃশ্বাস পড়ছে ওর মুখে। আলতো করে ঠোঁটে একটা চুমু খেলো। আশাবরী ধ্রুপদকে মুখ সরাতে দিলো না। আলতো থেকে গাঢ় হলো চুম্বন। ধ্রুপদের হাত আশাবরীর কোমর জড়িয়ে ওকে আরও কাছে টেনে নিলো।নিঃশ্বাস পড়ছে দ্রুত।আশাবরী ধ্রুপদের শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে।
ধ্রুপদের ঘরে একটা বড় পিতলের প্রদীপ জ্বলছে। তার আবছা আলোয় আশাবরীর নগ্ন পিঠে, স্তনে, উরুসন্ধিতে ধ্রুপদের ঠোঁট ছবি এঁকে চলেছে সমুদ্রতীরের সেই স্বপ্নদৃশ্যের,আশাবরী উত্তাল হয়ে উঠছে ঢেউয়ের মতো।শরীরের গোপনে যেন ভাইগেই নদী বয়ে চলেছে। যেনো উইমলাহ, গুনেডু আর মেহনীর অভিশপ্ত জড় অবস্থাকে ভাসিয়ে দিয়ে সে ফিরিয়ে দেবে মানুষের জীবন, কারমেনের কান্না ভুলিয়ে দেবে।ধ্রুপদ কখনো শান্ত,কখনো তীব্র।আশাবরী ভুলে যেতে থাকে সবকিছু।ধ্রুপদকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে,নিঃশব্দ মুখর ওর সারা শরীরে প্রগাঢ় আনন্দ ছড়িয়ে পড়তে চায়।আশাবরীর মনে হয় এমন গভীর করে কেউ ওকে কোনোদিন ভালোবাসেনি।ধ্রুপদের স্পর্শগুলো এত কোমল,আশাবরীর মনে হয় ধ্রুপদ ওর শরীরে ছবি এঁকে দিচ্ছে।
ধ্রুপদ আর আশাবরী হারিয়ে যেতে থাকে অপার্থিব সুখে,চরম উত্তেজনায়।বৃষ্টি নামে, ভিজতে থাকে ওরা।
“আএল পাউস নিবিড় অন্ধার।
সঘন নীর বরিসএ জলধার।।”

(আগামী পর্বে সমাপ্য)
Ki bhalo…all 💓
LikeLike
দুর্দান্ত….. প্রতিটি শব্দ যেন মনের ইজেলে একের পর এক জলছবি এঁকে চলেছে
LikeLike
ধন্যবাদ।
LikeLike
Eto taratari somapyo keno? Aro choluk…
LikeLike