দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ২৫: পূর্বরাগ

এর আগে: আশাবরী করাইকুড়িতে আবার ফিরে আসে। ধ্রুপদের সাথে দেখা হয়।

ধ্রুপদের পুরোনো এলপি রেকর্ডসের কালেকশনটা দেখে আশাবরীর রীতিমতো মাথা খারাপ হবার জোগাড়। পটাপট চার পাঁচটা ডিস্ক নামিয়ে ফেললো। এলভিস, বিটলস, জনি ক্যাশ, জিমি হেনড্রিক্স ,আশাবরীকে আর পায় কে!

ধ্রুপদের বাড়িটা সাবেকি ধাঁচের হলেও বাড়ির সর্বত্র আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পুনর্যোজন করা হয়েছে।ওয়াইফাই থেকে শুরু করে এসি সবই রয়েছে। কিন্তু ধ্রুপদের নান্দনিক বিন্যাস এমনই যে কোনোটাই আলাদা করে গলা বাড়িয়ে তাকিয়ে নেই। আশাবরী নিজের ঘর, ধ্রুপদের স্টুডিও আর ডাইনিং হল ছাড়া এখনও সব ঘর দেখে উঠতে পারেনি। ওর হাতে দু’দিন মাত্র সময় কিন্তু মন চাইছে এখানে আরও অনেক দিন কাটাতে।
ভেলাম্মার অবশ্য আপ্যায়নের ঘাটতি নেই। সুযোগ পেলেই এই বাড়ির গল্প বলতে শুরু করে। আগে কি ছিলো,এখন কি আছে,কোন জিনিসটা কতো পুরোনো আর কত দামী এসব বলতে বলতে ভেলাম্মার চোখ চকচক করে ওঠে। আশাবরী হাঁ করে শোনে। এই বাড়িটা নিয়ে ওর এতদিনের যে উৎসাহ সেগুলো আবার নতুন মাত্রা পায়।
ধ্রুপদকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে পেরেছে এককালে নাকি ব্রিটিশ আর জাপানি ব্যবসায়ী তথা সরকারী হোমড়াচোমড়া ব্যক্তিরাও এই বাড়িতে যাতায়াত করতো। আশাবরীর সবই খুব থ্রিলিং লাগছে।

এলভিসের রেকর্ডটা টার্নটেবিলে প্লেস করে আশাবরী নিজের মনেই ‘হাউন্ড ডগের’ তালে তালে নাচছিলো। খেয়ালই করেনি যে ধ্রুপদ কখন ঘরে এসেছে।
ধ্রুপদ একমনে আশাবরীর গানের তালে তালে নাচ উপভোগ করছিলো।
আশাবরী নাচতে নাচতে এবার পিছন ঘুরতেই একদম ধ্রুপদের কাছাকাছি চলে এলো। আরেকটু হলেই ধাক্কা খেত। কোনো রকমে সামলালো। শাড়ির আঁচলটা বেখেয়ালে নীচে নেমে গেছে।
আশাবরী আর ধ্রুপদের মধ্যে শুধু কিছু মুহূর্তের ব্যবধান।

” I am troubled, immeasurably
by your eyes.
I am stuck by feather
of your soft reply.
The sound of glass
speaks quick, disdain
and conceals
What your eyes fight
To explain”
………………………..

আশাবরীর একটা ক্যাসুয়াল ড্রয়িং করছিলো ধ্রুপদ।ওর স্টুডিওর কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে আশাবরী পোজ দিচ্ছিলো।

ধ্রুপদ আঁকায় মগ্ন হয়েছিলো,ক্যানভাস থেকে চোখ তুলে দেখলো মডেল হাওয়া! গেলো কোথায়?! এদিক ওদিক তাকিয়েও পাত্তা নেই! নিজের স্টুডিওর ঘর থেকে বেরিয়ে বা্রান্দায় এসে দেখলো আশাবরী টানা বারান্দার় গায়ে বসে পা বাড়িয়ে বৃষ্টির জলে পা ভেজাচ্ছে। পায়ের আ্যঙ্কলেট বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে।
ধ্রুপদ এসে দাড়াতেই আশাবরী বললো
“উফফ বাবা!
একটানা পোজ দেওয়া কি কঠিন ব্যাপার!
এ আমার কম্মো নয়!”

-“পোজ দিতে দিতে না বলে উঠে আসা কিন্তু
গর্হিত অপরাধ” ধ্রুপদ বললো।

-“তাই”? আশাবরী মুচকি হাসলো।

-“হ্যাঁ, এতে শিল্পী কিন্তু ইচ্ছা করলে ঘোরতর শাস্তি দিতে পারেন!”

আশাবরী এবার বারান্দা থেকে উঠে এলো।
ধ্রুপদের সামনে দাঁড়িয়ে বললো
-“বেশ, শাস্তি দিন তাহলে”

ধ্রুপদ আশাবরীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো
-“আপাতত দুপাত্র মোহিতো বানাও যাও, এরপর ভেবে দেখছি।”
আশাবরী বেশ খুশিমনে চলে গেলো মোহিতো বানাতে। ভেলাম্মার কাছ থেকে ফ্রেশ পুদিনা পাতা চেয়ে নিলো। ভদকা ধ্রুপদের স্টুডিওর মিনি সেলারের মধ্যেই থাকে। নীহারিকা হলে এতক্ষনে ড্রিঙ্ক বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিতো তবে আশাবরীও অল্পসল্প মিক্সোলজির পাঠ নিয়েছে। সিডনিতে একটা পাবে, ও আর বেন মাঝে মাঝে যেতো।সেখানে একজন ভালো মিক্সোলজিস্ট ছিলো। তার সাথে বেন আর ও বেশ চুটিয়ে আড্ডা দিতো।ছেলেটিও বেসিক কিছু ড্রিঙ্ক চটপট ঘরে বানাবার কৌশল শিখিয়েছিলো ওদের।

ধ্রুপদ একটা চুমুক দিয়েই একটু যেন চিন্তায় পড়ে গেলো। আশাবরী ওর দিকে তাকিয়ে বললো
“এতটাই খারাপ বানিয়েছি?”

-‘না আমি ভাবছি এটাকে মোহিতো না বলে অন্য একটা নাম দিই।”

-“বুঝেছি !!তার মানে হয় নি” আশাবরী ঠোঁট উল্টে বললো।

এবার ধ্রুপদ এক চুমুকে পুরো গ্লাস শেষ করে আশাবরীর দিকে তাকিয়ে বললো

-“ওয়ান মোর প্লিজ”।

বলেই হাহা করে হেসে উঠলো।
আশাবরী ধ্রুপদের হাতে একটা আলতো করে চড় মারলো।

ভেলাম্মা মাছ রান্না করছিলো, গন্ধ পেয়ে আশাবরী রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ালো,রান্নায় কি উপকরণ ব্যবহার করছে সেটাই দেখার ইচ্ছা।অস্ট্রেলিয়ায় থেকে রান্নার প্রতি বেশ ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। নিত্যনতুন রান্না আশাবরী নিজে বানাতে ভালোবাসে। রন্ধন পটীয়সীদের হাতের তেল মশলা দেবার আন্দাজ আশাবরীকে বরাবর মুগ্ধ করে। মা মাসিমণি,দিদি সবাইকে খুব যত্ন করে রান্না করতে দেখেছে আশাবরী। অবশ্য এই ব্যাপারে ওর নিজের দক্ষতা এখনো শিক্ষানবিশ পর্যায়ে।খুব সাবধানী হতে হয় এখনো।বারবার চেখে দেখে তবেই শান্তি। ভেলাম্মা আশাবরীকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই মুচকি হেসে বললো,
-“‘বাঙালিরা মাছের গন্ধ নাকে ঢুকলে আর বসে থাকতে পারেনা।”
আশাবরী হেসে ফেললো,
-“তুমি বুঝি অনেক বাঙালি দেখেছো?”
ভেলাম্মা আশাবরীর কথার উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে গেলো।আশাবরী পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল স্ক্রিন স্ক্রল করছিলো আর মুখে বাগেশ্রী গুনগুন করছিলো।
ভেলাম্মা স্থির দৃষ্টিতে আশাবরীর দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ ,তারপর বললো
-“এবাড়িতে এমন গান অনেকদিন হয়নি।তোমার মতো একজন থাকতো এই বাড়িতে,এই পরিবারের একজন।সেও এমন গুনগুন করে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতো ছেলের হাত ধরে।”
আশাবরী ভেলাম্মার স্মৃতিচারণের সাথে একটু পরিচিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু আজকের কথাগুলো যেনো অন্যরকম।কোথায় যেন এবাড়ির ছন্দপতন ঘটেছে,সেটা আশাবরীরও মনে হয়েছে দুয়েক বার।কিন্তু এখনো ঠিক ধরতে পারেনি সেই জায়গাটা।আজ ভেলাম্মার কথায় আশাবরীর আবার মনে হতে লাগলো,এবাড়িতে কোনো সুর বড়ো প্রাচীন,বড়ো গভীর হয়ে বাজছে,কিন্তু বড়ো করুণ তার রেশ।
আশাবরী ভেলাম্মাকে জিজ্ঞেস করলো,
-“সে কে ভেলাম্মা? তুমি কি ধ্রুপদের মা’র কথা বলছো”
ভেলাম্মা তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো -“কত কাজ পরে আছে,তোমার সাথে গল্প করলে চলবে?ওসব কথা পরে হবে।”
-“কাজই তো করছো।বলোই না।”আশাবরী নাছোড়বান্দা।
-“ধ্রুপদের মা খুব গুণী মেয়ে ছিলো।বাংলার মেয়ে এখানে এসে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলো।ছেলেকেও সবকিছুতে উৎসাহ দিতো।তারপর একদিন সব শেষ হয়ে গেলো।সব ছেড়ে চলে যেতে হলো।আর এবাড়িতে কখনো ফিরে আসেনি।” ভেলাম্মা একটু দম নিলো।
-“সে চলে যাওয়ার পর থেকেই এবাড়িতে যত কুনজর লাগলো। একে একে সব ফাঁকা হয়ে গেলো।” ভেলাম্মার গলা গভীর খাদে নেমে গেছে,
তারপর আপনমনেই বলে উঠলো,
-“ছেলেও তেমনি সারাদিন নিজের খেয়ালেই ডুবে থেকে সব ভুলে আছে।ভেতরে ভেতরে সব চেপে রাখে।কারো সাধ্যি নেই সেসব তার মধ্যে থেকে বার করে। সিন্দুক আছে,সিন্দুক!”
তারপর রান্না থামিয়ে আশাবরীকে বললো
– “তুমি যাও ওঘরে, এইখানে গরমে বসে কাজ নেই। আমি সব হয়ে গেলে খেতে ডাকবো।”
আশাবরী আর জোরাজুরি করলোনা।উঠে পড়লো। ধ্রুপদের মধ্যে একটা গভীর রহস্য আশাবরী বরাবর অনুভব করতে পারে,আজ বোধহয় তার কিছুটা আভাস পেলো।আশাবরী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধ্রুপদের স্টুডিওর ভেজানো দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলো, দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধ্রুপদের মুখ,ইজেলের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে।বাইরে বৃষ্টিও ধরে আসছে।আশাবরীর হঠাৎ মনে হলো একটু ঘুরে আসে ।চারপাশের ভেজামাটির গন্ধ ভেসে আসছে।তারপর কি মনে করে ধ্রুপদের স্টুডিওর দরজায় নক করলো, মুখ বাড়িয়ে বললো -“আপনার ধ্যানভঙ্গ হলে একবার ঘুরে আসি আশেপাশে”?
ধ্রুপদ আর্মচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলো,তারপর আশাবরীকে অবাক করে দিয়ে বললো,
-“Yes, I exactly know where to take you”!

আশাবরী আর ধ্রুপদ দুজনেই যেভাবে ছিলো, সেভাবেই বেরিয়ে পড়লো। ধ্রুপদ পরনের মুন্ডুবেষ্টি আদ্ধেক গুটিয়ে কোমরে জড়িয়ে নিয়ে মোটরবাইক স্টার্ট দিলো। ধ্রুপদের রয়েল এনফিল্ডের সওয়ারি হলো আশাবরী।বাইকে বসার অভ্যেসটা বহুদিন নেই।তাই বসার পর ব্যালেন্স করতে একটু অসুবিধাই হচ্ছিলো আশাবরীর।ধ্রুপদ খুবই সাবধানে স্টার্ট দিলো,তবু আশাবরী টাল সামলাতে না পেরে ধ্রুপদের দিকে ঝুঁকে পড়লো। ধ্রুপদ বললো
-” সংকোচ করে লাভ নেই কাঁধে ভর না দিলে উল্টে পড়বে অতএব নিশ্চিন্তে আমাকে ছুঁতে পারো।”
ধ্রুপদের গলার রসিকতা আশাবরী ধরতে পেরেছে।দুজনেই হেসে ফেললো।

লোকালয়কে বেশকিছুটা ছাড়িয়ে এসে ওরা জঙ্গলের রাস্তা ধরে,সমতল ভূমি থেকে একটা টিলার উপর উঠে এলো।ওপরে উঠে মোটরবাইক থামতেই আশাবরী সামনে তাকিয়ে হাসলো, বিরাট একটা জলাশয়, যার ওপার প্রায় দেখাই যায় না। জলাশয়ের চারিপাশের পাড়টা উঁচু হয়ে টিলার আকার নিয়ে নিয়েছে। দূরে ধূসর মেঘ করে আছে। স্বচ্ছ জল টলটল করছে। ভেজা হাওয়া জলের ওপর পড়ে বিলি কেটে যাচ্ছে। একপাড়ে একটা সজনে গাছের নীচে কাঠ দিয়ে বানানো একটা বেঞ্চি। ওরা অনেকক্ষণ বসে রইলো। আয়েশ করে দুটো সিগারেট খেলো।কারো মুখে তেমন কথা নেই।শুধু বাতাসের চলাফেরা।

আকাশে মেঘ আবার ঘন হয়ে আসছে।আশাবরী আর ধ্রুপদ দুজনেই সেদিকে তাকিয়ে রইলো।আশাবরীর খুব ইচ্ছে করলো ধ্রুপদকে ছুঁয়ে দেখে।আরো কাছ থেকে।যতটা কাছে গেলে ভেলাম্মার বলা সেই সিন্দুকটার খোঁজ পাওয়া যায়।ধ্রুপদ আকাশের দিকে তাকিয়েই বললো -“চলো ফেরা যাক।বৃষ্টি ভিজে অসুখ বাঁধিয়ে ফেললে ছবির জন্যে পোজ কে দেবে?!”
আশাবরী ধ্রুপদের দিকে তাকিয়ে বললো -“রোগীদের ছবি বুঝি ভালো আঁকতে পারো না?”
এই কথায় আশাবরী ও ধ্রুপদ দুজনেই হোহো করে হেসে উঠলো,আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। আশাবরী ধ্রুপদের হাত ধরে টেনে বললো
-“চলো চলো।আর দেরি করা ঠিক হবেনা।”
আশাবরীর টানাটানিতে ধ্রুপদ উঠে দাঁড়ালো।আশাবরীর মুখে বৃষ্টির জল বিন্দু বিন্দু ঝরে যাচ্ছে। ধ্রুপদ নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে রইলো।আশাবরীর চোখে চোখ রেখে। তারপর আলতো করে আশাবরীর ঠোঁটে চুমু খেলো।অপ্রত্যাশিত চুম্বনে আশাবরী স্তম্ভিত,ভালোলাগা আর চমক মিলে আশাবরীর মধ্যে ঘূর্ণির মতো ঘুরপাক খেতে লাগলো।ধ্রুপদ নিজের ব্যবহারে নিজেই কিছুটা অবাক হয়েছে।তড়িঘড়ি বাইকে উঠে বসবে,আশাবরী সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,তারপর ধ্রুপদের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখলো।আশাবরীর মনে হলো পৃথিবীতে এই মুহূর্তের মতো ভালো কিছু আর নেই।সব স্তব্ধ,নিশ্চল হয়ে আছে।শুধু ধ্রুপদ আর ওর ঠোঁটের মাঝে জীবনের সবটুকু আস্বাদ লেগে আছে।আশাবরী ধ্রুপদের আরো কাছে সরে এলো,হৃদপিন্ড অতিমাত্রায় সচল।আরো গাঢ় প্রশান্তি নেমে আসছে দুজনের মাঝে।

( ক্রমশঃ)

উদ্ধৃতি: Jim Morrison
চিত্র: Santanava Roy

4 thoughts on “পর্ব ২৫: পূর্বরাগ”

Comments are closed.