দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ২৪: মাটির টানে

এর আগে: আশাবরী দেশে ফিরে আসে। কলকাতা হয়ে চেন্নাইতে মাসির বাড়ি। শুরু করে নতুন কর্মজীবন। ব্যাঙ্গালোরের এক চিত্র প্রদর্শনীতে ধ্রুপদের আঁকা ছবি দেখতে পায়।
Madurai, Tamil Nadu.

এয়ারপোর্টে নামার পর আশাবরী ভেবেছিলো তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে। হিসাবমতন দেড় ঘন্টার রাস্তা। এমনিতেও কাজের চাপে এই কয়েকমাসে এখানে আসার প্ল্যানটা পিছিয়ে সেই বর্ষা চলে এলো। সেই কারণেই এবার প্লেনে মাদুরাই হয়ে আসার প্ল‍্যান করেছিলো কিন্তু শহরের ভীড় কাটিয়ে করাইকুড়ির রাস্তায় পড়তে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেলো। মাদুরাইয়ের বাইরে দেখা যায় ভাইগেই নদী। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পূর্ব দিকে অবস্থিত কম্বম উপত্যকাকে দুভাগে ভাগ করে এই নদী আরো দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে গেছে। ভাইগেই শব্দের অর্থ হল আ৺জলা করা হাত বা অঞ্জলী মুদ্রা।

*গল্প প্রচলিত আছে- পান্ডিয়ান রাজার মেয়ে মীনাক্ষী ( পার্বতীর আরেক রূপ) ভগবান সুন্দরেশ্বর অর্থাৎ শিবকে বিয়ে করার পণ করেছিলেন। আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তার পরিবার সেই বিয়ে দিতে রাজী হয়। বরযাত্রীদের জন্য প্রচুর ধুমধাম করে বিশাল এক ভোজসভার আয়োজন করেন পান্ডিয়ান রাজা। কিন্তু শিব, কুন্দদর‌ নামে মাত্র একজন শিষ‍্যকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছান বিয়ে করতে। রাজা এতে রেগে গিয়ে শিবকে সেই বিপুল ভোজের আয়োজন দেখিয়ে অপমান করেন। শিব উত্তরে বলেন যে তার শিষ‍্য একাই ওই রাশি রাশি খাবার খেয়ে নিঃশেষ করে দিতে পারে এবং তার আদেশে কুন্দদর একে একে সমস্ত পদ সাবাড় করে ফেলে।এরপর তার পায় চূড়ান্ত জলতেষ্টা। মাদুরাইয়ের সমস্ত জলাধার,কুয়ো আর পুকুরের জল নিঃশেষ করেও তার তেষ্টা মেটানো যায়না। শিব তখন কুন্দদরকে দুহাত বাড়াতে বলে নিজের ‌জটার এক অ়ংশ খুলে দেন। জটা খুলতেই গঙ্গা নেমে আসেন কুন্দদরের হাতে, সে আঁজলা ভরে জলপান করে তেষ্টা মেটায় আর হাত থেকে ঝরে পড়া বাকি জল থেকে ভাইগেই নদীর জন্ম হয়।

আশাবরী ফ্লাস্ক থেকে একটু সুক্কু কফি ঢেলে খেলো। আজকাল ক‍্যাফেইন ছাড়ার চেষ্টায় আছে তাই মাসির বানানো আদা, ধনের বীজ আর মধু দেওয়া এই নতুন পানীয়টা বেশ কাজে দিচ্ছে। ড্রাইভার ছেলেটি চালাচ্ছিলো ভালো। সবুজ উর্বর শস‍্য-শ‍্যামলা মাটি,ধানক্ষেত সব দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে গ্রামগুলোতে বসেছে ছোট ছোট সব্জির হাট। ফুলের মালা,কলার কাঁদি,নারকেল,আরো কত কি বিকিকিনির পর্ব চলছে। যেখানে গাড়ি ঢিমে হচ্ছিলো আশাবরী মুখ বাড়িয়ে দু’একটা ছবি তুলছিলো। গাড়ি এগিয়ে চললো আরও দক্ষিণের দিকে।

আশাবরীর একটু চোখ লেগে গেছিলো হঠাৎ ফটাশ করে একটা আওয়াজ হয়ে গাড়িটা ডান দিক বরাবর কাত হয়ে চলতে শুরু করলো । ড্রাইভার কোনোরকমে গতি সামলে রাস্তার একপাশে দাঁড়ালো। গাড়ির হাবভাব দেখেই আশাবরী বুঝতে পেরেছে টায়ার গেছে। নিজে গাড়ি চালায় বলেই পরিস্হিতিটা বুঝতে সময় লাগেনি। ড্রাইভার ছেলেটি গাড়ির ডিকি থেকে স্টেপনি বার করছিলো, আশাবরী নেমে গিয়ে হাত লাগাতেই বোধহয় লজ্জা পেয়ে চিৎকার করে উঠলো,
-“ম‍্যাডাম, ম‍্যাডাম, আপনি ছেড়ে দিন
আমি করে নিচ্ছি, হাত ময়লা হবে।”
-“ময়লা হলে ধুয়ে নেব। তুমি নীচে জগ লাগাও আমি নাট খুলছি, স্প‍্যানার দাও।” আশাবরী টুলবক্স থেকে স্প‍্যানার তুলে নিলো।
রাস্তা দিয়ে মোটরবাইকে করে দুজন গ্রামবাসী যাচ্ছিলো, ড্রাইভারের সঙ্গে আশাবরীকে চাকা লাগাতে দেখে নিজেরাই দৌড়ে এলো। ধরাধরি করে চাকা লাগাতে সাহায্য করলো।
ড্রাইভার তড়িঘড়ি জলের বোতল আর সাবান নিয়ে এলো আশাবরীর জন্য। আশাবরী হাত ধুতে ধুতে বললো
-“তোমার স্টেপনির অবস্থা তো ভালো নয়, বাকিটা রাস্তায় কোনো প্রবলেম হবে নাতো?”
ড্রাইভার খানিকটা ইতস্তত হয়েই মাথা নাড়লো যে ঠিক পৌঁছে যাবে।

এবার মাটির রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে। সবুজাভ আচ্ছাদন উঠে গিয়ে লাল ল‍্যাটেরাইটের জমি, উঁচু নীচু ঢিপি উঁকি দিচ্ছে, রুক্ষতা বাড়ছে, যেনো একটু অভিমান সবুজের উপর। এই ট্রান্সিশানটা ওর চমৎকার লাগে,আগেরবার ট্রেনে আসার সময়ও এটা লক্ষ্য করেছিলো কিন্তু এবার যেন আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলো। দূরে আকাশে মেঘ জড়ো হচ্ছে।

রাস্তা দিয়ে স্কুল ইউনিফর্ম পরা একদল ছেলেমেয়ে বাড়ি ফিরছে, মেয়েদের চুল রিবন দিয়ে যত্ন করে বাঁধা,পিঠে ব‍্যাগ। পিছনে ছেলের দল একে অপরের কাঁধে ভর দিয়ে বা গলা জড়িয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে দুইদলের মধ্যে ঠাট্টা-খুনসুটিও হচ্ছে। মেয়েরা কটাক্ষ করছে কখনো, কখনো আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে।

বৃষ্টি নামলো ঝিরঝির করে। রাস্তা দিয়ে গরু ছাগলের ছোট ছোট দল নিয়ে যারা ফিরছিলো,তারা এবার দ্রুত পা চালালো। আশাবরী কাঁচ নামিয়ে জানালার বাইরে হাত বাড়ায়।বৃষ্টি বেশ জোরে এসে গেলো,

“… पलकों पर एक बूंद सजाये
बैठि हूं सावन ले जाये
जाये पी के देस में वरसे “

Karaikudi

ধ্রুপদ স্টেশনে গেছিলো একটা কুরিয়ার প্যাকেজ রিসিভ করার জন্য। প্রিন্ট মেকিং এর কিছু কেমিকাল ডাই ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিল্লি থেকে আসার কথা ছিলো। মধ‍্যেখানে বৃষ্টি নেমে যাওয়ায় স্টেশনেই অপেক্ষা করছিলো। একটা সময় বৃষ্টি থামলে, বাইক স্টার্ট করে বেরিয়ে পড়লো। ফেরার রাস্তায় দেখতে পেলো একটা সাদা টয়োটা গাড়ি রাস্তার মাঝখান জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সম্ভবত চাকা খারাপ হয়েছে। গাড়ির ড্রাইভার টায়ার নিয়ে ধস্তাধস্তি করছে।ধ্রুপদ রয়াল এনফিল্ডটাকে একটা গাছ তলায় দাঁড় করিয়ে রেখে,গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো।
ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলো
-” স্টেপনি কই”?
ড্রাইভার কাঁচুমাচু মুখে উত্তর দিলো
“এটাই স্টেপনি ছিলো, এখন দুটো টায়ারই অকেজো হয়ে গেলো।”
ধ্রুপদ কিছুক্ষণ ভেবে বললো
-“এক কাজ করো আমি একটি ছেলেকে বাইকে পাঠাচ্ছি, ওর সাথে টায়ার নিয়ে টাউনের দিকে চলে যাও, ওখানে শান্মুগাম অটো সার্ভিস আছে, ঘণ্টা দুয়েকের ব্যাপার, স্টেপনি সারিয়ে চলে এসো।ততক্ষণ গাড়ির চাবি আমার কাছে রাখতে পারো আমি কাছেই থাকি। গাড়িটা এই মাঝরাস্তায় না রেখে এসো একটু ঠেলে সামনের গাছ তলাতে নিয়ে যাই।”
ড্রাইভারটি বলে উঠলো
-“কিন্তু ম্যাডামের তাহলে কি হবে?”
শুনে ধ্রুপদ বললো
-“ম্যাডাম কোথায়”?
-” ওই যে, ওই বাড়ীটার পিছন দিকে গেছেন ফোন করতে। এখানে ভালো সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছিলো না”
ড্রাইভার সামনের পুরনো পোস্ট অফিস বিল্ডিংয়ের দিকে ইশারা করলো।
-” বেশ ঠিক আছে আমি তোমার ম্যাডামের সাথে কথা বলে দেখছি, তোমার ফোন নাম্বারটা দাও”
ড্রাইভারের ফোন নাম্বার নিয়ে ধ্রুপদ পুরনো পোস্ট অফিস ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলো। বারান্দায় মেয়েটি বসে, ফোনে বেশ বিরক্তির সুরে কারোর সাথে কথা বলছিলো, গাড়ির চাকা খারাপ হওয়ায় বোধহয় বেশ বিব্রত।
ধ্রুপদ মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো
-“মনে হচ্ছে আরো একবার আমার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে, তবে এবার গৃহকর্তার অনুমতি ও আতিথ্য দুটোই মিলবে।”
আশাবরী ফোনের কথাবার্তায় বিরক্তির ভাব কেটে গিয়ে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ধ্রুপদের দিকে। মাথার চুলে হাল্কা কাঁচাপাকা ভাব এসেছে ধ্রুপদের। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকায় পর ফিক করে হেসে ফেললো আশাবরী। ধ্রুপদ এতদিন পর দেখছে ওকে। চেহারায় একটা ক্লান্তির ছাপ পড়েছে কিন্তু হাসিটা এখনও একইরকম আছে আশাবরীর।

ভেলাম্মার নাতি বালাজিকে ড্রাইভার এর সাথে পাঠানো হয়েছে গাড়ির চাকা সারাতে। ভেলাম্মা কফি বানিয়ে এনেছে দুজনের জন্য সঙ্গে থাট্টে ভাজা আর চিজ পকোড়া। মার্কাস গন্ধ পেয়ে একটু দূরে এসে বসেছে সামনের বারান্দায়। ভেলাম্মাকে আগেরবার দেখতে পায়নি সে তাই এবার একটু অবাক হয়েই চেয়েছিলো। বয়স হয়ে গেলেও কি স্নিগ্ধ আর সুন্দর। সাদা চুলের খোঁপায় তাজা ফুলের মালা, উজ্জ্বল নীলাভ দক্ষিনী কটন সিল্কের শাড়িতে ভেলাম্মাকে অপূর্ব লাগছিলো। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে আশাবরীকে অভ্যর্থনা করলো, আশাবরী বাঙালি, এটা শুনে ভেলাম্মা কিছুক্ষণ ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো। তারপর কফি,আর খাবার টেবিলে নামিয়ে রেখে বললো, দুপুরে খাবার তৈরি আছে কিন্তু বাড়িতে কোনো মিষ্টি নেই,যদি আশাবরী মিষ্টি খেতে চায় তাহলে পায়সম বানিয়ে দেবে।আশাবরী খুশি হলো ভেলাম্মার কথায়,অতিথি সমাদরে।ভেলাম্মাকে অনেক ধন্যবাদ জানালো আর বললো তার প্রয়োজন নেই। ভেলাম্মা চলে যেতেই
আশাবরী এবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলো। আগেরবারের চেয়ে এবারে যেন সামান্য হাল ফিরেছে বাড়িটার। সামনের ভাঙ্গা গেটটা সারানো হয়েছে। আতাঙ্গুডি টাইল কিছু ভেঙে চটে যাওয়া ছিলো সেগুলিও নতুন বসানো হয়েছে।

ধ্রুপদ আশাবরীকে কফির মাগ এগিয়ে দিতে দিতে বললো
-“এখানেই আসছিলে যখন, আমাকে আগে জানাওনি কেন”?
আশাবরী কফিতে চুমুক দিয়ে একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললো
-” এদিকে আবার এসেছিলাম আমাদের ট্রাভেল ওয়েব ম‍্যাগাজিনের তরফ থেকে একটা স্টোরি বানাবার কাজে, তার সাথে ইচ্ছে ছিলো তোমায় একটা সারপ্রাইজ দিতে কিন্তু আবার আমার ভাগ্য বিরূপ। তবে আরো একটা ব‍্যাপার আছে…”

-“কি ব‍্যাপার?” ধ্রুপদ সামান্য উদগ্রীব। কফিটা রেখে আশাবরী টোট ব‍্যাগ থেকে বিদেশি আর্ট গ্যালারির একটা ত্রৈমাসিক বার করলো,দু’তিনটে পাতা উল্টিয়ে একটা ছবিওয়ালা পেজ ধ্রুপদের সামনে মেলে ধরলো। ছবিতে একটি মেয়ে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ল্যান্টার্ন, ঘন নীলাভ
দৃশ্যপট। নীচে ছবি ও শিল্পীর নাম রয়েছে। ‘Ashabari’ by Dhrupad Subramaniam। ধ্রুপদ দেখে বেশ লজ্জা পেলো।

-” এ বাবা তুমি এর মধ্যে দেখেও ফেলেছ, আমি ভাবছিলাম…”
-“যে আমায় জানাবে না তাই তো?! কিন্তু এই সোশাল মিডিয়ার যুগে আর সে উপায় নেই মশাই। আর আমি সাংবাদিক সেটা মনে রেখো। অতএব…” আশাবরী এবার কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে বসলো।
“অতএব কি”? ধ্রুপদ একটু ধন্ধে পড়লো।
-“কপিরাইট লাগবে!” বলে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে তাকালো ধ্রুপদের দিকে।
-“বেশ, বলো কি ভাবে চাও? ধ্রুপদ জিজ্ঞেস করে। – “একবার কল্পনা থেকে এঁকেছ, এবার একখান জলজ‍্যান্ত পোর্ট্রেট এঁকে দিতে হবে।” আশাবরীর সুরে আব্দার মেশানো।
-” Si seniora..” বলেই ধ্রুপদ মার্কাসের দিকে একটুকরো ভাজা এগিয়ে দেয়, মার্কাস লেজ নেড়ে এসে সেটা নিয়ে ফের নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। এবার আড্ডার মেজাজে ধ্রুপদ জিজ্ঞেস করে
-“এদেশে কতদিন থাকার প্ল্যান.. ফিরছো কবে”? কিছুক্ষণের জন্য একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা এলো দুজনের মধ্যে। একটা অস্বস্তির বিরাম।আশাবরী সোজা ধ্রুপদের চোখের দিকে তাকালো। ওর চোখের কোণটা হাল্কা চিকচিক করেই যেন মিলিয়ে গেলো।

(ক্রমশঃ)

উদ্ধৃতি: Gulzar
চিত্র: Santanava Roy

1 thought on “পর্ব ২৪: মাটির টানে”

Comments are closed.