এর আগে: ইন্দ্রাণী মুখার্জি আসার পরে আশাবরীর সংসারে জটিলতা বাড়ে। অরুন্ধতী বসুর বাড়িতে ওনাকে কাছ থেকে জানতে পেরে আশাবরী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। সেখানে দেখতে পায় এক চেনা শিল্পীর আঁকা ছবি। ফেরার পথে আবার রাজীব অপমান করে আশাবরীকে।
Sydney
রবিবার সিডনির আলেক্সান্ড্রিয়া টাউন হলে অরুন্ধতীর গানের অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পেলো আশাবরী। আশাবরীকে সপরিবার সেখানে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন তিনি।
রাজীবের মায়ের সাথেও বেশ খানিকক্ষণ ফোনালাপ সারলেন।ইন্দ্রাণী মুখার্জী খুব আগ্রহ দেখালেন।
সন্ধ্যাবেলা তিনজন মিলে হাজির হলো অনুষ্ঠানে।অরুন্ধতী ও আরো দুজন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীর পরিবেশনা থাকবে।
আশাবরী,রাজীব আর ইন্দ্রাণী তিনজনেই এসেছে ভারতীয় পোশাকে।ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারাল স্টাইলের এই হল অস্ট্রেলিয়ান হেরিটেজ।কমিউনিটি হল হিসেবেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
এদের এখানের টাউন হলগুলিরও আ্যাকুস্টিক্স এত চমৎকার, মনে হয় কোনো অডিটরিয়ামে বসে আছে ।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেখা গেলো, বেনও এসেছে পাঞ্জাবী পরে।আশাবরীদের দেখেই খুশি হয়ে এগিয়ে এলো,রাজীবের মায়ের সাথে পরিচয় করলো নিজেই।আশাবরী হালকা খোঁচা দিলো -“এক্কেবারে ভারতীয় হবার চেষ্টা!”
বেনও পাল্টা জবাব দিলো
-“সবই আপনাকে ইমপ্রেস করার জন্যে”বলেই চোখ টিপলো।
আশাবরী হেসে ফেললো।
রাজীব কথাটা শুনতে পেয়েছে।
-“তোরা কি এখন সবার সামনেই নিজেদের প্রেম জাহির করছিস এভাবে?”
আশাবরী অবাক হয়ে বললো
-“এটা তোর প্রেম মনে হচ্ছে?!বেশ বুদ্ধিমান হয়ে উঠছিস আজকাল।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে অন্য দুজন শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করলেন।শেষে এলেন অরুন্ধতী।
বাগেশ্রীর আলাপ ধরলেন।স্বরমালিকার আবেগ ছুঁয়ে গেলো সকলকে।
রাগ বিস্তার শুরু হলে পুরো হলঘর জুড়ে যেনো সুরের ছায়া নেমে এলো।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো আশাবরী তাকিয়ে রইলো অরুন্ধতীর দিকে।অরুন্ধতীর মুখে আলো পড়েছে স্পটলাইটের।চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছেন বোলগুলো। আশাবরীর মনে হলো ও যেনো এই হলঘরের বাইরে অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে।শিবরঞ্জনীর তানপুরা,মাসিমনির রিয়াজ,সব দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে।কারাইকুড়ির সেই ঝুম বৃষ্টি যেনো সারা শরীরে নেমে আসছে।আর কোথাও কেউ নেই,আশাবরী সেই বৃষ্টিতে ভিজছে একা।নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে আশাবরী।একজোড়া চোখ মনে পড়লো আশাবরীর।যে দৃষ্টি ভুলতে পারেনি কখনো।হৃদস্পন্দন সুরের সঙ্গতে ওঠাপড়া করছে।
অনুষ্ঠান শেষ হলে আশাবরী,রাজীব,রাজীবের মা তিনজনেই অরুন্ধতীকে সাধুবাদ জানাতে গেলো।আশাবরীকে দেখে অরুন্ধতী আনন্দিত হলেন।সকলের সাথে কথা বললেন আর সকলকে আরো একবার ওনার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন।
অরুন্ধতীর প্রশংসা করতে গিয়ে আশাবরীর চোখে জল চলে এলো,ভালো করে কিছু বলতে পারলোনা। মানুষটাকে প্রণাম করতে ইচ্ছে করছে।জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে আপনি অসাধারণ গেয়েছেন।অপার্থিব সুরে আপনি ভরিয়ে রেখেছিলেন সময়টা।কিন্তু কিছুই বলা হলোনা।অরুন্ধতী বাকিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখছিলেন আশাবরীকে।বোধহয় ওর মনের কথা বুঝতে পেরেই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন আশাবরীকে।
কানে কানে বললেন
-“সুরের অসীম ক্ষমতা আশাবরী।অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, আবার অনেক ক্ষত মুছে দেয়।তোমাকে শ্রোতা হিসেবে পাওয়া সৌভাগ্যের মতো।”
অরুন্ধতীর কথাতেই কি না বোঝা গেলোনা আশাবরী নিজেকে সামলে নিলো।
বললো
– “এমন একটি সন্ধে উপহার দেবার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবার ধৃষ্টতা করবোনা।ভালো থাকবেন।”
রাজীবের মা অরুন্ধতীকে নিমন্ত্রণ জানালেন ওদের এপার্টমেন্টে যাবার জন্যে।
রাজীবের চোখ বেনের দিকে।বেন অরুন্ধতীর সাথে দেখা করেই চলে গেছে।ওর বিশেষ তাড়া আছে মনে হলো।
গাড়িতে ফিরতে ফিরতে আর কেউ তেমন কথা বললোনা।শুধু রাজীবের মা বললেন
-“কি দারুন অভিজ্ঞতা।এখনো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।”
আশাবরী মনে মনে হাসলো।
আশাবরীর গা ম্যাজ ম্যাজ করছিলো, বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছেনা।সকালে হাঁটতেও বেরোয়নি দুদিন।রাজীব অফিসে বেরিয়ে গেছে অনেকক্ষন।রাজীবের মা ব্রেকফাস্টের জন্য ডেকেছিলেন।আশাবরী শুধু কফি খেয়েছে।মুখে স্বাদ পাচ্ছেনা।বেডরুম লাগোয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পাশের এপার্টমেন্টের বারান্দায় সেই শ্রীলঙ্কান ভদ্রমহিলা ও তার হাসব্যান্ডকে দেখতে পেলো।গাছে জল স্প্রে করছেন,আর ভদ্রলোক চেয়ারে বসে কেটে রাখা আম খাচ্ছেন,আর মাঝে মাঝে একটুকরো স্ত্রীর মুখে তুলে দিচ্ছেন।এমন ভালোবাসামাখা একটা দৃশ্য গ্রীষ্মের সকালকেও আদুরে করে দিলো।ভদ্রমহিলা আশাবরীকে দেখে হাত নাড়লেন।তারপর স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে গল্প করতে বসলেন।আশাবরী আস্তে আস্তে ঘরে চলে এলো,ওদের ভালোবাসা মাখা সময়ে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে থাকতে চায়না সে।
সকাল থেকে তিন চারবার বেনের মেসেজ এসেছে।দেখা করতে চায়।আশাবরী বিকেলে বেরোলো,কাছাকাছি একটা ক্যাফেতে বেন আর ও বসেছে।কফি নিয়ে বসেছে দুজনে,এখন সূর্যাস্ত হতে রাত আটটা বাজে প্রায়। আশাবাদী যে একটু বিমর্ষ হয়ে আছে বেন সেটা লক্ষ্য করেছে। কিন্তু কি কারণ সেটা জানতে চায়নি। কিছুক্ষণ চুপচাপ কফি খাওয়ায় পর বেন আশাবরীকে বললো
-“আমি তোমাকে কিছু দিতে চাই।”
আশাবরী অবাক হলো,
-“তুমি আবার কি দেবে আমাকে?”
বেন বললো
-“উপহার”
আশাবরী না বোঝার ভান করে বললো,
-“কিসের উপহার?”
বেন ওর ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বার করলো
-,”এইটা তোমাকে দিতে চাই।আমাদের নিজস্ব হাতে তৈরী জুয়েলারি।এবরিজিনাল কালচারের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।”
ফিরোজা রঙের বিডের ওপর এক্রিলিক পেইন্টিং করা।আশাবরী মুগ্ধ হলো দেখে।
-“কিন্তু বেন আমি কি করে তোমার উপহার নেবো?”
-“কেন?আমি কি তোমাকে গিফট দিতে পারিনা?”এরপরে বেন ওই বিডগুলোতে আঁকা প্রতিটি পেইন্টিংয়ের যে আলাদা অর্থ আছে,আর প্রতিটি রং ও ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে একেকটি গোষ্ঠীর কাছে সেটা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলো।
আশাবরী মন দিয়ে শুনছিলো কথাগুলো,সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস।
হঠাৎ আশাবরী খেয়াল করলো রাজীব ওদের দিকে হেঁটে আসছে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজীব বেন আর আশাবরীকে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো
-“প্রেম তাহলে জমে উঠেছে!?
শি মাস্ট বিন ওয়ান হেল ওফ আ গুড লে”!?
-“রাজীব!” আশাবরী চিৎকার করে ওঠে
বেন রাজীবকে কিছু একটা বলতে যায়।
-“ইউ ব্লাডি ফ্লার্ট!আমার স্ত্রীর পেছনে সারাদিন সারারাত পড়ে আছো!”বেন কে আরো কুৎসিত কিছু গালি দিয়ে আশাবরীকে হ্যাচকা টান মেরে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসতে গেলো রাজীব।
আশাবরী ও বেন দুজনেই হতভম্ব,কাফে ভর্তি লোকজনও ওদের দিকে তাকাচ্ছে।অপমানে লজ্জায় আশাবরী কুঁকড়ে গেলো।বেনকে কোনোরকমে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলো ওরা।
গাড়িতে বসে কিছু অশ্রাব্য কথা আশাবরীকে বললো রাজীব।আশাবরী শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইলো।এরকম একটা জঘন্য ঘটনার অংশ হতে হবে আশাবরী কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি।
রাজীব ঘরে ঢুকেই চাবিগুলো ছুঁড়ে দিলো সেন্টার টেবিলের ওপর। আশাবরী রাজীবের এরকম মূর্তি আগে দেখেনি,এমন কি হয়েছে!?
আশাবরীর মনেও এবার তীব্র রাগ দানা বাঁধছে।
রাজীবের মা ছুটে এসেছেন চাবি ছোঁড়ার শব্দে।উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞেস করলেন-
-“কি হয়েছে বাবু?!এরকম করছিস কেনো?”
রাজীব উত্তর দিচ্ছেনা, শুধু আশাবরীর দিকে তাকিয়ে আছে।রাজীবের মা ওর গায়ে পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
-“কি হয়েছে আমাকে বল!আমি সব ঠিক করে দেবো।”
-“কি ঠিক করবে মা?!একজন যথেচ্ছ চড়ে বেড়াচ্ছে।তুমি আটকাতে পারছো?এক ছোকরা জুটিয়েছে,তার সাথে দিন নেই রাত নেই,সংসার ফেলে,দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুয়েছেও কিনা কে জানে! আর তুমিও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছো।” রাজীবের গলার স্বর বেশ উঁচুতে,আশাবরী বেডরুম থেকে শুনতে পাচ্ছে।
রাজীবের মা কি বলছেন তেমন বোঝা যাচ্ছেনা।তবে বেশিক্ষণ লাগলোনা বুঝতে,তিনি নিজেই এলেন বেডরুমে আশাবরীকে বোঝাতে-
“দেখো আশাবরী,তোমাদের মধ্যে কি হয়েছে আমি জানিনা।তবে সংসার ফেলে অহেতুক ঘুরে বেড়ানোটা তোমারও ভুল হয়েছে।আর কোন ছেলের সাথে ঘুরছো, বিদেশ বিভূঁইয়ে একটা অঘটন ঘটলে তোমার বাবা মা কে কি জবাব দেবো আমরা?”
আশাবরী এইবারে ফোঁস করলো,
-“অঘটনটা কিন্তু তোমার ছেলের সাথে থেকেই হয়েছিল। তখন আমার বাবা-মাকে যা উত্তর দিয়েছিলে,যদি দিতে হয়ে থাকে আদৌ,তাহলে এখনো সেই উত্তরটাই দিয়ো।আমি তোমার ছেলের ঘাড়ে চেপে সব জায়গায় ঘুরতে পারবোনা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”
কথাটা বলতে বলতে রাজীবও বেডরুমে ঢুকলো,বললো –
“মায়ের সঙ্গে কথা বলার ভদ্রতাটুকুও নেই?এসব ওই আদিবাসীটার শিক্ষা মনে হচ্ছে।”
আশাবরীর মনে হলো রাজীবকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দেয়।কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তির সামনে দাম্পত্য কলহের রুচি আশাবরীর হয়নি।
-“সেরকম শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে বেশ ভালোই হয়।”আশাবরী এই বলে জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে যাবে,পেছন থেকে রাজীব বললো
-“আমার মায়ের সাথে তোকে আর এভাবে কথা বলতে যেন না দেখি ।”
উদ্ধত রাজীবকে আশাবরী শুধু বললো
-“তোর আর আমার মাঝে তোর মাকে টেনে আনতেও আমি যেনো আর না দেখি!” রাজীব আশাবরীর দিকে এগোতেই ইন্দ্রাণী রাজীবকে থামিয়ে দিলেন। রাজীব প্রায় ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাথটাবের জলে ডুবে একটা তীব্র প্রতিবাদ কান্না হয়ে চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল আশাবরীর। মিশে গেল বাথটাবের জলের সাথে। অনেকক্ষন নিজেকে জলে ডুবিয়ে রাখলো আশাবরী।
স্নান করে বেরিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসলো।
ধ্রুপদ অনলাইন।
কারাইকুড়ি ফেরার পর এখন মাঝে মাঝেই ধ্রুপদ অনলাইন থাকে।কথাও হয় অনেক রাত অব্দি।আজকেও কথা হলো,আশাবরী নিজের সমস্যার কথা কিছুই বললোনা ধ্রুপদকে।
ধ্রুপদও নিজের নানা বিষয়ে কথা বললেও নিজের কথা তেমন কিছু বললোনা।
দুজনেই দুজনের কথায় ভুলে থাকলো বাকি সবকিছু।
(ক্রমশঃ)
