এর আগে: কড়াইকুরির বাড়িতে ধ্রুপদের স্কারলেটের স্মৃতি মনে পড়ে,তার মাঝে আবার রিয়েল এস্টেট মাফিয়াদের আগমন হয় ওর বাড়িতে। ওদিকে আশাবরী আর রাজীবের জীবনে এসে পড়েন রাজীবের মা ইন্দ্রাণী।
Rockdale, New South Wales
ইন্দ্রাণী মুখার্জী ছেলের সংসারের হাল খুব শক্ত হাতে ধরতে চেষ্টা করছেন।প্রতিটি ব্যাপারেই নিখুঁত দৃষ্টি।ছেলে আর পুত্রবধূর সমস্যাটিও ধরতে চেষ্টা করছেন।কিন্তু মুশকিল হলো ছেলেকে তিনি চেনেন কিন্তু বৌমার চরিত্র বুঝতে পারছেন না।বিয়ের পর সেভাবে একসাথে থাকা হয়নি।ফলে একেকসময় ভারী দোটানায় পড়তে হচ্ছে।মেয়েটি ঠিক কি চায় বুঝতে পারেননা।আপাত শান্ত হলেও মাঝেমধ্যে বেশ খামখেয়ালি লাগে আশাবরীকে।কিন্তু ইন্দ্রাণী মুখার্জী এতদিন ছাত্র পড়িয়েছেন,এক হাতে সংসারও সামলেছেন,তিনিও হাল ছাড়বেন কেন!?সারাদিন রাজীব আশাবরী দুজনেই প্রায় ঘরে থাকেনা।তিনি বই পড়ছেন,গান শুনছেন।সময় কাটতে চায়না।আশাবরী বাড়িতে থাকলে তবু দুটো কথা বলা যায়।
রাত অনেক হয়েছে,আশাবরী খাবার টেবিল সাজিয়েছে,খেতে বসে বেশ কিছুক্ষণ গল্প হলো।সবই রাজীবের বাড়ির কথা,কলকাতার কথা।আশাবরী কিচেন পর্ব সাঙ্গ করে স্নানে যাবে,তখনই ডাক পড়লো,
“আশাবরী শোনো!”
টু বেডরুম এপার্টমেন্টের এই ঘরটা বেশিরভাগ সময় খালি পড়ে থাকে,কখনো হয়তো আশাবরী ল্যাপটপ নিয়ে বসে,বিছানা থাকলেও সেটা ব্যবহার হয়নি এতদিন।এখন রাজীবের মা থাকছেন।ঘর যদিও অন্ধকার,বাথরুমের আলো দিয়েই আশাবরী ঘরে ঢুকলো,
“কিছু লাগবে?”
“না,একটু বসো আমার কাছে,
তোমার আপত্তি না থাকলে।”
আশাবরীর একটু অদ্ভুত লাগলো,এ কেমন কথা বলার ভঙ্গি,
“না না,আপত্তি থাকবে কেন?”
কথা বলতে বলতে আশাবরী ছোট টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিলো।শুয়ে আছেন রাজীবের মা। আশাবরীর হাতে তোয়ালেটা দেখতে পেয়ে বললেন
– “রোজ এতো রাতে স্নান করছো,ঠান্ডা লাগিয়োনা,দেখো।”
আশাবরী ধীরে উত্তর দিলো
-“স্নান না করলে ঘুম আসেনা”।
সঙ্গে সঙ্গে রাজীবের মা বললেন
– “ঘুমের আর দোষ কি!সারাদিন একই চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকলে ঘুম কি করে আসবে?কিন্তু তাই বলে তো জীবন থেমে থাকবেনা।সময়ের সদ্ব্যবহার করো।যা হয়েছে ভুলে যাও।আগামী দিন নিয়ে ভাবো।”
আশাবরী এই একই কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত।
-“এতো সহজে কি সব ভোলা যায়?নিজের সত্তার একটা অংশ কি করে মুছে ফেলি?”
খুব আস্তে আস্তে কথাগুলো বললো আশাবরী,তারপর রাজীবের মায়ের গাঢ় ঘুমের নিঃশ্বাসের শব্দ পেয়ে আলো বন্ধ করে বেরিয়ে এলো।কথাগুলো শুনলেও কি উনি বুঝতে পারতেন আশাবরীর মানসিক অবস্থা?আশাবরীর চোখ জ্বালা করে উঠলো।
সকাল সাতটায় আশাবরী মর্নিংওয়াক থেকে ফিরলো।দরজা খুলতেই কফি আর টোস্টের গন্ধ নাকে এলো।ভেতরে ঢুকে বুঝলো আজ রাজীবের মা ব্রেকফাস্টের দায়িত্ব নিয়েছেন।টেবিলে ছেলের পছন্দের বেকন,ফুল ফ্যাট কফি,টোস্ট,পোচড এগ,সসেজ,যাকে বলে এক্কেবারে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট।ভদ্রমহিলার এলেম আছে,ঘুম থেকে উঠেই এতসব তৈরী করতে বসে গেলেন।
আশাবরী নিশ্চিন্ত হলো,আজ আর হুড়োহুড়ি করে ওকে রান্নাঘরে ঢুকতে হবেনা।ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে রাজীব ভীষণ উৎফুল্ল,কতদিন মায়ের হাতের ব্রেকফাস্ট খায়নি বলে এমন আদিখ্যেতা করলো,আশাবরী আরেকটু হলে হেসেই ফেলতো।
রাজীবের মা টেবিলে বসেই বললেন
-,”মর্নিংওয়াকটা আরেকটু আগে সেরে এলে তুমিও এসব করে দিতে পারো আশাবরী।ওর অফিসের সময় হয়ে যায়,তাড়াহুড়ো করে খেতেও পারেনা।”
আশাবরী এইবারে এই এলাহী ব্রেকফাস্টের পেছনের কারণটা ধরতে পারলো,রাজীবের ঠিকভাবে খাওয়াদাওয়া হয়না,এই ধারণা নিয়েই ইন্দ্রাণী মুখার্জী আয়োজন করেছেন এত কিছু।আর খুব স্বাভাবিকভাবেই এর জন্যে দায়ী আশাবরী,কারণ ও মর্নিংওয়াকে গিয়ে দেরি করে ফেরে।
-“প্রতিদিন তো ওর পছন্দের ব্রেকফাস্টই করে দিতে চেষ্টা করি।ও তো কখনো কিছু বলেনা।”আশাবরী কথাটা বললো রাজীবের দিকে তাকিয়ে।
রাজীব একমনে বেকন চিবিয়ে যাচ্ছে।যেন ওর মা আর আশাবরীর কথাবার্তা কিছুই কানে যাচ্ছেনা।
-“সব কিছু তো বলে দিতে হয়না।তোমাকেও বুঝে নিতে হবে নিজের দায়িত্ব।আমি যখন থাকবোনা তখন কে বুঝিয়ে দেবে,বলো?” ইন্দ্রাণী মুখার্জী দমে যাবার পাত্রী নন।
আশাবরী উত্তর দিতে যাচ্ছিলো।কিন্তু রাজীব মাঝখান থেকে উঠে পড়লো,ওর খাওয়া হয়ে গেছে।কথাটা আশাবরী হজম করে ফেললো,এই মুহূর্তে এসব কথায় জড়াতে ইচ্ছে করছেনা।কিন্তু আশাবরীর সকালটা উচ্ছেসেদ্ধর মতো হয়ে গেলো।
আশাবরী স্নান করে তৈরী হচ্ছিলো, বেন কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে।এসে বড্ড তাড়া দেবে।অবশ্য এদেশে সবাই খুব পাঙ্কচুয়াল।এগারোটা বলেছে মানে এগারোটাই হবে।ইন্দ্রাণী মুখার্জী আশাবরীর বেডরুমে উঁকি দিলেন,আশাবরী একটা সামার জ্যাকেট আর ডেনিম পড়েছে আজ।গ্রীষ্মকাল প্রায় এসে গেছে।ভারী কিছু পড়া যাচ্ছেনা।আবার খুব হালকা কিছু পড়ারও সময় আসেনি।
-“বেরোচ্ছো কোথাও?”ইন্দ্রাণী মুখার্জীর প্রশ্নে আশাবরী ঘুরে তাকালো।
-“হ্যাঁ,একটা লাঞ্চের নেমন্তন্ন আছে আসলে।”আশাবরী সহজভাবেই বললো।
-“বাবু কে বলেছিলে?ও যদি জিজ্ঞেস করে আমাকে,কোথায় গেছো!” রাজীবের মা’র গলায় খোঁচা স্পষ্ট।
বেনের মেসেজ এসে গেছে।মোবাইলটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললো
-“আমি টেক্সট করে দিচ্ছি।কোনো প্রবলেম হবেনা।তোমার কোনো সমস্যা হলে আমাদের কাউকে ফোন কোরো।আমি বেরোলাম।”
আশাবরী সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রাজীবকে মেসেজ পাঠালো।
Hurstville, New South Wales.

ইউরোপীয় নকশার বাড়িটা থেকে মৃদু গানের আওয়াজ ভেসে আসছে।আশাবরী বুঝতে পারলো এটাই অরুন্ধতীর বাড়ি। কলিংবেল টিপতে হলোনা,দরজা ভেজানো ছিলো। দরজা দিয়ে ঢুকেই আশাবরী আর বেন বিশাল হলঘরে চাইনিজ, আফ্রো,ভারতীয়,ককেশীয় বিভিন্ন দেশ ও বয়সের কচিকাঁচাদের দেখতে পেলো। তারা প্রবল উৎসাহে গান গাইছে। আর সামনে স্মিত হাসি নিয়ে তানপুরা ধরে বসে আছেন অরুন্ধতী। হাতের ইশারায় দুজনকে বসতে বললেন। নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়লো আশাবরীর।এমন করে দিদি আর সে মাসির কাছে গান শিখতো।
আশাবরী কাঁচের দরজা দিয়ে দেখতে পেলো বাড়ির পেছনে খোলা ব্যাকইয়ার্ডে শুভ্র দাড়িওয়ালা একজন ইউরোপীয় চেহারার বয়স্ক সুপুরুষ পায়চারি করছেন। দরজাটা একটু ফাঁকা করে রাখা,বোধহয় হাঁটতে হাঁটতে গান শুনছেন। বেন সেইদিকে চলে গেলো।ইনি বেনের টিচার ছিলেন।বেনের কাছে অনেক শুনেছে ওনার গল্প।রাজীব এলে খুব ভাল লাগতো। বাচ্চারা চলে গেলে অরুন্ধতী জিজ্ঞেস করলেন –
-“তোমার চা চলবে নাকি ওয়াইন নেবে? আমার কাছে এখন শুধু হোয়াইট আছে, পিনো-নোয়ারটা ফুরিয়েছে।”
আশাবরী চা নিতে রাজি হলো। অরুন্ধতী ওর সামনে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন
-“তুমি এসেছ,আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।”
আশাবরী বললো
-“আমার সৌভাগ্য যে আপনার কাছে আসতে পেরেছি।” তারপর ইতস্তত ব্যাকইয়ার্ড এর দিকে তাকাতেই অরুন্ধতী বললেন,
-“উনি হলেন ডেনিস এলবার্ট।
We are living together for last 12 years.”
এতক্ষনে আশাবরী অরুন্ধতীর হাতের দিকে তাকালো,আংটি নেই।
ডেনিস ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন।পেছন পেছন বেনও।অরুন্ধতী আশাবরীর পরিচয় দিতেই ডেনিস জিজ্ঞেস করলেন
-“এটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি রাগ ,তাইনা?”
আশাবরী অবাক। মানুষটির সাথে অল্প সময়ের মধ্যেই আলাপ জমে গেলো বেশ। ডেনিস মূলত আইরিশ বংশোদ্ভূত। বাপ-ঠাকুরদা লন্ডন নিবাসী ছিলেন। কিন্তু ডেনিস অস্ট্রেলিয়াকে ভালোবেসে এখানেই নিজের ডেরা বেঁধেছেন। সিডনি ইউনিভার্সিটিতে আ্যবরিজিনাল স্টাডিজ পড়াতেন। এখন অবসর।এমন আমুদে ও প্রাণখোলা মানুষদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে আশাবরীর অনেকদিন পর নিজেকে হালকা লাগছিলো।
ব্যাকইয়ার্ড গার্ডেনে বিভিন্ন সব্জি ও টাটকা হার্ব-এর চাষ করেন ডেনিস। অর্গানিক খাবারের প্রতি পশ্চিমীদের ঝোঁকের ব্যাপারে আশাবরী শুনেছিলো, এবার চাক্ষুষ করলো। ডেনিস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাগানটা দেখালেন।বেন অরুন্ধতীকে সঙ্গত দিচ্ছে রান্নাঘরে। কত অচেনা গাছপালার সাথে পরিচয় হলো। আশাবরীর সবচেয়ে ভালো লাগলো বেড়ার গায়ে ম্যান্ডারিন গাছটা। রোদ পড়ে কমলা রঙের চমৎকার রূপ খুলেছে। সবুজের মাঝে কি যে অপূর্ব লাগছিলো!
দুপুরে খাবার আয়োজন দেখে আশাবরীর মাথা ঘুরে যাবার যোগাড়, অরুন্ধতীর হাতে হরিণের মাংস খেয়ে আশাবরীর মুখ দিয়ে শুধু ‘লাজবাব’ ছাড়া আর কিছুই বেরোলো না। বাগানের সবজি আর হার্ব দিয়ে ডেনিস বানালেন স্থানীয় halloumi চীজের স্মোক্ড স্যালাড। আশাবরী এঁদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ।
খাবার পর আরেকপ্রস্থ আড্ডা হলো। গান,ইন্ডিয়া,বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি,কিভাবে তাদের উদ্ভব,বেনের রিসার্চ এসবই আড্ডার বিষয়বস্তু হয়ে উঠলো।ডেনিস একটু রবীন্দ্রসংগীতও গেয়ে শোনালেন,সঙ্গে অরুন্ধতী তানপুরা ধরলেন-
‘রাখো রাখো রে জীবনে ,জীবনবল্লভে’।
আশাবরীর খেয়ালই রইলোনা সময় কখন সূর্যাস্ত ছুঁয়েছে। রাজীবের ফোন আসায় আশাবরীর মনে পড়লো ফেরার সময় হয়েছে। রাজীব ওকে নিতে আসবে কিনা জানতে চাইছিলো,আশাবরী না করেনি।শুধু শুধু বেনকে এতটা কষ্ট দিতে ভালো লাগেনা সবসময়।তাছাড়া রাজীব এলে একসাথে গাড়িতে এটুকু সময় ভালো লাগবে।
রাজীব আসতে আসতে অরুন্ধতী ওকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। ডুপ্লে কাঠামো ও এট্রিয়াম ধাঁচের ইন্টিরিয়র। একটা ঘরে এসে চোখ আটকে গেলো আশাবরীর। দেওয়ালে খুব সুন্দর একটা আর্টপ্রিন্ট। কাছে গিয়ে শিল্পীর নাম দেখেই আশাবরী উত্তেজিত হয়ে অরুন্ধতীকে জিজ্ঞেস করে ফেললো,
-“আপনি এই শিল্পীটির ফ্যান বুঝি?”
অরুন্ধতী বললেন – “তুমি চেনো নাকি?”
আশাবরীর ফোনটা আবার বেজে উঠলো।রাজীব এসে গেছে। কথা শেষ হলোনা। ডেনিস ও অরুন্ধতী দুজনেই গাড়ি অব্দি এগিয়ে দিতে এলেন আশাবরীকে। রাজীবকেও ভেতরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু রাত হয়ে গেছে বলে রাজীব আর দেরি করতে চাইছিলোনা।
-“আবার এসো” অরুন্ধতী বললেন।
আশাবরীর চোখের কোন চিকচিক করে উঠলো,অনেকদিন কেউ এমন করে বলেনি।
গাড়িতে উঠেই রাজীব বাঁকা সুরে বলে উঠলো
-“সংসার ফেলে যেখানে সেখানে চড়ে বেড়াবার জন্যেই কি বিয়েটা করেছিলি? দায়িত্বজ্ঞানহীন”।
আশাবরী কি উত্তর দেবে ভেবে পেলোনা। মনে হলো শুধু এইভাবে হেনস্থা করবে বলেই রাজীব এতদূর ড্রাইভ করে ওকে নিতে এসেছে। একবার ভাবলো দায়িত্বটা শুধু ওর একার কিনা জিজ্ঞেস করে।তারপর মনে পড়লো-
‘পরিবর্তন সংসারের অঙ্গ।তার সাথে মানিয়ে গুছিয়ে চলতে হয়।সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।রমণীর এইসব গুণ থাকতে হয়।নয়তো সংসার ধরে রাখবে কে’?
কথাগুলো মা বলেছিলো শিবরঞ্জনীকে।আজ সেই কথাগুলো মনে পড়তেই আশাবরীর সত্বাকে কেউ আরো জোরে আঘাত দিলো যেনো।
‘For most of history
Anonymous was a women’
(ক্রমশঃ)

Bhasar proyog khub sundor…sotta ta khanik ta nijeder Sathe mile jae.bhalo…bessh bhalo
LikeLike
সুন্দর, সাবলীল
LikeLike
ধন্যবাদ।
LikeLike