এর আগে: বেন আর অরুন্ধতী বসুর সান্নিধ্যে আশাবরী তার মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করে কিন্তু রাজীবের আশাবরীর জীবনযাত্রা পছন্দ হয়না।
স্কারলেটের স্মৃতি:
“There is no exquisite beauty…without some strangeness in the proportion”
রোমের এক ক্যাফেতে প্রথমবার আলাপ হয় দুজনের ।একটি মেয়ে ধ্রুপদের ক্যারিকেচার স্কেচ করছে দেখে ধ্রুপদ নিজেই এগিয়ে যায় আলাপ করতে।ঢেউ খেলানো বাদামি চুল,সামান্য বেখেয়ালি,নীল রঙা জিন্স আর প্যাস্টেল পিঙ্ক টপ,প্রথম দেখাতেই নজর কেড়েছিলো স্কারলেট। তারপর উদ্দাম প্রেম আর ইউরোপ জুড়ে ঘুরে বেড়াবার পালা- ওয়াইন, সেক্স, আর্ট আর মিউজিক। স্কারলেটের রূপে,লাস্য আর সারল্য ধ্রুপদকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো খুব অল্প সময়েই।বেলজিয়ান একটি অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিলো স্কারলেট। এক দূরসম্পর্কের ভাই ছাড়া তার কেউ ছিলো না। ধ্রুপদের অধ্যাপনার কাজ শুরু হলে ওরা একসাথে থাকতে শুরু করে।দিনগুলো কাটছিলো স্বপ্নের মতো। তারপর এলো সেই দিনটা।
স্কারলেটের জন্মদিন উদযাপন করতে ওরা শহর থেকে দূরে একটা বাংলোতে গিয়েছিলো।পাশেই মাছ ধরার বন্দোবস্ত রয়েছে,বোটও।নিশ্চিন্ত,নির্জন,রোম্যান্টিক একটা উইকেন্ড।স্কারলেট নেশার ঘোরে বারবার
-“বেস্ট বার্থডে এভার” বলে চেঁচিয়ে উঠছিলো,আর ধ্রুপদকে চুমু খাচ্ছিলো।গভীর নেশায় দুজনেই ঝিমিয়ে পড়েছিলো।হঠাৎ ধ্রুপদের ঘুমটা ভেঙে গেলো।
ফায়ারপ্লেসের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, ধ্রুপদ লেপের ভিতরে পাশ ফিরে স্কারলেটকে খুঁজে পেলো না। সময় কতো হবে তাও বুঝতে পারছেনা,কাঠের মেঝের উপর পাতা কার্পেটের উপর ওদের দুজনের জামা কাপড় পড়ে রয়েছে।
ধ্রুপদ লেপ্ ছেড়ে বেরিয়ে এলো। নিরাবরণ দেহ। এদিকে ওদিকে তাকালো। স্কারলেটের নাম ধরে দুয়েকবার ডাকলো। কোনো সাড়া নেই। এগিয়ে গিয়ে ঘরের স্কাইলাইটের জানলা দিয়ে নিচে তাকাতেই যেটা দেখতে পেলো তাতে প্রথমে চমকে উঠলো। নিচের বাগানে চেরি গাছটার নিচে স্কারলেট আর একজন শক্তিশালী চেহারার পুরুষের মধ্যে কোনো একটা তর্কবিতর্ক হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে। পাশে রোকো দাঁড়িয়ে আছে। রোকো স্কারলেটের দূরসম্পর্কের ভাই, মাঝেই মাঝেই স্কারলেটের কাছ আসতো দেখা করতে। কিন্তু ও ঠিক কি করে,কোথায় থাকে,কেনো আসে সেসব কোনদিনই পরিষ্কার করে জানতে চায়নি ধ্রুপদ।
লোকটা রোকোর সামনেই স্কারলেটকে নিজের কাছে টেনে এনে, জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে গেলো। ধ্রুপদের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো। কোনোরকমে ট্রাউজার গলিয়েই নীচে ছুটলো।
-“লে ইউর হ্যান্ডস অফফ্ হার”!
ধ্রুপদকে চিৎকার করে ওদের দিকে ছুটে আসতে দেখে লোকটি কোমরের পিছন থেকে একটা অটোমেটিক পিস্তল বার করে ওর দিকে তাক করে ধরলো।
-“স্টে আউট অফ দিস্ আমিগো! এটা আমার আর আমার স্ত্রীর মধ্যেকার ব্যাপার!”
ধ্রুপদ ততক্ষণে লোকটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
লোকটারও ট্রিগারে চাপ পড়েছে কিন্তু স্কারলেট লোকটার হাত ধরে গুলির দিশা ঘুরিয়ে দিয়েছে অন্যদিকে।
গুলির শব্দে ধ্রুপদ হতভম্ব হয়ে গেলো।লোকটা সত্যি গুলি চালাবে ধ্রুপদ ভাবেনি,মাথা কাজ করছিলোনা ওর। লোকটা তখন বন্দুকের পিছনের অংশ দিয়ে ধ্রুপদকে সজোরে মারলো। সে ছিটকে পড়লো মাটিতে। স্কারলেট চিৎকার করে উঠলো
-“নো !!!!ডোন্ট কিল হিম”!
কিন্তু ধ্রুপদ উঠে দাঁড়াবার আগেই ওর ওপর সমানে লাথি ঘুঁষি এসে পড়তে শুরু করলো। লোকটা বন্দুকের বাঁট দিয়ে ওর মাথায় মারতে মারতে অজ্ঞান করে দেয় ওকে।
কার্ডিফের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ধ্রুপদ স্কারলেটের সঙ্গে আবার মিলিত হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু নিক হেফনার আর কোনো ভাবেই স্কারলেটের সঙ্গে ধ্রুপদকে দেখা করতে বারণ করেন এবং সেই কারণটা কিছু দিন পরই জানা যায়।
পাঁচ বছর আগে স্কারলেট আর দিয়াজের বিয়ে হয়েছিলো।দিয়াজ পেশায় ট্রান্সপোর্ট ড্রাইভার হলেও আড়ালে একটা ড্রাগ পেডলিং-এর দল পরিচালনা করতো। ওর সাথে স্কারলেটও জড়িয়ে পরে মাদকদ্রব্যের ব্যবসায়। কিন্তু আইনের নজর এড়াবার জন্য ওরা কেউ একসাথে থাকতো না। রোকো ছিলো দিয়াজের মুখ্য সহকারী,আর পাশাপাশি স্কারলেটের ওপর নজর রাখার কাজটাও ওই করতো। ধ্রুপদকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছিলো স্কারলেট ও তার দল, কিন্তু ধ্রুপদের সঙ্গে থাকতে গিয়ে ওকে ভালোবেসে ফেলে স্কারলেট। তাই মাদক ব্যবসা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে চায় আর সেটাই দিয়াজের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। কার্ডিফের ঘটনার এক মাস পর ওদের পুরো নেটওয়ার্কটাই পুলিশের জালে ধরা পড়েছিলো। কিন্তু ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয় স্কারলেটের। মাথায় গুলি লেগেছিলো ওর।
মর্গে ওর মৃতদেহ দেখে ধ্রুপদের মনে হয়েছিলো যেন সাজানো কোনো দৃশ্য দেখছে।এ কোন স্কারলেট!মুখটা বীভৎস ফুলে গেছে,হাতে পায়ে অসংখ্য মারের চিহ্ন।আর তাকিয়ে থাকতে পারছিলোনা ধ্রুপদ। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলো। নিক বলেছিলেন যত তাড়াতাড়ি এই স্মৃতি তোমাকে ছেড়ে যায় ততোই ভালো।কিন্তু ধ্রুপদ জানে স্মৃতিরা ছেড়ে যায়না,শুধু চাপা পড়ে থাকে।কোনো গহীন অন্ধকারে।আবার কখনো আলো পেলে ছুটে আসে,ঘিরে ধরে।

এই ঘটনার পর ওর মা ধ্রুপদকে নিজের বাড়িতে কিছু দিন এসে থাকার প্রস্তাব দেয়। মা’র একজন জীবনসঙ্গী হয়েছে ততোদিনে।ভদ্রলোক প্রবীণ,প্রাজ্ঞ। কিন্তু ধ্রুপদকে যথাযথ সম্মান করতেন।
একসাথে থাকতে গিয়ে মা’র সাথে এতদিন ধরে তৈরী হওয়া বরফের দেওয়ালে একটু একটু করে রোদ পড়া শুরু হয়।স্কারলেটের বিয়োগব্যথাও প্রশমিত হয়ে আসছিলো।কিন্তু মায়ের জীবনে অন্য পুরুষের উপস্থিতি ধ্রুপদকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছিলো।মা প্রাণপনে ধ্রুপদকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন সেসময়।কিন্তু ওর মনের আগল খুলতে পারেননি।তাই একসময় ধ্রুপদ নিজেই বিদায় নেয় মায়ের কাছ থেকে।আর তারপর লন্ডন কেও বিদায় জানিয়ে ফিরে আসে।
Karaikudi TN
-“দশটা বাজতে গেলো যে! আর কখন বেরোবে”!?
ভেলাম্মার ডাকে চিন্তায় বিরাম এলো ধ্রুপদের।
ব্যাঙ্কের দিকে যেতে হবে একবার। আজ গনেশাপ্পার শরীর খারাপ। ধ্রুপদ গ্যারাজ থেকে বুলেটটা বার করে স্টার্ট দিলো। বাইকটা অনেক দিনের পুরোনো মডেল কিন্তু গনেশাপ্পার যত্ন আর তত্ত্বাবধানে এখনও চমৎকার অবস্থায় আছে।
এই বাড়ির গ্যারাজে এক সময় অ্যাসটন মার্টিন, প্রিন্স, নিসানের মতো কতরকম গাড়ি থাকতো।ধ্রুপদেরও একটা স্করপিও হয়েছিলো কিন্তু সেটা বেশি দিন চালায়নি। গাড়িটাকে গনেশাপ্পা শহরে পাঠিয়ে দিয়েছে ট্রাভেল কোম্পানির কাছে। গ্যারাজে একমাত্র সদস্য বলতে এখন এই বুলেট মোটরবাইকটি।
বাজার থেকে ফেরার সময় বাড়ির সামনে একটা দামী ল্যান্ডরোভার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ধ্রুপদের মনে সন্দেহ হলো। নিশ্চয়ই সেই হোটেল ইন্ডাস্ট্রির লোকজন এসেছে। বারান্দায় ঢুকেই সেটা ঠিক প্রমানিত হলো। আগেরবারও এরা এসেছিলো।
নধরপুষ্ঠ গোলগাল চেহারার সেই এক্সেকিউটিভ লোকটা অকারণে দে৺তো হাসি দিল। এর নাম বিকাশ চৌরাসিয়া। দন্তবিকাশ হলে বেটার হত বোধহয়। সঙ্গে যথারীতি দুই জন লোক, একজনের নাম পিটার ভাস্করণ, আরেকজন মহসিন ইকবাল।
মহসিন নিজেকে দক্ষিণ ভারতের রিয়েল এস্টেট ব্যাবসার একজন উঠতি এবং সফল ব্যাবসায়ী বলে পরিচয় দেয় সবজায়গায়। ওর কোম্পানির নামে বড়বড় হাউজিং প্রোজেক্ট, হোটেল, বিলাস বহুল ভিলা ইত্যাদি রয়েছে তামিলনাড়ু ও কর্নাটক জুড়ে। এর সাথে আবার প্রচুর দানধ্যানও করে। এই অঞ্চলে কয়েকটা প্রাথমিক স্কুল, বাস সার্ভিস ও ছোট-বাজার ইত্যাদি বানিয়ে দিয়েছে। অনেকের কাছে ও রবিনহুড মহসিন বলেও খ্যাত। কিন্তু ধ্রুপদ ভালো মতনই জানে যে মহসিন আদতে একজন বড়সড় রিয়েল এস্টেট মাফিয়া। এই ভাস্করণ লোকটা ওরই একরকমের ডানহাত গোছের। লোকটা পলিটিক্যাল যোগাযোগ বেশ উচ্চস্তরীয়। ওর নামে বেশকিছু পুলিশ কেসও ধামাচাপা রয়েছে।এক কৃষকনেতার মৃত্যুর অভিযোগও আছে ওর বিরুদ্ধে।
“আপনারা অযথা কেন নিজের আর আমার সময় বারবার নষ্ট করছেন বলুনতো!?” ধ্রুপদ গম্ভীর ভাবেই বললো লোকগুলি কে।।
-“আমাদের অফারটা কিন্তু এবার একটু অন্যরকম মিঃ সূব্রমনিয়াম।” চৌরাসিয়ার দাঁত বেরিয়ে পড়লো।
-“দেখুন কতো ভাবে বোঝালে বুঝবেন বলুন দেখি। এই বাড়ি আমি হোটেল বা গেস্ট হাউস বানাবো না। দিস প্রপার্টি ইস নট ফর সেল। বাইরে টাঙানো বোর্ডটা কি চোখে পড়েনি আপনাদের”?
মহসিন বলতে শুরু করলো
-“আপনার আশেপাশের বেশীরভাগ বাড়িই কিন্তু আমাদের হাতে চলে এসেছে। তাছাড়া আপনি শিল্পী মানুষ আর এখন তো আপনার নাম সবাই জানে। আমরা আগের থেকে অনেক বেশি প্রাইস অফার করছি আপনাকে। আপনার যে সেক্লুশান আর নিরিবিলি জায়গা পছন্দ সেটা আমরা ভালোই বুঝি। আপনি আমাদের উটি বা কূর্গের একটা ভিলা নিয়ে নিন। জলবায়ু দারুন, এখানকার মতন গরমও পড়ে না। মনের আনন্দে ছবি আঁকুন কবিতা লিখুন যা খুশি করুন।”
এবার চৌরাসিয়া দেঁতো হেসে বললো
-“চাইলে গোয়াতেও যেতে পারেন। ওখানে তো সব ভালো ভালো আর্টিস্টদের স্টুডিও ভিলা রয়েছে। আমরা চমৎকার জায়গা প্রোভাইড করবো আপনাকে। আমাদের ওখানে একটা আর্ট গ্যালারী হয়েছে।আপনি চাইলে ডিরেক্টর এর দায়িত্ব নিতেই পারেন। তাছাড়া..”
-“গেট দ্যা হেল আউট অফ হিয়ার রাইট নাও!” ধ্রুপদ কঠিন স্বরে তর্জনী তুলে গেটের দিকে ইশারা করলো। ভাস্করণ লোকটা তাতে একটা প্রতিক্রিয়া জানাতে উঠে দাঁড়াতে গেছিলো। মহসিন তাকে হাত ইশারায় থামিয়ে দিলো। তারপর শান্তভাবে উঠে দাঁড়ালো। ধ্রুপদকে নমস্কার জানিয়ে বললো
-“ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের মনে হয়েছিলো হয়তো আপনি এবারের অফারটা নিয়ে ভেবে দেখবেন। আমরা আপনাকে আর বিরক্ত করবোনা। চলি” বলেই সে চৌরাসিয়া কে ইশারা করলো ওঠার জন্য। ওদের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে চৌরাসিয়া আবার দেঁতো হেসে জানলা দিয়ে বললো
-“ভালো থাকবেন মিঃ সুব্রমনিয়ম”।
Sydney, Airport
রাত প্রায় আটটা,আশাবরী আর রাজীব এয়ারপোর্টে বসে আছে।ফ্লাইট ল্যান্ড করলেও কাস্টমস শেষ করে এখনো বের হতে পারেননি রাজীবের মা। আশাবরীর খুব মাথা ধরেছে। বসে বসে হাই উঠছে।রাজীব খুব চিন্তায় পড়ে গেছে।মুখটা দেখেই হাসি পেলো আশাবরীর।ওর নিজের অবশ্য আসার তেমন ইচ্ছে ছিলোনা।কিন্তু না এলে মাতা-পুত্র দুজনেই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারবেনা,অহেতুক একশো প্রশ্নের উত্তর দেবার ইচ্ছে আশাবরীর নেই।তাই একপ্রকার জোর করেই এসেছে।অবশেষে রাজীবের মা’কে দেখা গেলো, ট্রলি ঠেলে বেরিয়ে আসছেন গটগট করে।ওরা কাছে যেতেই আশাবরী আর রাজীবকে জড়িয়ে ধরলেন।
বাড়ি পৌঁছতে ওদের মিনিট কুড়ি লাগলো।ঘরে ঢুকেই ইন্দ্রানী মুখার্জির প্রথম মন্তব্য,ঘর গোছানোর সময় হয়না বুঝি?!আশাবরী বুঝলো,অফিস ফেরত রাজীবের ব্যাগ জ্যাকেট আজ লাউঞ্জেই পরে আছে,তোলার সময় হয়নি।এয়ারপোর্টে যেতে হয়েছিলো।সেই কথাটা রাজীবও জানে,কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য করলোনা।আশাবরীও চুপই থাকলো।এসব কানে তুললে চলবেনা।কিন্তু এরপরে যে প্রতিটি ছোট বড় ব্যাপারেই মিসেস ইন্দ্রানী মুখার্জির এক্সপার্ট ওপিনিয়ন কানে আসবে সেটা সম্পর্কে আশাবরী মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলো।
(ক্রমশঃ)
Crisis is in its form…..allover beautiful..keep going
LikeLike
Khub bhalo lagche… dhrupad 💕💕💕
LikeLike