দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১৯: Habanera

এর আগে: আশাবরীর গর্ভবতী হওয়ার উপলক্ষ্যে সিডনি অপেরা হাউসের ঐতিহ‍্যশালী রেস্টুরেন্টে উদযাপন করে বাড়ি ফেরার পথে একদল ছিনতাইকারীদের হাতে রাজীব আর আশাবরী আক্রান্ত হয়। ঘটনাচক্রে আশাবরীর শ্লীলতাহানি ও গর্ভপাত ঘটে এবং রাজীবের সঙ্গে তার এই প্রথমবার এক মানসিক ব‍্যবধান তৈরী হয়।
Karaikudi, TN.

বেশ কয়েকদিন হতে চললো আশাবরীর থেকে কোনো মেল আসেনি লক্ষ্য করলো ধ্রুপদ। ধ্রুপদ মা’র পাঠানো ইমেলের একটা উত্তর লিখছিলো। এর মধ্যে অনেকবারই ভেবেছিলো কিছুই লিখবেনা, শুধু ‘ভালো আছি’ লিখে ছেড়ে দেবে। কারণ তার জীবনের ধারা কোন গতে বইছে সে বিষয়ে কাউকেই জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করেনা ধ্রুপদ। কিন্তু উড়িষ্যার ঘটনাটা আকারে প্রকারে এবং মিডিয়ার বদান‍্যতায় এতটাই বড় খবর হয়ে গেছে যে এখন অনেক লোকের কাছেই ধ্রুপদের নাম বেশ পরিচিত ব্যাপার। করাইকুড়ির নির্লিপ্ত জীবনেও এখন মাঝে মাঝে নিউজ মিডিয়ার আনাগোনা বেড়েছে। দুয়েকজন সাংবাদিক তো ধ্রুপদকে নিয়ে ম‍্যাগাজিন বা কাগজে ফিচার লেখারও প্রস্তাব দিয়ে গেছে। তার এই অন‍্যধরনের জীবনযাত্রা, শিল্পচর্চার সঙ্গে মানবকল্যাণ মূলক কাজকর্ম এইসব একসাথে লিখতে পারলে নাকি দারুণ স্টোরি হবে। একটি মেয়ে দিল্লি থেকে ওর উপর একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাবারও প্রস্তাব দিয়েছে। দেশীয় আর্ট গ‍্যালারিগুলিও হঠাৎ করে ধ্রুপদের কাজ, নিজেদের প্রদর্শনীতে নেওয়ার জন্য উৎসাহী হয়ে পড়েছে। এতদিন এরা ধ্রুপদ কে অলস, নাক উঁচু,ব‍্যাকডেটেড কাজ করে ইত‍্যাদি বলে ব্রাত‍্য করে রাখতো হঠাৎ সব পাল্টে গেছে মনে হচ্ছে।
কিন্তু এসবের কোনোটাই ধ্রুপদেরও উৎসাহজনক লাগে না। পুরোটাই একটা লোকদেখানো বাণিজ্যিক প্র‍্যাকটিসের অংশ। নিজেদের কাজ হয়ে গেলেই এরা ধ্রুপদকে কিছুদিন বাদে ভুলে যাবে। সুতরাং এগুলিকে একদম পাত্তা দেয় না।
মা’কে খুব সংক্ষেপে উড়িষ্যার ঘটনা আর তার সুস্থতার খবর লিখে চিঠি শেষ করলো ধ্রুপদ। নিজের ঘরের জানালাটার পাশে, প্রপিতামহর বার্মা কাঠের আরামকেদারাটায় বসে লিখছিলো। এক চিলতে মিঠে রোদ ধ্রুপদের কোলে এসে পড়েছে। জানালার বাইরে, উঠানে ভেলাম্মা পাঁপড় আর লাল লঙ্কা শুকোতে দিয়েছে। মার্কাস ঘোরাঘুরি করছে ইতস্ততঃ,সঙ্গে সাদা বেড়ালটা।
ল‍্যাপটপে একটা মৃদু যান্ত্রিক শব্দ হলো। মেইল সেন্ট হয়ে গেছে।

Rockdale, NSW

‘কিছু সম্পর্ক খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠার মতোই বিরক্তিকর,আবার কিছু সম্পর্কে ক্ষতি হচ্ছে জেনেও সারারাত জেগে থাকা অমৃত লাগে।
অনেক সম্পর্ক শুধু টিকে আছে এই ভেবে যে,এর চেয়ে ভালো পাবোনা হয়তো।আর কিছু সম্পর্ক টিকে যায় এই ভেবে যে,ছুঁড়ে ফেলে দিলে কেউ যদি নিয়ে যায়। প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গেই
অভিনয়,নিজেকেই বোকা বানানো।’-

এই পর্যন্ত লিখে আশাবরী ল্যাপটপ স্ক্রীনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো।
ও কি নিজের সম্পর্কেও একই কথা ভাবে আজকাল ?
দরজায় লক ঘোরানোর শব্দ হলো খুট করে। রাজীব ফিরেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু আশাবরীর উঠে আসতে ইচ্ছে করলোনা।
রাজীব ঘরে উঁকি দিলো। আশাবরী দরজার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ল্যাপটপে বসে।
রাজীব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
আশাবরীকে একবার ডাকতে গেলো,কিন্তু মনে হলো একই ঘরে দুজনের মাঝে এক যোজন দূরত্ব। পার করতে খুব কষ্ট বা কেউ হয়তো পার করতে চাইছেইনা।
আশাবরী ও রাজীব দুজনেই কি পাল্টে যাচ্ছে?হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আশাবরীর মধ্যে সমস্ত ব্যাপারেই একটা নিস্পৃহ ভাব লক্ষ্য করে রাজীব।ওর ভালো লাগেনা।দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই।তা নিয়ে দিনের পর দিন বসে থাকলে জীবন তো চলবেনা।জীবন থেমে থাকবে না।সময়ের সাথে নিজেদেরও মানিয়ে নিতে হবে।আর এখন নতুন উপসর্গ,ডাক্তার দেখাতে যাবেনা। এদিকে বেন নামের এক ছোকরা জুটিয়েছে,নিত্যনতুন বায়নাক্কা নিয়ে হাজির।আদিবাসী ইতিহাসের এতো কিছু জেনে লাভটা কি হবে সেটাই রাজীবের মাথায় ঢোকেনা।নাহ আজ কিছু বলতেই হবে।এভাবে দিনের পর দিন,মাসের পর মাস চলতে পারেনা।মা এলে সব ঠিক হয়ে যাবে হয়তো।মাকে যত দ্রুত সম্ভব এখানে নিয়ে আসতে হবে।শাওয়ার থেকে বেরিয়ে রাজীব দেখলো,ডিনার রেডি।
দুজনেই আজকাল চুপচাপ টিভির দিকে তাকিয়ে ডিনার পর্ব সারে।কিন্তু আজ রাজীব একটা হেস্তনেস্ত করবে ভেবে নিয়েছে-
-“ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট ছিলো। যাসনি?” আশাবরী না-সূচক মাথা নাড়ে।
-“কেন?” রাজীব ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো।
-“ভালো লাগছিলো না।” আশাবরী যেন আরো শীতল। গত তিন মাস ধরে ডাক্তার,টেস্ট আর ওষুধ নিয়ে ক্লান্ত আশাবরী।
-“It’s for your own good,damn it!!” রাজীব সুর চড়ায়।
-“আমার ভালোমন্দ নিয়ে তোর মাথাব্যথা থাকলে এত বড় ঘটনাটা জাস্ট চুপ করে হজম করে যেতিস কি?”
আশাবরীর প্রশ্নে রাজীবের মুখে কেউ যেন একটা চড় মারলো। খানিকটা সামলে নিয়ে বললো
-“একই কথা কতবার বোঝাবো তোকে।এটা আমাদের দেশ নয়, তাছাড়া রাস্তা ঘাটে এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। তার ক’টার কিনারা হয়!?তুইও তো সেদিন প্রপারলি ড্রেসড্ ছিলিনা। We were just unlucky.”

“আর আমাদের বাচ্চাটা?সেক্ষেত্রেও তুই নিজেকে আনলাকি বলে শান্ত্বনা দিচ্ছিস ?”
আশাবরীর গলায় কিছু একটা আটকে আছে।
“তুইও তো বেন কে নিয়ে দিব্যি ভুলে আছিস,আর আমি বললেই…..”রাজীবের কথা শেষ করার আগেই আশাবরী তীব্র ঘৃণা নিয়ে রাজীবের দিকে তাকালো। রাজীব মুখ ঘুরিয়ে নিলো।আশাবরী খাবার সমেত প্লেট তুলে নিয়ে সিংকে নামিয়ে রেখে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। বুকের ভিতরটা মোচড় দিচ্ছে কেমন।বাইরে নিঝুম রাত। আকাশটাও যেন চুপ হয়ে বসে আছে।মানুষের সাথে মানুষের মনের দূরত্ব পার করা অসম্ভব।লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে থেকেও পাশে থাকা সম্ভব,মনের অন্তরঙ্গতা যদি থাকে।একই ছাদের তলায় দুজন বিষম-মনা মানুষ কখনো নিজেদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনা।
আকাশের দিকে তাকালো আশাবরী,একটা দুটো তারা ফুটে আছে। মাঝেমাঝে বাতাস এসে শিরশিরানি ধরাচ্ছে। আশাবরীর শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে,সেটা ঠান্ডায় না কোনো কিছুর প্রতি প্রবল আকাঙ্খায় বুঝতে পারলোনা।হঠাৎই কারমেনের কথা মনে পড়লো। আজ বেন নিয়ে গিয়েছিলো ম‍্যাটিনী শো দেখাতে অপেরা হাউসে। কি অপূর্ব সংগীত! মনটা ঘিরে রেখেছে কারমেনের সেই প্রেমিক ভোলানো হাসি, আর হোসে-র সেই না পাওয়ার যন্ত্রনাভরা আকুতি । চোখ বুজে অস্পষ্ট এক চাহনির কথা ভাবতে লাগলো।ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে,আশাবরী ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লো।রাজীব লাউঞ্জে টিভি দেখতে
ব্যস্ত।টিভি দেখতে দেখতে হয়তো ওখানেই ঘুমিয়ে পড়বে।আজকাল এমনই হচ্ছে মাঝে মাঝে।ঘুমাতে যাবার আগে এখন আশাবরী বাথটাবে কিছুক্ষণ নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। ল্যাভেণ্ডার এসেনসিয়াল অয়েলে। রাতে ঘুম আসতে চায়না। মনে হয় ঘুমালেই কেউ যেন ওর সমস্ত শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে।শেষরাতে চোখ জড়িয়ে আসে,ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম আর তন্দ্রার মাঝে ভোর হয়ে যায়।ভোরের আলোয় সব আবার নতুন লাগে,কিন্তু চোখ খুললেই সব ফিকে হয়ে যায়।বেলা যত বাড়ে,দিন ততই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।ধ্রুপদের সাথে বারকয়েক কথা হয়েছে,কিন্তু এসব কিছুই জানানো হয়নি।কথাগুলো বলতে কোথায় যেন খুব কষ্ট হয়।জীবনের সমস্ত সুখ দুঃখ যেন ওই রাতেই থেমে আছে।তারপর আর কিছু নেই।এসব কাকে বলবে?সাইকিয়াট্রিক হেল্প নিয়েও তেমন লাভ হয়নি।রাজীবের মা এখানে এসে কিছুদিন থাকবেন বলছেন।উনি এলেই নাকি সব ঠিক করে ফেলতে পারবেন।আশাবরী আবার মা হতে পারবে।এসব কথায় আশাবরী হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না।
বাথটবের উষ্ণ জলে চোখ বন্ধ করে ডুবে যায় আশাবরী।অপেরার দৃশ্যগুলো আবার মনে আনতে চেষ্টা করে।কানে বেজে ওঠে-

L’amour est un oiseau rebelle /Que nul ne peut apprivoiser-
(Love is a rebellious bird,That none can tame”)

বেন আশাবরীকে এখন বেশ ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে।ঘটনা জানার পর বেন বাড়িতেও চলে আসে আশাবরীকে দেখতে।রাজীব ভদ্রতা করলেও ব্যাপারটা বিশেষ পছন্দ করেনি।ওর নাকি বেনের আশাবরীর প্রতি আগ্রহ ভালো লাগেনি।তবে আশাবরী সেটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায়নি।বেনের বন্ধুত্ব ও বেশ উপভোগ করে।এত অল্প বয়সে ছেলেটি এত কিছু জানে,বা জানার চেষ্টা করে সেটাই আশাবরীকে আরো টানে।
বেন আজ অপেরায় প্রবাসী বাঙালি এক চমৎকার মানুষের সাথে আলাপ করিয়ে দিলো।অরুন্ধতী বসু।বেন তো অপেরা নিয়ে ওনার সাথে গভীর আলোচনা শুরু করে দিয়েছিলো।শেষে তিনজনেই একটা ক্যাফেতে উপস্থিত হলো।
অরুন্ধতী বললেন
-“I really liked your name।”
আশাবরী লাজুক হেসে বললো

-“আমার দিদির নাম শিবরঞ্জনী।”
অরুন্ধতী বেশ অবাক হলেন মনে হলো

-“মধ্যরাত্রি আর সকাল পাশাপাশি!” আপনমনেই বললেন অরুন্ধতী।
“আমাদের দুজনেরই নামকরণ করেছেন আমার মাসিমনি। উনি শাস্ত্রীয় সংগীতের খুব ভক্ত। আমাদের গানের ব্যাপারে যেটুকু জ্ঞান তার প্রায় সবটুকুই মাসিমনির দৌলতে।”-
আশাবরী বললো।
আশাবরীর মিউজিকের প্রতি আগ্রহ দেখে খুব খুশি হলেন অরুন্ধতী।উনি নিজেও একজন ধ্রুপদী সংগীতের শিল্পী।তবে বেন ওদের বাংলা শব্দগুলো বুঝতে না পেরে মাঝে মাঝেই প্রশ্ন করছিলো।যেমন

‘মাসিমণি কি?”
অরুন্ধতী আর আশাবরী দুজনেই একটু হাসলো।তারপর অরুন্ধতী পুরো ব্যাপারটা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন বেনকে।
আশাবরীর বাড়ি ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছে।বেশি রাতে ফিরতে ওর এখন ভয় করে।যদিও বেন অনেকটা পথ ওর সাথেই যাবে বলেছে। তবু গলির মুখটায় এলেই আবার শরীরে কাঁটা দেয়।আশাবরী আলগোছে কফির কাপে চুমুক দিলো।

অরুন্ধতীর টিকালো নাক,গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো।আশাবরী অরুন্ধতী মুখের দিকেই তাকিয়েছিলো, পুরো সময়টা।অরুন্ধতী দেশ ছেড়েছেন বহু বছর।আশাবরীকে জিজ্ঞেস করলেন দেশের কথা, কলকাতার কথা।আশাবরী বেনকে তাড়া দিলো।কফি শেষ করে অরুন্ধতীর কাছে বিদায় নিতে চাইলে,তিনি আশাবরীকে জড়িয়ে ধরলেন।
“আজ ভীষণ ভালো লাগছে তোমার সাথে আলাপ হয়ে।আমার সামনেই একটা গানের অনুষ্ঠান আছে,তোমাদের নিমন্ত্রণ রইলো।আশা করি আবার দেখা হবে” অরুন্ধতীর মুখ উজ্জ্বল।
আশাবরী বললো “নিশ্চয়ই দেখা হবে”।

ফেরার সময় বেন জিজ্ঞেস করছিলো কেমন লাগলো আশাবরীর?আশাবরী অপেরা আর অরুন্ধতীকে নিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো।শুধু ভালো ছাড়া আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেলোনা।
অরুন্ধতীর চেহারায় একটা অদ্ভুত মায়া রয়েছে,ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা সেই মায়াকে মুছে ফেলতে পারেনি।

আশাবরীর চিন্তা আবার কারমেনে ফিরে গেলো। কারমেনের মৃত্যুদৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো।ভালোবাসার এক চিরন্তন অথচ নিষ্ঠুর পরিণতি। ভালোবাসা বোধহয় অবহেলা সহ্য করতে পারেনা। প্রত্যাখ্যান মানুষের অহমিকাকে তীব্র আঘাত করে বলেই মানুষ নিজের বোধ হারিয়ে বসে।তখন সবকিছু জুড়ে শুধু বিফল আর্তনাদ ছেয়ে থাকে। অস্বীকৃতি, ভালোবাসার মানুষের প্রতি ঘৃণার জন্ম দেয়।

(ক্রমশঃ)

চিত্র: Jam San
Habanera: এক ধরনের কিউবান নৃত্য
উদ্ধৃতি: Georges Bizet

7 thoughts on “পর্ব ১৯: Habanera”

  1. খুব সুন্দর, শান্ত, নির্মল একটা সিল্যুয়েট

    Like

Comments are closed.