দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১৫: বন‍্যজোৎস্না

এর আগে: ধ্রুপদ আর গার্সিয়া উড়িষ্যার অরণ্যের যে অংশে কাজ করছিল তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিপ্লবী বাহিনীর আক্রমণ হয় পুলিশের উপর। নতুন এসপি ওদের সতর্ক করা সত্ত্বেও গার্সিয়া কাজ বন্ধ করতে রাজি হয় না
Forest, Orissa Border.

আজ সন্ধ‍্যাবেলা গ্রামে পরব ছিলো, ক‍্যাম্পের সবার নেমন্তন্ন। নবীন আজকে টাউনে গেছে একটা কাজ নিয়ে। ওর ফিরতে রাত হতে পারে তাই একজন পুলিশ কনস্টেবলকে ধ্রুপদ সঙ্গে পাঠিয়েছে। অন্যজন ক‍্যাম্পে পাহারায় আছে। মধু, ধ্রুপদ আর গার্সিয়া গ্রামে এসেছে পরব দেখতে। আজ পূর্ণিমা। চাঁদের আলোর সাথে গ্রামবাসীদের নাচগানের পালা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিলো। তার সঙ্গে ফুল পচিয়ে বানানো পানীয় আর শালপাতায় ঝাল-ঝাল মাংস। গার্সিয়া তুমুল উৎসাহে ওদের বাজনদারদের মধ্যে একজনের কাছ থেকে মাদল তুলে নিয়ে নিজেই বাজাতে শুরু করলো। তাতে ওরা আরো মজা পেয়ে গার্সিয়াকে ঘিরে নাচতে শুরু করলো।

বুধি নামের মেয়েটি নাচতে নাচতে এসে এবার ধ্রুপদের হাত টেনে ধরলো। একটু কিন্তু কিন্তু করে ধ্রুপদও উঠে পড়লো। আজ খুব সুন্দর সেজেছে বুধি,একদম অন‍্যরকম দেখাচ্ছিলো ওকে। ধ্রুপদের কোমর জড়িয়ে বুধি তাকে নিজেদের দলের মধ্যে সামিল করে নিলো। কত স্বতঃস্ফূর্ত আহ্বান। ওদের গানের মধ‍্যে গাম্ভীর্য, মগ্নতা আর আদিমতার একটা মেশানো আমেজ আছে। প্রকৃতিকে, প্রকৃতির উপাদান দিয়েই উদযাপনের একটা তরতাজা স্বাদ আছে। ঢিমে তালে ও ছন্দে,একইরকম ভঙ্গিতে,একটা নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে,বারবার নেচে চলার এই রীতি যেন মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী নিজের ছন্দে ঘুরে চলেছে,এক নিয়ন্ত্রিত,পরিমার্জিত ভারসাম্যের মধ্যে। এক কক্ষপথ থেকে আরেক কক্ষপথে শক্তির আসা যাওয়া চলেছে অনাদিকাল ধরে অথচ বাইরের অবয়বটা নির্দিষ্ট থাকছে। সেই বিস্ময়কর গ্র‍্যাভিটির খেলা। সংসতিপ্রবণ অথচ পরিবর্তনশীল।পানাহার সেরে ক‍্যাম্পে ফেরার পথে গ্রামের কয়েকজন ওদের এগিয়ে দিলো। গার্সিয়া গুনগুন করে এখনও ওদের গানের সুরটা ভেঁজে চলেছে। ওর মনটাও আজ বেশ ফুরফুরে। প্রোজেক্টের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়ে এসেছে। ঘরের কাঠামোগুলিও দিব‍্যি দাঁড়িয়েছে। এরমাঝে আর কোনোরকম গোলমাল বা পুলিশের উৎপাতও হয়নি। প্রোজেক্ট রিপোর্ট, ফোটোগ্রাফ ইত‍্যাদি দেখে ফিনান্সারদেরও বেশ পছন্দ হয়েছে।

ধ্রুপদ নিজের টেন্টের ভেতরে এসে নাইলনের বেডের উপর গা এলিয়ে দিল। টেন্টের মুখের পর্দাটা সরানো। সেখান থেকে বাইরেটা দেখা যায়। অরণ‍্যজুড়ে চাঁদের আলোয় সারিয়াল এক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে।

জ‍্যোৎস্না, প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি। আলোর জাতিটা একরকম। গাছের গায়ে পড়লে দিনের আলোর মতন একইভাবে ছায়ার আকার পাল্টায়। ধ্রুপদের ধীরে ধীরে চোখ বুজে আসে। দূরে গ্রাম থেকে বাজনার আওয়াজ ভেসে আসছে।
আশাবরীকে দেখতে পায় যেন..

কালচে নীল আকাশ আর সমুদ্রের মেলবন্ধন, সূর্য আকাশে দেখা দেওয়ার আগের নীলাভ ম‍্যাজিক আওয়ার। আশাবরী সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে,পরনের সাদা পোশাক হাওয়ার সাথে খেলা করছে। তার মৃদু আবরণের ভিতর দিয়ে দেখা দিচ্ছে আশাবরীর দেহের অস্বচ্ছ সিল‍্যুয়েট। সুঠাম বুক, ঈষৎ তরঙ্গায়িত পেট ও কোমর, ত্রিকোণ জঙ্ঘা, সুডৌল নিতম্ব আর সচ্ছল পায়ের গোছ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে ধ্রুপদ। আশাবরী ধ্রুপদের দিকে ফিরে তাকালো, মুখে একটা অচেনা হাসি। ডানহাতে ধরা একটা ল্যান্টার্ন। তার উষ্ণ আলো নীল দৃশ্যপটকে মায়াবী করে তুলছে। কিন্তু পিছনের আকাশটা হঠাৎ কালো হয়ে উঠলো।এক লহমায় মৃদু মন্দ হাওয়ার গতিবেগ প্রবল হয়ে গেলো। সমুদ্রটাও উত্তাল। ল‍্যান্টার্ন ছিটকে পড়লো বালির উপর…

ঘুমটা ভেঙে যেতেই ধ্রুপদ বুঝতে পারলো ওর গলায় ধারালো কিছু একটা চাপ দিচ্ছে । ঘুমভাঙা চোখে ঠাহর করলো ওর বেডের পাশে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে। টেন্টের ভিতরের আলোটা কোন কারণে নিভে গেছে, বাইরের জ‍্যোৎস্নার আলো কিছুটা এসে ভিতরে পড়ায় লোকগুলির অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। সবার হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। ওর গলায় যে লোকটা ছুরি ধরেছিল সে এবার ভাঙ্গা ইংরেজি আর হিন্দি মিশিয়ে বললো

-“চিৎকার বা লাফঝাঁপ করার কোনো চেষ্টা কোরো না। চুপচাপ উঠে বাইরে চলো।”

বাইরে কিছুটা দূরে গার্সিয়ার টেন্ট। অন‍্যদিকে মধু আর নবীনের টেন্ট। তিনটে টেন্টের মাঝামাঝি যে জায়গাটায় কাঠের গুঁড়ি দিয়ে খাবার টেবিল বানানো আছে সেখানে দশ পনেরো জন বন্দুকধারী লোক দাঁড়িয়ে আছে।
একদম সামনে একজন বেঁটেখাটো পেশীবহুল চেহারার লোক দাঁড়িয়ে। তার আগ্নেয়াস্ত্রটা কোমরে গোঁজা। এই বোধহয় নেতা। প্রত‍্যেকের মুখ ঢাকা কাপড়ে। নেতার সামনে মাটির উপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে গার্সিয়া। হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। একটু দূরে পুলিশ কনস্টেবলটির দেহ পড়ে। অচৈতন‍্য অথবা প্রাণ নেই । মধুকে দেখতে পাচ্ছেনা। নবীনও কি ফেরেনি? কতরাত এখন? এরা কখন এলো? কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় নি!
ধ্রুপদ ভালো করে ব‍্যাপারটা মাথার মধ্যে সাজাতে পারছেনা। গার্সিয়ার মুখটা চাঁদের আলোয় অল্প হলেও দেখা যাচ্ছে। থমথমে। এরকম একটা ব‍্যাপার বোধহয় সেও আশা করেনি।

এবার ধ্রুপদকেও একজন পিছন থেকে ধরে ওর হাত দুটো বেঁধে ফেললো। তারপর কালো কাপড় দিয়ে চোখটা। কানে যেটুকু শোনা যাচ্ছে তাতে বোঝা গেলো ওরা টেন্টের ভিতর থেকে জিনিসপত্র সব বার করে নিচ্ছে। ক‍্যাম্পে একটাই রেডিও কমিউনিকেশন ব‍্যবস্থা ছিলো পুলিশ স্টেশন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। আওয়াজ শুনে মনে হলো এরা সেটারও ইতি ঘটালো।

‘এবার আমার জন্য কি অর্ডার চিফ’?
নেতাকে কেউ একজন জিজ্ঞেস করে। কিন্তু এই গলাটা ধ্রুপদের চেনা। এ তো মধুর গলা! কিন্তু মধু এদের কাছে অর্ডার চাইছে কেন?! মধু কি তাহলে এতদিন..?! সর্বনাশ! ধ্রুপদের মাথায় সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

চিফ বলে যাকে ডাকা হলো সে মধু’র কথার উত্তরে বলে উঠলো
-“তোমার কাজে আমরা খুবই খুশী। আমাদের উইং কমান্ডার তোমার জন্য একটা বার্তা পাঠিয়েছেন।”

এরপর শোনা গেল একটা ধস্তাধস্তি আর রুদ্ধ গলায় মধু’র খাবি খাওয়ার আওয়াজ। তারপর ধপ্ করে মাটির উপর কেউ পড়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ ছটফট করতে থাকলো। ক্রমে সেই ছটফটানি ধীর হয়ে থেমে গেলো। ওরা বোধহয় মধুকে মেরে ফেললো!

হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কতটা পথ চলে এসেছে তা বোঝার উপায় নেই কারণ চোখ বাঁধা। তবে গতকাল রাত থেকে ঘন্টা তিনেক তো হবেই। রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। গায়ে রোদ লাগছে বুঝতে পারছে ধ্রুপদ।

চোখ বাঁধা অবস্থায় হাঁটতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিলো প্রথমে। এদিক ওদিক হোঁচট খাচ্ছিলো, পড়ে যাচ্ছিলো। এখন ছন্দটা কিছুটা আয়ত্তে আসছে। একটা দড়ি দিয়ে ধ্রুপদ আর গার্সিয়া দুজনের কোমরে বেঁধে ফলো করানো হচ্ছে। ধ্রুপদের আগে আগে গার্সিয়া হাঁটছে বুঝতে পারছে কারণ ও বেশী এগিয়ে গেলেই কোমরে টান পড়ছে। দড়ির দুটো মাথা দুজন লোক ধরে থাকছে। মাঝে মাঝে হাত বদল হচ্ছে। উঁচু-নিচু, চড়াই-উৎরাই এসব খুব একটা মানছেনা ওরা। ধ্রুপদ আর গার্সিয়ার চোখের সঙ্গে হাতও বাঁধা ফলে ব‍্যালেন্স রাখতে না পেরে দুজনেই কখনও হড়কে পড়ছে, কখনও গাছের ডালে ঠোকা খাচ্ছে, ছড়ে কেটে যাচ্ছে শরীর। কিন্তু উপায় নেই কারণ ঠিক তখনই পিঠে এসে লাগছে বন্দুকের গুঁতো ।

এরকমভাবে প্রায় একদিন অতিক্রান্ত হলো।রাত্তিরবেলা ওরা যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থেমেছিলো সেই জায়গাটা দেখা গেলো না কারণ চোখের বাঁধন ওরা খুলে দেয় নি। তবে ধ্রুপদ এটুকু বুঝতে পেরেছিলো যে ওকে আর গার্সিয়াকে একজায়গায় রাখা হয়েছিলো।

রাত্রে গার্সিয়া ধ্রুপদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু ওরা সমানে দুজনকে পাহারা দিচ্ছিলো তাই অত‍্যধিক কথাবার্তা শোনা মাত্রই বন্দুকের গুঁতো এসে গার্সিয়ার কথা থামিয়ে দেয়। ধ্রুপদের গোটা রাত ঘুম আসেনি,গুঁড়ি মেরে পড়েছিলো।সারাদিন পর খাবার বলতে জুটেছে একখানা আধপোড়া রুটি আর জল। দলের নেতার কন্ঠস্বর দূর থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছিলো কিন্তু তিনি বা বাকিরা ঠিক কি নিয়ে আলোচনা করছে সেটা জানার উপায় ছিলোনা।

সকাল হতেই আবার চলা শুরু হয়। পুরো ব‍্যাপারটাই এবার ধ্রুপদের বেশ কাল্পনিক লাগতে শুরু করেছে। সে মনে মনে হাসে।। ক্রিয়েটিভ মানুষরা কি বিপদেও সৃষ্টিশীলতা খোঁজে!? পিকাসোর ‘Guernica‘র কথা মনে পড়ে। যুদ্ধ জিঘাংসার এক অনবদ্য চিত্রকল্প! গার্সিয়া কোনো কারণে গতকাল থেকেই চুপ মেরে আছে।

চলতে চলতে একটা সময় ওদের দলটা থামে। ধ্রুপদের কানে, কাছেই কোথাও জল বয়ে যাওয়ার শব্দ আসে। কোনো জলাশয় বা নদী হবে। জলের উপর ভারী বুটের হেঁটে চলে বেড়াবার শব্দ হচ্ছে। বোধহয় ওরা নিজেদের খাবার জল সংগ্রহ করছে। জলের উপস্থিতি বুঝতে পেরেই প্রচন্ড তেষ্টায় গলাটা শুকিয়ে উঠলো। ধ্রুপদ আর থাকতে পারলোনা। জলের শব্দ লক্ষ্য করে এগোতে গেলো। কিছুটা এগোতেই দড়ির অন‍্যপ্রান্তে বাধা গার্সিয়ার কোমরে টান পড়লো, ফলে দুজনেই মাটির উপর উল্টে পড়লো।

ধ্রুপদ কোনো শ‍্যাওলামাখা পাথর বা ওই রকম কিছুর উপরে পড়েছিলো তাই বেশ খানিকটা পিছলে গেলো। পায়ের তলায় জলের ভেজা ভাব এসে লাগতেই বুঝলো ঠিক দিকেই এগোচ্ছিলো। মরিয়া ধ্রুপদ, গার্সিয়া সমেত হেঁচড়ে হেঁচড়ে আরেকটু সামনের দিকে এগোবার চেষ্টা করলো যাতে জলের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।

ওদের এই কান্ড দেখে বাহিনীর লোকজন অনেকেই হেসে উঠলো। এইবার একটা পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে ওদের দিকে মনে হচ্ছে। বোধহয় বন্দুকের ঘায়ে মাথাই ফাটিয়ে দেবে! কিন্তু না। দুটো বলিষ্ঠ হাত ধ্রুপদের ঘাড় ধরে ওকে সোজা করে বসালো তারপরে ওর মুখ চেপে ধরে হাঁ করিয়ে জল ঢালতে থাকলো।

আহ! কি শান্তি!

ধ্রুপদ ঢকঢক করে বেশ কিছুটা জল খাচ্ছিলো হঠাৎ কোথা থেকে একটা বুলেট ফায়ারিং-এর আওয়াজ এলো। ওর জলদাতা লোকটার শরীর ধপ করে ধ্রুপদের পাশে পড়ে গেলো।

-“গেট ডাউন” পিছন থেকে গার্সিয়ার মরিয়া চিৎকার ভেসে এলো।

কথাটা শুনে, ব‍্যাপারটাকে মাথার মধ্যে দ্রুত বিবেচনা করে, মাটিতে শুয়ে পড়ার মূহুর্তে ধ্রুপদ বুঝতে পারলো ওদের চারিদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি চলছে, দুই পক্ষে। গুলির ধাক্কায় একটা শক্ত কিছু ছিটকে এসে সজোরে ওর মাথায় লাগলো।

জ্ঞান হারালো ধ্রুপদ।

জ্ঞান যখন ফিরে এলো, তখন বুঝতে পারলো মাথার পিছনটা ভিজে ও ভারী লাগছে। একটা চলমান ভ‍্যানের ভিতর স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। পাশ ফিরে দেখলো গার্সিয়া বসে আছে ওর হাত ধরে।

ধ্রুপদের চোখের দৃষ্টি একটু পরিষ্কার হচ্ছে আবার ঝাপসা হয়ে আসছে।
ভ‍্যানের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রধারী কয়েকজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোক বসে আছে মনে হল। গার্সিয়ার দিকে আবার তাকাতেই ও মাথা নেড়ে বলল
-“ইয়েস, উই আর সেফ নাও”।
ধ্রুপদ উঠে বসতে গেলো। পারলোনা। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা। ওর আবার চোখ বুজে এলো।

(ক্রমশঃ)

চিত্র: Francois Cachoud

3 thoughts on “পর্ব ১৫: বন‍্যজোৎস্না”

  1. apoorbo..eto sundore manobiksamporko sahnubhuti bhashay uthe esheche..chonirmoto

    Like

Comments are closed.