দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১৪: অরণ‍্যকথা

এর আগে: আশাবরী বিয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার জীবনের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে মেতে থাকে। ওদিকে ট্রেনে উড়িষ্যা যাওয়ার পথে আশাবরীর কথা মনে পড়ে ধ্রুপদের।
Forest, Orissa Border.

বেলা প্রায় একটা। মাথার উপর সূর্য বেশ গনগনে। একটু দূরে বড় বড় গাছের সারি থাকায় হাওয়া দিচ্ছে অল্প অল্প। ধ্রুপদ ঘেমে নেয়ে এসে প্রোজেক্ট এরিয়ার গায়ে লাগোয়া, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো বেঞ্চিতে বসলো। ওদিকে মধু আর নবীনকে নিয়ে গার্সিয়া এখনও খুঁটির উপর দেওয়াল তোলার কাজ জরিপ করে চলেছে। নবীন আর মধু দুজনেই বেশ তৎপর কাজের ছেলে। কটক থেকে ওদেরকে গার্সিয়া আর ধ্রুপদ নিয়োগ করেছে প্রোজেক্টের সহকারী হিসেবে।

আজ দু’মাস হল উড়িষ্যা-তেলেঙ্গানা সীমান্তের এই গ্রামে ওরা ক‍্যাম্প করে, সহজলভ্য সামগ্রী দিয়ে পরিবেশ সচেতন,টেকসই ও এনার্জি স্বনির্ভর গৃহ নির্মাণের এই প্রোজেক্ট শুরু করেছে। এটা মূলত গার্সিয়ার গবেষণার কাজ। ও এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ভারতবর্ষের আদিবাসী গ্রামাঞ্চলে এধরণের একটা কাজ করার স্বপ্ন তার বহুদিনের। লন্ডনে থাকতে নিক হেফনারের বাড়িতে,গার্সিয়া আর ধ্রুপদের এই নিয়ে প্রথম কথা হয়েছিলো।সব শোনার পর ধ্রুপদও যোগাদান করতে চায়।

তারপর দফায় দফায় প্ল‍্যানিং, ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকে প্রোজেক্ট এপ্রুভাল করানো, রাজ‍্যে রাজ্যে ঘুরে প্রয়োজনীয় অঞ্চল বাছাই করা, এসমস্তই হয়েছিলো কিন্তু বৃহত্তর ফান্ডিং-এর অভাবে মূল কাজটা এতদিন শুরু করা যায়নি।এবারে কাজটা করার জন্য বিদেশি এক এনার্জি উৎপাদক সংস্থার আর্থিক সাহায্য ও ভারত সরকারের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।

ওদের গ্রামটা দুই রাজ‍্যের সীমান্তবর্তী অরণ‍্যসঙ্কুল উপত‍্যকা অঞ্চলে। এর পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে বেশ কিছুদিন হলো বিচ্ছিন্নতাবাদী বিপ্লবী দলের গতিবিধি বেড়েছে। উড়িষ্যা ও তার সীমান্তবর্তী চার রাজ্য জুড়েই রয়েছে বৃহৎ অরণ‍্যভূমি। আর এর মধ‍্যেই ছড়িয়ে আছে ওই গেরিলাবাহিনীর বিভিন্ন শাখা। যদিও দীর্ঘদিনের সীমান্তরক্ষী সেনাদের অভিযান,চিরুনী তল্লাশি ও অনেক আত্মসমর্পণের পর এদের আধিপত্য কমে এসেছে কিন্তু কার্যকলাপ এখনও চলছে।

এ অঞ্চলে কাজ করতে আসার বিপত্তিগুলি সম্পর্কে ধ্রুপদ বা গার্সিয়া দুজনেই সরকারিভাবে আভাস পেয়েছিলো। তাই স্থানীয় পুলিশ সুপার জয়দেব পট্টনায়কের কাছে প্রথম দিকে গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসতো। তিনিও দুয়েকবার নিজে এসে ওদের কাজ দেখে গেছেন। দুজন বন্দুকধারী পুলিশ কর্মীকে মোতায়েন করে দেন ওদের ক‍্যাম্পে। গার্সিয়া সেই পুলিশদের সাথে এমন ভাব জমিয়েছে যে পাহারা দেওয়া ছেড়ে তারাও মাঝে মাঝে প্রোজেক্টের কাজে নেমে পড়ে। জয়দেব পট্টনায়ক ধ্রুপদ-দের টিমকে বেশ উৎসাহ আর সাহস দিয়েছেন। প্রোজেক্টে লেবারওয়ার্ক করার জন্য স্থানীয় লোকজন যোগাড় করার ব্যাপারেও সাহায্য করেছেন।

গ্রামের লোকজন প্রথমে একটু গররাজি হলেও পরে অনেকেই এসে যোগ দিয়েছে, মাটি, কাঠ ইত্যাদি কাটা, কাঠামো বানাবার কাজে। দিনমজুরি ভালোই জুটছে তাই এখন বেশ উৎসাহ পাচ্ছে, তাছাড়া কাজটা যে ওদের জন্যই করা হচ্ছে সেটাও বুঝতে পেরেছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ধ্রুপদ, ওদের জেশ্চার আর ফিগার ড্রয়িংও করে থাকে অনেক। ওরা ছবিগুলো দেখে বেশ মজা পায়।

এদিকের গ্রামগুলো অভাবী। জোয়ান পুরুষেরা অনেকেই গ্রাম ছেড়ে উপত্যকা অঞ্চলের নীচে টাউনের দিকে,সরকারী অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের কারখানায় চলে গেছে জীবিকার সন্ধানে। আর একদল মিলিয়ে গেছে অরণ‍্যের গভীরে,সশস্ত্র বিপ্লবের পথে। মহিলারা বেশীরভাগ গাছের পাতার ঠোঙা, ঝুড়ি বানিয়ে বিক্রি করে আর জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করে,কেউ কেউ যা একটু সব্জি ফলাতে পারে তারা হাটে গিয়ে বিক্রি করে। একটা প্রাথমিক ইস্কুল গোছের বাড়িও আছে কিন্তু তাতে ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকের দেখা নেই।

গ্রামসংলগ্ন উপত্যকা অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনবদ্য ও প্রগাঢ়। চারিদিকে ফ্লোরা ও ফনার বিশাল সম্ভার ছড়িয়ে আছে। অনেক রকমের পাখির বাসস্থান। অরণ‍্যের আরও গভীরে শোনা যায় লেপার্ডও রয়েছে গুটিকয়েক । গার্সিয়া এটা শুনে প‍্রথমে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল কিন্তু এখনও অবধি চিত্রিত মার্জারের দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তাদের।

পাশে একটা চেনা গলা পেয়ে ফিরে তাকাল ধ্রুপদ। বুধি ও তার মা। ওরা রোজ আসে ধ্রুপদ-দের ক‍্যাম্পে। রান্নাবান্নার কাজ করে। বদলে নিজেদের জন্য খাবার নিয়ে যায়। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হয়েছে ওদের কাজকর্ম শেখাতে। এখানে মধু আর নবীন ছাড়া ওদের ভাষা আর কেউ বলতে পারেনা। ধ্রুপদ এখন একটু বুঝতে পারে, গার্সিয়া পুরোটাই আকারে ইঙ্গিতে চালায়। প্রথমে ওরা জ্বালানি কাঠেই রান্না করতো, ধীরে ধীরে শেখানোর পর এখন নিজেরাই সোলার প‍্যানেল ব‍্যবহার করতে পারে। এছাড়াও জামাকাপড় কাচাকাচির দরকার পড়লে বা হাট থেকে আনাজপাতি আনার দরকার পড়লে সেসব কাজও করে দেয়।

তবে মাসকাবারি রেশন আর কাজের রসদ আনতে বা মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগের জন‍্য নীচে টাউনে যেতেই হয়। আগে ধ্রুপদ আর গার্সিয়া মধু বা নবীনকে নিয়ে প্রোজেক্টের জীপে করে, মালপত্র নিয়ে আসতো। ইদানীং পুলিশের নিষেধে জীপ নিয়ে ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়েছে। এলাকায় নাকি ল্যান্ডমাইন পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মধ‍্যেই। এখন হাতে টানা ভ‍্যানরিক্সো নিয়ে ঘুরপথে যেতে হয়। তাতে সময় লাগে বেশি।গ্রামের দুএকটা ছেলেকে এই কাজে লাগানো হয়েছে।

ধ্রুপদ মেয়েটিকে ইশারায় বলল খাবার বেড়ে দিতে। সে খুব খুশি। এই ক’দিনে ধ্রুপদ,গার্সিয়া-দের সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়েছে। ওরা যতক্ষণ না খাচ্ছে ততক্ষণ বুধি ও তার মা অপেক্ষা করে। খায় না। অনেকবার বোঝানো হয়েছে ক্ষিদে পেলে,খেয়ে নিতে কিন্তু কাজ হয়নি।

বাসনকোসন ধুয়ে নিজেদের অংশটা নিয়ে ওরা ফিরে যায় গ্রামে। বুধি মেয়েটির বয়স ষোল সতেরো হবে, মা’র বয়স ওই চল্লিশের কাছাকাছি। চকচকে কালো ওদের গায়ের রঙ। চোখগুলি অসম্ভব উজ্জ্বল। মেদহীন রোগাটে কিন্তু দৃঢ় শরীরের গড়ন।

আগে এই অঞ্চলে একটা ফরেস্ট রেস্টহাউস গোছের ছিল, বার্ড ওয়াচিং-এর জন্য। বুধির বাবা-মা ওখানেই কাজ করতো। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উপদ্রবে সরকার সেসব বহুদিন বন্ধ করে দিয়েছে। ওর বাবা এখন টাউনের এক মাল গুদামে কাজ করে।এক, দু’মাসে বাড়ি আসতে পারে।ধ্রুপদ মধুর কাছে জানতে পেরেছে যে মেয়েটির এক বড়দাদা ছিল কিন্তু সে একদিন হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে জানা যায় যে,সে গেরিলাবাহিনীর দলে যোগদান করেছে। বুধি স্কুল যাওয়া ছেড়েছে অনেক আগেই। ওর মা ওই ঠোঙা বানাবার আর পুলিশ ফোর্সের ক‍্যাম্প বসলে রান্নার কাজ করে ।

দুপুরের খাওয়া সেরে গার্সিয়া হ‍্যামক ঝুলিয়ে একটু জিরোচ্ছিলো। গাছতলায় মা-মেয়েতে মিলে বাসন মাজছে। ধ্রুপদ ওদের স্কেচ করছিলো। এমন সময় একটা পুলিশ-এর জীপ এসে থামলো।
একজন সাব-ইন্সপেক্টর নেমে এসে বললেন এসপি এখনি একবার ডেকে পাঠিয়েছেন।
গার্সিয়া আর ধ্রুপদ একবার একে অপরের দিকে তাকালো।তলবের কারণটা আন্দাজ করা যাচ্ছে।

আজ দুসপ্তাহ হলো এসপি জয়দেব পট্টনায়ক বদলি হয়ে নতুন এক অফিসার এসেছেন এবং তার কিছু দিনের মধ্যেই সাংঘাতিক কান্ডটা ঘটে। ধ্রুপদরা যে অঞ্চলে কাজ করছে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে সীমান্তবর্তী এলাকায়,পাশের রাজ‍্য থেকে একটা পুলিশের টিম আসছিলো। সুমো গাড়িতে। টিমটা বিপ্লবী গেরিলা বাহিনীর গতিবিধির খবর পেয়ে আসছিলো তদন্ত করতে । সন্ধ্যা নাগাদ, সীমান্ত এলাকা সংলগ্ন জঙ্গলের ধারে পৌঁছে তাদের গাড়ি খারাপ হয় আর সেই সময়েই আক্রান্ত হয়। এএসপি সমেত ছয়জন অফিসারের ছিন্নভিন্ন দেহ আর বুলেট বিদ্ধ গাড়িটাকে পাশের গ্রামের কিছু লোক পরের দিন সকালে দেখতে পায়।

গার্সিয়া ঘটনাটা শুনে বলেছিলো, এটা ‘অ‍্যামবুশ’। মিথ্যা ইনফরমেশন তৈরি করে একধরনের ট্র‍্যাপ সাজানো হয়। গেরিলা যুদ্ধে নাকি এগুলি হয়েই থাকে।ও যখন কলম্বিয়াতে ছিল সেখানেও আকছার এরকম ঘটনা হতো।এরপর থেকেই চারিদিকে পুলিশের উপদ্রব বেড়ে গেছে।

ধ্রুপদ আর গার্সিয়াকেও থানায় অনেকক্ষণ জেরা করলেন নতুন অফিসার। ওদের কাছে সরকারী অনুমোদনের কাগজপত্র দেখেও খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। ভ্রু কুঁচকে বললেন
-“শুনুন এই মুহূর্তে আপনাদের সিকিউরিটি প্রোভাইড করা আমাদের পক্ষে ডিফিকাল্ট। আমাদের এখন তল্লাশির জন্য অনেক ফোর্স দরকার । আমি এখনি অর্ডার দিচ্ছি না তবে ইটস্ বেটার যে আপনারা ওখান থেকে বেস সরিয়ে নিন।”

গার্সিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– ” আমরা আমাদের প্রোজেক্টের ফার্স্ট ফেজ-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছি,এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে কাজ বন্ধ করা সম্ভব নয়।আর এতদিন তো কোনো কিছু হয়নি। আমার মনে হয়না আমাদের কেউ আ‍্যাটাক করবে। আপনি সিকিউরিটি সরিয়ে নিতে চাইলে নিন। আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু কাজ বন্ধ করা যাবে না।”

-“দেখুন আপনি বিদেশী নাগরিক। আপনার যদি কিছু হয় এম্বাসি আর দিল্লি আমায় …” অফিসারের কথা শেষ হওয়ার আগেই গার্সিয়া কড়া ভাবে বলে উঠলো
-“আমরা একে অপরের সময় নষ্ট করছি অফিসার। আপনি অযথা দুশ্চিন্তা করছেন। আই হ‍্যাভ সিন ওয়ার্স।”
গার্সিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো। ওর হাবভাব দেখে ধ্রুপদও আর বেশী কথা বাড়ালোনা।

নতুন অফিসারটি এবার বাঁকা হাসি দিয়ে বললেন

-“ঠিক আছে। যখন নিজের ভালো চান না…ইন দ‍্যাট কেস। পুলিশ কনস্টেবল দুটো রেখে দিচ্ছি। এরপর আপনাদের ভাগ‍্যে যা আছে। আমি শুধু আপনাদের সাবধান করে দিলাম।”

ক‍্যাম্পে ফেরার পথে পুলিশ অফিসারের কথাটা ধ্রুপদের কানে বারবার ফিরে আসছিলো।

‘ভাগ‍্যে যা আছে’!

(ক্রমশঃ)

চিত্র: Pinterest