এর আগে: রঞ্জনীর মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পরে আশাবরী ও রাজীব বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। আশাবরী ধ্রুপদকে নিমন্ত্রণ জানালেও সে আসেনা।
New South Wales, Australia
..”we were cruising to the backbeat,
Oh yeah,making love in the backseats
We were wild,wild in the streets
Wild,wild in the streets”….
কার স্টিরিওতে রাজীবের প্রিয় গান বাজছে।গাড়ি চালাতে চালাতে রাজীব হাতে ট্যাপ করছে গানের তালে তালে। আজ গন্তব্য হান্টার ভ্যালী। এই ওয়াইন টেস্টিংয়ের ট্যুরটা আশাবরীর প্ল্যান।যদিও রাজীবও সমান উৎসাহী।ঘন্টা দুয়েকের ড্রাইভ তার ওপর ঠান্ডা বেশ জানান দিচ্ছে। মাঝে কাটুম্বাতে একটু ব্রেক নিয়ে পাহাড়ের গায়ে একটা কাফেতে বসেছিল দুজনে।সেখানকার হ্যান্ডমেড চকোলেট কিছু সঙ্গে নিলো যাত্রাপথের জন্যে।কুয়াশা ঘেরা পাহাড় হঠাৎ ঝিরিঝিরি বরফ পড়তে শুরু করলো। এরকম দৃশ্য নাকি বড় একটা দেখা যায়না।
হান্টারভ্যালিতে পৌঁছে ওরা মুগ্ধ।আঙুরখেত,ওয়াইন ব্যারেল,সব মিলিয়ে এক মহাযজ্ঞ।এইসময় ফুলেরা ঘুমন্ত,শীতঘুমের আমেজ কাটিয়ে ফুটবে কিছুদিন পরেই।এসব আশাবরীর কাছে ইউরোপিয়ান কোনো সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছিলো।এই প্রকান্ড আঙুরখেত হেঁটে দেখার জন্যে অতি প্রয়োজনীয় হলো শারীরিক সক্ষমতা।রাজীব ও আশাবরী দুজনকেই সেটা ট্যুর বুকিংয়ের সময় বলে দেওয়া হয়েছে।দুজনে সেভাবেই তৈরী হয়ে এসেছে।এখানে সমস্ত কাজের মধ্যে সমন্বয় এত নিখুঁত যে সত্যি অবাক হতে হয়।আশাবরীর আরো ভালো লাগলো এই ভিনিয়ার্ডের কর্তাব্যক্তিটিকে,যিনি প্রগাঢ় ভালোবাসায় নিজের এই কর্মযজ্ঞকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করে চলেছেন।নিতান্ত অজ্ঞ ব্যক্তির জন্যেও তিনি ট্যুর সাজিয়েছেন এমনভাবে,বাস্তবিক চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন।অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি ওয়াইন ও তার ইতিবৃত্তান্ত বললেন।সঙ্গে আঙ্গুর পরিচিতি।তারপর বিভিন্ন ধরণের ওয়াইন টেস্ট করা হলো,সাথে লাঞ্চ।দারুণ এক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরলো দুজনে। আশাবরী কয়েকটা ছবি পোস্ট করলো ফেসবুকে।তারপর ধ্রুপদকে মেল করলো একটা। গত উইকেন্ডের ব্লু মাউন্টেন,আর ফেদারডেল ওয়াইল্ডলাইফ পার্কেরও কিছু ছবি ফেসবুকে পোস্ট করলো।
ব্লু মাউন্টেনের খাঁড়া পাহাড়,ইউক্যালিপ্টাস সারি,আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু গ্রাম,একদম আঁকা ছবির মতো। বুশ ওয়াকিংয়ের জন্যেও এখানে দারুন ব্যবস্থা রয়েছে।পাহাড়ের গায়ে প্রবল ঠান্ডা হাওয়ায় দুজনেই কাঁপছিলো রীতিমতো।এ এক অন্য পৃথিবীর মতো।এঅঞ্চলে অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরাই মূলত বাস করতো,তারপর ধীরে ধীরে পরিবর্তন ও আধুনিকীকরণ হয়েছে। তবু এই অঞ্চলগুলো আদি মানবসভ্যতার জীবনযাপনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ব্লুমাউন্টেনের একটি অনবদ্য আকর্ষণ হলো থ্রি সিস্টার্স।জেমিসন ভ্যালির উত্তরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিক মতে এসব হলো জল,বাতাসের ক্রিয়ার ফলে নরম বেলেপাথরের ক্ষয়ে যাওয়া এক রূপ।
এ এক অনন্য সাধারণ রূপ। দিনের বিভিন্ন সময়ে সে রূপ বদলে বদলে যায়। তবে এই এলাকার আদিবাসী কিংবদন্তিটি ভারী চিত্তাকর্ষক। যাকে এবরিজিনাল ড্রিম-টাইম লেজেন্ড বলে।
গল্পটা এরকম, কাটুম্বা উপজাতির তিন বোন মিহনী, উইমলাহ, আর গুনেডু,প্রেমে পড়লো নেপিয়া উপজাতির তিন ভাইয়ের।কিন্তু গোষ্ঠীর রীতি অনুযায়ী তাদের বিয়ে কোনোভাবেই কেউ মেনে নিলোনা। তিন ভাই স্থির করলো তাদের প্রেমিকাদের তারা বন্দি করে নিয়ে আসবে,অতঃপর বিয়ে করবে।এই নিয়ে দুই গোষ্ঠীর শুরু হলো যুদ্ধ।তখন কাটুম্বা উপজাতির এক জাদুকর এই তিন বোনকে রক্ষা করার জন্যে তিনটি শিলায় পরিণত করলেন।কিন্তু যুদ্ধে তাঁরও মৃত্যু হওয়ায় তিন বোনের আর মানবীরূপে ফিরে আসা হয়নি।
গল্পগুলো ধ্রুপদকেও লিখেছে আশাবরী।
ওর কোয়ালা দেখার প্রথম অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছে। আশাবরী মাঝে মাঝে ভাবে,বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছে,ধ্রুপদ হয়তো এসব জানতেও চায়না।আবার নিজেকে প্রবোধ দেয়,ধ্রুপদের ভালো না লাগলে তো বলে দিতে পারে।আশাবরীর নিজের অভিজ্ঞতা ধ্রুপদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ভালো লাগে ,তাতে ধ্রুপদের কোনো অনুমতি বা আপত্তি তাকে হতোদ্যম করতে পারেনা।
আবার ছবিগুলোতে চোখ বোলাতে থাকে আশাবরী,দুটো কোয়ালার মাঝে দাঁড়িয়ে হাসছে সে। রাজীব তো একটাকে সাথে করে নিয়ে আসার উপক্রম করেছিলো। সময় খুব দ্রুত কাটছে। সপ্তাহগুলি চোখের নিমিষে ফুরিয়ে যাচ্ছে। এর পরের গন্তব্য ক্যানবেরা,ক্যাঙ্গারুর অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। এইবারে সঙ্গে রাজীবের এক কলিগ ও তার পরিবারও যাচ্ছে।আশাবরী ওখানকার বিশেষ আকর্ষণগুলো শর্টলিস্ট করে ফেলেছে। দীর্ঘ ড্রাইভ,কি কি গান শোনা যায়,তারও একটা লিস্ট করে ফেলবে কিনা ভাবলো আশাবরী।পথে কোথায় ব্রেক নেবে কে জানে।
রাজীব বেশ কিছুক্ষণ এঘরে নেই।আশাবরী বেডরুমে উঁকি দিয়ে দেখলো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গান শুনছে,কানে আইপড গুজেছে।আশাবরী ডাকলোনা ।সেলফোনটা চার্জে বসিয়ে স্নানের জন্য তৈরী হলো।শাওয়ার কার্টেনের আড়ালে আশাবরীর শরীরের ছায়া অবয়ব দেখা যাচ্ছে,গুনগুন করছে কোনো রাগ। রাজীব খুব সন্তর্পণে বাথরুমে ঢুকেছে,পেছন থেকে আশাবরীকে আঁকড়ে ধরে ওর ঘাড়ের কাছে চুমু খেলো, চমকে আশাবরীর হাত থেকে লুফাটা পড়ে গেল। রাজীব এবার আরো শক্ত করে আশাবরীকে টেনে ধরলো।আশাবরীর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে রাজীবের হাত,ঠোঁট।
প্রবল উত্তেজনায় চোখ বুজলো আশাবরী।স্নানের জলে দুজনের শরীর মিশে গেলো।
Yashwantpur Express, India
রাত প্রায় দশটা, কামরার আলোগুলি বেশিরভাগই নেভানো হয়ে গেছে। ট্রেন বেশ জোরে চলছে সেটা দুলুনিতেই টের পাওয়া যাচ্ছে। ডঙ্গল্টা মাঝে মাঝেই নেটওয়ার্ক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বেদম ঝাঁকুনির ফলে ধ্রুপদ কিছুতেই আর্টিকল্-টায় মনোযোগ দিতে পারছিলোনা। উল্টো দিকের আপার-বার্থ থেকে প্রবল নাক ডাকার শব্দ আসছে,একজন মধ্যবয়স্ক লোক কামরা কাঁপিয়ে নাক ডাকছেন। নিচের বার্থে ওনার পনের-ষোলো বছরের মেয়েটি এখনও জেগে। কানে হেডফোন গুঁজে স্মার্টফোনে কিছু একটা দেখে চলেছে। মাঝে চোখ তুলে একবার নাসিকা গর্জনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে, ধ্রুপদের দিকে তাকালো। ইশারা করে ধ্রুপদকে কানে হেডফোন দেওয়ার পরামর্শ দিলো।ধ্রুপদও ইশারায় বললো যে ওর কাছে হেডফোন নেই তারপর ম্যাকবুক বন্ধ করে রেখে দিলো।
জানলার বাইরে দূরে অন্ধকারের মধ্যে কিছু গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছে। মিটমিটে আলোগুলো আধস্বচছ জানালার কাঁচ অবধি পৌঁছেই প্রায় মিলিয়ে যায়।ধ্রুপদের ওপরের বার্থে গার্সিয়া দিব্যি ঘুমাচ্ছে।
হুয়ান গার্সিয়া মার্টিনেজ। বার্সেলোনা স্কুল ওফ আর্কিটেকচারের অধ্যাপক এবং শিল্পী।ধ্রুপদের অনেক দিনের বন্ধু। মাসখানেক হলো সে এদেশে এসেছে। ধ্রুপদকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি, ওড়িশা, হয়ে বেঙ্গালুরুতে চারদিনের একটা ওয়ার্কশপ সেরে দুজনে আবার ওড়িশা ফেরত যাচ্ছে,তিন-চার মাসের একটা প্রোজেক্ট নিয়ে।
বার্থ ছেড়ে উঠে, করিডোর দিয়ে হেঁটে গিয়ে টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়ালো ধ্রুপদ। আ্যটেন্ডেন্টের সিটটা খালি। এদিক ওদিক দেখে নিয়ে টয়লেটের দরজা খুলে ভিতরে সেঁধিয়ে পকেট থেকে মিনি-ফ্লাস্কটা বার করলো। নাসিকা গর্জনের যা প্ৰকোপ তাতে ‘ওল্ড মন্ক’ পেটে না গেলে ঘুম হবে না। দুই তিন ঢোক গিলে বাইরে বেরিয়ে এসে কামরার দরজার ছিটকিনিটা খুললো। এটেন্ডেন্ট ব্যাটার এখনও পাত্তা নেই।
দরজাটা অল্প ফাঁক হতেই ট্রেন চলার শব্দ আর তীব্র হাওয়া ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। নিজেকে দরজার ফাঁক আর কামরার দেওয়ালের মধ্যে ব্যালেন্স করে গু৺জে একটা সিগারেট ধরালো ধ্রুপদ।বাইরের পৃথিবীটা নিমেষের মধ্যে চোখের সামনে থেকে পেরিয়ে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ করে আছে।
আজ প্রায় এক বছর হতে চললো আশাবরীর সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিলো। ধ্রুপদ কলকাতা থেকে ফিরে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই ফোন করেছিলো আশাবরী। প্রথমে নিজের ব্যবহার নিয়ে ক্ষমা চায়,এরপর আসে নানা গল্প। সেদিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই লম্বা ফোন কল আর ওয়াটস্যাপের পালা শুরু হয়।
কড়াইকুরির বাড়িটার প্রতি আশাবরীর দুরন্ত উৎসাহ,তার আদ্যপান্ত ইতিহাস সে জানতে চায়। ধ্রুপদকে এই বিষয়ে ও রীতিমতো জ্বালিয়ে মেরেছে। অদ্ভুত ভাবে ধ্রুপদের তাতে কোনো বিরক্তি বোধ হয়নি,যেটা ওর নিজেরও বেশ অবাক লেগেছিলো।
আশাবরী শেষ ফোনটাতে, রাজীব আর তার বিয়ের আমন্ত্রন জানিয়েছিলো। কিন্তু যাওয়া হয়নি, সেই নিয়ে মেয়ের অভিমানও হয়েছিলো কিছুদিন। আশাবরী এখন নিউ সাউথ ওয়েল্সে থাকে। কবে কোথায় বেড়াতে গেলো, কি দেখলো কি খেলো ইদানীং শুধু তার গপ্পো নিয়ে মশগুল থাকে আশাবরী। বিদেশে থাকতে শুরু করলেই লোকের যা হয়ে থাকে আর কি। কথার ফাঁকে ফাঁকে অস্ট্রেলিয়াতে ঘুরে যেতে অনুরোধ করে ওকে। ধ্রুপদ অবশ্য বলেছে যে এখন কয়েক মাসের জন্য সে গা ঢাকা দেবে ওড়িশার অরণ্যে। তাতে আশাবরী “জঙ্গল মে মঙ্গল” বলে ফুট কেটেছিলো। ধ্রুপদ মনে মনে হেসে ওঠে। বাইরে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। দূরে উল্টো দিকের লাইনে ধেয়ে আসা একটা ট্রেনের সাইরেন শোনা যাচ্ছে।
-“আরে সাব ইতনি রাত কো দরওয়াজা মত খোলিয়ে, গাড়ি বহুৎ তেজ হ্যায় !”
এটেন্ডেন্টের গলার আওয়াজে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে ধ্রুপদ।
ক্রমশঃ


Sundor egochcche.kintu milan hobe katodine!!!!!!!
LikeLike
ধন্যবাদ।
LikeLike