দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১২: পরিণীতা

এর আগে: শিবরঞ্জনীর মৃত্যু নিয়ে আশাবরী ও তার বাবা-মা ‘র মধ্যে যে মনোমালিন্য হয় ধ্রুপদ তার সাক্ষী হয়ে থাকে। আশাবরী রাগে দুঃখে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলে ধ্রুপদ ওকে বিদায় জানিয়ে আসতে পারেনা।
Circuit House Area, Jamshedpur.

সানাইয়ের শব্দে ঘুম ভাঙলো আশাবরীর,বাইরে তখন অন্ধকার। ব্ল্যাংকেটের বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখলো বাকিরা সবাই উঠে পড়েছে,কাল অনেক রাতে সবাই এসেছে।তবু সবাই জেগে গেছে?!

মাসিমণি ডাকতে এলো,
-“আশি, ঝটপট উঠে পড় মা,তোর দধি মঙ্গলের সময় হয়ে গেছে।”
আশাবরী বিরক্তিসূচক শব্দ বের করলো মুখ থেকে
-“ওসব তোমরা করোনা!আমি পরে উঠবো!”
মাসিমণি আঁতকে উঠলেন
-“বলিস কি? দধি মঙ্গল না হলে তোর আর সারাদিনে খাওয়া হবেনা।এরপর শাঁখা পলা পড়তে হবে,আমাদের গঙ্গা নিমন্ত্রনে যেতে হবে।তুই দেরি করলে এসব কখন হবে?”
-“এই মাঝরাতে তোমাদের এসব করতে হবে!?আমি পরে খেয়ে নেবো, তোমরা তোমাদের কাজ করো।” আশাবরী ঘুমজড়ানো গলায় বললো।
-“ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই।উঠে এই নতুন শাড়িটা পরে নে।” বিছানার উপর শাড়িটা রেখে মাসিমণি বেরিয়ে গেলো।

আশাবরীর সেলফোন বেজে উঠলো।রাজীব ভিডিও কল করছে,ওদের কাছাকাছি একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধরবেনা ধরবেনা করেও ধরেই ফেললো ফোনটা,

-“কিরে?!কেমন ফীল্ করছিস?আমিতো দারুন এক্সাইটেড!!” রাজীবের গলায় উত্তেজনা।
আশাবরী আধখোলা চোখেই বললো -“হ্যাঁ ,সেতো তোর বিকশিত দন্ত,আর মাঝরাত্তিরে ভিডিও কলের বহর দেখেই বুঝতে পারছি। কি জন্যে ফোন করেছিস সেটা বল্!”
-“মাঝরাত্তির কি রে!ভোর হতে চললো,তোদের বাড়িতে আচার অনুষ্ঠান শুরু হয়নি?তুই এখনো কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে আছিস?”

আশাবরী হুঁ-হা করে ফোন রেখে,আড়মোড়া ভেঙে উঠলো।একটা নতুন লাল পাড় সাদা শাড়ি সযত্নে রাখা বিছানার পাশে। আশাবরী নাইটস্যুটের ওপরেই শাড়িটা পড়লো, আয়নায় একবার নিজেকে একঝলক দেখলো,পাটভাঙ্গা শাড়ি চারিদিক দিয়ে ঢোলের মতো ফুলে আছে,থাকুক!

বাইরে সব বন্ধুরা আর আত্মীয়স্বজনরা আশাবরীকে দেখেই হইহই করে উঠলো

-“জলদি বসে পড়, এরপর পুরুত আসবে শাঁখাপলা পড়াতে।”
আশাবরী শাড়ি সামলিয়ে কোনরকমে বসে পড়লো। ব্যস! শুরু হয়ে গেলো আচার অত‍্যাচারের পালা।

অনুষ্ঠান হচ্ছে,সকলের হাসি তামাশা চলছে। সবাই আশাবরীর দিকে তাকাচ্ছে, হাসছে, উলুধ্বনি, ওর বাসি মুখে দই-চিড়ে-মিষ্টি ঠুসে দিচ্ছে। আশাবরী খাচ্ছে নিতান্ত অনীহায়। হঠাৎ চোখ ভরে জল এলো। রঞ্জনীর বিয়ের দিনটা মনে পড়ে গেলো। দিদি কি হাসিমুখে সব আচার পালন করছিলো। এখন তো আশাবরীর এসবই অর্থহীন লাগে।পাটভাঙ্গা এরকম একটা শাড়িতে দিদিকে কি স্নিগ্ধ লাগছিলো! আশাবরীর চোখে রঞ্জনী ভেসে উঠলো।
হঠাৎ পিছন থেকে আশাবরীর এক কাকিমা ওকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে শুরু করলেন,
-‘রঞ্জনী থাকলে আজ কত কিছু করতো,এত কম বয়েসে ছেড়ে চলে যাবে ভাবেনি,পুণে থেকে আসতে পারেন নি সেসময়’ এরকম বিভিন্ন কথা। আশাবরী ঠিক মনে করতে পারলোনা ইনি শেষ কবে আশাবরী বা রঞ্জনীর খবর নিয়েছিলেন।
মাসিমণি আশাবরীর অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে ভদ্রমহিলাকে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন।আশাবরী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

বন্ধু,কাজিন,এবার এদের সঙ্গে সেলফি তোলার পালা। ফেসবুক ভরে যাচ্ছে ট্যাগ নোটিফিকেশনে। কোত্থেকে এক ওয়েডিং ফোটোগ্রাফার জুটিয়েছে মেশো। নিজে এত ভালো ছবি তোলে অথচ তাও এসব করা চাই! ফোটোগ্রাফার বেচারা দু একবার সঠিক ক‍্যামেরা অ‍্যাঙ্গেল বার করতে গিয়ে একজন পিসির ঘাড়ের ওপর পড়েই যাচ্ছিলো প্রায়। রাজীব হোয়াটস্যাপ করেছে,তোকে দারুন লাগছে ইত্যাদি।

আশাবরী আবার ঘুমাবার আয়োজন করছিলো,কিন্তু এত লোকের মাঝে ঘুম আসছেইনা। বাড়ীটা একবার ঘোরা যেতে পারে,অনেকদিন পর এসেছে আশাবরী।শেষবার রঞ্জনী আর ও একইসাথে এসেছিলো। রঞ্জনীর ঘরটায় ঢুকলো আশাবরী। একটা তানপুরা ধুলোমাখা পড়ে আছে,বোধহয় বিয়ের আগে শেষ বাজিয়েছিলো রঞ্জনী,আশাবরী পাশে বসে শুনতো,মাঝে মাঝে গলা মেলাতো। হঠাৎ পুরোনো একটা সুর কানে এলো।আওয়াজটা বাবার ঘর থেকে আসছে,এই গান কে শুনছে!?
আশাবরী ছুটে পাশের ঘরে ঢুকেই থমকে গেলো,বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।সিডি প্লেয়ারে রঞ্জনীর গলা,বাবা চশমা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। ঘন ঘন চোখ মুছছে।
আশাবরী কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলো। বাবাকে কেউ ডাকতে এসেছে। নিচে পুরুত অপেক্ষা করছে, বিদ্ধি হবে। আশাবরী আলতো পায়ে ছাদের সিঁড়ি ধরলো। ছাদটা বেশ বড়, তবে বহুদিন অযত্নে পড়ে আছে,বোঝাই যাচ্ছে।

একবার সব বন্ধুরা মিলে এখানে এসে খুব হুল্লোড় হয়েছিলো।আশাবরী সবে সিগারেট টানতে শিখেছে তখন,সবাই মিলে আড্ডা দিতে যেই সিগারেট ধরিয়েছে অমনি দেখে বাবা পেছনে দাঁড়িয়ে।সেকি ভয়ংকর অবস্থা! রঞ্জনী অবশ্য পুরোটাই সামলে নিয়েছিলো।ভেবে ঠোঁটের কোণে একঝলক হাসি খেলে গেলো আশাবরীর। দিদি ছিলোই এরকম,সবকিছু কেমন সামলে নিতে পারতো। নয়তো বাবা সেদিন ঘাড় ধরে বার করে দিতে দুবার ভাবতেন না। বন্ধুদের সামনে সে এক বিচ্ছিরি কান্ড হতো!
পেছনে একটা হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো,মা!
-“রঞ্জনীর কথা খুব মনে পড়ছে,না রে?আমার যে কি খালি খালি লাগে এই বাড়ি ঘর!বুকটা থেকে থেকে হু হু করে ওঠে।এবার তো তুইও বিদেশে চলে যাবি”। মা কথা বলতে বলতে নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা।চোখ থেকে জল গড়িয়ে গেলো। আশাবরী মাকে খানিকটা শান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো,কিছু বললোনা,শুধু কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকলো।
-“নিচে চল্,তোর জন্যে সবাই বসে আছে।আজ একটু সবার সাথে কথা-টথা বল্,এরপর আবার কোথায় কবে দেখা হবে,তোর শাঁখা পলা পড়াবার জন্যে পুরুতও এসে গেছে।” মা চোখ মুছতে মুছতে সহজ হতে চাইলো।

গায়ে হলুদের সময় খুবই হৈচৈ, পুরো বাড়িটাতে উৎসবের মেজাজ। হলুদ মাখা একটা সেলফি তুলে আশাবরী ধ্রুপদকে পাঠালো। ওদিকে কোনো উত্তর নেই! কি রে বাবা! আজব! বাড়িতে বাবার বন্ধু ও কলিগদের স্ত্রী’রা কয়েকজন এসেছেন,আর কয়েকজন পাড়া-পড়শী।এঁরা আশাবরীকে অনেক কম বয়স থেকে চেনেন। যেমন হরবিন্দর আঙ্কলের স্ত্রী সুমন আন্টি, শ্রীবাস্তব আন্টি, আরও অনেকে। মাসিমণি ওদের বাঙালি বিয়ের আচারগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল। তার মাঝেই দু’কলি ঠুংরি বা গীতা দত্ত গুনগুন করতে করতে কাজও করছে। মাসিমণি একাই মাতিয়ে রাখতে পারে।

নীহারিকা সকালে এসেছে,যদিও আসবেনা বলেছিলো।শেষমেশ এই একদিনের জন্যে এসেছে।কাল আশাবরীদের সাথেই ফিরবে।দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর আশাবরী একটু গড়িয়ে নিলো,বিকেলে মেকআপের লোকজন চলে আসবে। নীহারিকা বকবক করেই চলেছে।মিশার সাথে বার দুয়েক কথা বললো ভিডিও কলে। তারপর আচমকাই প্রশ্ন করে বসলো
-“তোর ধ্রুপদ এলোনা?!”
আশাবরী প্রশ্নের কটাক্ষটা স্পষ্ট বুঝেও না বোঝার ভান করে বললো
-“নেমন্তন্ন করার কথা,করেছিলাম। আসা,না-আসা একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।তবে এলে তোর সময়টা বেশ ভালোই কাটতো।” আশাবরী চোখ টিপলো।

ধ্রুপদ সেদিন কলকাতার বাড়িতে দেখা না করেই চলে গেছিলো। তার জন্য আশাবরী পরে বেশ লজ্জিত বোধ করে। ফোনে আর ই-মেইলে নিজের ব‍্যবহারের জন্য ক্ষমাও চায় কিন্তু ধ্রুপদ ওসব মনে ধরে রাখেনি। আশাবরীর মতন দুমদাম অভিমান করার মতন লোক সে নয়। এটা একদিকে ওদের দুজনের আচরণে একটা সমতা রক্ষা করে। যদিও এই সংযোগটা ঠিক কি সেটা নিয়ে আশাবরী এখনও ভাবেনি।তবে এই কয়েক মাসে এমনও দিন গেছে যে ধ্রুপদের সঙ্গে ফোনে বা চ‍্যাটে কথা বলতে বলতে দুপুর পেরিয়ে রাত বা রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেছে।

গোধূলি লগ্নে আশাবরীর বিয়ে।রাজীব একদম বাঙালি বরবেশে তৈরী। আশাবরী আর ওর যখন শুভদৃষ্টি হল রাজীব চোখ ফেরাতে পারছিলোনা।আশাবরীকে রাণীর মতো লাগছে। আটপৌরে বেনারসি,কোমরবন্ধ,নথ এইসব মিলিয়ে যেনো অন্য কোনো জগৎ থেকে আসা মোহময়ী নারী।

আশাবরী রাজীবকে আড়চোখে দেখছিলো, একবার ইশারায় জানতে চাইলো কেমন লাগছে ওকে। রাজীব তার উত্তরে যা মুখভঙ্গি করলো, আশাবরী হেসে ফেললো।অসংখ্য ছবি আর আলোর মধ্যে শুভপরিণয় সম্পন্ন হলো। নিমন্ত্রিতদের সংখ‍্যা খুব বেশী ছিলোনা। একে একে বয়োজ্যেষ্ঠরা আশীর্বাদ জানিয়ে বিদায় নিলেন।
এবার বর বধূর খাবার পালা। নীহারিকা ও অন্যান্য কাজিনরা দল বেঁধে ঘিরে ধরলো রাজীবকে। বিভিন্নভাবে রাজীবকে উত্যক্ত করার চেষ্টা,কিন্তু রাজীব হাসিমুখেই সব সামলে নিলো।খেতে বসে টেবিলের নিচে আশাবরীর পায়ে পা ঠেকাচ্ছিলো বারবার।আশাবরী সরিয়ে দিচ্ছিলো।চোখে চোখ পড়লেই খাবারে মন দিচ্ছিলো।

খাবার পর আড্ডা গান এসব নিয়ে বাসর জাগা হবে।আশাবরী প্রচন্ড ক্লান্ত,কিন্তু নিরুপায়।এরা ছাড়বেনা।আশাবরীকে গান গাওয়ার জন্যে খুব জোরাজুরি করলো সবাই, আশাবরী কোনোমতে দু’ কলি শোনালো। এরপর রাজীবের পালা।ওর গান শুনে নীহারিকা রীতিমতো বিষম খেল।

-“তুই এরকম ভয়ংকর গান করিস জানলে তোকে গাইতেই বলতাম না!এযে ভূত তাড়ানো সংগীত!আশি, তোর এবার সারাজীবনের জন্য একটা অ-সুর জুটলো রে!”
নীহারিকার গলায় কপট আফসোস।সেই নিয়ে সকলে খুব হাসলো।এরপর একে একে সবার প্ল্যান অনুযায়ী গল্প, ডান্সিং ইত‍্যাদি হলো। রাত গভীর হতে আশাবরী রাজীবকে বললো
-” সিগারেট এনেছিস?চল্ একটু বারান্দায় যাই।”
রাজীব বললো
-” এখন সিগারেট খাবি?বাড়ি ভর্তি তোর,আমার আত্মীয়স্বজন। কি ভাববে বল্ তো?”
আশাবরী বললো,
-“যা ভাবার ভাববে।আমার ভালো লাগছেনা,ফিলিং এক্সস্টেড!!”
রাজীব দোনামনা করে উঠলো,বাকি সকলেরই উৎসাহে মোটামুটি ভাটা পড়েছে। নীহারিকাও ঢুলছে। আশাবরী বাইরে আসতেই রাজীব ওর ঠোঁটে একটা আলতো চুমু খেলো।
-“আজ তোকে যা লাগছেনা!আমিতো নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না।” রাজীব ফিসফিসিয়ে বললো।

সিগারেট শেষ করে আশাবরী রাজীবকে কাছে টেনে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো,গভীর আবেশে।একটা ঠান্ডা হাওয়া শিরশিরানি দিয়ে গেলো দুজনকে।

ক্রমশঃ

চিত্র: Santanava Roy

1 thought on “পর্ব ১২: পরিণীতা”

Comments are closed.