এর আগে: একদিকে হসপিটালে শিবরঞ্জনীর অন্তিম অবস্থা আর অন্যদিকে আশাবরী ও ধ্রুপদের একে অপরের আবেগ ও চিন্তা ভাবনার আদান প্রদান চলে।
Southern Avenue
ভোরবেলা রঞ্জনী চলে গেল। নির্মলা খুব কাঁদছিলো। হসপিটালে ডেথ সার্টিফিকেট আর বডি রিলিজ নিতে ঘন্টাদুয়েক সময় লাগলো।রাজীব বেশি রাতে এয়ারপোর্টে নেমেই চলে এসেছে। এসে মোটামুটি সব সামলে নিয়েছে। ধ্রুপদকে আশাবরীর সঙ্গে দেখে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলো কিন্তু আশাবরী ধ্রুপদকে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় দেওয়ায় আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রঞ্জনীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে আশাবরী একবারও কাঁদেনি, কোনো কথাও বলেনি। যেন স্থির এক মূর্তি। মৃতদেহকে সাজিয়ে গুছিয়ে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ করোনেশন ভ্যানে তুলে দিলো।
ধ্রুপদের দেজাভ্যু হল।এরকম আগেও হয়েছিল। এই দৃশ্য,শবদেহ,শোকস্তব্ধতা সে যেন আগেও দেখেছে, বাস্তবে না স্বপ্নে… একটু গুলিয়ে যায়। মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা থাকে যেগুলো স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে একই রকম দেখতে হয়। বিশেষতঃ মৃত্যুর ব্যাপারগুলো।
ধ্রুপদের ঠাকুরদা যখন মারা যান তখন ধ্রুপদ ছোট, করাইকুড়ির বাড়ির চারিদিকে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি, ঠাকুমা,ভেলাম্মা প্রভৃতি বাড়ির মহিলাদের আর্তস্বরে কান্না, এসব অল্প অল্প মনে আছে। গ্রামের লোকজনের ভীড় করে ঠাকুরদাকে দাহ করতে নিয়ে যাওয়া এসব দেখে প্রথমবার বেশ ভয় পেয়েছিলো ধ্রুপদ। ভেলাম্মার হাত জাপ্টে ধরেছিলো। তার একবছর পর ঠাকুমাও চলে যান, তখন অবশ্য ধ্রুপদরা চেন্নাইতে চলে এসেছিলো। তবে বাবার মৃত্যুর পুরো ব্যাপারটাই ধ্রুপদের চোখের সামনে হয়, তখন সবে ও লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।রবিবারের রান্নাটা নিজেই করতেন বরাবর।
রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ করেই বাবা বুক চেপে মাটিতে শুয়ে পড়েন। ডাক্তার এসে পৌঁছবার সুযোগও পাওয়া যায় নি। ম্যাসিভ কার্ডিয়াক আ্যরেস্ট হয়েছিলো।
বাবার সৎকারের সমস্ত কাজ ধ্রুপদকে নিজের দায়িত্বেই সারতে হয়।
ওই সময় একজন মানুষকে হয়তো এক মুহূর্তে আশা করেছিল ধ্রুপদ,কিন্তু তাকে পাশে পায়নি।
তাঁর ফোন এসেছিলো অনেক পরে, লন্ডনে থাকতে।ধ্রুপদ তাঁকে ক্ষমা করতে পারেনি।
আশাবরীর মা বাবা পৌঁছেছেন অবশেষে। কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে। দুজনেই রঞ্জনীর সাথে শেষ দেখা না করতে পেরে আক্ষেপ করে চলেছেন।
রাজীব আশাবরীর সাথে দুএকবার কথা বলার চেষ্টা করলো।কিন্তু আশাবরী যেন ধ্যানে বসেছে। বাইরের পৃথিবীর কিছুই ওর ভেতরে পৌঁছচ্ছে না। সমস্ত শব্দ,দৃশ্যের ঊর্ধ্বে, নিজের মনের খিড়কি দরজা বন্ধ করে বসে আছে।
শ্মশান থেকে ফ্ল্যাটে ফিরতে সবার প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেলো। নির্মলা সবাইকে চা বানিয়ে দিচ্ছে। ঘরে আশাবরীর মা বাবা, রাজীব ও কিছু চেনাজানা লোক মিলিয়ে আন্দাজ পনেরোজন হবে।নীহারিকা সরাসরি ফ্ল্যাটেই এসেছে,মিস্টার মিত্র এবং আরো কয়েকজনকে নিয়ে।রাজীব সকলকে জানিয়েছিলো, সুনিপুণভাবে রাজীব আয়োজনগুলো সেরেছে। আশাবরীর চেন্নাইয়ের মাসি-মেশো এখনও এসে পৌঁছাতে পারেননি।নীহারিকা একপ্রস্থ শান্ত্বনা বাণী শোনালো,মিস্টার মিত্র আশাবরীকে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করলেন।আশাবরীর চোয়াল মাঝে মাঝে শক্ত হয়ে উঠছে,রাজীব বুঝতে পেরে সবাইকে নানা অজুহাতে সরিয়ে আনলো। একজন পুরোহিত সব নিয়মাবলী,ফর্দ ধরিয়ে দিলেন আশাবরীর বাবাকে। ভদ্রলোক এখনো সেভাবে ভেঙে পড়েননি।
ধ্রুপদের এই মৃতদেহ সৎকার ও আনুষঙ্গিক রীতিরেওয়াজগুলো খুব অনর্থক লাগে,কিন্তু কোনো কারণে আশাবরীকে ছেড়ে যেতে পারছেনা। অগত্যা লোকজনের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কাজ ছিলোনা। মিস্টার মিত্র আর নীহারিকা আসায় কিছুটা সময় ওদের সাথে কথা বললো,তারপর আবার আশাবরী যে ঘরে বসে আছে সেখানে এসে বসলো।
লোকজন একটু কমে আসতে রাজীব, ধ্রুপদকে সিগারেট খেতে ব্যালকনিতে নিয়ে এলো।
-” সরি, এতকিছুর মাঝে আপনার সাথে ভালো করে আলাপ হয়নি,আমি রাজীব মুখার্জি। আশাবরীর ফিয়ন্সে!”
রাজীব হাত বাড়িয়ে দেয়।
-“আমি ধ্রুপদ সুব্রম্যনিয়ম।” ধ্রুপদ প্রতিনমস্কার জানায়।
-“কি বলে যে ধন্যবাদ জানাই,আপনি গতকাল পাশে না থাকলে আশির..”
রাজীব আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ ঘরের মধ্যে উঁচু গলায় কথা বলার আওয়াজ পাওয়া গেলো।
দুজনেই সিগারেট ফেলে ঘরে এলো কিন্তু ধ্রুপদ একটু থমকে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো আশাবরীর চেহারা দেখে। আশাবরীর বাবা-মা আর তার মধ্যে মনোমালিন্য হচ্ছে সম্ভবত। আশাবরী ফুঁসছে,চোখে জল। রাগ আর ঘৃণা মেশা এক প্রচন্ড মূর্তি!
-“তোমরা এইভাবে দিদির জীবনটা তছনছ করে দিয়েছিলে আর এখন আমাকে সেই একই দোহাই দিচ্ছো!আত্মীয়-পরিজন আর সমাজ! নিজের মেয়ের জীবন কিছু নয়!? দিদি যখন আমেরিকাতে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করছে তখন প্রতিনিয়ত সোসাইটি, ফ্যামিলি, এইসবের নামে দিদিকে ভুল বুঝিয়ে,ফিরে আসতে বারণ করেছ। নিউ জার্সি থেকে চলে আসার পরও ওকে নিজেদের থেকে দূরে রেখেছিলে, যাতে পাড়া প্রতিবেশী কোনো প্রশ্ন না তোলে।এখন তো শান্তি। সব মিটে গেছে।”
-“আশাবরী!” পাল্টা ধমকের সুরে আশাবরীর বাবা বলে উঠলেন।
-“তোমাকে সমস্ত প্রশ্নের জবাবদিহি করবার প্রয়োজন দেখিনা।আমরা কেউ সমাজের বাইরে নেই।তবে তোমার এই চিন্তাধারা একদিন তোমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করবে,মিলিয়ে নিয়ো।”
আশাবরীর মা এবার ডুকরে উঠলেন
-“আশি,আমরা কি তোর খারাপ চাই?তোর বাবা-মা তো আমরা।তোরা ভালো থাকিস এটাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা। একজনকে তো হারালাম।তুইও যদি আমাদের থেকে দূরে চলে যাস..”
-“মা,প্লিজ! এসব ইমোশনাল ড্রামা করে তো দিদিকে বিয়ে দিয়েছিলে,কি হলো তার?কেমন জীবন পেলো সে? কিন্তু একবারও তোমাদের কমপ্লেন করতে আসেনি। Not for a bloody single time!”
চিৎকার করে উঠল আশাবরী, গলায় কান্না আর রাগ মিলে মিশে গেছে।
-“আশি! কি পাগলের মতো করছিস! রঞ্জনীর চলে যাওয়াটা সবার জন্যেই একটা গ্রেভ লস এবং দুর্ভাগ্যজনক। তুই তার জন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারিসনা”। রাজীব আশাবরীকে শান্ত করার় চেষ্টা করলো।
এক ঝটকায় রাজীবের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দিদির বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল আশাবরী,
-“হ্যাঁ !চলে গেছে,আর যাবার আগে নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে পৃথিবীতে শুধু অন্যের জন্যে বেঁচে থাকা যায়না! নিজের বোধবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র চাপিয়ে দেয়া নিয়ম কানুন,আর ধ্যানধারণা নিয়ে জীবন কাটাতে আমি পারবোনা। আমি রঞ্জনী নই।এবার আমায় মুক্তি দাও।”
বেডরুমের দরজা সশব্দে বন্ধ হলো। ভিতর থেকে আশাবরীর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে।কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।আশাবরীর মা মাথা নিচু করে মাটিতেই বসে পড়লেন।বাবা পাশের ঘরে চলে গেলেন।ধ্রুপদ দেওয়ালে মাথা হেলান দিলো। সিলিং ফ্যানের গতির সাথে ধ্রুপদের চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকলো। একজন মানুষ বাইরে থেকে যেমন,মনের ভেতরে সে কত অন্যরকম! রঙের পরতের নীচে যেমন শিল্পীর ভাবনাগুলো মিশে থাকে,তেমনি বাইরের আদব কায়দায় মানুষের ভেতরের রং চাপা পড়ে যায়।
রাজীব কিছুক্ষণ আশাবরীর দরজায় ধাক্কা দিয়ে হাল ছেড়ে দিলো।তারপর আশাবরীর মা কে অন্য ঘরে নিয়ে গেলো ধরে ধরে। ভদ্রমহিলা যে ভেঙে পড়েছেন বোঝাই যাচ্ছে। নির্মলা, ঠিক কি করবে বুঝতে না পেরে রান্নাঘরে খুটখাট করে চলেছে। রাজীব একটু পরে ধ্রুপদের কাছে এসে বসলো
-“আপনার হয়তো অস্বস্তি হচ্ছে,আসলে এত বড় একটা শোক,বুঝতেই পারছেন।”
ধ্রুপদের মনে হলো এসব কথা না বললেও হতো। তবু সে ভদ্রতা করে বললো,
-“সেটাই স্বাভাবিক।আমি অবাক হচ্ছিনা।”
রাজীব এবার বলে উঠলো
-” আমাকে একবার বাড়ি যেতে হবে। আসলে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা এখানে এসেছি তো। একটু ফ্রেশ হবো। আপনারও তো কিছু পেটে পড়েনি বোধহয়,চলুন আমার বাড়ি। সন্ধে হয়ে গেলো তো প্রায়।”
ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই ধ্রুপদ উঠে দাঁড়ালো,এবার বেরিয়ে পড়তে হবে।
8.40 এর ফ্লাইটটা নয়তো মিস হয়ে যাবে।কলকাতার বাকি কাজগুলো এই ঘটনার জন্য সারা হলো না। কাল দিল্লিতে ওয়ার্কশপ। ঘড়ি থেকে মুখ সরিয়ে ধ্রুপদ রাজীবকে বললো
-“ধন্যবাদ কিন্তু আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে।আমি আর দেরি করতে পারবোনা।হোটেল থেকে ব্যাগেজ নিয়েই এয়ারপোর্টে ছুটবো।আপনার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলাম না,দুঃখিত!”
রাজীব তাও বলে
-“বেশ তো!আমি আপনাকে হোটেলে নামিয়ে দি!?”
-“তার প্রয়োজন নেই,আমি ক্যাব ধরে নিচ্ছি, আপনিও যথেষ্ট ক্লান্ত।একটু রেস্ট নিন,এদিকেও অনেক কাজ পড়ে আছে।”ধ্রুপদ রাজীবকে নিরস্ত করলো।তারপর আশাবরীর বাবা-মা ও রাজীবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো। আশাবরীকে বিদায় জানানোর সুযোগ পেলোনা, আশাবরী দরজা খোলেনি…
‘Aisa na ho kabhi
Ki palat kar na aa sakun
Har baar dur jaake
Sadaayein mujhe na do’
ক্রমশঃ

Bhalo hoeche
LikeLike