দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১০: শিবরঞ্জনী

এর আগে: নীহারিকার বাড়ির ডিনার পর্বের পর আশাবরী ও ধ্রুপদের পরিচয় যখন আরেকটু ঘনীভূত হচ্ছে সেইসময় আশাবরীর কাছে দুঃসংবাদ আসে।শিবরঞ্জনী হসপিটালে।ওরা হসপিটালে পৌঁছে জানতে পারে শিবরঞ্জনীর অবস্থাশঙ্কাজনক
Hospital

মধ‍্যরাত পেরিয়েছে কিছুক্ষণ,তবু সময় যেন কাটতেই চাইছেনা। রঞ্জনীর অবস্হার এখনও বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।ইতিমধ্যে অনেকগুলি ফোন এসেছে। বাবা মাকে খবর দিতেই হয়েছিলো।ওঁরা ভোরের স্টীল এক্সপ্রেসে পৌঁছাবে। নীহারিকাও ফোন করেছিলো,সকালে আসবে।রাজীবের ফ্লাইটও হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাবে।

আশাবরীকে এবার একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। গতকাল সারাদিন ধরে অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। দিনের শেষভাগে এসে যে এমন কিছু হবে তার জন্য শরীর বা মন কোনোটাই তৈরি ছিলোনা।
আশাবরী বারবার উঠে আই সি ইউ’র সামনে যাচ্ছিলো। যদিও ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা,তবু। উৎকণ্ঠিত আশাবরী ফিরে এসে বসলো মাথা ঝুঁকিয়ে। শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে।
ধ্রুপদ ওর অবস্থা দেখে বললো
-“এক কাপ কফি খাবেন? এখনও তো অনেকটা রাত জাগতে হবে। খেলে ভালো লাগবে, নার্ভগুলো একটু সতেজ হবে। ”
আশাবরী কোনো কথা বললোনা,শুধু মাথা নেড়ে ধ্রুপদের কথায় সায় দিলো। নির্মলাকে বলে দুজন বেরিয়ে এলো।
ধ্রুপদ আগে আগে হাঁটছে,আশাবরী বাচ্চা মেয়ের মতো ধ্রুপদকে অনুসরণ করছে। ক্লান্ত আশাবরী মাথা নামিয়ে একটু দুলে দুলে হাঁটছিল,লিফ্টের দরজার কাছে ধ্রুপদের পিঠে ধাক্কা খেলো।
-“সরি,সরি!আপনার লাগেনিতো?আমি খেয়াল করিনি লিফ্ট এসে গেছে।”বলে জিভ কাটলো আশাবরী।
ধ্রুপদ ওর ভঙ্গি দেখে অল্প হেসে উঠলো।এরপর দুজনে কফি নিলো,ব্ল্যাক! উইদাউট সুগার! বসলো হসপিটাল ক্যাফের একটা কোণায়।পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় হলো একবার।

ক‍্যাফেতে খুব বেশী লোক নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু’একজন বসে আছে।কেউ মোবাইলে ব্যস্ত,কেউ ঢুলছে।ঝিমিয়ে পড়া চারপাশ। ধ্রুপদের হাসপাতাল-স্মৃতি খুব বেশী নেই। ঠাকুরদা, ঠাকুমা থেকে বাবা সকলে বাড়িতেই দেহ রেখেছেন।এক দু’বার যা গেছে সেটাও নিজের লোকের জন্য নয়।
শুধু একবার… কার্ডিফ সিটির হসপিটালের বেডে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলো, আচ্ছন্ন অবস্থায়… সেসব ঘটনার কথা ভাবতে চায়না ধ্রুপদ, ভুলে যেতে চায়।
হসপিটালে ঢুকলেই ওর কেমন গুমোট লাগে। কথাবার্তা বললে হয়তো সে ব্যাপারটা কেটে যাবে।এই ভেবে মনে মনে একটু গুছিয়ে নিয়ে আশাবরীকে জিজ্ঞেস করলো
-“এরকম কি অনেকদিন ধরেই হয়?”
-” টার্মিনাল লাং ক‍্যানসার, শেষ স্টেজ” গলার স্বর প্রায় বুজে আসছে আশাবরীর।
ধ্রুপদ আর কিছু জানতে চাইলোনা।
কফি কাপটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আশাবরী। চুপচাপ। চোখের কোণ বেয়ে ক্ষীণ একটা জলের ধারা নেমে আসছে গালে।
কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ আপনমনেই বলতে শুরু করলো
-“দিদির মতো সহজ মানুষের জীবন এতটা জটিল হয়ে যাবে সেটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়,এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত রেহাই দিচ্ছেনা। সুন্দর সংসারের স্বপ্নে বিভোর মেয়েটার সংসার আর জীবন, কোনোটাই উপভোগ করা হলোনা।জীবন কখনো কখনো আমাদের ফাঁকি দেয়, কথাটা আজ বেশ বুঝতে পারি।”

ধ্রুপদ খেয়াল করলো, আশাবরীর চিবুক বেশ দৃঢ় ও জ‍্যামিতিক। তার ওপরে কোথাও স্নিগ্ধ একটা শৈশবের রেশ থেকে গেছে। আশাবরীর অন‍্যহাতটা টেবিলের ওপরেই আলগোছে পড়েছিলো।
ধ্রুপদ তার ওপর হাত রাখল,ভরসা দিতে চাইলো আশাবরীকে। আশাবরী ওর দিকে তাকিয়ে ধীরে চোখের পলক ফেললো।একটা জলের বিন্দু টুপ করে ধ্রুপদের হাতে পড়লো।
ধ্রুপদ কয়েকটা টিস্যু এগিয়ে দিলো আশাবরীকে। চোখ মুছে কফিতে চুমুক দিলো আশাবরী।

প্রতীক্ষার প্রহর লম্বা হচ্ছে। আই সিউর বাইরে অপেক্ষায় আরও দুঘন্টা সময় কাটলো। নির্মলাকে চা আর রাতের খাবার খাইয়ে এনেছে আশাবরী। এবার ধ্রুপদকে বললো
-“একবার বাইরে যাবেন আমার সাথে?”
ধ্রুপদ বুঝতে পারলো আশাবরী এই পরিবেশ থেকে বেরোতে চাইছে।
হাসপাতালের বাইরে বেশ লোকজন রয়েছে এখনও। একটা দোকান খোলা। এটা প্রায় সারারাতই খোলা থাকে বোঝা যায়। রাতের খাবার-দাবারের পর্ব শেষ,এবার চা কফির খদ্দেরদের ভীড়। মাঝে মাঝে বাটার টোস্ট, ডিম ভাজা,ম‍্যাগি ইত্যাদি হচ্ছে। উর্দি পরা হসপিটালের কর্মীরা আসা যাওয়া করছে । কেউ ডিউটির ফাঁকে ফোনে প্রেম করছে। কেউ সংসারের গালগপ্পো করছে চা খেতে খেতে। ডিউটিরত ডাক্তাররাও মাঝেমধ্যে আসছেন। আশাবরী আর ধ্রুপদ দোকানটা থেকে সিগারেট কিনে একটা পাশে এসে দাঁড়ালো।এদিকটায় লোক কম যাতায়াত করছে,দোকানের রেডিওতে এফ.এম তরঙ্গে পুরোনো হিন্দি গান বাজছে,পাকিজা ছবির ‘ঠারে রহিয়ো’।

আশাবরী সিগারেটে টান দিতে দিতে বললো,
-“এটা দিদির প্রিয় একটা গান। গান দিদিকে যত আনন্দ দিতো, তা বোধহয় আর কোনকিছুতেই দিতে পারেনি। সেটাও তো ছেড়ে গেলো। ভালোমানুষগুলোর সঙ্গেই এরকম কেন হয়?”

ধ্রুপদ মন দিয়ে কথাগুলো শুনছিলো।
শিবরঞ্জনীর গানের কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে আমেরিকাতে সংসার,ভঙ্গুর বিবাহ,স্বামীর অত‍্যাচার আর ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে আমেরিকা থেকে ফিরে আসা,পরিবারের সাথেও পরোক্ষ এক লড়াই,এমন অনেক ব্যক্তিগত কথা বলে ফেললো আশাবরী। তারপর একসময় ওর গলা ধরে এলো। অনেকক্ষন জল না খাওয়ায় ডিহাইড্রেশন হচ্ছে বোধহয়। ধ্রুপদ দোকানটা থেকে জল কিনতে গেলো,ততক্ষনে আশাবরী একটু সামলে নিয়েছে।

গ‍্যালারিতে ধ্রুপদকে যতটা অহংকারী মেজাজের বলে মনে হয়েছিলো, এতক্ষণ ওর সাথে থাকার পর মনে হচ্ছে সেটা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়।তাহলে এভাবে হসপিটালে বসে থাকতোনা।
আশাবরী লক্ষ্য করলো ধ্রুপদ জল নিয়ে ফিরে আসছে। ঋজু, দৃঢ় হাঁটার ভঙ্গি।বেশ লাগে দেখতে! মনে মনে আবার জিভ কাটলো।
ধ্রুপদ আশাবরীর হাতে জলের বোতল দিয়ে নিজে আরেকটা সিগারেট ধরালো।হালকা একটু নেশা যা হয়েছিলো,সেটা আর নেই।তার বদলে মাথার পেছন দিকটায় চাপ লাগছে। আড়চোখে আশাবরীকে দেখতে গিয়ে চোখে চোখ পড়লো,দুজনেই হেসে ফেললো।

দুঢোক জল খেয়ে বোতলটা ওর দিকে এগিয়ে ধরলো আশাবরী। চেহারায় ক্লান্তি আর উদ্বেগের মাঝেও ওর স্বতঃস্ফূর্ত ব্যক্তিত্বটা ফুটে আছে। প্রথম দেখাতেও আশাবরীর এহেন সহজ ভাবভঙ্গি ভালো লেগেছিলো ধ্রুপদের।আজও সেটাই আবার টানছিলো। আশাবরীর সঙ্গে এ মুহূর্তে এখানে বসে থাকার কি এটাই কারণ? কে জানে! এখন এসব ভাবনা নিতান্তই অবান্তর মনে হলো ধ্রুপদের।

-“আপনি চাইলে ফিরে গিয়ে রেস্ট করতে পারেন।এভাবে এতক্ষণ বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই!কাল তো আপনার দিল্লি যাবার কথা”
ক্লান্তি আর বিষাদ জড়ানো গলায় বললো আশাবরী।
-“আমি ঠিক আছি।রাত জাগায় আমার কোনো অসুবিধে নেই।তবে আপনি আপনার বাড়িতে খবরটা..”

“দিয়েছি”…আশাবরী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো।
কিন্তু তার আগেই ফোন বেজে উঠলো।

-“আমরা এখুনি আসছি।” ফোনে শুধু এই উত্তর দিয়েই ধ্রুপদের হাত টেনে ধরলো আশাবরী।
-“তাড়াতাড়ি চলুন,দিদির জ্ঞান ফিরছে।”

আশাবরীর মুখ উজ্জ্বল,সে হাঁটছে হাওয়ার ছন্দে।ধ্রুপদের চোখে একটা ক্যানভাস ভেসে উঠছে।মুক্ত হাওয়ার মতো,একঝলকেই সমস্ত বিষাদ দূরে নিয়ে যাচ্ছে।

ডাক্তার বললেন শিবরঞ্জনী আধো-চেতনের মধ্যে আছে, তবে আশাজনক কোনো প‍্যারামিটার আর দেখা যাচ্ছে না। ওকে এবার কেবিনে শিফ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। আশাবরী একবার দেখা করতে পারে। আশাবরীকে যেন কেউ পেরেক দিয়ে মাটির সাথে গেঁথে দিচ্ছে।পা নড়তে চাইছে না।
আর কিছু করার নেই!
ধ্রুপদ আশাবরীর কাঁধে হাত রাখলো।
তারপর হাত ধরে সামনের একটা চেয়ারে বসালো।
আশাবরী যেন বাহ্যজ্ঞান হারিয়েছে।
ধ্রুপদ বুঝতে পারলো আশাবরী ভেঙে পড়ছে।যতটা সম্ভব আশ্বাসের গলায় বললো
-“ভেতরে যান,দিদি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন”
ধ্রুপদের কথায় কিছুটা শক্তি পেয়ে আশাবরী আবার উঠে দাঁড়ালো।
কেবিনটা ঠান্ডা, খুব মৃদু যান্ত্রিক আওয়াজ আসছে দিদির পাশে রাখা হার্ট মনিটর থেকে। রঞ্জনীর হাত ধরে আশাবরী খুব ধীরে ডাকলো
-“দিদি!”
রঞ্জনী মৃদু চোখ খুলেছে,হালকা আলোয় ধ্রুপদ আর আশাবরীকে একবার দেখতে পেলো। আশাবরী হাতে একটা হালকা চাপ অনুভব করছে, রঞ্জনী কিছু বলতে চায়! ধ্রুপদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে।
আশাবরী আবার ডাকলো
-“দিদি!!কিছু বলবি?”
রঞ্জনীর চোখের মধ্যে কিছু একটা বক্তব্য আছে বোঝা গেলো কিন্তু জানা গেলোনা। ঘরে যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই। রঞ্জনীর নি:শ্বাসের শব্দ ভারী হয়ে এলো। অত্যন্ত ধীর। ধ্রুপদ আর দাঁড়ালোনা।ওদের একা ছেড়ে দিলো। আশাবরী বেশ কিছুক্ষণ ভেতরেই বসে রইলো।

রাত এবার শেষপ্রহরে পা রেখেছে।হাসপাতালে একটু একটু ক’রে লোক বাড়ছে, তবে বেশীরভাগই কর্মী। আশাবরী ভারাক্রান্ত মনে কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের চেয়ারে বসলো।ধ্রুপদও জল খেয়ে ফিরে এসে পাশে বসেছে।

আশাবরী একটু ঝিমিয়ে পড়েছে। ধ্রুপদ আলতো ভাবে চেয়ারে গা ঘেঁষে আশাবরীর চেয়ারের পেছনে হাত রাখলো। আশাবরী মাথাটা আস্তে আস্তে ধ্রুপদের কাঁধে এলিয়ে দিলো। ধ্রুপদের বলিষ্ঠ কাঁধ,হাতের পেশিগুলো টানটান,তবু আরামদায়ক একটা ওম আছে যেন! আশাবরীর ঘুমে চোখ বুজে এলো। শরীরটা ভারী হয়ে আসছে। তন্দ্রা আর জাগরণে কিছুটা সময় কেটে গেলো। শুনতে পেলো রঞ্জনী ডাকছে! চমকে উঠে সোজা হয়ে বসলো আশাবরী। নাহ!কোথাও কিছু নেই। একটু উঠে হাঁটাহাঁটি করা যাক।ওর নড়াচড়ায় ধ্রুপদও সজাগ হয়ে একটু দূরে সরে বসেছে।

নির্মলা অন‍্যদিকের চেয়ারে বসে ঢুলছে।মেয়েটার ওপর দিয়েও কম ধকল যায়নি। ভোর হতে আর বেশী বাকি নেই। হঠাৎ কি খেয়াল হতেই মোবাইলটা ব্যাগ থেকে বার করলো আশাবরী। রাজীবের এয়ারপোর্টে নামার সময় হয়ে গেছে ওকে একটা ফোন করতে হবে। ভাবতে ভাবতে ধ্রুপদের দিকে দৃষ্টি গেলো আশাবরীর।

ধ্রুপদ অন্যদিকে তাকিয়ে আছে,যেন কোনো গভীর চিন্তায় মগ্ন। চোখগুলো ক্লান্ত তবু কি এক অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য আছে। এই দুদিন কতরকম ভাবে মানুষটা তার কাছে ধরা দিলো, এক একটা রূপ এক এক রকমের

“…saari aankhein thi aainey uske
saare chehron mein intekhaab tha woh
ye khwaab hai ki woh haqeeqat tha
ye haqeeqat hai ki koi khwaab tha woh
sab se ghul-mil kar ajnabi rehna
ek dariya’numa saraab tha wo
apni neendein usi ki nazar hui
maine paya tha ratjagon mein usey.

Maine dekha tha un dino mein usey..”

ক্রমশঃ

চিত্র: Nhienan
উদ্ধৃতি: Mohsin Naqvi

1 thought on “পর্ব ১০: শিবরঞ্জনী”

  1. Khub bhalo hoeche ae parbo ta…asole akdom personal experience er Sathe mil ache to tai…chobi ta asadharan….mon kharap

    Like

Comments are closed.