দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ৯: প্রিয় যে জন

এর আগে: নীহারিকার বাড়িতে ডিনারে এসে দ্বিতীয়বার ধ্রুপদের দেখা পায় আশাবরী। মিশার সাথে ধ্রুপদের বন্ধুত্ব দেখে অবাক হয়। ধ্রুপদের সঙ্গে আলাপ জমে উঠতে শুরু করে।
Lake Road.

নির্মলা রোজকার মতন আটটার মধ্যে দিদিকে ওষুধ দিয়ে ডিনার খাইয়ে দিয়েছিল। এরপর টিভি খুলে বসে। আগে দিদিও এসে পাশে বসে দেখতো। কিছু কিছু সিরিয়াল দেখলে নিজেই ধমক দিয়ে বলতো
“কি সব ছাইপাশ দেখছিস চ‍্যানেল চেঞ্জ কর এক্ষুনি”!
আবার কিছু অনুষ্ঠানের আগে নিজে থেকেই নির্মলাকে টিভি খুলে দিতে বলতো । গানের যে কোনো অনুষ্ঠান দিদির খুব প্রিয়। হিন্দি বাংলা সবরকম। একটু সুস্থ থাকলেই দিদি গান গায়। নির্মলাকেও অনেক গান শুনিয়েছে। তবে ইদানীং দিদির শরীরটা বেশ খারাপ যাচ্ছে। বেশিক্ষন বসে থাকলেও নিঃশ্বাসের কষ্ট হয়। বেডরুমেই দিনের সিংহভাগ সময়টা কাটায়। দিদির মা-বাবাও একটানা বেশি দিন এসে থাকতে পারেন না, বাবার সম্প্রতি হার্টের রোগ ধরা পড়েছে। শুধু আশিদিদি রোজ আসে। নিয়মিত দিদির চেকাপ করানো বা টেস্ট ইত‍্যাদি সব করে। মাঝে মাঝে রাতে থেকেও যায়। এই বাড়িতে প্রায় বছরখানেক হলো নার্সিং-এর কাজে বহাল হয়েছে নির্মলা। ওর ডাক্তারি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য একটু বেশি টাকা দিয়েও আশাবরী ওকে রাখতে রাজি হয়েছিল। ও কাজে আসার পর থেকে আশাবরী অনেকটা ভরসা পায়।
টিভির শব্দটা সাধারণত কমই রাখে নির্মলা, যাতে পাশের ঘরে দিদির কিছু হলেই বুঝতে পারে। কিন্তু আজ প্রায় একঘন্টা হতে চলল দিদির ঘর থেকে কোন সাড়াশব্দ পায়নি । বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে ঘুমাবার আগে তো দিদি একবার ডাকে। পোশাক পাল্টে তার গায়ে হাতে ক্রিম মাসাজ না করে দিলে দিদি ঘুমাতে যায় না। নির্মলা টিভি বন্ধ করে, দিদির বেডরুমে উঁকি দিল। বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বলছে, বিছানায় কেউ নেই। বইটা বালিশের পাশে খোলা পড়ে রয়েছে। বিছানার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বাথরুমের দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল নির্মলা। বাথরুমের দরজা আর ঘরের মাঝে দিদির শরীরটা পড়ে আছে। অচৈতন্য। নির্মলার মুখ থেকে একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে গেল..

Southern Avenue

নীহারিকার বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায় দশটা বাজল। ডিনারে খুব সুন্দর বোলোনিজ সসের সাথে স্পাগেটি, গ্রিলড ফিস আর একটা হাল্কা রিসোতো রাইস ছিল। আশাবরী এমনিতে চূড়ান্ত খাদ্য রসিক তবে আজকে খাবারের চাইতেও ধ্রুপদের কথাই বেশি উপভোগ্য ছিল। চমৎকার ডিনার টেবিল সাজিয়েছিল ধ্রুপদ। তার উপর আবার নীহারিকার ন‍্যাকামি,অযাচিত বকবক, সবই সামলেছে হাসিমুখে। ডিনার খেতে খেতে সুন্দর কিছু গল্প শুনিয়েছে মানুষটা। ইউরোপের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা, বিখ‍্যাত শিল্পীদের জীবনের নানান মজাদার গল্প, দক্ষিণ ভারতের কোটা আদিবাসীদের গল্প, সন্ধ্যাটা জমে গেছিল।

নীহারিকার বাড়ি আসার এই এক মজা।
নিজে যতই প্রগলভ হোক না কেন,
ঠিক ইন্টেরেস্টিং মানুষজন যোগাড় করে ফেলে। তবে এবারের অতিথি একটু বেশিই স্পেশাল হয়ে পড়ছে যেন। ধ্রুপদকে বাড়ি যাওয়ার আগে দেশপ্রিয় পার্কের একটা ‘বেড এন্ড ব্রেকফাস্টে’ ছাড়তে হবে। ওর আগামীকাল দিল্লি যাওয়ার কথা। অফারটা আগ বাড়িয়ে নিজেই দিয়েছে আশাবরী। মানুষটার সঙ্গে আরও সময় কাটাতে ইচ্ছে ‌করছে। সারাটা রাত কাটিয়ে দিলে হয়না? এঃ! কি যে ভাবে,থেকে থেকে! সব ওই ভদকার দোষ!

নীহারিকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে সিনেমা নিয়ে আলোচনা করছিল। উডি অ্যালেনের ‘মিডনাইট ইন্ প‍্যারিস’।

– “পরিচালক ব‍্যাপারটা বেশ সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন” ধ্রুপদ বলতে থাকে।

-“এই যে এক-একটা প্রজন্মের মানুষ, আমাদেরই ধরুন,নিজের বর্তমান সময় থেকে নিরাশ হয়ে ইতিহাসের ফেলে আসা কোনো এক যুগকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে,সেই সময়ের ঘটনাবলী,গল্পকথা পড়ে সেটাকে এক স্বর্ণ যুগ ভাবে,যদি ওই সময়ে ফেরা যেত তাহলে ‘কত কিছু দেখতে পারতাম’ এমনকি প্রেমটাও যদি ওই অমুকের মতন করে করতে পারতাম তাহলে কি ভালো যে হত!এরকম কল্পনায় মেতে ওঠে। ”

আশাবরী মুগ্ধ হয়ে শোনে, ধ্রুপদ বলে যায়
“এবার সেই ইতিহাসের চরিত্রগুলোর কাছে গল্পের নায়ক যখন পৌঁছে গেল তখন দেখল তারাও তাদের পূর্ববর্তী কোনো এক সময়ে ফিরতে চাইছে। বর্তমানটা অনেক সময়ই আমাদের কাছে একঘেয়ে হয়ে ওঠে-
The present is always going to seem unsatisfying because life itself is unsatisfying – ”

-“গিল পেন্ডার!” আশাবরীর কথায় ধ্রুপদ মাথা নেড়ে বলে
– “বকলমে উডি অ্যালেন স্বয়ং। আমার মনে হয় বয়স কম হলে চরিত্রটাতে নিজেই অভিনয় করতেন, তবে ওয়েন উইলসনকেও বেশ মানিয়েছে।”

কথা বলতে বলতে ওরা গাড়ির সামনে অনেকক্ষন পৌঁছে গেছে।খেয়াল হতেই আশাবরী তড়িঘড়ি ব‍্যাগ হাতড়ে চাবি বার করল।

-“আপত্তি না থাকলে আমি চালাই”?
কথাটা ধ্রুপদ বাংলায় বলেছে।
হঠাৎ পরিষ্কার বাংলায় এরকম একটা প্রস্তাব যে আসবে সেটা আশাবরী ভাবতেই পারেনি! ধ্রুপদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।

ধ্রুপদ চাবির জন্য হাত বাড়িয়ে বলে

” আমি বাংলাটা অল্প অল্প বলতে পারি আর বুঝতে পুরোটাই পারি। আপনার সাথে নীহারিকার কথাবার্তা বেশ ভালোই উপভোগ করেছি।” আবার ধ্রুপদের কথায় রসিকতার ছোঁয়া।

-“আচ্ছা আপনি এগুলো করে ঠিক কি ধরনের আনন্দ পান একটু বলবেন?” আশাবরী একটু ক্ষুব্ধ।

-“উত্তর না দিলে আপনাকে কোথাও নিয়ে যাবো না” আশাবরীকে এবার একটু অভিমানী শোনায়।

-“ওকে ওকে, রাগবেন না দোহাই। দেখুন জন্মসূত্রে আমি হলাম অর্ধেক তামিল আর অর্ধেক বাঙালি। আমার মা বাঙালি। এছাড়াও কলকাতায় আমি এর আগে অনেক বার এসেছি। তাই রাস্তাঘাটও মোটামুটি চিনি। দিন এবার চাবিটা দিন”

আশাবরীর মনটা হঠাৎ কি কারণে জানি উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ধ্রুপদকে কিছু একটা বলতে যাবে সেই সময় ব‍্যাগের মধ্যে মোবাইলটা গোঁ গোঁ করে উঠল। কিন্তু ব‍্যাগ হাতড়ে ফোনটা বার করতে করতে কেটে গেল।
একি !!ফোনটা এতক্ষণ ভাইব্রেশন মোডে ছিল !!? অনেকগুলো মিসড কল! আবার ফোন আসছে, ইনকামিং নাম্বারটা দেখে আশাবরীর বুকের ভিতরে একটা ছোট্ট আলোড়ন হল, নির্মলার ফোন!
-“কি হয়েছে নির্মলা”?
আশাবরীর গলায় দুশ্চিন্তা।ওদিকে যা শুনল তাতে আশাবরীর পায়ের নিচের মাটি যেন দুলে উঠল।কোনোক্রমে বলল,
-“আমি আসছি,এক্ষুনি”
ধ্রুপদ আশাবরীর মুখ দেখে আঁচ করার চেষ্টা করলো ব্যাপারটা।
-“কোনো প্রবলেম?আমি যাবো আপনার সাথে?”
আশাবরী কিছু না ভেবেই সায় দিলো।গাড়ির চাবিটা আশাবরীর হাত থেকে নিয়ে ধ্রুপদ গাড়ি স্টার্ট করল।আশাবরীর ঠোঁট কাঁপছে।

মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা ভীড় করে আসছে । ফোনটা আবার বাজছে, এবার রিংটোনের শব্দ শোনা গেল।
Historia de un Amor‘।

ধ্রুপদ গাড়ি চালাতে চালাতে একটু অবাকই হল। এটা তার পছন্দের একটা স্প‍্যানিশ গান। আশাবরীর ফোনে বাজবে সেটা ভাবেনি। আশাবরী ফোন তুলেই বললো

-“রাজীব.. দিদি আবার…আমি.. আমি হসপিটালে পৌঁছে তোকে জানাচ্ছি।”
একনিঃশ্বাসে কথাগুলি
বলে ফোন রেখে দিল আশাবরী।

গোটা রাস্তাটা নিজের হাতের আঙ্গুলগুলো অস্থির ভাবে চেপে রেখেছিল। কোনরকমে রাস্তা বলে দিচ্ছিল ধ্রুপদকে। তবে ধ্রুপদ পাকা ড্রাইভার সেটা বোঝাই যায়। কোনরকম তাড়াহুড়ো না করেই ওরা পৌঁছে গেল হসপিটালে।হসপিটালের বাইরে পার্কিং চত্বরে ঢুকতে না ঢুকতেই কোনোক্রমে গাড়ি থেকে নেমে আশাবরী ছুটল।

নির্মলা ইনটেন্সিভ কেয়ার-এর সামনেই দাঁড়িয়েছিল, আশাবরী ঢুকতেই এগিয়ে এল। আশাবরীর ঠোঁট এখনো কাঁপছে কিন্তু সে সংযত হওয়ার চেষ্টা করল।
ধ্রুপদ গাড়ি পার্ক করে একটু পরে এসে ঢুকতেই দেখতে পেলো ডাক্তারের সাথে আশাবরী কথা বলছে।
-“এই স্টেজে এটা এখন বারবার হবেই।আমাদের হাতে তো এখন কিছু নেই।তবু যন্ত্রনা যতটা কম করা যায়। এখন ঈশ্বর ভরসা”। বলে ডাক্তার বেরিয়ে গেলেন।

আশাবরী চোখ বুজে একটু দম নিল তারপর চেয়ারে ঘাড় নিচু করে বসে পড়ল। ধ্রুপদ পাশে এসে বসল,একটু ইতস্তত ভেবে, আশাবরীর কাঁধে আলগা হাত রাখতেই কেঁপে উঠল আশাবরী,কাঁদছে।
ধ্রুপদ কোনো কথা বললনা,শুধু আশাবরীকে ছুঁয়ে থাকল।আশাবরী মুখ তুলছেনা,প্রানপনে কান্না ঢাকছে।

-“বাবা-মা কে খবর দিয়েছ?
তাঁদেরও তো জানাতে হবে।” নির্মলা প্রশ্ন করল।

-“এই অবস্থায় জানিয়ে লাভ নেই,দিদির জ্ঞান ফিরুক, তারপর বলব। বাবার শরীরের যা কন্ডিশন,রাতের বেলা এইসব শুনে আরো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।ভোর হোক,দেখছি” আশাবরী উত্তর দেয়।
-“মাফ করবেন ধ্রুপদ,আপনাকে এভাবে সমস‍্যার মধ্যে ফেললাম”।
অনেকটা সামলে নিয়েছে আশাবরী।
-“আমার কোনো কষ্ট হচ্ছেনা।আপনি আমাকে নিয়ে চিন্তিত হবেন না।”
ধ্রুপদ-এর গলায় আশ্বাস পেল আশাবরী।

ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পেরোলো।

ক্রমশ:

চিত্র: salman khoshroo

4 thoughts on “পর্ব ৯: প্রিয় যে জন”

  1. Beautiful..chacters are getting life..the situation the lived world has in its demand..the moral attitude of tolerance and task.
    vilambit to madhyalaya.
    the flow…

    Like

  2. Khub bhalo lagche..monei hochche na je ae writer der ami chini…ato mature lekha. Je kono protisthito writer ke palla dite parbe. Boi hisabe ber kortei Paris.. apurbo.

    Like

Comments are closed.