দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ৮: মিশার বন্ধু

এর আগে: আশাবরী, শিবরঞ্জনীর সাথে দেখা করে নীহারিকার বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যায়, সেখানে একটা পেইন্টিং দেখে অভিভূত হয়ে শিল্পীর নাম জিজ্ঞাসা করলে পিছন থেকে অচেনা পুরুষ কন্ঠে উত্তর আসে।
Southern Avenue, Kolkata.

ছবির মধ্যে এতটাই মগ্ন হয়ে গেছিল যে পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে সেটা খেয়ালই করেনি আশাবরী। আচমকা পুরুষ কন্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেল। ধ্রুপদ!

ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে বলে চলেছে-
“ দ‍্যা ফাইটিং টেমেরেয়র। ট্রাফালগারের যুদ্ধে ফ্রেঞ্চ-স্প‍্যানিশ যৌথ নৌবহরের ৩৩টি জাহাজ নিয়ে নেপোলিয়ন আক্রমণ করলেন বৃটিশ নৌসেনাকে। ব্রিটিশদের যুদ্ধ-জাহাজগুলির মধ্যে সবথেকে শক্তিশালী ছিল ভিকট্রি আর তার সহযোগী টেমেরেয়র। ভিকট্রি-কে নেপোলিয়ন-এর নৌবহর যখন চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে প্রায় পর্যুদস্ত করে ফেলেছে।সেইসময় এই টেমেরেয়র-এর পাল্টা আক্রমন তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। ৯৮টা কামান সম্পন্ন এই টেমেরেয়র-এর দূর্ধর্ষ লড়াইয়ের ফলে ব্রিটিশরা নেপোলিয়নকে আটকে দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তবে পালতোলা জাহাজের সেই ছিল শেষ যুগ। এরপর বৃটেনে এদের তাৎপর্য কমে যায়। স্টিম-নৌকার চলাচল বাড়ে। টার্নার ছবিতে সেই প‍্যাথোসটাই তুলে ধরেছেন। একটা স্টিমনৌকা ওই
বীরবিক্রম টেমেরেয়রকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কারখানায়,যেখানে তার মজবুত কাঠের শরীরটাকে ভেঙে টুকরো করে ফেলা হবে। আর একদিকে আকাশে সূর্য অস্তগামী। জাহাজের হারিয়ে যাওয়া গৌরব নিয়ে চূড়ান্ত রোমান্টিক ইন্টারপ্রিটেশন। টার্নারের শৈল্পিক ছোঁয়া একে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে!”

ঘর জুড়ে একটু নীরবতা। আশাবরী ধাতস্থ হতে সময় নিচ্ছিল,তার আগেই নীহারিকা বলে উঠল
-“আশি, ইনিই হলেন মিশার নতুন বন্ধু। শিল্পী ধ্রুপদ সুব্রমনিয়াম। আজ ওনার জন‍্যই এই ডিনার।”
আশাবরীর হতভম্ব ভাবটা কেটে গেছে। বিরক্তিটা আবার ফিরে এলো। এরকম লোক আবার মিশার বন্ধু!
ধ্রুপদ প্রথাগত কায়দায় বলে উঠল
-” শুভ সন্ধ্যা!” যেন গ‍্যালারিতে যেটা হল সেটা মনেই নেই! ন্যাকামো হচ্ছে! আশাবরী উত্তর দিল-
-“শুভ কিনা এখনও ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা”।
নীহারিকা ভুরু নাচিয়ে বলল,
-“ওমা তুই চিনিস নাকি?!”
ধ্রুপদ মুচকি হেসে বলল

-“ওই সামান্য,তেমন ভালো করে পরিচয় হয়নি।”

আশাবরী প্রতিনমস্কার জানিয়ে সরে পড়তে যাবে এমন সময় মিশা ছুট্টে এসে আশাবরীকে জড়িয়ে ধরল। আশাবরী এবার ধ্রুপদকে কটাক্ষ করল
-“মিশা তোর তো নতুন বন্ধু হয়ে গেছে দেখছি!”
মিশার হাতগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় একটু ছোট,তাই দিয়ে সে আরো জোরে চেপে ধরল আশাবরীকে। জড়িয়ে জড়িয়ে কিছু একটা বলল। আশাবরী নিচু হয়ে বসে ওর কথাগুলো বুঝতে চেষ্টা করছিল,পাশ থেকে ধ্রুপদ বলে উঠল
-“মিশা বলছে, তুমি তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।তাইনা মিশা?”
মিশা মাথা ঝাঁকাল।অর্থাৎ ঠিক।
আশাবরী অবাক চোখে ধ্রুপদের দিকে তাকাল। ৭ বছরের মিশার ডাউন সিনড্রোম আছে,ওর কথাগুলো অস্পষ্ট, হাবে ভাবে আর কিছুটা আন্দাজে বুঝে নিতে হয়। আশাবরী ,নীহারিকা ওরা সবাই মিশাকে জন্মে থেকে দেখছে তাই অভ্যেস হয়ে গেছে,কিন্তু ধ্রুপদ এরই মধ্যে মিশার কথা বুঝতে শুরু করেছে!আশ্চর্য্য!
-“তাই বুঝি”?
বলে মিশার হাতে একটা আলতো চুমু খেলো আশাবরী।
-“আপনি তো দেখছি জাদু জানেন,এই কদিনের মধ্যে মিশার কথা বুঝতেও পারছেন! ইমপ্রেসিভ!” নীহারিকা বেশ গদগদ। ধ্রুপদ এবার নিচু হয়ে বসে মিশার একটা হাত ধরে বলল
-“আসলে ব্যাপারটা হল। ভাষা কান দিয়ে শোনা যায় কিন্তু কথা মন দিয়ে শুনতে হয়,উপলব্ধি করতে হয়। বিশ্বের সমস্ত শ্ৰাৱ্য শব্দের আলাদা আলাদা ইমোশন আছে।”
আশাবরী, নীহারিকা দুজনেই এবার হাঁ।
বাহ! মানুষটা সত‍্যিই চমৎকার কথা বলতে পারে! ‘ইমপ্রেসিভ’ আশাবরী মনে মনে ভাবল।? এরইমধ্যে মিশা ধ্রুপদের জামা ধরে টানতে শুরু করেছে।

-“ও বোধহয় আপনাকে নিজের রুম দেখাতে চাইছে” বলল আশাবরী। ধ্রুপদ মিশার হাত ধরে ওর আঙ্গুলকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেল। ওরা অন‍্য ঘরে যেতেই নীহারিকা আশাবরীর হাত চেপে ধরে, টেনে ব‍্যালকনিতে নিয়ে এল।

-“উফফ! করছিসটা কি তুই”?
আশাবরী হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল।
-“কি করে চিনলি এই apuesto* কে”?
-“ওহ হো একেবারে স্প্যানিশ উপমা!” আশাবরী ভুরু তোলে।
-“এরকম টল, ডার্ক, ওয়েলরেড, ওয়েলস্পোকেন পুরুষ, apuesto নাহলে কি ?” নীহারিকা বেশ মজেছে।
-“তোর কি এখনি নেশা হয়ে‌ গেছে নাকি!?” আশাবরী ফুট কাটে।
-“আরে বলনা কেমন করে চিনলি?কি জানিস ওর ব্যাপারে?” নীহারিকা অস্থির করে দিল।

আশাবরী একটা সুখটান দিল সিগারেটে, একটু ভেবে নিল কি বলা যায়। করাইকুড়ির পর্বটা নীহারিকাকে খোলসা করার দরকার নেই। তারপর বলল
-“কিছুই না। তুইও যেখানে আমিও সেখানে। মিশার ওয়ার্কশপে মি:মিত্র পরিচয় করালেন। ওই পর্যন্তই। একটু আঁতেল মনে হয়,কিন্তু তোর ইন্টারেস্টটা কি?” নীহারিকার ড্রেসের বুকের কাছে আঙ্গুল দিয়ে টেনে আশাবরী বাঁকা হাসি দিল।

নীহারিকা অপ্রস্তুতে পড়ে থতমত খেয়ে বললো

-“আহঃ ছাড় নতুন জামা! আমার আবার কিসের ইন্টারেস্ট!? আমি তো মিশার ভালো লাগবে বলেই বাড়িতে ডেকেছি।” নীহারিকা সামলে নিল।
‘আর মিশার মা ’! মনে মনে হাসল আশাবরী। এমনি এমনি মিশার জন্যে এক্কেবারে বাড়িতে ডেকে ডিনার!?
যাইহোক আর কথা বাড়ালনা। সিগারেট শেষ করে ঘরে ঢুকলো।

মিশার হাসির শব্দ পেয়ে ওর ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল ধ্রুপদ আর মিশা হাতে জলরং নিয়ে আর্টপেপারে ছাপ দিচ্ছে, রঙের খেলা একরকম। তাতেই মজা পেয়ে মিশা খুব হাসছে। দ্বিতীয় ড্রিংকটা একটু স্ট্রং হয়ে গেছে। আশাবরীর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। দিদি আর সে এইরকম রং মাখিয়ে বেড়াতো সর্বত্র,বাড়িতে লোকে অতিষ্ট হয়ে যেত ওদের নিয়ে।আজ ধ্রুপদ আর মিশাকে দেখে ওর মনটা অনেক হালকা হয়ে যাচ্ছিল।

আশাবরী যে বেশ কিছুক্ষণ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটা ধ্রুপদ টের পেয়েছে।
সেইদিকে না ঘুরেই বলে উঠল
-“কাম, জয়েন আস”
আশাবরী একটু অবাক হল তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে মিশা আর ধ্রুপদের পাশে বসলো।

কাগজের উপর রঙের ছাপ দিতে দিতে মাঝে মাঝে আশাবরীর হাত ধ্রুপদের হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আর তারপরেই মিশার হাত এসে পড়ছিল তার উপর। সবার হাতেই রং লেগে একাকার।
-“আমার উপর এখনও পুরোপুরি রাগ কমেনি আপনার বুঝতে পারছি।” বলল ধ্রূপদ
-” গ‍্যালারীতে আসলে আমি একটু ঠাট্টা করতে গেছিলাম বিশ্বাস করুন।”
-“ভালো করে চেনা জানা হল না আর আপনি ঠাট্টা শুরু করে দিলেন!” আশাবরী একটু গম্ভীর ভাব রেখে বলল, ভিতরে যদিও একটু দুষ্টুমি।

ধ্রুপদ কাগজ থেকে হাত তুলে নিল। মুখ তুলে সোজা তাকালো আশবরীর চোখে।
মরহবা! আশবরী চোখ সরাতে পারছে না।
-“আপনাকে প্রথমবারেও তো অচেনা লাগেনি আমার!”

এবার আশাবরীর খোঁচা দেওয়ার পালা।
-“বাহ্! এটা কি আপনার পিকআপ লাইন? তবে মাপ করবেন বেশ ডেটেড কিন্তু!” মুখ টিপে একটু হাসল আশাবরী।

ধ্রুপদ কিংকর্তব্য। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বলল

-“আপনার লেখাটা পড়ার ইচ্ছা আছে। অনুবাদ করলে জানাবেন। অবশ্য বাংলা..” ধ্রুপদ কথা শেষ করলনা তার আগেই নীহারিকার গলা শোনা গেল।

– ” বাহ আশি! আমায় নিরুৎসাহ করে নিজে এখানে বসে দিব‍্যি প্রেম করে যাচ্ছিস!?” কখন জানি নীহারিকা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

কথাটা নীহারিকা বাঙলায় বলেছে যাতে ধ্রূপদ বুঝতে না পারে। ধ্রুপদ আর আশাবরী এবার দু’জনেই উঠে দাঁড়ালো। আশাবরী নীহারিকার দিকে তাকিয়ে প্রথমে চোখ গোলগোল করল তারপর ধ্রুপদ আর মিশাকে দেখিয়ে ইংরেজীতে বলল
– “আসলে আমরা মিশার সাথে খেলছিলাম, রঙের খেলা” নীহারিকা এতে খুব একটা আশ্বস্ত হলনা বরঞ্চ ধ্রুপদের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল
– “মিঃ সুব্রমনিয়ম আমার একটা খারাপ রেপুটেশন আছে। আমি অতিথিদের দিয়ে কাজ করাই। আমাকে ডিনার সাজাতে হেল্প করবেন একটু”?
ধ্রুপদ একবার আশাবরীর দিকে তাকাল তারপর বলল

-“অবশ‍্যই এতো আমার সৌভাগ্য” বলে হাত ধুতে চলে গেল। ও বেরিয়ে যেতেই নীহারিকা প্রথমে আশাবরীর দিকে তাকিয়ে একটা মেকি হুঁহ্ করল তারপর মিশাকে ঘুম পাড়াতে বলে চোখ টিপে হাসতে হাসতে ডিনার আনতে কিচেনের দিকে গেল।

‘Full Nautanki Saali’! বলে আশাবরী মনে মনে হাসল।

ক্রমশঃ

*Apuesto: স্প‍্যানিশ শব্দ। নারীহৃদয়ে সাড়া জাগানো যুবা।
চিত্র: MelfergieArt

5 thoughts on “পর্ব ৮: মিশার বন্ধু”

  1. khub sundore..lekha dekha jogot ke ek adekhayniye jay..prachin jakichu notunhoyejay…khub sambedanshil ek uposthapona..

    Like

  2. Khub sundor lekhar badhon.. Ek nisase e abar last 5ta porbo pore nilam.. Aar porer porber apekhhai thaklam.

    Like

    1. অসংখ্য ধন্যবাদ, ধারাবাহিক ভাবে মন্তব‍্য দেওয়ার জন্য। এটা খুবই উৎসাহজনক।😊🙏

      Like

Comments are closed.