এর আগে: আশাবরী মিশার ওয়ার্কশপে ছবি দেখতে এসে ধ্রুপদের দেখা পায়। আশাবরীর আবার সেই চোখের দৃষ্টিতে বিভোর হয়ে যায় কিন্তু ধ্রূপদের ব্যাবহারে আশাবরীর কল্পনায় ঘা পড়ে।
Weavers Studio, Kolkata.
নীহারিকা ওয়ার্কশপে ঢুকতেই,কাজের বাহানা করে মিশাকে ওর হাতে দিয়ে বেরিয়ে এলো আশাবরী। আংটি দেখে নীহারিকা তো আর ছাড়েই না।
‘Oh wow! such a beautiful ring!’ ‘নববধূ’, ‘ম্যায় তুলসী তেরে.. ইত্যাদি যত রকম ন্যাকামো করা যায়!
মিঃ মিত্র বলেছিলেন আরেকটু থেকে যেতে, কিন্তু আশাবরীর আর সেখানে মন বসছিল না। বেরোবার সময় ভীড়ের মধ্যে ধ্রুপদকে দেখা গেল না। তার অবশ্য প্রয়োজনও নেই। কিছু কিছু সাক্ষাৎ হয়তো জীবনকে অযথা জটিল করে তোলে।
Gariahat, Kolkata.
গাড়ি চালাতে চালাতে রাগটা ফিরে আসছিল।কি অদ্ভুত খোঁচা মেরে কথা বলা স্বভাব লোকটার!
গড়িয়াহাটে একটা ওয়াইন শপের সামনে গাড়ি পার্ক করে দমাশ্ করে দরজা বন্ধ করল আশাবরী। দোকানের বাকি খদ্দেররা চমকে উঠেছিল। ‘ইনসিওরেন্স তো দরজাতেই গেল’ জাতীয় খুচরো রসিকতাও কেউ কেউ করল আড়াল থেকে। এবার মেয়ে দোকানে দাঁড়িয়ে মদ কিনছে দেখে কেউ বিরক্ত হয়ে আর কেউ হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে। দুবোতল ভদকা তুলল রাগের মাথায়। এখুনি গলায় ঢেলে ফেলতে মন চাইছে কিন্তু উপায় নেই,গাড়ি চালাতে হবে। রাজীবটাও আজকেই গুয়াহাটিতে, রাতের আগে ফিরবেনা, যত্তসব।
আশাবরী গাড়ির মুখ ঘোরাল লেকের দিকে, রঞ্জনীর কাছে হয়ে আসা যাক। বাবা-মার এই ফ্ল্যাটে এখন রঞ্জনী আর ওর নার্স থাকে। বাবা-মা আসা যাওয়া করেন তবে খুব কম। আগে আশাবরী এখানেই থাকতো কিন্তু ওর কাজের ধরন আর লেখার যা চাপ বেড়েছে। তাই ভাড়া বাড়ি নিয়েছে একটা। রাজীবেরই এক চেনা লোকের ফ্ল্যাট। ফাঁকা পড়ে ছিল। ফ্ল্যাটটা গোলপার্কে হওয়ায় রঞ্জনীর কাছে যাতায়াতের সুবিধাও হয়েছে।
প্রস্তাবটা প্রথমে রঞ্জনীই ওকে দিয়েছিল। আশাবরী রঞ্জনীকে ছেড়ে থাকতে চায় নি। কিন্তু বাবা-মায়ের এই ফ্ল্যাটে রাজীব আসতো, আশাবরীর অন্যান্য বন্ধুবান্ধব ও কলিগরাও আসতো। অনেক রাত অবধি আড্ডা, গানবাজনা, কাজ ইত্যাদি হত। ব্যাপারটা বাবা জানবার পর তুমুল এক ঝামেলা হয় আশাবরীর সাথে। আশাবরী বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল সেই রাতে। রঞ্জনী বাঁধা দেয়। পরে রাজীবকে বলে এই বাড়িটার ব্যাবস্থা করে।
রবীন্দ্রভারতীর সংগীতের ছাত্রী ছিল রঞ্জনী। এই ফ্ল্যাটে ওর গানের খাতা, গীতবিতান,তানপুরা সবকিছুই এখন গৃহসজ্জার অনুষঙ্গ। বিয়ের আগে গানের জগতে ভালোই নামডাক হচ্ছিল ওর। তারপর একরকম জোর করেই বাবা-মা ওর বিয়ে দেয়। এরকম পাত্র নাকি লাখে একটাই পাওয়া যায়! বিয়ে করে আমেরিকায় গিয়ে গান ছেড়ে দিয়েছিল রঞ্জনী। স্বামীর খুশির জন্য, সংসারের শান্তির জন্য। কোনোটাই হয়নি।
বাবা মা’র পছন্দ করা বিরাট বিজনেসম্যান রঞ্জনীর স্বামীর, দুবছরের মধ্যেই বহুবিধ নারী সম্পর্কের কথা জানা যায়। তারপর ব্যাবসাতেও বড় লোকসান হয়। এসবের জন্য সে রঞ্জনীকেই দায়ী করতে শুরু করে । প্রথমে শুরু হয় মানসিক অত্যাচার। তার কিছু দিন পরে শারীরিক।। বাবা-মা এসব জানার পরও ওকে থেকে যেতে বলেছিল। ফিরে আসতে দেয় নি।
আশাবরী একসময় নিজেই ঠিক করে এনাফ ইজ এনাফ। তখন এক কর্পোরেট কম্পানিতে চাকরি করছিল। কারও কথায় কান না দিয়ে নিজের জমানো পয়সাতেই সোজা চলে যায় আমেরিকা। রঞ্জনীকে ফেরৎ নিয়ে আসে। কিন্তু রঞ্জনীর তারপর আর ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সামর্থ হয়নি। অসুখ ওকে ভেতরে ভেতরে ক্ষইয়ে দিয়েছে, যদিও ব্যাবহারে তার ছাপ পড়তে দেয়না কখনও।
আশাবরী ঘরে ঢুকতেই রঞ্জনী জিগ্যেস করল
-“কোন পক্ষে লড়ে এলি আশি, সিরাজ না ক্লাইভ”?
-“কেন? সব সময় পক্ষই কেন নিতে হবে? মানুষ নিজের সম্মান নিজে রক্ষা করতে পারেনা”? আশাবরী রঞ্জনীর খাটে গোঁজ হয়ে বসল।
-“তা পারে বৈকি” মুচকি হেসে বলল রঞ্জনী। বালিশ থেকে মাথা তুলে শরৎসমগ্রটা পাশে রেখে আরেকবার আশাবরীকে খোঁচালো,
-“তা কে তোর সম্মানে ঘা দিল, বুকের পাটা আছে বলতে হবে,রাজীব বাবাজীবনের দ্বারা তো একাজ সম্ভব নয়”।
-“কাম অন দিদি, ও মোটেই বাবাজীবন নয়”!এতক্ষনে আশাবরীর মুখে হাসি ফিরেছে।
এই একটি মানুষ যে আশাবরীর মুখ দেখেই মনের চালচিত্র বুঝে যায়। দিদি এমন সব কথা বলে যে আশাবরীর সব বিরক্তি,রাগ,এখানে এলেই গলে জল হয়ে যায় অথচ আশাবরী জানে কি দারুণ কষ্টে আছে রঞ্জনী। দুই বোন আশাবরীর হবু শাশুড়ির সঙ্গে হওয়া লাঞ্চডেট নিয়ে রসিকতা করছিল। কথার মাঝে নীহারিকার ফোন এল। আজ বাড়িতে ডিনারের নেমন্তন করছে। হঠাৎ আবার কি খেয়াল হল মেয়েটার!? আশাবরী একবার না করে দেবে ভাবলো,তারপর নীহারিকার ঘ্যানঘ্যানের কাছে আত্মসমর্পণ করল। তবে শর্ত একটাই, ভদকাগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। আরো কিছুক্ষন রঞ্জনীর সাথে আড্ডা দিয়ে মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে গেল।
বেরোবার সময়, নার্সকে নতুন কিছু দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গাড়িতে বসলো আশাবরী।
Southern Avenue
সাদার্ন এভিনিউয়েই নীহারিকার ফ্ল্যাট। দরজা খুলেই নীহারিকা এমন ভাবে জড়িয়ে ধরল যে আশাবরী আরেকটু হলে পড়েই যাচ্ছিল।
-“আশিইইই!!! তোর বার্থডে পার্টিতে যেতে পারিনি আই ফেল্ট সো ব্যাড! ভাবলাম তোর অভিমান হয়েছে। সো গ্ল্যাড তুই এলি।”
নিজেই ফোনে ন্যাকামো করে নেমতন্ন করল আবার এখন এই কথা! কি আদিখ্যেতা যে করতে পারে মেয়েটা! কিন্তু বড্ড ভালোবাসে আশাবরীকে, সেই কলেজ জীবন থেকেই।
ভদকার বোতলদুটো ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আশাবরী বলল-
“চট করে একটা বানিয়ে ফেল,ঢং পরে দেখালেও চলবে”। ঘরে ঢুকেই আশাবরী ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে জল দিল। সারাদিন আজ অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে। তারপর এসে লিভিং রুমের খয়েরী লেদার কাউচের উপর ধপাস করে শরীর এলিয়ে দিল। ততক্ষণে নীহারিকার পানীয়ের বন্দোবস্ত কমপ্লিট। কিন্তু তিনটে গ্লাস দেখে একটু অবাক হল।
-“তোর এই ডিনার ইনভিটেশনটা কোন আনন্দে, অভিজিৎ তো এখনও ফেরেনি। আর মিশা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?” Lemon Drop vodkatini-র গ্লাস হাতে নিয়ে বলল আশাবরী।
-“আর বলিসনা,মিশার এক নতুন বন্ধু হয়েছে, দুদিন ধরে তাকে আর ছাড়েনা।আজ মিশাকে আনতে গিয়ে দেখি তার জামা ধরে টানাটানি করছে। আমিও তাই ডিনারে ডেকেই ফেললাম। রাজি হবে অবশ্য আশা ছিলোনা!” নীহারিকা একটু উত্তেজিত যেন। ক্লিভেজ শোভিত একটা খাদির ড্রেসও পরেছে। কিন্তু কই অন্য অতিথিটিকে তো দেখা যাচ্ছে না! ভাবল আশাবরী। তারপর পানীয়তে চুমুক দিল।
চুমুক দিয়েই মনে মনে বলল আহঃ। এই একটি ব্যাপারে মেয়েটার এলেম আছে বলতেই হবে । ককটেলের ঘরোয়া বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করে আর প্রত্যেকটাই রসনার তৃপ্তিদায়ক। আশাবরী গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরের ইন্টেরিয়র দেখছিল, শৌখিন বিত্তবান মানুষের সাজানো গোছানো ঘর। গৃহসজ্জায় বিভিন্ন দেশের স্যুভেনির, মেমোরিবিলিয়া,দামি পেইন্টিং এসব রয়েছে। নীহারিকার স্বামী অভিজিতের এসব সংগ্রহের নেশা আছে। বিদেশ গেলেই কিছু না কিছু সংগ্রহ করে আনে। আশাবরীর সাথে সেসব নিয়ে দারুণ সব আলোচনাও হয়। আশাবরীও আগেরবার মেঘালয় থেকে বাঁশের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প নিয়ে এসেছে ওদের জন্য। দেওয়ালে হঠাৎ একটা পেইন্টিং দেখে আশাবরী এগিয়ে গেল। এটা নতুন আমদানী।
অপূর্ব একটা সূর্যাস্ত। আকাশটার কোনে কেউ আগুন ঢেলে দিয়েছে। সেই আগুন ছড়িয়ে গেছে জলের উপরে। জাহাজটার গায়েও মায়াবী একটা আভা এসে পড়েছে। চূড়ান্ত প্যাশনে দীপ্ত এক চিত্রপট। শিল্পীর নামটা মনে আসছে না কিন্তু এনার আঁকা ছবি আগে দেখেছে।
–”এটা কার ছবি যেন “? জিজ্ঞেস করে আশাবরী
-“জোসেফ ম্যালর্ড উইলিয়াম টার্নার”! আচমকা পুরুষকণ্ঠ শুনে যেন ধ্যানভঙ্গ হল আশাবরীর।
ক্রমশঃ

Bhalo cholche..
LikeLike
Thank you.
LikeLike