এর আগে: আশাবরীর জন্মদিনের নৈশভোজে ওর লেখা প্রবন্ধ ‘দক্ষিণ দুয়ার’ প্রশংসিত হয়। নীহারিকা ফোন করে আশাবরীকে জানায় নীহারিকার মেয়ে মিশাকে ছবির ওয়ার্কশপে নিয়ে যেতে।
Golpark, Kolkata
ন’টায় ঘুম ভাঙল আশাবরীর,পাশ ফিরে মাত্র একটা চোখ খুলে সময় দেখেই আবার চোখ বুজল। কতক্ষন চোখ বন্ধ ছিল বুঝতে পারেনি,পাশে রাখা মোবাইলটা গোঁ-গোঁ করে উঠল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে বেজে গেল।
ঘুম ভেঙেই ফোনে কথা বলায় ঘোর আপত্তি আশাবরীর। গলার স্বর শুনেই অপরপ্রান্ত বলে উঠবে “ঘুমাচ্ছিলি!?” যেন ঘুমানোটা খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার। ভাবটা এমন যেন সারাক্ষন তারা ফোন হাতে জেগে বসে থাকে। যত্তসব!
কপাল কুঁচকে ফেলল অজান্তেই।
এবার সারাদিন কপালটা ভাঁজ পড়া টিস্যুপেপার হয়ে থাকবে।নিত্যনতুন উপসর্গ উঁকি দিচ্ছে।
“বয়সের দোষ”..ফিক করে হেসে ফেলল আশাবরী। আপনমনে কিছুক্ষণ কথা বলল,তারপর মনে এলো মিশাকে দুপুরে ওয়ার্কশপে নিয়ে যেতে হবে। ফোনটা নীহারিকা করেনিতো!!?
বিছানা ছেড়ে উঠে চট করে একটা জম্পেশ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে ফোন হাতে নিল। নীহারিকা নয়। কলকাতার এক বিখ্যাত স্কুলের প্রাক্তন হেডমিসট্রেস ইন্দ্রানী মুখার্জি। রাজীবের মা। হবু শ্বশ্রূমাতা!! তিনটে মিসড্ কল! আশাবরী আবার কপাল কুঁচকালো, মহিলা হঠাৎ সকাল সকাল ফোন করেছে ব্যাপারখানা কি?
কফিতে একটা চুমুক দিয়ে কলব্যাক করল, মধুর রবীন্দ্র সংগীত বাজছে।
– “আশাবরী,কেমন আছো?
– “ভালো। আপনি কেমন আছেন?
-“ভালো,শোনো আজ একটু তোমার সাথে দেখা করা যাবে?এই ধরো শপিং তারপর লাঞ্চ।তোমার সাথে তো সময় কাটানো হয়নি সেভাবে। আজ ভাবছিলাম দুজনে মিলে একটু আড্ডা দেয়া যাক।”
আশাবরী প্রমাদ গুনলো। আজকেই?এখন, গেলেও সমস্যা না গেলেও।একটু ভেবে নিয়ে সত্যিটাই বলল
-“আসলে দুটোর দিকে আমার একটা ওয়ার্কশপে যাবার কথা….”
-“বেশ তো, আমি নাহয় তোমাকে সেখানে ড্রপ করে দেব।”
আশাবরী বলল -” অসুবিধে নেই, আমি গাড়ি নিয়েই আসবো তবে..
-“তাহলে চলে এসো, এগারোটায়, সাউথ সিটি মলে”। বলেই ভদ্রমহিলা ফোন রাখলেন।
আশাবরীর উত্তরের অপেক্ষা করলেন না।দীর্ঘদিন স্কুলে পড়ানোর ফলেই বোধহয় এই অবস্থা। নিজের কথা শেষ হলে আর কারও কথা শোনার অবসর রাখেন না।
আশাবরী তৈরী হতে শুরু করল। অবশ্য একটা ব্যাপার ভালোই হয়েছে। লাঞ্চের জন্যে আর ভাবতে হবেনা। স্নান সেরে,বেছে বেছে একটা ফিরোজা রং-এর কুর্তি পড়ল আশাবরী। তলায় ডিসট্রেসড্ জিন্স। কপালে একটা টিপ পড়বে কিনা একটু ভাবল। না,থাক!এমনিতেও অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হবে,টিপ কোথায় হাওয়া হয়ে যাবে। তারপর চওড়া কাজল আঁকল চোখে। গলায় একটা আফগানি চোকার পড়ল।নতুন ফসিল ঘড়িটা পড়ল। লিপস্টিকে ওর আসক্তি নেই,লিপবামটা ব্যাগে রাখল।
সাউথ সিটি পৌঁছে গাড়ি পার্কিং করে,মলে ঢুকতে ঢুকতে ফোন করল ইন্দ্রানীকে। তিনি মলের দ্বিতীয় ফ্লোরে ছিলেন। আশাবরীকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। দুজনে বেশ কিছুক্ষণ বিপণি পরিক্রমা করল। আশাবরী মিশার জন্যে একটু চকলেট কিনলো,আর ইন্দ্রানী টুকটাক কেনাকাটা করলেন। আশাবরীর আপত্তি সত্ত্বেও একটা কুর্তি কিনে দিলেন। তারপর দুজনে একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলো।
আশাবরীকে ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখে,প্রশ্ন করলেন,
-“খুব দেরি হয়ে গেল?সবে তো বারোটা বাজে।”
-“না,না,অসুবিধে নেই। আশাবরী স্যুপের অর্ডার দিতে দিতে বলল।
-“তোমার পুজোসংখ্যার লেখাটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে শুনলাম।আমার অবশ্য পড়া হয়নি।কিছু মনে কোরো না, আজকালকার লেখক-লেখিকাদের সম্পর্কে আমার খুব একটা উৎসাহ নেই।”
আশাবরী হতভম্ব হয়ে গেল।গায়ে পড়ে অপমান করার জন্যে ডেকেছে নাকি! এসব শুনে মাথা ঠান্ডা রাখবে,তেমন মেয়ে আশাবরী নয়।তবু যথাসাধ্য ঠান্ডা মাথায় থেমে থেমে বলল
-“আপনি কি ধরনের সাহিত্যে উৎসাহ রাখেন সেটা আমার জানা নেই তবে ইদানীং কয়েকজন খারাপ লিখছেন না। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ভালো লাগতেও পারে।”
ইন্দ্রানী বোধহয় কিছু আঁচ করতে পারলেন।প্রসঙ্গ পাল্টে বিয়ের কথা তুললেন।
-“তোমরা বিয়ের দিনক্ষণ নিয়ে পরিকল্পনা কিছু করলে?তোমার বাবা-মা’ র সাথে বসে কথাও তো বলতে হবে!”
আশাবরী একটু চিন্তায় পড়ল!এই রে পণ-টন চাইবেন না তো! ইশ্ কিসব ভাবছে! নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
-“তাহলে সবাই মিলে একবার জামশেদপুরে ঘুরে আসুন। ভালো লাগবে। ঘোরাও হবে আর বাবা মায়ের সাথে কথাবার্তাও হবে।”
এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা
-“তোমাদেরও কিন্তু যেতে হবে।”
সেরেছে! কেন যে বলতে গেল! এবার অজুহাত দিতে হবে। আশাবরী একটু দৃঢ় হয়ে বলল
-“এখন তো আমার যাওয়া একটু কঠিন হবে,কিছু পাবলিকেশন্স নিয়ে মিটিং রয়েছে।”
ইন্দ্রানী যে কথাটা শুনে নাখোশ হলেন আশাবরী দিব্যি বুঝতে পারল। কিন্তু না দেখার ভান করে চুপচাপ লাঞ্চে মন দিল। দুটো নাগাদ বেরতে হবে।
Weaver’s Studio, Kolkata.
মিশাদের আর্ট এন্ড ক্রাফটের কর্মশালা গত দুদিন ধরে চলছে, আজ বোধহয় তার শেষ দিন। মিশার মতন অন্যান্য স্পেশাল চাইল্ডদের নিজের হাতে কাগজ,কাপড় ইত্যাদির উপর বিভিন্ন রঙ দিয়ে করা প্রিন্টের ছবি চারিদিকে সাজানো হয়েছে।
মিশা প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে আশাবরীর হাত ধরে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছিল, আশাবরী অবাক হয়ে দেখছিল। কি অপূর্ব আর স্বতঃস্ফূর্ত সব ছবি। এই কর্মশালা কলকাতার দুটি এনজিও এবং এক নামকরা সংবাদপত্র যুগ্ম ভাবে আয়োজন করেছে। কিছু কর্পোরেট স্পন্সরও ছিল। লন্ডন থেকে বিশিষ্ট শিল্প ব্যাক্তিত্ব এরিক হেফনারের আসার কথা ছিল কিন্তু তিনি আসতে পারেননি। ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে বেশ কয়েকজন শিল্পীরা এসেছেন কর্মশালা নিতে,শহরের কিছু বিশিষ্ট শিল্পী ও সংবাদমাধ্যমের কর্তা ও এডিটররাও আমন্ত্রিত ছিলেন। যেমন মিঃ মিত্র। আশাবরী অনেককেই চেনে, কথা বলার ইচ্ছে না থাকলেও প্রথাগত হাসি আর সৌহার্দ্য বিনিময় করতেই হচ্ছিল।
– “এই যে আশি, কি কান্ড!তুই কখন এলি!?” মিঃ মিত্রর গলা পেল।
আশাবরী হেসে মিশার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
-“এই যে,এদের টানে এসে পড়লাম, নাহলে তো মিস্ করতাম,এতো ভাল একটা উদ্যোগ “।
-“ওহ ওয়ান্ডারফুল!” বললেন মিঃ মিত্র।
-“তুই আসবি জানলে আমি নিজে তোকে নিয়ে আসতাম।এদিকে আয়,তোকে এই কর্মশালার বিশেষ আকর্ষণকে দেখাই” বলে আশাবরীকে নিয়ে মিঃ মিত্র এগিয়ে গেলেন।
গ্যালারির মধ্যেখানে দীর্ঘদেহী এক পুরুষ, সামনে দাঁড়ানো উৎসুক সাংবাদিকদের কিছু একটা বোঝাচ্ছিলেন, মিঃ মিত্রর ডাকে ঘুরে তাকালেন।
-“আশি, এরিক হেফনর না আসতে পারলেও অনেক চেষ্টায় ওকে ধরে বেঁধে আনতে পেরেছি, মিট,মিঃ ধ্রূপদ সুব্রমণ্যম”!
পুরুষটি স্মিত হেসে আশাবরীকে নমস্কার করল। মিঃ মিত্রর পরের কথাগুলি আর আশাবরীর ‘কর্ণকুহরে পশিল না’।
সামনে দাঁড়িয়ে এ কে!? সেই কপিলবর্ণ, সৌম্যকান্তি ! সেই ”চঞ্চল খঞ্জন জোড়’ নিয়ে আবার ভদ্র উপস্থিত হয়েছেন সভাকক্ষ উজ্জ্বল করে! গ্যালারি জুড়ে বৃষ্টি নামল বোধহয়!
ধ্রুপদ! আহা নামটিও মানানসই।ঠিক যেমনটি দৃশ্যকাব্যে দরকার ছিল।
কিন্তু এসব কি হচ্ছে হঠাৎ? এই চোখ যে এত তাড়াতাড়ি আবার দেখতে পাবে সেটা তো আশা করেনি। হৃদস্পন্দন একটু বাড়ল নাকি!? আশাবরীর মনে হল যেন ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে চেট্টিনাড হাউসের সেই বারান্দায়। মৃদঙ্গের তালে তালে কালিদাস গাইছেন-
“সঙ্গীতায়া প্রহতমূর্যা:
স্নিগ্ধগম্ভীরঘোষণম্ ”
মৃদঙ্গের শব্দ দূরে মিলিয়ে গিয়ে এবার একটু সম্বিত ফিরছে আশাবরীর। শুনতে পাচ্ছে মিঃ মিত্র বলে চলেছেন
-” ..আশাবরী সেন, নতুন প্রজন্মের যাকে বলে প্রলিফিক রাইটার। ওর লেখা পড়লে বুঝতে পারবে ধ্রুপদ, কি সচ্ছল! কি স্বতঃস্ফূর্ত!পাঠকের মনের ভিতর নির্দ্বিধায় ঢুকে পড়ার ক্ষমতা আছে ওর”।
-“সেটা মানতেই হবে। স্বতঃস্ফূর্ত অবশ্যই, কোনো বাঁধাই মানেন না। নির্দ্বিধায় অচেনা লোকের বাড়িতেও ঢুকে পড়েন যখন তখন “।
ধ্রুপদ একটু রসিকতার ভাবেই বলতে চেয়েছিল কিন্তু আশাবরী তাতে খোঁচা খেল। কালিদাস গাছের ডাল ভেঙে পড়লেন।
মিঃ মিত্র একটু অপ্রস্তুত হয়ে আশাবরীর দিকে তাকালেন। বাকিরাও একটু অস্বস্তিতে।এইভাবে সবার সামনে কটূক্তিটার জন্যে আশাবরী প্রস্তুত ছিলনা। তাছাড়া সে তো তখনই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল। রাগ চেপে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল আশাবরী। ফিকে হাসি টেনে বলল
-” ওয়েল, মেইনগেটের অবস্থা দেখে তো গৃহকর্তাটিকে এতো অব্জারভেন্ট বলে মনে হয়নি!”
চারিদিকে কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা।
-“Oh this is such a small world!তোদের আগেই পরিচয় হয়েছে নাকি?!কি কান্ড!” মিস্টার মিত্র হেসে ফেললেন।
আশাবরী তির্যক হেসে বলল
-“দেখা হয়েছে,কিন্তু তাকে পরিচয় বলেনা।”
এবারে মিস্টার মিত্র ব্যাপারটা আঁচ করে হোহো করে হেসে উঠলেন।
আশাবরী যে খোঁচাটা হজম করে ফেলেনি,ধ্রুপদ সেটা বুঝতে পেরে বলল
-“পরিচয়টা বোধহয় আজকের জন্যেই তোলা ছিল।”
মিস্টার মিত্র আগ বাড়িয়ে বলে উঠলেন -“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!!একেবারে সুবর্ণ অবসর।”
উপস্থিত সকলেই কি কারণে যেন হেসে উঠল এই কথায়!
পরিবেশটা একটু হাল্কা হয়ে এল ঠিকই কিন্তু আশাবরীর মনে খোঁচাটা লেগেই থাকল।
ক্রমশঃ

Hmmm🙂
LikeLike
Jome gache..
LikeLike