এর আগে: শিল্পী ধ্রুপদ সুব্রমনিয়মের করাইকুড়ির নির্লিপ্ত জীবনে হঠাৎ করে অল্প সময়ের জন্য এসে পড়া আশাবরী কি ওর মন ছুঁয়ে গেছে?
Forest.
ঘন কুয়াশার বেড়াজাল কাটিয়ে কিছু একটা এগিয়ে আসছে যেন।ছেলেটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছেনা। এবার সেটা আকারে আর আয়তনে বাড়তে থাকল। জঙ্গলের বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে তার বিরাট দেহের ছায়া ক্রমে এগিয়ে এল ছেলেটার দিকে। দপ্ করে জ্বলে উঠল তার চোখদুটো, উফ্ !কি অদ্ভুত দৃশ্য!ধ্রুপদ প্রচন্ড ঘেমে উঠে বসেছে। কখন চোখ লেগে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি। কিন্তু দৃশ্যটা এত জীবন্ত ছিল যে ধ্রুপদের এখনও ধন্দ হচ্ছে।
Karaikudi
দুঃস্বপ্ন দেখার বাজে অভ্যেসটা ওর ছোটবেলা থেকেই রয়েছে। মা বাড়ী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ধ্রুপদের খামখেয়ালি, কল্পনাপ্রবণ মনের দিকটা বোঝার মতো খুব বেশি কেউ ছিলোনা।
করাইকুড়ির বাড়িতে তখন ঠাকুমা আর ঠাকুরদা বেঁচে ছিলেন। কিন্তু বদমেজাজি ঠাকুরদার পক্ষাঘাতের সেবা করতেই ঠাকুমার সময়টা কেটে যেত। ঠাকুরদা চলে যাওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যে ঠাকুমাও মারা যান। বাবা আর বিয়ে করেননি। ওরা চেন্নাইতে থাকাকালীন বাবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তাই খুব একটা সময় করে উঠতে পারেননি। ধ্রুপদের স্কুলের পড়াশোনা সব ওখানেই হয়।
এই বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসা তখন ধ্রুপদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল। একমাত্র ভেলাম্মার কাছে ধ্রুপদ মনের রসদ খুজে পেত। থাট্টে ভাজা খেতে খেতে ভেলাম্মার মুখে মহাভারতের কথা, নীলগিরি পাহাড়ের কোটা আদিবাসীদের গান, এসব শুনতে অপূর্ব লাগত ধ্রুপদের। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে পড়লে সোজা চলে যেত ভেলাম্মার কাছে ঘুমাতে। এখনও সন্ধ্যা বেলায় মাঝে মাঝে ভেলাম্মা সেসব গান গুনগুন করে।
বেড সাইড টেবিল হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার করল ধ্রুপদ। লাইটারটা গেল কোথায়!?
আগুনবিহীন সিগারেট ঠোটেঁর কোনায় ঝুলিয়ে উঠে পড়ল।আর শুয়ে থাকা চলেনা।ঘড়িতে প্রায় বারোটা। স্নান সেরে এবার ভাসুদের গ্রুপটাকে নিয়ে বসতে হবে।আজ ভেজিটেবল ডাই তৈরি করা শেখাবে ওদের। বাচ্চাগুলো অত্যন্ত উৎসাহী।ওদের সারল্য মাখা মনের কাছাকাছি থাকলে ধ্রুপদ সব কিছু ভুলে যায়।
দরজায় টুক করে আওয়াজ হল।
-“আমি জেগে আছি,ভেলাম্মা।”
কফির কাপ হাতে ঘরে ঢুকল ভেলাম্মা। মেজাজটা একটু উত্তপ্ত। কাঁচাপাকা চুল আর উজ্জ্বল সিল্ক কটনের শাড়িতে এখনও তাকে অপূর্ব দেখায়।
-“আজ কি সারাদিন বিছানায় কাটাবি?এভাবে রোজ রোজ রাত জাগলে তো শরীর খারাপ করবে! ঘন্টায় ঘন্টায় কফিও তখন কিচ্ছু করতে পারবেনা।”
ভেলাম্মার গলায় শাসন।
ভেলাম্মা আজ অব্দি কখনও ধ্রুপদের ঘরে অনুমতি ছাড়া ঢোকেনা। সেই ছোট থেকেই। কোলে পিঠে করে মানুষ করলেও ধ্রুপদের প্রাইভেসি কখনো লঙ্ঘন করেনি। অথচ ধ্রুপদের সামান্য কোনো প্রয়োজনও চোখ এড়ায় না ভেলাম্মার।
কফি রেখে, চেয়ারের উপর ফেলে রাখা একরাশ রংমাখা হাত মোছার কাপড় তুলে নিয়ে বেরোবার সময় ঘরের দরজা টেনে দিলো ভেলাম্মা।
টেবিলে রাখা কফির গন্ধে একটা মগ্নতা তৈরি হয়েছে ঘরে। অবশ্য বাড়ি জুড়ে প্রায় সবসময়েই কফি, সিগারেট আর অন্য কোনো গন্ধ মিলেমিশে থাকে।
ঠাকুরদা সিঙ্গল মল্ট আর বার্মা চুরুট খেতেন, ঠাকুমা রান্নাঘরে গোলমরিচ পেশাই করাতেন,বাবা পারকোলেটরের কফি পছন্দ করতেন, আর মা জুঁইফুল, দারচিনি এসব ভালোবাসতেন। গন্ধের মৌতাতটা বরাবরই এই বাড়ির একটা অন্যতম অঙ্গ।
তবে যখন তখন কফি খাওয়ার এই বদভ্যাস ধ্রুপদের লন্ডনে থাকতে হয়েছে। এরিক হেফনর, ওর শিক্ষক ও কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। মাঝবয়সী,খোলা মনের, কাজ পাগল লোক। ধ্রুপদকে বিভিন্ন সময় সাহায্য করেছেন নানাভাবে। সারাক্ষণ কফি নয়তো ‘জিম-বিম’খেতেন। ওনার সাথে থাকতে থাকতে ধ্রুপদেরও নেশা হয়ে গেছে।
কফি মাগ হাতে নিয়ে ধ্রুপদ অর্ধসমাপ্ত পেইন্টিং-এর সামনে এসে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। ঠিক মনের মতো হচ্ছেনা। রঙের আবেগ ধরা পড়ছেনা। কোথায় যেন ভাবনায় ভাটা পড়েছে। অগত্যা ইমেল খুলে বসল। কয়েকটা মেইলের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। নভেম্বরে দুটো ওয়ার্কশপ নিতে যেতে হবে। কলকাতা আর দিল্লি। কলকাতায় যাবার তেমন ইচ্ছে নেই। দিল্লির স্টুডিওটাকে কনফার্ম করে উত্তর লিখল।
ফোর্থ নভেম্বর:দিল্লি। রিমাইন্ডার সেট করল।এবার কলকাতাকে কি উত্তর দেওয়া যায় তাই ভাবছে এমন সময় ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। এমনিতেই রিংটোনের শব্দ বিরক্তিকর হয়,এখন যেন এই গোঁ-গোঁ শব্দটাও ভালো লাগেনা।
ট্রুকলারে দেখালো : পার্থপ্রতিম মিত্র।ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্তে মিঃ মিত্র বলে উঠলেন
-” গুড আফটারনুন মিস্টার সুব্রমনিয়াম। ইজ ইট আ গুড টাইম টু টক? আসলে আপনাকে নিমন্ত্রণ করার এই সুযোগটা আমরা একদম হারাতে চাইছিনা।”
– “ওহ,ইয়েস মিস্টার মিত্র।ইনফ্যাক্ট আমি আপনাদের মেইলের উত্তর দিতে বসেছিলাম। আমার যতদূর মনে হচ্ছে ওই সময়ে কলকাতা যাওয়া সম্ভব হবেনা। আমি খুবই দুঃখিত।”
-“কিন্তু আপনার অনুপস্থিতিতে যে এই উদ্যোগটাই মাটি হয়ে যাবে! আমরা একটা সচেতনতা তৈরী করতে চাইছি সাধারণ মানুষের মধ্যে। শিল্পীসত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ যে সবার মধ্যেই ঘটতে পারে,এটা আপনার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? আপনাকে কিন্তু আমরা ভীষণভাবে চাইছি। আমাদের নিরাশ করবেন না প্লিজ।” মিস্টার মিত্রের গলায় অনুনয়।
ধ্রুপদ খুব ভালোভাবেই জানে যে এই উদ্যোগটা অভিনব। কিন্তু কলকাতার জন্যে তার মনে কোথাও একটা প্রচ্ছণ্ণ বিরাগ কাজ করে। সে আরেকটু ভেবে জানাবে বলে ফোন রাখলো।
ইতিমধ্যে আরেকটা নতুন মেইল এসেছে।
এরিক হেফনার,লিখেছেন ধ্রুপদ যেন অবশ্যই চেষ্টা করে কলকাতার কর্মশালায় যোগ দিতে।উনি নিজে খুবই আগ্রহী ছিলেন,কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে এবার সম্ভব হচ্ছেনা।
ধ্রুপদ একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল! এরিকের কথা রাখা উচিৎ। আবার কলকাতায় যেতেও মনের সায় নেই। এইসব ভাবতে ভাবতে শুনতে পেল বাইরে ডুমাডুম শব্দ। ড্রাম বাজাতে বাজাতে ভাসু, ওর দলবল নিয়ে হাজির। ধ্রুপদ বারান্দায় বেরিয়ে দেখল ছ’টা বাচ্চা মুখে অনাবিল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্রমশঃ
চিত্র : Dawid Planeta

Sorry ota kiser byatha?
LikeLike