দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ৩: চেনা অচেনা

এর আগে: চেন্নাইয়ে মাসির বাড়িতে ফিরে,আশাবরী নিজের লেখার কাজ শুরু করে। কিন্তু করাইকুড়ির চেট্টিনাড হাউসের বারান্দায়, বৃষ্টির মধ্যে দেখা সেই দীর্ঘকায় পুরুষ ও তার একজোড়া চোখ আশাবরীকে টানে
Karaikudi

ভেলাম্মা গজগজ করছিল। তার নাতি বালাজি সুজুকি মোটরবাইক কেনার জেদ ধরেছে, কিনে না দিলে সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে,আজকালকার ছেলেমেয়েরা সব উচ্ছন্নে যাচ্ছে ইত্যাদি।
ধ্রুপদের আজ বিছানা ছেড়ে ওঠার কোনো ইচ্ছা নেই। ভোরবেলা অবধি ছবি এঁকেছে তারপর একটু চোখ বুজেছিল। ইতিমধ্যে মার্কাস এসে দুবার চেটে গেছে।তাতেও চোখ খোলেনি।

বছর ছত্রিশের ধ্রুপদ সুব্রমণ‍্যম কিছুদিন আর্কিটেকচার ও ডিজাইন পড়ে পরবর্তীকালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্টস নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে। এরপর ইউরোপে বেশ কিছু বছরের কর্মজীবন সেরে, দেশে ফিরে আপাততঃ করাইকুড়ির পৈতৃক বাড়িতেই থাকে।

চেন্নাই,আমেদাবাদ, লন্ডন, প‍্যারিস ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা আর কাজের জন্য অনেক শহরেই থেকেছে সে। এখন আর শহুরে জীবনের প্রতি টান নেই তার। বিভিন্ন জায়গায় ভিজিটিং ফ‍্যাকালটি হিসেবে বা কোনো ওয়ার্কশপের ডাক পেলে তবেই করাইকুড়ি ছেড়ে বেরোয়।

শিল্পকলার ব‍্যাপারটা এদেশে প্রায় পাইকারি স্তরে চলে গেছে। শস্তা,মোটা রুচির কাজ গিজ্গিজ করছে চারিদিকে। ধ্রুপদের পছন্দ হয়না। সে এখানে বসে বিভিন্ন বিদেশী ম‍্যাগাজিনের জন্য ইলাস্ট্রেশন করে। দেশ বিদেশের শিল্পী বন্ধুরা এলে সবাই মিলে গ্রামের বাচ্চাদের নিয়ে আর্ট ক‍্যাম্প, প্রিন্ট মেকিং এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

এই বাড়ি সামলায় বুড়ি ভেলাম্মা ও তার স্বামী গনেশন। ধ্রুপদের ঠাকুরদার আমল থেকে ওরা এখানে রয়েছে। এছাড়া আছে মার্কাস,দুই বছরের সাদা এক ল‍্যাব্রাডর। বাবা মারা যাবার পর এরাই এখন ধ্রুপদের পরিবার ।

বাড়িটা ১৯০৫ নাগাদ ধ্রুপদের প্রপিতামহ চেট্টিয়ার অরুমুগম বানিয়েছিলেন। চড়া সুদে টাকা ধার আর দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় কাঠ ও মশলা আমদানি-রপ্তানির ব‍্যবসা ছিল তাঁর। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইউরোপ, সিলোন, জাপান প্রভৃতি দেশে বানিজ্য করে বেড়াতেন।

ভারি শৌখিন মেজাজের লোক ছিলেন। সিলোন থেকে বৈঠক খানার আসবাবপত্র আনিয়েছিলেন। বসিয়েছিলেন পর্তুগিজ টাইল্স,জার্মান কাস্ট আয়রনের গেট, ইতালীয়ান সাঁঝবাতি,বেলজিয়ান আয়না। তবে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মে বাড়ির দশা যে বেশ উদাসীন হয়ে পড়বে সেটা বুঝতে পারেন নি।

তাঁর বড় ছেলে মোটর আ‍্যক্সিডেন্টে মারা যায়। ছোট ছেলে বরদারাজন অর্থাৎ ধ্রুপদের ঠাকুরদার ছিল জুয়ার নেশা। সম্পত্তির অনেক কিছুই জুয়ায় বিলিয়ে তারপর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে, শেষ জীবনটা অন‍্যদের দোষারোপ করতে করতে মারা যান।

এই অঞ্চলের বেশীরভাগ চেট্টিয়ার ম‍্যানশনকেই এক একটা বুটিক হোটেলে পাল্টে ফেলছে কিছু বাণিজ্যিক সংস্থা। করাইকুড়ি এখন কালচারাল ট্যুরিজমের আকর্ষণ বিদেশী টুরিস্টদের কাছে।

অন‍্যান‍্য চেট্টিয়ার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে অধিকাংশই প্রবাসী ভারতীয়। তাদের পক্ষে আর এই সম্পত্তিগুলি রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয়না। এককালীন মোটা টাকায় সম্পত্তি বিক্রি করে ভারমুক্ত হয়েছে অনেকেই।

ধ্রুপদের কাছেও এভিনিউ গ্রূপ ওফ হোটেলস্ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছে বেশ কয়েকবার, সঙ্গে দালাল নিয়ে। তাদের প্রস্তাব মন দিয়ে শোনার পর ধ্রুপদ ভদ্র ভাবে না বলেছিল। তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই উৎপাত করে ওরা। টাকার লোভে কাজ না হওয়ায় এখন হুমকি দেওয়ার পালাও শুরু হয়েছে। ধ্রুপদ পাত্তা দেয় না। এদের স্বভাবই এরকম হয় সে জানে।

বাইরে ভেলাম্মার গজগজের সঙ্গে মার্কাসের প্রতিবাদ যোগ হয়েছে, উঠোনে বোধহয় সাদা হুলো বিড়ালটা আবার মাস্তানি করছে।

নাহ্! আজ আর ঘুম হলনা। ধ্রুপদ উঠে বসল।

বিছানা ছেড়ে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এল। বৃষ্টিতে এই অঞ্চলের লাল মাটি ভিজে গিয়ে অপূর্ব একটা রং হয়। এটাকে কালার পিগমেন্ট হিসাবে ব্যবহার করার ইচ্ছে আছে।

বৃদ্ধ গণেশন গেটের সামনে রয়াল এনফিল্ড বাইকের চেন ঠিক করছিল,ধ্রুপদকে দেখেই বলে উঠল
-” এবার কিন্তু মেইন গেট সারাই করতে হবে, শহর থেকে ভালো মিস্ত‍্রি আনাও, নাহলে হুটহাট অচেনা লোকজন বাড়িতে ঢুকে পড়ছে”।

ধ্রুপদ মনে ‌মনে একটু ‌হাসল।

‘অচেনা লোক!? সত্যিই তো! নাম পর্যন্ত জানা হয়নি! অচেনাই রয়ে গেল।

ক্রমশঃ

চিত্র: DakshinChitra

6 thoughts on “পর্ব ৩: চেনা অচেনা”

    1. অসংখ‍্য ধন্যবাদ। আগামী পর্ব এই শুক্রবার।

      Like

  1. খুব সুন্দর… এগিয়ে চলুক… অপেক্ষা আরেকটু কম করতে হলে আরো বেশি ভালো লাগবে…☺☺☺

    Like

    1. অসংখ‍্য ধন্যবাদ। প্রকাশনার সংখ্যা বাড়াবার ব‍্যাপারে পরিকল্পনা চলছে। পাঠকদের উৎসাহী যোগদান ও মন্তব্য পেয়ে খুব ভালো লাগছে।

      Like

Comments are closed.