দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ২: দক্ষিণ দুয়ার

এর আগে: ভ্রমণ কাহিনী লেখার কাজে আশাবরী সেন তামিল নাড়ুর করাইকুড়িতে এসে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে, এক পুরনো চেট্টিনাড হাউসের বারান্দায় আশ্রয় নেয়। সেখানে দেখা পায় এক পুরুষের,যার চোখের দিকে তাকিয়ে আশাবরীর বিদ্যাপতির কবিতা মনে পড়ে।
Indira Nagar, Chennai.

সকাল থেকে তিন কাপ কফি হয়ে গেল, কিন্তু লেখাটা একটুও এগোলোনা। ল‍্যাপটপ আর টেবিল ছেড়ে উঠে, জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় আশাবরী।আজ বাইশে শ্রাবণ। হোয়াটস‍্যাপ আর ফেসবুক মেসেঞ্জারে সকাল থেকে লোকে অতিপৃক্ত হয়ে পড়া রবীন্দ্র অনুরাগ পাঠিয়ে চলেছে অবিরাম, বিরক্তিকর।
একটা সিগারেট ধরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল আশাবরী। জানালার নীচে ইন্দিরানগর পাড়া,বেশ নিরিবিলি আর গাছগাছালিতে ভরতি। এখানে মাসির বাড়ি। চেন্নাই এলে এখানেই ওঠে।মেশো আর মাসি সন্তানহীন।আশাবরী এলে খুব খুশি হন দুজনে।

আশাবরীর ছোটবেলাটা বেশিরভাগই কেটেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্টিলটাউন গুলিতে। বাবার কাজের সূত্রে বোকারো, ভিলাই, বার্ণপুর ইত্যাদির পরে বাবা-মা জামশেদপুরে স্থায়ী বসবাস শুরু ‌করেন। ছোটবেলা থেকেই নিজের শহর বা হোমটাউন বলতে লোকে যেটা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সেরকম কিছু আশাবরীর নেই। তবে এই বিভিন্ন শহরে ঘুরে বড় হয়ে ওঠার ফলে ওর মধ‍্যে একটা ভবঘুরে ভাব বাসা বেঁধেছে।

ওর দিদির এইসব ঘর-বাড়ি, সংসার নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ছিল,যাকে বলে সংসার-মুগ্ধ। সকলে রঞ্জনী বলে ডাকে।স্বভাবে বিপরীত হলেও আশাবরীর সমস্ত বেড়ে ওঠার এক প্রকান্ড ছায়াবীথি ওর দিদি।আশাবরীর দুষ্টুমির প্রশ্রয়।যে গুটিকয় মানুষ আশাবরীকে বুঝতে পারে রঞ্জনী তার মধ‍্যে একজন। বাবা-মা’র সাথে আশাবরীর দূরত্ব বরাবরের।বিশেষত রঞ্জনীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির পর থেকে মা-বাবা কে নিজের ভাবতেও আশাবরীর কষ্ট হয়।

-“আশি.. এগারোটা বাজলো…”
মাসিমণি নিচের তলা থেকে ডাকল। চিন্তায় একটু বিরাম এল।

মাসিমণির সাথে এখনও আশাবরীর সেই ছোটবেলার মতনই আবদারের সম্পর্ক। মাসিমণির কোলের উপর পা তুলে দিয়ে আচার খেতে খেতে খুনসুটি, তাঁর সাথে ইমন কল্যাণে গলা মেলানো আর ফটোগ্রাফার মেসোর আড়াল থেকে এইসব টুকিটাকি মূহূর্ত ক‍্যামেরাবন্দি করে রাখা। এই বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে ওর আর রঞ্জনীর বিভিন্ন বয়সের ছবি। ওদের নামদুটোও মাসিমনির রাখা। আশাবরী আর শিবরঞ্জনী।

এবারের লেখাটা দক্ষিণের চেট্টিনাড হাউস ও তার ইতিহাস নিয়ে লিখছে তাই মাসিমণির বাড়ি আসার আবার একটা সুযোগ হয়েছে।

দু’দিন হল করাইকুড়ি থেকে রিসার্চ সেরে ফিরেছে কিন্তু লেখাটা কিছুতেই এগোচ্ছেনা। এবারের পূজাবার্ষিকীতে বেরনোর কথা। আরেকটা দিন থাকতে পারলে ভাল হতো, বাড়িগুলির ইন্টিরিয়রের আরো কয়েকটা ছবি দরকার ছিল। সেদিন মাঝপথে বৃষ্টি নেমেই সব গুলিয়ে দিল।গৃহকর্তাটিকে কোনরকমে একটা শুকনো ধন্যবাদ আর বিদায় জানিয়েই আশাবরী গাড়িতে উঠে পড়েছিল। মানুষটির চোখে একটা হাসি লেগে ছিল যেন।আলাপচারিতা কিছুই হয়ে ওঠেনি,এমনকি নাম পর্যন্ত না। হয়তো অন‍্যরকমের কোনো নতুন গল্পও পাওয়া যেত! ইশ্! ট্রেনে ফেরার সময়ও মনটা খচখচ করছিল।

-“কিরে? তুই আজ চানে যাবি না!?” মাসিমণি উপরে উঠে এসেছে ।

-“তুমি সেরে নাও আগে, আমার একটু দেরি হবে” আশাবরী উত্তর দিল।

-“দিন দিন একটা জিপসি হয়ে যাচ্ছিস! দাঁড়া,তোর এবার বিয়ে দিতেই হবে, আমি রঞ্জনীকে বলছি।” মাসিমণি আদরের শাসন জানিয়ে চানে চলে গেল।

চোখ বুজল আশাবরী। মাথার মধ্যে লেখাটা গুছিয়ে আনতে চেষ্টা করছে।মনে মনে লেখার শিরোনামগুলি আবার ভাবল…দক্ষিণের বারান্দা…না খুব কমন, দখিন দরজা…দখিনা হাওয়া…নাহ্,হচ্ছে না।

সেই ‘চঞ্চল খঞ্জন জোড়‘ দেখতে পেল।

ক্রমশঃ

চিত্র: Ottokim

4 thoughts on “পর্ব ২: দক্ষিণ দুয়ার”

Comments are closed.