দক্ষিণ দুয়ার, ধারাবাহিক কাহিনী

পর্ব ১: Petrichor

Karaikudi, Tamil Nadu.

ভিন্টেজ পোস্টকার্ড প্রিন্টের মতন দেখতে পুরোনো ভাঙ্গা পোস্ট অফিস ঘরটার বিভিন্ন কম্পোজিশনে কয়েকটা ছবি তুলতে তুলতে, আশাবরী লক্ষ্যই করেনি কখন মাথার উপর ঘন কালো মেঘ এসে জমেছে।

বড়বড় ফোঁটায় নিমেষের মধ্যে বৃষ্টি নেমে গেল। আশাবরী সঙ্গে ছাতা আনেনি। দিশেহারা হয়ে আশেপাশে তাকাল। কিছুটা দূরে আরেকটা চেট্টিয়ার ম‍্যানসন দেখা যাচ্ছে। বাড়িটা পুরোনো কিন্তু লোকজনের বসবাস আছে বলেই মনে হয়। আর ওসব ভাবার অবকাশ নেই। যত জোরে বৃষ্টি নামছে, ততোই দ্রুত আলো কমে আসছে। আশাবরী দৌড়ে বাড়িটার ভাঙা গেট পেরিয়ে,সামনের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নিল।

বেশ ভিজে গেছে। খেয়াল ছিলনা, হাঁটতে হাঁটতে হোটেল থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছিল। এখন বৃষ্টি থামলে হয়। ওদিকে সাতটা নাগাদ কার্তিককে বলা আছে। গাড়ি করে স্টেশনে যেতে হবে। আজই ফিরে যাবে চেন্নাই। আশাবরী একবার চারিদিকটায় চোখ বোলাল। এই বাড়িটাও অন্যান্য চেট্টিয়ার হাউসগুলির মতন। সেই আতাঙ্গুডি টাইল্সের মেঝে, বার্মাকাঠ আর পাথর মেশানো থামের সারি, দরজায় ইউরোপীয় শৈলীর কাঠের নক্সা। কিন্তু একটু অযত্নের ছাপ চারিদিকে।বাড়ির ভিতর থেকে পারকোলেটারে চুঁইয়ে পড়া দেশীয় কফির গন্ধ আসছে। চারিদিকে একটা উদাসীনতা ছড়ানো।

একটু চমকে আবছা আলোয় দেখতে পেল এক দীর্ঘকায় পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে সদর দরজার কাছে।পরনে সাদা মুন্ডুবেষ্ঠি ও খয়েরী কুর্তা। গায়ের রঙটা পিতলের মতন।
আশাবরী ইংরেজিতে বলে উঠল
– “দুঃখিত,অনধিকার প্রবেশ করে ফেলেছি। হঠাৎ এতো জোরে নামল, কাছাকাছি আর কিছু ‌দেখতে না পেয়ে…” বলে হাসার চেষ্টা করল। বুকটা একটু দুরুদুরু করছে, এরকম হঠাৎ করে একা এখানে ঢুকে পড়াটা একটু বেয়াক্কেলে ব‍্যাপার হয়েছে। কিন্তু উপায়ও তো ছিলনা!

-“হুম‌্।” বলেই লোকটি ‌অন‍্যমনস্ক হয়ে বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।যেন এর বেশি জানার প্রয়োজন নেই!

লোকটা কি এখানেই দা৺ড়িয়ে ছিল? মনে করতে পারছে না। ঠিক তখনই আরেকটি পুরুষালী অথচ কর্কশ গলা পেল আশাবরী। এই লোকটি বয়স্ক, পরনে সাদা ধুতি শার্ট,একটু সন্দিগ্ধ ভাব।
কোত্থেকে আসছেন?এখানে কেন? ইত্যাদি প্রশ্ন শুরু করল।

আশাবরী ব্যাপারটা সামলে নিল। সে ভ্রমণকাহিনী লেখে।এইরকম অভিজ্ঞতা তার কাছে নতুন নয়। লেখার কাজে অনেকবার অনেক অচেনা জায়গায় গিয়েছে আর সেখানে এরকম প্রশ্ন তাকে হামেশাই শুনতে হয়েছে।

-“আপনি চাইলে এখানে বসতে পারেন” বারান্দায় অনাদরে রাখা একটা বার্মা কাঠের চেয়ারের দিকে ইশারা করল পিত্তল পুরুষ।

-“যতক্ষণ না বৃষ্টি থামছে” তার গলার স্বরে একটু দ্বিধা মেশানো।

-“ওটা তো ভাঙা! বসা যাবে না”। অন‍্যদিক থেকে বৃদ্ধ লোকটি উত্তর দেয়। অবাঞ্ছিত তরুণীকে আপ‍্যায়ন করার তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই বোঝা গেল।

-” ব‍্যাস্ত হবেন না আমি ঠিক আছি। তাছাড়া আমার গাড়িটা এখুনি এসে পড়বে” বলল আশাবরী। কথা শেষ করতে গিয়ে চোখ পড়ল দীর্ঘকায় পুরুষটির চোখে।

তাপর চঞ্চল খঞ্জন জোড়”!

মনে মনে হেসে ফেলল আশাবরী।এইরকম সময়েও তার কিসব মনে পড়ছে। ভিজে চুপসে যাচ্ছে সব।কফি আর তপ্ত ভেজা মাটির গন্ধ মিলেমিশে গেছে। মানুষটিকে নিয়ে বেশ কৌতুহল জাগছে মনে। আলাপটা সেরে ফেলা যাক। কিন্তু ব‍্যাগের মধ্যে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। কার্তিক ফোন করেছে।

ক্রমশঃ

Petrichor: বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ।
চিত্র: Pinterest, Google Images.
উদ্ধৃতি: বিদ্যাপতি(রাধার অনুরাগ)

7 thoughts on “পর্ব ১: Petrichor”

  1. Ashaborir anubhuti k anuvob korte parlam….eto sundor 1ta lekha upohar dawar jonne dhonnyobad. ..kintu 1 hopta oppeksha korte hobe vebe khub dukkho hochche😞

    Like

    1. ধন্যবাদ। ভালো লেগেছে যেনে খুশি হলাম।

      Like

Comments are closed.